You are currently viewing ভার্সাই চুক্তি 1919
ভার্সাই চুক্তি 1919 এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি

ভার্সাই চুক্তি 1919

ভার্সাই চুক্তি 1919 এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি 1919 (Treaty of Versailles (1919) and U.S. President Woodrow Wilson’s Fourteen Points Policy)।ভার্সাই চুক্তি 1919 সালের ২৮শে জুন স্বাক্ষরিত হয়। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এবং মিত্রশক্তির মধ্যে সম্পাদিত একটি শান্তি চুক্তি ছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। জার্মানির উপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছিল এবং এর ফলে জার্মানির অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি চুক্তি ছিল ভার্সাই চুক্তি (১৯১৯)। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করা হয় এবং কঠোর আর্থিক, আঞ্চলিক ও সামরিক শর্ত আরোপ করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল জার্মানিকে দুর্বল করে ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা থেকে বিরত রাখা।

READ MORE – হিটলার ও ন্যাৎসীবাদ (Hitler and Nazism) (1918-1933)

ভার্সাই চুক্তি 1919 এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি

ভার্সাই চুক্তি (1919)

ভার্সাই চুক্তি 1919 এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর জার্মানি মিত্রপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে ৩২টি দেশের ৭২ জন প্রতিনিধিরা শান্তি সম্মেলনের উদ্দেশ্যে প্যারিসে সমবেত হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই শান্তি সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডে। কিন্তু ফ্রান্সের একগুয়েমি মনোভাবের জন্য বিশেষ করে ১৮৭০ সালের বিসমার্কের মিথ্যা এমস টেলিগ্রামের প্রচারের জন্য ফ্রান্স সেই রাগ ঘুরে বসে মেটাতে চেয়েছিল।

তাই সুইজারল্যান্ডের পরিবর্তে ফ্রান্সের প্যারিসে বসেছিল বৈঠক। আর এই সম্মেলন মূলত চারটি দেশের প্রতিনিধি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। এঁরা হলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েডজর্জ, ফরাসী প্রধানমন্ত্রী লর্ড ক্লিমেনশো, ইতালির প্রধানমন্ত্রী অলান্ডো এবং আমেরিকার রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন। এই চারটি দেশকে একত্রে Big Four বলা হত। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ক্রিমেনশো।

           পরাজিত জার্মানির সঙ্গে মিত্রপক্ষের ১৯১৯-এর ২৮ জুন ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। মিত্রপক্ষ জার্মানির ওপর সামরিক অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক শর্ত চাপিয়ে দেয় এবং সন্ধির শর্ত না মানলে জার্মানিকে পুনরায় আক্রমণের হুমকি দেয় ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ঘোষণা করেছিলেন যে জার্মানি ভার্সাই সন্ধি না মানলে তাকে বার্লিনে সন্ধি করতে হবে। চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও ২৩০ পৃষ্ঠার লিখিত সন্ধিপত্রে জার্মানরা ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হয়। ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানিকে যুদ্ধ অপরাধী বলে ঘোষণা করা হয় এবং জার্মানির ওপর এমনভাবে অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক শর্ত চাপানো হয়, যাতে জার্মানি পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল।

♦ ভার্সাই সন্ধির আর্থিক শর্ত:-

(ক) জার্মানির ওপর বিরাট আর্থিক ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপানো হয় এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য মিত্রশক্তি একটি ক্ষতিপুরণ কমিশন গঠন করে। পরাজিত ও বিধ্বস্ত জার্মানীকে ৬৬০ কোটি পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। এ যেন হাঁসকে খেতে না দিয়ে সোনার ডিম আশা করার সমান।

(খ) কয়লা খনি সমৃদ্ধ সার উপত্যকা ফ্রান্সকে দিতে বলা হয় ১৪ বছরের জন্য। পরে গণভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে সার অঞ্চল ফ্রান্স না জার্মানির সঙ্গে থাকতে চায়।

(গ) জার্মানি আগামী দশ বছরের জন্য মিত্রপক্ষের ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়ামকে কয়লা সরবরাহ করবে।

(ঘ) রাইন নদীর আন্তর্জাতিককরণ করা হয়।

(ঙ) মিত্রশক্তি জার্মানিতে তাদের পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের অধিকার পায়।

(চ) মিত্রপক্ষকে জার্মানি ৫০০০ রেলইঞ্জিন ও দেড় লক্ষ মোটরগাড়ি সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।

(ছ) জার্মান উপনিবেশগুলিতে জার্মানির সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

(জ) জার্মানি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামকে অশ্বভেড়া ইত্যাদি সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।

          উল্লেখ যে, জার্মানি কি পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেবে তা চুক্তি পত্রের ২৩১ নং ধারায় বলা ছিল। তবে জার্মানিও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং জার্মান প্রতিনিধিদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন ভালো ব্যবহার করা হয়নি বা তাদের এক আসনে বসতেও দেওয়া হয়নি। তারা চুক্তিপত্রের বহুধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেও তাদের কথা মিত্রবর্গ কর্ণপাত করেনি।

