November/ বলশেভিক/ রুশ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি লেখো :- বিশ্ব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হল ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব। যা বলশেভিক বিপ্লব হিসাবেও পরিচিত। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব হঠাৎ ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুরাবস্থা দেশকে অনিবার্য ভাবে বিপ্লবের পথে নিয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক লিপসনের মতে রুশ বিপ্লবের শিকড় প্রোথিত ছিল রাশিয়ার ইতিহাসের মধ্যেই।
Table of Contents
READ MORE – ওয়েস্ট ফেলিয়ার শান্তি চুক্তি

November/ বলশেভিক/ রুশ বিপ্লবের কারণ বা পটভূমি লেখো
*বিপ্লবের কারণ: রুশ বিপ্লবের কারণগুলি হল-
(ক) স্বৈরতান্ত্রিক জারতন্ত্র:
রুশে সর্বোচ্চ প্রশাসন যন্ত্র ছিল জারের হাতে। এই জার ছিলেন ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী, রক্ষণশীল মানসিকতাসম্পন্ন এবং স্বৈরতান্ত্রিক ভাবধারায় শিক্ষিত। আস্তে আস্তে জার বিরোধী রাজনৈতিক দল সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্রমশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে যার অনিবার্য পরিণাম হল রুশ বিপ্লব।
(খ) কৃষকদের দূরবস্থা:
রুশ অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষি। কিন্তু অধিকাংশ কৃষক পরিবারের সারা বছর খাবার জুটত না। জার দ্বিতীয় আলোকজান্ডার ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটালেও সাধারণ কৃষকদের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। এর প্রতিবাদে কৃষকরা ঘন ঘন বিদ্রোহ করেছে।

(গ) শ্রমিকদের অসন্তোষ :
উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রাশিয়ায় শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়। কিন্তু এই বিপ্লব শ্রমিক জীবনের দুঃখ দুর্দশার অবসান ঘটাতে পারেনি। স্বল্প বেতন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জীবিকার নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা না থাকা, শ্রমিক আন্দোলনের অধিকার না থাকা প্রভৃতি বিষয়গুলি শ্রমিকদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল। ফলে ক্রমে শ্রমিকশ্রেণি জারতন্ত্রের বিরোধী হয়ে ওঠে।
(ঘ) দার্শনিকদের ভূমিকা:
রুশ বিপ্লবের পটভূমি প্রস্তুতিতে দার্শনিকদের অবশ্যই যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। গোর্কি, টলস্টয়, তুর্কোনিভ প্রমুখ রুশ সাহিত্যিকদের রচনা রুশ বিপ্লবের মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদ ও কার্ল মার্কসের সাম্যবাদ, রুশ বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও চেতনাকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। এঁদের রচনা থেকে সর্বপ্রকার শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শক্তি জনসাধারণ লাভ করেছিল।
(৫) দুর্বল অর্থনীতি:
দুর্বল জারদের আমলে রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, রাশিয়ার পেট্রোলিয়াম, কয়লা, রাসায়নিক, ইঞ্জিনিয়ারিং, লোহা ইস্পাত শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল। ফলে রাশিয়ার বিদেশি ঋণের পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের আর্থিক দুর্দশা বৃদ্ধি পায়। অথচ শিল্পায়নের ফল ভোগ করত মুষ্টিমেয় বিত্তশালী কিছু মানুষ। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে।
(চ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার যোগদানের ফলে তার কোনো বৃহৎ আর্থিক বা রাজনৈতিক লাভ হয়নি। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক। এই যুদ্ধে ১০ মিলিয়ন সেনার রসদ জোগাড়ে রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। বিভিন্ন রণাঙ্গণে রাশিয়ার পরাজয় ঘটে এবং প্রায় ৬০ লক্ষ রুশ সেনা প্রাণ হারায়। এই যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটাতে রুশ জনগণের ওপর বিপুল করভার আরোপিত হয়, যার ফলে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ‘বৃদ্ধি পায়।
(ছ) রুশীকরণ নীতি:
রুশ জাতি ছাড়া আরও বহু অ-রুশ জাতি রাশিয়ায় বসবাস করত। এই সমস্ত জাতির জাতীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে জোর জবরদস্তি রুশ সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়া ছিল জারতন্ত্রের সুপরিকল্পিত নীতি। স্বভাবতই এরা জারন্ত্রের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে তাদের স্বাধীন জাতীয় সত্ত্বা রক্ষার জন্য ও গণতান্ত্রিক সংবিধান ও সম-অধিকারের জন্য লড়াই চালায়। বলশেভিক দল এই জাতিগোষ্ঠীকে আশ্বাস দেয় যে, যদি তারা ক্ষমতায় আসে তবে তারা এই সকল জাতিকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেবে।
(জ) বলশেভিকদের ভূমিকা :
১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবে বলশেভিকদের ভূমিকা ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বলশেভিক দল দলীয় পত্রিকার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বৈপ্লবিক ভাবধারা সঞ্চার করে। সর্বোপরি, বলশেভিক নেতা লেনিনের বাগ্মিতা, নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ রুশ জনতা সমাজবাদের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে ওঠে।
মূল্যায়ন:
রুশ বিপ্লবের প্রভাবে রাশিয়াতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন ঘটায়। রুশ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রুশ বিপ্লবের ফলে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। রুশ বিপ্লব সমগ্র পৃথিবীর মানুষের চিন্তাধারায় এক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।
ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ, যিনি সাধারণত লেনিন নামে পরিচিত, ছিলেন একজন রুশ বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তিনি ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল রাশিয়ার সিম্বিরস্কে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারী রাশিয়ার গোর্কিতে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবে লেনিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত করে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবে লেনিনের ভূমিকা লেনিনের নেতৃত্ব এবং আদর্শ রুশ বিপ্লবের গতিপথ এবং ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
বিপ্লবে তাঁর ভূমিকার ব্যাখ্যা :-
১. বলশেভিক পার্টির নেতৃত্ব –
লেনিন বলশেভিক পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যা রাশিয়ান অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে একটি উগ্র সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ছিল। – তিনি বিপ্লবের সময় বলশেভিকদের শক্তিশালী নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।

২. মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শের বিকাশ: –
লেনিন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মতাদর্শ বিকশিত করেছিলেন, যা কার্ল মার্ক্সের কমিউনিজমের নীতিগুলিকে বিপ্লব এবং দলীয় সংগঠন সম্পর্কিত লেনিনের নিজস্ব তত্ত্বের সাথে একত্রিত করেছিল। – তার মতাদর্শ একটি অগ্রণী দলের গুরুত্ব এবং সর্বহারা একনায়কত্ব অর্জনের জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিল।
৩. এপ্রিল থিসিস :-
১৯১৭ সালের এপ্রিলে, লেনিন নির্বাসন থেকে রাশিয়ায় ফিরে এসে এপ্রিল থিসিস উপস্থাপন করেন, যেখানে বিপ্লবের জন্য তার দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। – তিনি অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত, যুদ্ধের সমাপ্তি এবং সোভিয়েতদের (শ্রমিক পরিষদ) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান।
৪. অক্টোবর বিপ্লব :-
১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে লেনিন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন যা সফলভাবে অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করেছিল। – তিনি বলশেভিকদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন দখলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং কার্যকরভাবে পেট্রোগ্রাড (বর্তমানে সেন্ট পিটার্সবার্গ) এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। অক্টোবর বিপ্লব ছিল ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে এই বিপ্লব রাশিয়ার অস্থায়ী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিত্তি স্থাপন করে। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে জমি ও শিল্প কারখানার উপর ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্ত করা হয়। এই বিপ্লব কেবল রাশিয়ার অভ্যন্তরেই পরিবর্তন আনেনি, বরং বিশ্বজুড়ে সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রসারে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এটি বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
৫. শান্তি, জমি এবং রুটি –
লেনিনের স্লোগান “শান্তি, জমি এবং রুটি” জনসাধারণের কাছে অনুরণিত হয়েছিল এবং বলশেভিকদের পক্ষে সমর্থন আদায়ে সহায়তা করেছিল। – যুদ্ধের অবসান, কৃষকদের জমি পুনর্বণ্টন এবং জীবনযাত্রার অবস্থার উন্নতির প্রতিশ্রুতি তাকে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন এনে দেয়।

৬. সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন –
বিপ্লবের পর, লেনিন বলশেভিক শক্তিকে সুসংহত করার এবং একটি নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলেন। – ১৯২২ সালে, তিনি সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ইউনিয়ন (ইউএসএসআর) গঠনের নেতৃত্ব দেন, যা বিশ্বের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
উপসংহার :-
১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লবের সাফল্যে লেনিনের নেতৃত্ব, আদর্শ এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীকালে কমিউনিজমের প্রসারে তার ভূমিকা বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।