সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গঠনতন্ত্র 1920-1946 আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত হয়েছিল এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের যুদ্ধ আর না হয়, তা নিশ্চিত করা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর হত্যালীলা, ক্ষয়ক্ষতি প্রভৃতির সম্মুখীন হয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রনায়কেরা উপলব্ধি করেছিল যে, যুদ্ধ কখনো মানুষের জীবনে শেষ কথা হতে পারে না। তাই উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা নীতির ওপরে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা হয় জাতিসংঘ। কিন্তু ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাতিসংঘ কোমায় চলে যায়। গণতন্ত্র প্রিয় ইউরোপীয় রাষ্ট্রনায়করা একদিকে যেমন ফ্যাসিবাদী, ন্যাৎসীবাদী শক্তির মোকাবিলা করতে থাকে তেমনি যুদ্ধ চলাকালীন যাতে পুনরায় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা যায় সেই উদ্যোগও গ্রহণ করতে থাকে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রনায়করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী সময়ে লন্ডন (১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ), ওয়াশিংটন (১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ), মস্কো (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ), তেহেরান (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ), ডাম্বারটন ওকস (১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ), ইয়াল্টা (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ), সানফ্রানসিস্কো (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ) প্রভৃতি সম্মেলনে মিলিত হন। অবশেষে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে অক্টোবর একান্নটি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জন্ম হয়। এই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা United Nations শব্দটি প্রখ্যাত ইংরেজ কবি বায়রনের ‘চাইল্ড হেরল্ড পিলগ্রিমেজ’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ মাত্র কুড়ি বছর স্থায়ী হলেও জাতিপুঞ্জ কিন্তু এখনও তার অভিষ্ট লক্ষ্যে সাবলীল ভাবে এগিয়ে চলেছে। এর সদর দফতর নিউইয়র্কে অবস্থিত।
Table of Contents
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গঠনতন্ত্র 1920-1946
READ MORE-জাতিসংঘ (United Nations) (1920)
• প্রতিষ্ঠার পটভূমি:-
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গঠনতন্ত্র 1920-1946 নামক এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি একদিনে হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক সম্মেলন ও আলোচনার ফলশ্রুতি হল এই জাতিপুঞ্জের প্রতিষ্ঠা এবং এর প্রথম উদ্যোগ শুরু হয়েছিল লন্ডনে এক ঘোষণার মাধ্যমে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে ইংল্যান্ড, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রনায়কেরা ভবিষ্যতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। এর পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল আটলান্টিক সনদ ঘোষণা।
১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৯-১২ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট একটি সনদে সাক্ষর করেন। এই সনদটি উত্তর আটলান্টিকের নিউফাউল্যান্ড-এর কাছে ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’ জাহাজে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে এটিকে ‘আটলান্টিক সনদ’ বলে। এই সনদের আটটি মূল নীতির অনেকগুলিই রাষ্ট্রসংঘের দলিলে স্থান পেয়েছিল। এরপর ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বিশ্বের ছাব্বিশটি দেশ ওই ঘোষণাপত্রে সাক্ষর করে। যা ‘রাষ্ট্রসংঘের সনদ’ নামে পরিচিত। এই সনদে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।
ওয়াশিংটন সম্মেলনে এই ঘোষণাটি করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে মস্কো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছরই ডিসেম্বর মাসে তেহেরান সম্মেলন, এরপর ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ২১ আগস্ট থেকে ৯ অক্টোবর আমেরিকার ওয়াশিংটনের পার্শ্ববর্তী ডাম্বারটন ওকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৪-১১ই ফেব্রুয়ারি জার্মানির ইয়াল্টা সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলির নাম স্থির করা হয়। অবশেষে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন ৫১টি দেশের প্রায় তিনশো প্রতিনিধি ও দেড় হাজার বিশেষজ্ঞ সনদের ১৯টি অধ্যায় ও ১১১টি অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা করে। অবশেষে ২৪শে অক্টোবর ওই একান্নটি দেশের প্রতিনিধিরা সনদে স্বাক্ষর করলে আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতিপুঞ্জের জন্ম হয় ২৪ অক্টোবর জাতিপুঞ্জ দিবস (United Nations Day) হিসেবে পালন করা হয়। এইভাবে শুরু হয় রাষ্ট্রসংঘের পথ চলা।