জার্মানিকে শাস্তি দেওয়া ও ভবিষ্যত যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে যেভাবে জার্মানির প্রতি সন্ধি চাপানো হয়েছিল তাঁকে অনেকেই জবরদস্তি মূলক সন্ধি বা Dictated Peace বলেছেন। ফিলিপ সীডম্যান ‘মৃত্যুপরিকল্পনা’ এবং ‘দাসত্বের নামান্তর’ বলেছেন। অধ্যাপক কিম্‌স্ একে ‘কার্থেজিয়ান পিসে’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। অধ্যাপক জে এল কারভিন লিখেছেন সমস্যা সমাধানের নামে মিত্রশক্তিবর্গ ভার্সাই সন্ধির মধ্য দিয়ে জার্মানির প্রতি অবিচার করেছিল যা থেকে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

ভার্সাই চুক্তি(1919) এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি

মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দ দফা নীতি

ভার্সাই চুক্তি 1919 এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন উড্রো উইলসন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ভার্জিনিয়াতে তাঁর জন্ম হয়। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি ১৯১৩-১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এই আট বছর আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আমেরিকাকে যুদ্ধ থেকে মুক্ত রাখেন। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করলে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দতে তিনি মিত্রপক্ষের হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

যুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি মার্কিন কংগেসে তিনি তাঁর বিখ্যাত ১৪ দফা নীতি ঘোষণা করেন। এই ১৪ দফা শর্তকে শান্তির ভিত্তি হিসাবে গ্রহণের জন্য মিত্রপক্ষের কাছে আবেদন জানান। এরপর ফেব্রুয়ারি ও সেপ্টেম্বর মাসের আরো কয়েকটি বক্তৃতায় তিনি তাঁর ওই চোদ্দো দফা শর্তের কথা জানান। এই নীতিতে তাঁর Peace without Victory পরিকল্পনা বর্ণিত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরতির আগে থেকেই জার্মানির সঙ্গে উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা নীতি নিয়ে আলোচনা হয়।

এই চোদ্দো দফা নীতিগুলি হল-

(১) সমস্ত রকম গোপন চুক্তি পরিহার করে প্রকাশ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

(২) যুদ্ধ ও শান্তির সময়ে সমুদ্রে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না।

(৩) প্রত্যেকটি দেশ তার অভ্যন্তরের নিরাপত্তার বেশি অস্ত্র রাখতে পারবে না।

(৪) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের জন্য সমস্ত অর্থনৈতিক বাধা দূর করতে হবে।

(৫) নিরপেক্ষভাবে সমস্ত রকম উপনিবেশিক দাবির মীমাংসা করতে হবে।

(৬) রাশিয়ার যে অঞ্চলগুলি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তা রাশিয়াকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

(৭) বেলজিয়াম থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করে তাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

(৮) ফ্রান্সকে তার অধিকৃত অঞ্চল ফিরিয়ে দিতে হবে।

(৯) ইতালির নতুন করে সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয়তার দিকটি প্রাধান্য পাবে।

(১০) অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির জনগণের স্বশাসনের অধিকার দিতে হবে।

(১১) রুমানিয়া, সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর অধিকৃত সমস্ত অঞ্চল তাদেরকে ফেরৎ দিতে হবে, এবং সেই সঙ্গে সার্বিয়া যাতে সমুদ্রে যেতে পারে তার জন্য সুযোগ করে দিতে হবে।

(১২) অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের, তুর্কি অধ্যুষিত অঞ্চলের স্বাধীনতা স্বীকার করে নিতে হবে এবং অতুর্কি জাতিকে স্বশাসন দিতে হবে।

(১৩) পোল অধ্যুষিত স্বাধীন ও সার্বভৌম পোল্যান্ড রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। এবং পোল্যান্ড-এর সঙ্গে সমুদ্র যোগাযোগ স্থাপনের অধিকার দেওয়া হবে।

(১৪) ছোটো বড়ো সকল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। এবং তার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। উড্রো উইলসনের এই ১৪ দফা নীতির ওপর ভিত্তি করেই জামানি ১৯১৮-এর নভেম্বরে আত্মসমর্পণ করে। তবে তার সমুদ্রের নৌ চলাচলের অধিকার ও নিরপেক্ষভাবে ঔপনিবেশিক দাবির মীমাংসা ইত্যাদি মেনে নেওয়া হয়নি। তবে উইলসন যে আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছিলেন তার ওপরে ভিত্তি করেই লীগ অব নেশনস্ (League of Nations) জাতিসংঘ স্থাপিত হয়েছিল।

ভার্সাই চুক্তি(1919)

মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দদফা নীতি

Leave a Reply