d-day-day-of-deliverence-ডি-ডে’-দিবস-1944 – ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন মিত্রশক্তির পক্ষে পশ্চিম ইউরোপে অবস্থিত ফ্রান্সের নর্মান্ডিতে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার দিনটিকে বলা হয়। সোভিয়েত রাশিয়ায় জার্মা আক্রমণের পর জোশেফ স্টালিন মিত্রপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়ে পূর্ব ইউরোপ থেকে পশ্চিম ইউরোপে যুদ্ধের রণাঙ্গন সরিয়ে নিতে বলেন। কিন্তু মিত্রশক্তি তাতে সাড়া দেয়নি। তাদের যুক্তি ছিল ইতালি ও আফ্রিকার যুদ্ধের অবসান ঘটার পূর্ব পর্যন্ত এরূপ কিছু করা সম্ভব নয়।
আসলে মিত্রপক্ষ চেয়েছিল হিটলারের আক্রমণের মাধ্যমে আগে সোভিয়েত রাশিয়ায় সাম্যবাদ ধ্বংস হোক। কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতিতে রুশ সেনাবাহিনী গেরিলা আক্রমণের দ্বারা জার্মানি বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল স্টালিনের পূর্ব তম মানতে বাধ্য হন এবং দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার সিদ্ধান্ত নেন।
Table of Contents

d-day-day-of-deliverence-ডি-ডে’-দিবস-1944:-
• রুজভেল্টের প্রস্তাব:-
ইউরোপের পশ্চিম দিকে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার জন্য আলোচনার লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, রুশ রাষ্ট্রপ্রধান জোশেফ স্টালিন এবং আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্ক ডি রুজভেল্ট তেহরান বৈঠকে মিলিত হন (১৯৪৩ খ্রি., নভেম্বর)। এই বৈঠকে চার্চিল প্রস্তাব রাখেন ইতালিতে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনীর অবতরণ ঘটানো হোক। রুজভেল্ট পালটা প্রস্তাব রেখে জানান উত্তর ফ্রান্সের নর্মান্ডিতে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনীর অবতরণ ঘটানো উচিত। বৈঠকে রুজভেল্টের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
তেহরান বৈঠকে ঠিক হয়েছিল প্রথমে ৩৬ ডিভিশন ও পরে ১০ ডিভিশন সেনা নর্মান্ডিতে অবতরণ করবে। এই সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকবে ১০ হাজার বিমান এবং ৭,৫০০টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনীতে মার্কিন, ডাচ, ব্রিটিশ, ফরাসি, পোল, নরওয়েজীও কানাডিয়ান ও গ্রিক প্রভৃতি সৈন্যের সমাবেশ ঘটেছিল। সেনা অবতরণের আগের দিন অর্থাৎ ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ জুন সন্ধ্যায় মিত্রবাহিনীর প্রায় হাজার খানেক জঙ্গিবিমান ফ্রান্সের উপকূলবর্তী জার্মান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলির ওপর প্রবল বোমাবর্ষণ করে।
এইভাবে ওই অঞ্চলের সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এরপর ৬ জুন ভোরে সূর্যোদয়ের আগে মার্কিন সেনাপতি আইজেন হাওয়ারের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড থেকে চার হাজারেরও বেশি জাহাজে ১,৫৬,০০০ মিত্রসেনা নর্মান্ডি উপকূলের ৬০ মাইলব্যাপী অঞ্চলে পাঁচটি স্থানে অবতরণ করে। সেই সঙ্গে তাদের নিরাপত্তার জন্য আকাশে এগারো হাজার যুদ্ধবিমান নিয়োগ করা হয়। ঐতিহাসিক স্নাইডারের মতে-ইউরোপে সেনা অবতরণ উপলক্ষ্যে এত বিপুল সংখ্যক নৌবহর এর আগে দেখা যায়নি।
পাঁচদিন ধরে একটানা যুদ্ধ চলার পর জার্মান সেনাপ্রধান রোমেল পিছু হঠতে বাধ্য হন। জার্মান সেনাবাহিনী প্রবল পরাক্রমে লড়াই করেও মিত্রবাহিনীর অগ্রগতি রোধ করতে পারেনি। মিত্রসেনা একের পর এক ফরাসি ভূখণ্ড শত্রু কবলমুক্ত করতে থাকে। ফলে অচিরেই মার্সাই, নিস, লায়নস্ প্রভৃতি স্থান শত্রুমুক্ত হয়। দেখতে দেখতে মিত্রবাহিনী ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ আগস্ট রাজধানী প্যারিস দখল করে।
ফ্রান্সকে মুক্ত করার পর মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনী একে একে বেলজিয়াম, লুস্কেমবার্গে প্রবেশ করে ও ব্রুসেলস, অ্যান্টওয়ার্পকে জার্মানদের কবল থেকে মুক্ত করে। নিষ্কৃতি দিবসের প্রায় ৯৭ দিন পর (১১ সেপ্টেম্বর) মিত্রশক্তি বাহিনী জার্মানিতে প্রবেশ করে ও জার্মানির পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

♦ ‘পার্ল হারবার’ ঘটনা:-
উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে পার্ল হারবার হল একটি বন্দর। এখানে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে একটি নৌখাঁটি ছিল। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর জাপানি নৌবহর ও ৩৩৫টি যুদ্ধবিমান একযোগে আক্রমণ চালিয়ে এই মার্কিন নৌঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। এটিই পার্ল হারবার ঘটনা নামে পরিচিত। এই দিনটিকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট বলেন-একটি কলঙ্কিত দিন (a date which will live in infamy)
জাপানের অক্ষচুক্তিভুক্ত হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের জাপ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করে দিলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিমান জ্বালানি ইত্যাদি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত সমস্ত জাপানি সম্পত্তি যুক্তরাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করে।
জাপান চিনে আর আগ্রাসী নীতির প্রয়োগ ঘটালে (১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে) আমেরিকা জাপানকে বিমান সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং চিনকে গোপনে সহায়তা করে। শুধু তাই নয় কর্ডেল হাল চুক্তির শর্ত হিসাবে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে থেকে চিন ও পূর্ব এশিয়ার যেসব অঞ্চল জাপান দখল করে রেখেছে সেগুলি ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়। জর্জ কেন্নান-এর মতে-সুদুর প্রাচ্যে মুক্তদ্বার নীতি অনুসরণ ও চিনের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষায় অঙ্গীকার প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজো আমেরিকার সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে চাইলে আমেরিকা প্রথমেই চিন ও ইন্দোচিন থেকে জাপানি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। জাপান ওই প্রস্তাবে অসম্মত হলে দু-পক্ষে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে ওয়াশিংটনে যখন দু’-পক্ষের বৈঠক চলছে তখন হঠাৎই পার্ল হারবার ঘটনাটি ঘটে যায়।
১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর রবিবার সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে (হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের সময় সকাল ৮-১০ মি.) জাপানি সেনারা ভাইস অ্যাডমিরাল নোগুচির নেতৃত্বে প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌ-ঘাঁটি পার্ল হারবারে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে। ১৫টি জাপানি সাবমেরিন ও ১৬টি ডেস্ট্রয়ারসহ সর্বমোট ৭২টি যুদ্ধজাহাজ এই আক্রমণে যোগ দেয়। এর পাশাপাশি ৩৬০টি জাপানি বোমারু বিমান ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণ চালিয়ে পার্ল হারবার নৌঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। এই আক্রমণে ২০টি মার্কিন জাহাজ, ১২০টি বিধান ধ্বংস হয় ও প্রায় ২,৫০০ মার্কিনবাসী প্রাণ হারায়।
আমেরিকা আক্রান্ত হওয়ার পরের দিন ৮ ডিসেম্বর (১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের) জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এইভাবে প্রাচ্য ভূ-খণ্ডেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সাম্প্রসারিত হয়।

♦ জাপানের মাঞ্জুরিয়া আক্রমণ:-
চিনা রাজশক্তির দুর্বলতার কারণে মাঞ্চুরিয়া হয়ে উঠেছিল বিদেশি হানাদারদের লীলাভূমি।
জাপান কর্তৃক চিনের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের কারণকে দু’-ভাগে ভাগ করা চলে-
১. প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ:-
উত্তর-পূর্ব চিনের অন্তর্গত মাঞ্চুরিয়া ছিল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির নেতা জাপানেরও এই অঞ্চলটির ওপর লোভাতুর দৃষ্টি ছিল। ২. ভৌগোলিক অবস্থান:- ভৌগোলিক বিচারে মাঞ্চুরিয়া ছিল কোরিয়া উপদ্বীপের উত্তরে জাপানের নিকটবর্তী এক অঞ্চল। আবার এটি ছিল রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চল। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধালাভের উদ্দেশ্যে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে আর্থিক বিরোধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে বসে। ৩. রুশ দুর্বলতা:- রুশ-জাপান যুদ্ধে (১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে) রাশিয়ার শোচনীয় পরাজয় ঘটলে জাপান মাঞ্চুরিয়াব প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয়। এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রাসিয়ার বলশেভিক বিপ্লব ঘটলে রাশিয়ার পক্ষে সুদুর প্রাচ্যে যোগাযোগ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে।