• উদ্দেশ্য:-
মূলত চারটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
প্রথমত:
সারা বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ও বিশ্বে যাতে যুদ্ধের কোনও রূপ সম্ভাবনা সৃষ্টি না-হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া।
দ্বিতীয়ত:
বিশ্বের প্রতিটি জাতির ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মানব অধিকারকে রক্ষা করা।
তৃতীয়ত:
বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও ছোটো বড়ো সকল সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতায় হস্তক্ষেপ না করা।
চতুর্থত:
প্রতিটি রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক যাতে গড়ে ওঠে তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।
• নীতিসমূহ:
রাষ্ট্রসংঘের সনদটি একটি প্রস্তাবনা। যা ১৯টি অধ্যায় ও ১১১টি ধারা সমন্বিত। রাষ্ট্রসংঘের সনদে সাতটি মূলনীতির কথা বলা আছে। এগুলি হল- (১) জাতিপুঞ্জের ছোটো বড়ো সমস্ত সদস্যরাষ্ট্রের মর্যাদা সমান।
(২) জাতিপুঞ্জের সমস্ত সদস্য রাষ্ট্র জাতিপুঞ্জের নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে এবং যথাযথ ভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে।
(৩) জাতিপুঞ্জ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কখনোই কোনও রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না।
(৪) জাতিপুঞ্জের সদস্য নয় এমন দেশগুলিও যাতে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে জাতিপুঞ্জের সনদ মেনে চলে সেদিকে নজর রাখা হবে।
(৫) জাতিপুঞ্জের সদস্যরাষ্ট্র জাতিপুঞ্জকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে।
(৬) কোনো সদস্যরাষ্ট্রই একে অন্যের রাষ্ট্রীয় সীমানা লঙ্ঘন করবে না। অর্থাৎ এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সীমানা দখল করবে না।
(৭) সদস্যরাষ্ট্রগুলির মধ্যে কোনও বিরোধ থেকে থাকলে তার শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

• সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ:-
(১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।
(২) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ নামটির ইংরেজি হল United Nations Organisation এই শব্দটি ইংরেজ কবি বাইরনের ‘চাইল্ড হেরল্ড পিলগ্রিমেজ’ থেকে নেওয়া।
(৩) জাতিপুঞ্জের সদর দফতর নিউইয়র্কে অবস্থিত।
(৪) ১৯৪৫-এর ২৪শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিক ভাবে রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই প্রতি বছর ২৪শে অক্টোবর জাতিপুঞ্জ দিবস পালিত হয়।
(৫) বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, আন্তঃরাষ্ট্র পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রভৃতি লক্ষ্য নিয়ে জাতিপুঞ্জের প্রতিষ্ঠা হয়।
(৬) UNO-এর ৬টি শাখা। পাঁচটি সংস্থা নিউইয়র্কে অবস্থিত হলেও আন্তর্জাতিক বিচারালয় নেদারল্যান্ডে হেগ শহরে অবস্থিত।
(৭) UNO-এর প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে নিয়ে সাধারণ সভা গঠিত।
(৮) প্রতি বছর সাধারণ সভার কাজ পরিচালনার জন্য একজন করে সভাপতি ও ১৭ জন সহসভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
(৯) সাধারণ সভাকে বিশ্বের আলোচনা সভাও বলা যায়।
(১০) ৫টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী সদস্য নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যের সংখ্যা যথাক্রমে ৫ ও ১০।
(১১) নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য হল আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, চিন। এদের একত্রে পঞ্চপ্রধান বলে। এদের ভেটো (VETO) ক্ষমতা আছে।
(১২) নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের একমাত্র ভেটো ক্ষমতা আছে।
(১৩) প্রথমে ১৮টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ গঠন হলেও বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৫৪। বছরে দুবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
(১৪) WHO, UNESCO ইত্যাদি সংস্থা অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অঙ্গ।
