মুঘল স্থাপত্য ও চিত্রকলা 1526 – 1857, উভয়ই মুঘল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। মুঘল স্থাপত্যে, তাজমহল, ফতেপুর সিক্রি, এবং লাল কেল্লার মতো বিখ্যাত স্থাপত্যশৈলী দেখা যায়। এই স্থাপত্যে গম্বুজ, মিনার, এবং খিলান ব্যবহার করা হয়েছে। মুঘল চিত্রকলা, যা “মুঘল মিনিয়েচার” নামে পরিচিত, মূলত দরবারের দৃশ্য, পশুপাখি, এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য নিয়ে গঠিত। এই চিত্রগুলোতে উজ্জ্বল রং এবং বিস্তারিত নকশা ব্যবহার করা হতো।
মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬-১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্প ও স্থাপত্যে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এই সময়ে পারস্য, ভারতীয় এবং ইসলামিক রীতির এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটে, যা মুঘল শিল্পকে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি দান করে। স্থাপত্য ও চিত্রকলা উভয় ক্ষেত্রেই মুঘলরা তাদের অতুলনীয় নান্দনিকতা ও জাঁকজমকের পরিচয় দিয়েছিল।
Table of Contents
PHGI 2ND PAPER HISTORY SUGGEDTION

মুঘল স্থাপত্য ও চিত্রকলা 1526 – 1857
ভারতের ইতিহাসে মুঘল যুগ ছিল একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। মুঘল যুগের সম্রাটরা সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। ফলে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই যুগে চিত্রকলা, সাহিত্য ও স্থাপত্য শিল্পের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে।
মুঘল যুগের চিত্রকলা
① মুঘল যুগের চিত্রকলা:
মুঘল যুগে চিত্রকলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। মুঘল চিত্রকলাও এই সময়ে বিশেষ উন্নতি লাভ করে। পারস্যের মিনিয়েচার চিত্রকলার প্রভাব মুঘল চিত্রকলার ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পরে স্থানীয় ভারতীয় শিল্পকলার সাথে মিশে এক নতুন শৈলী তৈরি করে। সম্রাট আকবরের সময়ে চিত্রকলার এক বড় পৃষ্ঠপোষকতা দেখা যায়। তিনি অসংখ্য শিল্পী নিয়োগ করেছিলেন এবং মহাভারত, রামায়ণ, আকবরনামা ও বাবরনামার মতো মহাকাব্য ও ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলির চিত্রায়ন করিয়েছিলেন। এই চিত্রগুলিতে উজ্জ্বল রং, সূক্ষ্ম বিবরণ, বাস্তবসম্মত প্রতিকৃতি এবং গতিময় দৃশ্য অঙ্কিত হতো।ভারতীয় ও পারসিক রীতির সমন্বয়ে এই যুগে চিত্রশিল্প বিকাশ লাভ করে। বাবরের আমলের চিত্রশিল্প: মুঘল সম্রাট বাবর চিত্রকলায় বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়ে চিত্র অঙ্কনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করেন।
হুমায়ুনের আমলের চিত্রশিল্প:
মুঘল যুগের চিত্রকলার প্রবর্তক ছিলেন হুমায়ুন। পারস্যে থাকাকালীন সময়ে তিনি চিত্রশিল্পে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি পারসিক শিল্পরীতির অনুরাগী ছিলেন। পারস্যের দুই বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মীর সৈয়দ আলী এবং খাজা আব্দুস সামাদ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম হল ‘খামসা অব নিজামি’।

আকবরের আমলের চিত্রশিল্প:
জাহাঙ্গীরের সময়ে চিত্রকলার আরও উন্নতি হয়। তিনি প্রকৃতি, প্রাণী এবং দরবারের দৃশ্যাবলীর চিত্রায়নে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। তার আমলে প্রতিকৃতি চিত্রকলার এক নতুন ধারা গড়ে ওঠে, যেখানে শিল্পীরা ব্যক্তির আবেগ ও ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। শাহজাহানের সময়ে চিত্রকলায় কিছুটা অবনতি দেখা গেলেও, ঔরঙ্গজেবের সময়ে এর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা কমে যায়, যার ফলে মুঘল চিত্রকলার পতন শুরু হয়। সম্রাট আকবর চিত্রশিল্পে বিশেষ আগ্রহ দেখান। তাঁর রাজসভার ১৭ জন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন হিন্দু। তাঁদের অঙ্কিত চিত্রগুলি ফতেপুর সিক্রির অপূর্ব সৌধগুলির শোভাবর্ধন করে। আবদুস সামাদ, সৈয়দ আলী, যশোবন্ত, জগন্নাথ, তারাচাঁদ প্রমুখ তাঁর আমলের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ছিলেন। তাঁরা পারসিক গল্প, রামায়ণ, মহাভারত এবং আরব্য উপন্যাসের কাহিনীকে চিত্রে রূপায়িত করেন।
জাহাঙ্গীরের আমলের চিত্রশিল্প:
জাহাঙ্গীর চিত্রশিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর আমলের চিত্রকলায় পারসিক রীতির স্থানে ভারতীয় রীতি বিকাশ লাভ করে। তিনি চিত্রকলাকে শিল্প-ভাবনা থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। আকারিজা, মহম্মদ মুরাদ, মহম্মদ নাসির, ফারুক বেগ ছিলেন তাঁর আমলের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। তাঁর আমলে শ্রেষ্ঠ হিন্দু চিত্রকর ছিলেন বিষেণ দাস, গোবর্ধন, কেশব, মাধব, তুলসি প্রমুখ। তাঁর আমলে পাহাড়ি চিত্র শিল্পরীতি, বিজয়নগর ও বিজাপুর চিত্র শিল্পরীতির যথেষ্ট উন্নতি হয়।
শাহজাহানের আমলের চিত্রশিল্প:
সম্রাট শাহজাহান চিত্রশিল্পের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর রাজসভার শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী ছিলেন আসফ খাঁ। তাঁর আমলে চিত্রশিল্পে রঙের আধিক্য ও আড়ম্বর পরিলক্ষিত হয়। মির হাসান, অনুপ চিত্রা, চিত্রামণি, সমরকান্দি, মহম্মদ নাদির প্রমুখ ছিলেন শাহজাহানের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী।