১. বাড়তি জনসংখ্যার বাসস্থান ও কর্মসংস্থান:-
জনসংখ্যার বিস্ফোরণ জাপানকে মাঞ্চুরিয়ায় হস্তক্ষেপে উৎসাহিত করেছিল। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে যা জনসংখ্যা ছিল, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তা হয়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণেরও বেশী। এমতাবস্থায় জাপানের বিপুল জনসমষ্টির বাসস্থান ও কর্মসংস্থান ঠিক করে দেওয়া তাগিদ থেকে মাঞ্চুরিয়াই সঠিক স্থান হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে।
২. আর্থিক মহামন্দা:-
বিশ্বব্যাপী আর্থিক মহামন্দা জাপানের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। এর ফলে জাপানে মার্কিনসহ অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রপ্তানি পণ্যের মূল্য হ্রাস পায়, শিল্পে সংকোচন বেকার সমস্যাকে তীব্র করে। এভাবে যখন আর্থিক সমস্যায় জাপানিরা জর্জরিত তখন তাদের সৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থী সামরিকগোষ্ঠী বিস্তারধর্মী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে, যার অঙ্গ হিসাবে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর জাপান মাঞ্চুরিয়ার রাজধানী মুকডেন-এ আক্রমণ হানে। চিন জাতিসংঘ বা লিগের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করলে লিগ তার সদস্যরাষ্ট্র জাপানকে সেনা অপসারণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু জাপান লিগের নির্দেশ মেনে চলা তো দূরের কথা, সমগ্র মাঞ্চুরিয়াই দখল করে। শুধু তাই নয়, মাঞ্চুরিয়ার মাঞ্চুকুয়ো নামকরণ করে জাপান সেখানে একটি তাঁবেদার সরকারও (৯ মার্চ, ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে) প্রতিষ্ঠা করে। এই সরকারের প্রধান হন চিনের শেষ মাঞ্চু সম্রাট পু-ই।
প্রকৃত অর্থে আক্রান্ত হওয়ার পরই চিন জাতিসংঘে জাপানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে বলে যে জাপান যেন মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু তার সে আবেদন ব্যর্থ হওয়ার পুনরায় চিন জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করে অনুরোধ জানায়-জাতিসংঘ যেন লিগের চুক্তিপত্রের ১০ ও ১৫ নং ধারা প্রয়োগ করে জাপানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।
জাতিসংঘ জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে নীরব থাকে। নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য লিগ অন্য পদক্ষেপ নেয়। লিগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইত্যালি এই পাঁচটি বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রতিনিধিদের নিয়ে লিটন কমিশন গঠন করে মাঞ্চুরিয়া সমস্যার প্রকৃতি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে কমিশন তার প্রতিবেদনে জাপানকে আক্রমণকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে; কিন্তু কোনো শাস্তির সুপারিশ করেনি। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ২৪ ফেব্রুয়ারি লিগের সাধারণ সভায় কমিশনের প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
লিটন কমিশন নিয়ে জাতিসংঘের সংসদে ভোটাভুটি হলে উপস্থিত ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে ৪২টি দেশ লিটন কমিশনের রিপোর্টকে মঞ্জুর করে। একমাত্র জাপান বিপক্ষে ভোট দেয় আর থাইল্যান্ড ভোটদান থেকে বিরত থাকে। লিটন কমিশনের রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার এক মাস পরে জাপান জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করে। ফলে লিগের পক্ষে আর কিছুই করার থাকে না।