(১৫) আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের ১৫ জন বিচারপতির প্রত্যেকেই ৯ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
(১৬) রাষ্ট্রসংঘের প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের বিদেশমন্ত্রী ট্রিগভি লি।
(১৭) রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব পর্তুগালের নাগরিক আন্তেরিও গুটারেস, তিনি নবম মহাসচিব।

• সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ধারণা:-
• জাতিপুঞ্জের শাখা:-
সাধারণ সভা, নিরাপত্তা পরিষদ, সচিবের দফতর, আন্তর্জাতিক বিচারালয়, অছিপরিষদ, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিষদ।
• সাধারণ সভা (General Assembly):-
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গঠনতন্ত্র 1920-1946 জাতিপুঞ্জের অন্যতম সংগঠন হল সাধারণ সভা, প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রকে নিয়ে এই সাধারণ সভা গঠিত। প্রত্যেকটি রাষ্ট্র পাঁচটি করে প্রতিনিধি এই সভাতে প্রেরণ করতে পারলেও প্রত্যেকটি দেশ একটি করে ভোট দিতে পারে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবারে সাধারণ সভার অধিবেশন বসে। এবং দুই মাস ধরে প্রায় অধিবেশন চলে। আবার প্রয়োজন মনে করলে আবার অধিবেশন ডাকা যেতে পারে। সভার কাজ পরিচালনার জন্য প্রতি বছর একজন করে সভাপতি ও সতেরো জন সহসভাপতি নির্বাচন করা হয়। সভাপতি সভার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা, নিয়ম কানুন দেখা, সদস্য রাষ্ট্রদের বলার সুযোগ করে দেওয়া প্রভৃতি কাজ করে থাকেন। রাষ্ট্রসংঘের এই শাখাটি বিশ্ব সংসদ বা World Parliament নামে পরিচিত।

• সাধারণ সভার কাজ হল:-
(১) রাষ্ট্রসংঘের নতুন সদস্য, নিরাপত্তা পরিষদের দশজন অস্থায়ী সদস্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের চুয়ান্ন জন সদস্যকে নির্বাচন করা; (২) জাতিপুঞ্জের সনদ সংশোধন; (৩) অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিষদ, আছি পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ প্রভৃতির কার্যাবলিকে তত্ত্বাবধান করে; (৪) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য তারা আইন প্রণয়ন করতে পারে; এছাড়া (৫) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনও সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সাধারণ সভায় সেটি আলোচিত হয়।
• সাধারণ সভার কাজ পরিচালনার জন্য:-
নিরাপত্তা সংক্রান্ত কমিটি, আর্থিক কমিটি, সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক কমিটি, অছি কমিটি, প্রশাসনিক ও বাজেট কমিটি ও আইন বিষয়ক কমিটি আছে।
এটি হল একটি অদ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান। এটিকে বিশ্বের আলোচনা সভাও বলা যেতে পারে। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটের মূল্য এক হওয়ায় এর গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোটো বড়ো প্রতিটি রাষ্ট্রে বলার অধিকার থাকায় সাধারণ সভার গুরুত্ব যথেষ্ট। বিশ্বের যে-কোনো প্রান্তের সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য এই সাধারণ সভা আলোচনা করে থাকে।
• নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council):-
জাতিপুঞ্জের সব থেকে শক্তিশালী এবং ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা হল নিরাপত্তা পরিষদ। সনদের পঞ্চম অধ্যায়ের ২৩-৩২ ধারায় এর কাজগুলি বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে নিরাপত্তা পরিষদের ৫ জন স্থায়ী ও ৬ জন অস্থায়ী সদস্য ছিল। স্থায়ী সদস্যরা হলেন ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, চিন ও সোভিয়েত রাশিয়া (বর্তমানে রাশিয়া)। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে ২৩-এর ১নং ধারা সংশোধনের ফলে অস্থায়ী সদস্য সংখ্যা ছয় থেকে বৃদ্ধি করে দশ করা হয়েছে। ফলে বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মোট সংখ্যা হল ৫+১০= ১৫ জন। অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে, ভৌগোলিক দিকটি এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ওই রাষ্ট্রটির ভূমিকার কথা মাথায় রাখা হয়। অস্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ৫ জন এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে, ২ জন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ও ১ জন লাতিন আমেরিকা থেকে অবশ্যই থাকবে।
• ক্ষমতা ও কার্যাবলি:-