মাঞ্জুরিয়া সমস্যা লিগের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাকে সর্বসমক্ষে প্রকট করে তার মর্যাদা ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধেই প্রশ্ন তুলে ধরে। মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের মধ্যে দিয়ে জাপান সুদূর প্রাচ্যে তার সাম্রাজ্যবিস্তার নীতির সূচনা ঘটায়, যা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড়ো প্রশ্ন চিহ্ন তুলে ধরে।

♦ ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ:-
প্রাচীন রোমের গৌরবগাথার স্মরণ করে মুসোলিনি যুদ্ধরাজ বিদেশনীতি গ্রহণ করেন। বিশ্বজুড়ে মহামন্দার সুযোগে মুসোলিনি আবিসিনিয়া দখল করেন। ঐতিহাসিক জি.এম.গ্যার্থন হার্ডির মতে-আবিসিনিয়া আক্রমণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসের এক প্রামাণ্য ঘটনা (‘Abicinai attack mark a crucial turning point in post was history’)
বিশ শতকের তিনের দশকে বিশ্ব-অর্থনীতি যখন মহামন্দার সংকটে ধুঁকছে, তখন থেকেই ইতালি তার অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পূর্ব আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) দখলের উদ্যোগ নেয়।
১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি ওয়াল-ওয়াল মরুদ্যানটিকে ইথিওপিয়াভুক্ত একটি অঞ্চল বলে দাবি করলে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর মুসোলিনি হঠাৎ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে ইথিওপিয়া আক্রমণ করে বসেন।
ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য হল-১. স্যাডোয়ার যুদ্ধে (১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে) আবিসিনিয়ার কাছে ইতালির হারের প্রতিশোধ তোলা। ২. প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আবিসিনিয়া দখলের মাধ্যমে কাঁচামালের অভাব মেটানো এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার তৈরি। ৩. উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার বাসস্থান করে দেওয়া এবং ভয়াবহ বেকার সমস্যার সমাধান করা। ৪. শক্তিশালী দেশরূপে বিশ্বে ইতালির আত্মপ্রকাশ ঘটানো ও মর্যাদা বাড়ানো।
→ D DAY (Day of deliverence) ডি-ডে’ দিবস (1944) পরিণতি:-
লিগ ইতালিকে আক্রমণকারী দেশ বলে ঘোষণা করে এবং সমস্ত সদস্যরাষ্ট্রকে ইতালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ গড়ে তুলতে বলে। কিন্তু লিগের দুই অগ্রগণ্য সদস্যরাষ্ট্র ব্রিটেন ও ফ্রান্স যেমন লিগের প্রস্তাবের কোনো বিরোধিতা করেনি, তেমনি আবার ইতালির বিরুদ্ধাচরণও করেনি। বরং এক গোপন চুক্তিতে দুই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আবিসিনিয়ার মোট আয়তনের দুই-তৃতীয়াংশ ইতালিকে ছেড়ে দিতে সম্মত হন। ফলে সংকট আরও বাড়ে।
গোপন চুক্তি নিয়ে ইউরোপে হইচই পড়ে গেলেও শেষপর্যন্ত ইতালির প্রবল চাপে আবিসিনিয়ার ভেঙে পড়ে। সম্রাট হাইলে সেলাসি দেশত্যাগে বাধ্য হন (১ মে, ১৯৩৬ খ্রি.)। ৯ মে ইতালির রাজা আবিসিনিয়ার সম্রাট বলে ঘোষিত হন।
ইরিত্রিয়া, সোমালিল্যান্ড ও আবিসিনিয়া নিয়ে ইতালীয় পূর্ব আফ্রিকা নামে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। এর পরই ইতালি জাতিসংঘ ত্যাগ করে (১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে)।
ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ বিশ্বরাজনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা-১. আবিসিনিয়ার বিলুপ্তিতে: ইতালির আবিসিনিয়া দখলের ফলে আফ্রিকার এক অতি প্রাচীন রাষ্ট্রের স্বাধীন সত্তা বিলুপ্ত হয়। ২. লিগের ব্যর্থতায়: ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ রোধে ব্যর্থ হয় লিগ অব নেশন্স। এর ফলে প্রমাণিত হয়েছিল যুদ্ধোন্মাদ শক্তিশালী রাষ্ট্রের সিংহগর্জনের কাছে লিগ কতটা অসহায়। ৩. যুদ্ধোন্মাদনা বৃদ্ধিতে ইথিওপিয়ার ইতালির সেনাবাহিনী যে নারকীয় বীভৎসতার নমুনা রেখেছিল তা ইতিপূর্বে আর কোনো সভ্য দেশে দেখা যায়নি। এই ঘটনা ইতালি, জার্মানি ও জাপান এই তিন যুদ্ধবাজ অশ্বশক্তির যুদ্ধোন্মাদনাকে আরও তীব্র করে। ৪. মুসোলিনির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ইথিওপিয়া বা আবিসিনিয়া দখলের পর নিজের দেশ ইতালিতে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনেতা হিসেবে মুসোলিনির জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়।