সনদের ২৪ নং ধারায় বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার সমস্ত দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে। এছাড়া অছি ক্ষমতা নিয়োগ সংক্রান্ত, সদস্যপদ বাতিল, সনদ সংশোধন, নিরস্ত্রীকরণ প্রভৃতি ক্ষমতা, নিরাপত্তা পরিষদের হাতে অর্পিত আছে। যদি কোনও দেশ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমে আলাপ আলোচনা, সেটি ব্যর্থ হলে নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অর্থাৎ ওই দেশের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা। এটিও ব্যর্থ হলে তৃতীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিষদের বাহিনী ওই দেশের ওপর আক্রমণ করে থাকে। জাতিপুঞ্জের যাবতীয় অছি সংক্রান্ত কাজ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরাই করে থাকে।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রত্যেকটি সদস্য একটি করে ভোট দানের অধিকারী। তবে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ জন সদস্যের হাতে ভেটো ক্ষমতা আছে। এটি হল নিরাপত্তা পরিষদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করতে গেলে ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন। এর মধ্যে কোনো একটি রাষ্ট্র যদি অসম্মতি জানায় তাহলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায় এই ক্ষমতাকেই বলা হয় ভেটো ক্ষমতা। কোরিয়া যুদ্ধের সময় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে রাষ্ট্রসংঘের বাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এমনকি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করলে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে নিরাপত। পরিষদের বাহিনী এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছিল।
• অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (Economic and Social Council):-
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আর্থ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সহযোগিতার লক্ষে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮টি সদস্য রাষ্ট্রকে নিয়ে। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে এই পরিষদের সদস্য হয় ২৭টি দেশ। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র সাধারণ সভার দ্বারা তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। তবে প্রত্যেক বছর ১৮টি করে সদস্য রাষ্ট্র অবসর নেয় এবং নতুন সদস্যরা নির্বাচিত হয়। বছরে দু-বার এর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এপ্রিল মাসে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে ও জুলাই মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে এর অধিবেশন বসে।
সনদের দশম অধ্যায়ের ৬২-৬৬ ধারায় সংগঠনটির ক্ষমতা ও কার্যাবলি লিপিবদ্ধ আছে। এই সংস্থার প্রধান কাজগুলি হল পৃথিবী জুড়ে মানবাধিকার রক্ষা করা; বিশ্বব্যাপী স্বস্থ্য, শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ে নানারকম কাজ করা; জন্ম নিয়ন্ত্রণ, মাদক চোরাচালান বন্ধ করা; নারী-শিশু শ্রমিকের কল্যাণ করা প্রভৃতি এর কর্মসূচি। বিশ্বের চারটি অঞ্চলে এই পরিষদের চারটি আঞ্চলিক কার্যালয় আছে। এর অধীনে ১৩টি সংস্থা আছে। এগুলি হল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO-১৯৪৮), রাষ্ট্রসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (UNESCO-১৯৪৬), খাদ্য ও কৃষি সংগঠন (FAO-১৯৪৫), আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সমিতি (IDA-১৯৬০), আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন (ILO-১৯০৯), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IMF-১৯৪৫) ইত্যাদি।
• অছি পরিষদ (Trusteeship Council):-
জাতিসংঘের ম্যানডেট ব্যবস্থার মতো জাতিপুঞ্জেরও অছি ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ও সাধারণ সভা কর্তৃক নিযুক্ত উন্নত দেশগুলিকে নিয়ে এই সংস্থা গঠিত ছিল। যে-সমস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, সেই সমস্ত দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য ওই রাষ্ট্রগুলি থেকে একটি রাষ্ট্রকে ওই অনুন্নত রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রটি ওই রাষ্ট্রের সমস্ত রকম পরিকাঠামো তৈরির পর সেই রাষ্ট্রের হাতেই সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। এই ব্যবস্থাকে অছি ব্যবস্থা বলে। একদা অস্ট্রেলিয়ার অধীনে নিউগিনি, বেলজিয়ামের অধীনে আফ্রিকার রুয়ান্ডা, উদ্ভন্ডি, ফ্রান্সের অধীনে আফ্রিকার ক্যামারুন ও ইতালির অধীনে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার মোমানিল্যান্ড প্রভৃতি অস্থির অধীনে ছিল। বর্তমানে অছি ব্যবস্থার অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।