♦ ১৯৩৯ সালের রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি:-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মলোটভ ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ দশ বছর মেয়াদি এক রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মলোটভ-রিবেনট্রপ প্যাক্ট নামে পরিচিত এই চুক্তি বিশ্বের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক চমকপ্রদ ঘটনা। এই চুক্তি পর হিটলার বলেন-এখন পৃথিবী আমার পকেটের মধ্যে এক (‘Now Have the world in my pocket’)।
পরস্পরবিরোধী আদর্শে বিশ্বাসী দুটি দেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বেশ কিছু কারণে-
→ জার্মান তোষণ নীতি:-
ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির প্রতি তোষণ নীতি অনুসরণ করায় রাশিয়ার জার্মান-বিরোধী জোট গঠনের প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারেনি। ফলে রাশিয়া বাধ্য য়ে জার্মানির সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে।

→ সোভিয়েত পরিকল্পনা:-
জোশেফ স্টালিন নিশ্চিত ছিলেন যে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করবে। তাই আগাম সতর্কতা হিসেবে সোভিয়েত রাশিয়াকে সাময়িক দিক থেকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য কিছু সময়ের দরকার ছিল। এই সময় বের করার লক্ষ্যে রাশিয়া এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
→ জাপান আক্রমণের ভয়:-
জাপান যেভাবে তার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিস্তার ঘটাচ্ছিল তা দেখে রাশিয়া তার পূর্ব সীমান্তে জাপানি আক্রমণের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে।
রাশিয়ার অফুরন্ত কাঁচামালের লোভে জার্মানি এই চুক্তিতে আগ্রহী হয়।
→ সীমান্তে রুশ সাহায্য লাভ:-
জার্মানির দুই সীমান্তে (পূর্ব-পশ্চিম) যাতে আর যুদ্ধ না হয়, পোল্যান্ড যাতে রাশিয়ার কাছ থেকে সাহায্য না পায়, সর্বোপরি জার্মানি যাতে নির্বিবাদে পশ্চিম ইউরোপে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য জার্মানি সাময়িকভাবে হলেও রাশিয়াকে পাশে পেতে চেয়েছিল।
এই চুক্তির অন্যতম কয়েকটি শর্ত ছিল-১. ১৯৩৯-৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর রাশিয়া ও জার্মানি পরস্পরকে আক্রমণ করবে না। ২. চুক্তিবদ্ধ দুই দেশের কারুর ওপর যদি তৃতীয় কোনো দেশ আক্রমণ চালায় তাহলে তারা কেউ আক্রমণকারী দেশকে সাহায্য করবে না। ৩. উভয় দেশ এই চুক্তিকে গোপন রাখবে ও নিরপেক্ষ চুক্তি হিসেবে মেনে চলবে। ৪. চুক্তির মেয়াদকালের মধ্যে দু-পক্ষে কোনো মনোমালিন্য হলে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে তা মীমাংসা করা হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন বিশেষ কয়েকটি কারণে হিটলার এই অনাক্রমণ চুক্তি লঙ্ঘন করে এক অতি বিশাল বাহিনী নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন। কাজেই এই চুক্তির স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র দুই বছর। ঐতিাসিক এ.জে.পি. টেইলরের মতে-রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি হল বিশ্বাসগাতকতার চূড়ান্ত পরিণতি।
→ জার্মানির ধ্বংসে:-
হিটলার এই চুক্তিকে অমান্য করে রাশিয়া আক্রমণ করায়, জার্মানির ধ্বংসসাধন ঘটে।
→ রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায়:-
পূর্ব জার্মানিতে রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পূর্ব ইউরোপে হিটলারের দখল করা অঞ্চলগুলির কিছু স্থানে রাশিয়া সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
এই চুক্তির ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন কেবল জার্মানিকে পশ্চিমি কমিউনিস্ট-বিরোধী শক্তিজোট থেকে বের করেই আনেনি, তাকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ঠেলে দিতেও সক্ষম হয়েছিল। এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে এক অসামান্য কূটনৈতিক সাফল্য। চার্চিল চুক্তির কথা শুনে বলেছিলেন-এই দুর্ভাগ্যপূর্ণ খবরে বিশ্বে যেন এক বিস্ফোরণ ঘটল (The sinister news broke upon the world like an explosion’)।
♦ মিউনিখ চুক্তি (১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ):-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জার্মান-তোষণ নীতির এক চরম প্রকাশ হল ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ‘মিউনিখ চুক্তি’। হিটলারের সুদেতান অঞ্চল গ্রাস তথা চেকোশ্লোভাকিয়া আক্রমণে উদ্যত হওয়াকে কেন্দ্র করে এই চুক্তির অবতারণ। ঐতিহাসিক ল্যাংসামের মতে ‘মিউনিখ চুক্তি ছিল জার্মান তোষননীতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।’
১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে অস্ট্রিয়া গ্রাস করার পর হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার দিকে দৃষ্টি দেন। জার্মান সীমান্তে অবস্থিত চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলে বসবাসকারী জার্মান সংখ্যালঘুগণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানালে হিটলার সেই সুযোগে সুদেতানকে জামান সাম্রাজ্যভুক্ত করার দাবি পেশ করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির এই প্রস্তাবের বিরোধিতার পরিবর্তে সম্মতি জানায়। শুধু তাই নয়, চেকোশ্লোভাকিয়া যাতে এই প্রস্তাব মেনে নেয় সে ব্যাপারে তারা চাপ দেয়। অবশেষে চেকোশ্লোভাকিয়া নতিস্বীকার করলেও হিটলার আরও বেশি অঞ্চল দাবি করে চেকোশ্লোভাকিয়া আক্রমণে উদ্যত হন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন এতে বিচলিত হয়ে ওঠেন ও বার্লিনে ছুটে গিয়ে হিটলারকে চেকোশ্লোভাকিয়া আক্রমণ থেকে বিরত হওয়ার অনুরোধ জানান।
এরই প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনির মধ্যস্থতায় জার্মানির মিউনিখে চেম্বারলেন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের, হিটলার ও মুসোলিনির মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিই মিউনিখ চুক্তি (২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে) নামে পরিচিত। চেম্বারলেন এই চুক্তি সম্পর্কে বলেন-আমার বিশ্বাস এটা আমাদের সময়কার শান্তিরক্ষক I believe it is peace in our time’
মিউনিখ চুক্তিতে বলা হয়-১. ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১ থেকে ১০ অক্টোবরের মধ্যে সুদেতান জেলা থেকে চেকোশ্লোভাকিয়ার সেনা ও সরকারি কর্মচারীদের প্রত্য্যার করে নেওয়া হবে। ২. উল্লিখিত সময়কালের মধ্যে জার্মান সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে সুদেতান অঞ্চলের দখল নেবে। ৩. চার সপ্তাহের মধ্যে চেক সরকার সুদেতানের জার্মানদের চেক পুলিশ ও সেনাদল থেকে মুক্তি দেবে। ৪. ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি সুদেতানের ও অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার সীমানা নির্দিষ্ট করে দেবে। ৫. ব্রিটেন ও ফ্রান্স অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নেবে।
মিউনিখ চুক্তিকে তোয়াক্কা না করে হিটলার মাত্র ছ-মাসর মধ্যেই মসগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া অধিকার করে নেন (মার্চ, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে)। এরপরেই হিটলার পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দর দাবি করেন। পোল্যান্ড এই দাবি অগ্রাহ্য করলে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় মিউনিখ চুক্তি ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আপসরফা।
• হিটলারের কূটনৈতিক জয়:-
মিউনিখ চুক্তি সম্পাদন করে হিটলার কূটনৈতিক দিক থেকে জয়ী হয়েছিলেন বলা চলে। কেননা এই অপসরফার মাধ্যমেই হিটলারের মাম্রাজ্য সম্প্রসারণ নীতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স মেনে নিয়েছিল।
• জার্মান অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি:-
অস্ট্রিয়া-সংলগ্ন সুদেতান অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ও উৎপাদন সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে জার্মানির আর্থিক ভিত অনেকটাই মজবুত ও সমৃদ্ধ হয়।
• সামরিক সুবিধা:-
সুদেতান অঞ্চলের সীমানা বরাবর চেক সরকার যে সামরিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল তার সুবিধা লাভ করেছিল হিটলারের জার্মানি। তাই জিওফ লেটন বলেছেন-এই সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কর্তৃত্ব লাভ করেছিল জার্মানি (‘its frontier defences were simply taken over by Germany’)।