• আন্তর্জাতিক বিচারালয় (International Court of Justice):-
যে-কোনও আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক বিচারালয় ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে। সনদের ৩নং ধারা অনুসারে জাতিপুঞ্জের সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে থেকে ১৫ জন বিচারপতিকে ৯-বছরের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তবে একটি রাষ্ট্র থেকে একজন মাত্র প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেন। তারা প্রত্যেকেই সাধারণ সভা ও নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত হন। এমনকি বিচারপতিরা পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেন। তবে প্রতি তিন বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ বিচারপতি, অর্থাৎ পাঁচ জন করে অবসর নেন। আন্তর্জাতিক বিচারালয় তিন বছরের জন্য একজন সভাপতি ও একজন সহসভাপতি নির্বাচিত করেন।
• বিচারালয়ের কাজ:-
যে-কোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ, অর্থাৎ কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ বাধলে আন্তর্জাতিক বিচারালয় তার মীমাংসা করে থাকে। বিচারালয়ের রায় প্রত্যেকটি সদস্য রাষ্ট্র মেনে চলতে বাধ্য হলেও রায় পছন্দ না-হলে নিরাপত্তা পরিষদে আবেদন করতে পারে। তবে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন তার নিজের দেশকে এড়িয়ে কোনও মামলা দায়ের করতে পারে না।
• বিচারালয়ের মূল্যায়ণ:-
বেলজিয়াম ও হল্যান্ড-এর মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে মন্দির সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি করেছিল এই আন্তর্জাতিক বিচারালয়। তবে এখানকার বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, বিচারপতিদের পক্ষপাতমূলক আচরণ, বিচারের দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়া ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রভৃতির ঊর্দ্ধে উঠতে পারলে আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের সুনাম আরো বৃদ্ধি পাবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
• মহাসচিব ও তার সচিবালয় (General Secretary and its Secretariate):-
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রায় সমস্ত রকম প্রশাসনিক কাজকর্মের দায়িত্ব এই মহাসচিব ও তার কার্যালয়ের হাতে ন্যস্ত আছে। এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের বিদেশমন্ত্রী ট্রিগভী লি। অষ্টম মহাসচিব দক্ষিণ কোরিয়ার বিদেশমন্ত্রী বান-কি-মুন। সনদের ৯৭ নং ধারা অনুসারে সাধারণ সভা মহাসচিবকে নিয়োগ করে থাকে। তবে এ বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদ সুপারিশ করে থাকে। মহাসচিবের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও তিনি পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেন। এই সচিবালয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কর্মচারী আছে। রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব পর্তুগালের নাগরিক আন্ডেরিও গুটারেম।
• সচিবালয়ের ক্ষমতা ও কার্যাবলি:-
এটি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মুখ্য প্রশাসনিক সংস্থা। বিভিন্ন কমিটি গঠন, সাধারণ সভার অধিবেশন আহ্বান, প্রত্যেকটি দফতর কাজ সুষ্ঠভাবে করছে কিনা তার তদারকি করা, বাজেট প্রস্তুত করা, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করা প্রভৃতি এর দায়িত্ব। সচিবের কর্ম দফতর নিউইয়র্ক-এ অবস্থিত। সচিবালয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কর্মচারী কাজ করে থাকে। এর থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে কী বিশাল কর্মকাণ্ড সচিবালয়ের হাতে অর্পণ করা আছে।
∆ জাতিসংঘ (League of Nations) ও জাতিপুঞ্জের (United Nations) মধ্যেকার সাদৃশ্যগুলি হল-
(ক) জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তেমনি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জও একই উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
(খ) জাতিসংঘে ও জাতিপুঞ্জ দুটি আন্তর্জাতিক সংগঠনই ছিল কতকগুলি রাষ্ট্রসমূহের সমবায়, কখনোই অতিরাষ্ট্রিক চরিত্র ধারণ করেনি।
(গ) উভয় সংগঠনই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়েছিল।
(ঘ) উভয় সংগঠনই শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করতে চেয়েছিল।
(ঙ) জাতিসংঘের যেমন চারটি সংস্থা ছিল, ঠিক তেমনি জাতিপুঞ্জেরও মূল সংস্থা চারটি। সাধারণ সভা, নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচারালয় ও সচিবালয়।