ঔরঙ্গজেবের আমলের চিত্রশিল্প:
সম্রাট ঔরঙ্গজেব ধর্মীয় আবেগে বশীভূত হয়ে চিত্রশিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে চিত্রশিল্পীরা পাটনা, মহীশূর, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি প্রাদেশিক রাজদরবারে আশ্রয় নেয়। তাঁর আমলে পাঞ্জাব ও রাজস্থানে নতুন চিত্রশৈলী বিকশিত হয় এবং রাজপুত চিত্রশৈলী জনপ্রিয়তা লাভ করে।
মুঘল যুগের স্থাপত্য শিল্প:
স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষের ক্ষেত্রে মুঘল যুগ এক স্মরণীয় অধ্যায়। স্থাপত্যের ক্ষেত্রে, মুঘলরা বিশাল দুর্গ, মসজিদ, প্রাসাদ, সমাধি এবং বাগান নির্মাণ করে। এই নির্মাণশৈলীতে লাল বেলেপাথর এবং মার্বেলের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। সম্রাট বাবরের সময়ে স্থাপত্যের সূচনা হলেও, হুমায়ুনের সময়ে এর কিছুটা উন্নতি ঘটে। তবে সম্রাট আকবরের সময়ে মুঘল স্থাপত্য তার পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা ফোর্ট এবং লাহোর ফোর্টের মতো স্থাপনাগুলি আকবরের স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এই সময়ে ইন্দো-ইসলামিক রীতির সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়, যেখানে হিন্দু ও ইসলামিক মোটিফগুলি একত্রিত হয়েছিল। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতক থেকেই ভারতবর্ষে মুঘল স্থাপত্য শিল্প বিকাশ লাভ করে। এই যুগের স্থাপত্য শিল্পে ইন্দো-পারসিক শিল্পরীতির প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। এই যুগে মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় অসংখ্য স্থাপত্যকীর্তি নির্মিত হয়। নীচে এই স্থাপত্যকীর্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

বাবরের আমলে:
বাবর ভারতীয় স্থাপত্যরীতির অনুরাগী না হলেও তিনি পারসিক স্থাপত্য রীতির অনুরাগী ছিলেন। মাত্র পাঁচ বছরের রাজত্বকালে তিনি আগ্রায় লৌহ দুর্গ, পানিপথে কাবুলিবাগ মসজিদ সহ চোলপুর ও গোয়ালিয়রে বেশ কিছু প্রাসাদ ও মসজিদ নির্মাণ করেন।
আকবরের আমলে:
আকবরের আমল থেকেই মুঘল শিল্পের প্রকৃত বিকাশ শুরু হয়। তাঁর আমলে ভারতীয় ও পারসিক শিল্পরীতির সমন্বয় ঘটে। আকবরের আমলে নির্মিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থাপত্য কীর্তি হল- ফতেপুর সিক্রিতে অবস্থিত যোধাবাঈ প্রাসাদ, দেওয়ান-ই-খাস, দেওয়ান-ই-আম, জামি মসজিদ ও বুলন্দ দরওয়াজা। এগুলির মধ্যে হিন্দু স্থাপত্য রীতির প্রভাব দেখা যায়। দিল্লিতে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধিতেও হিন্দু স্থাপত্য রীতির প্রভাব ছিল।
জাহাঙ্গীরের আমলে:
জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে ‘পিয়েত্রা দুরা’ নামে এক শিল্পরীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই রীতির বৈশিষ্ট্য হল নির্মাণের ক্ষেত্রে মার্বেল পাথরের ব্যাপক ব্যবহার এবং দামি পাথর নির্মিত দেওয়ালে সূক্ষ্ম কারুকার্য করা। জাহাঙ্গীরের আমলে নির্মিত সেকেন্দ্রার ‘আকবরের সমাধি’ ও আগ্রার ‘ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি’ সুবিখ্যাত। ‘ইতিমাদ উদ দৌলার সমাধি’-তে রাজপুত শিল্পরীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
শাহজাহানের আমলে:
মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণ যুগের সূচনা ঘটে শাহজাহানের আমলে।শাহজাহানের আমলে মুঘল স্থাপত্য তার স্বর্ণযুগে পৌঁছায়। তাজমহল, দিল্লীর জামা মসজিদ, লাল কেল্লা এবং আগ্রা ফোর্টের মোতি মসজিদ তার স্থাপত্য প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সময়ে সাদা মার্বেলের ব্যবহার, সূক্ষ্ম কারুকার্য, পিয়েট্রা ডুরা এবং জটিল জ্যামিতিক নকশা স্থাপত্যের সৌন্দর্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। এই নির্মাণগুলিতে প্রতিসাম্য এবং ভারসাম্য বজায় রাখা হতো, যা তাদের এক চিরন্তন আবেদন প্রদান করে। শাহজাহানের আমলে নির্মিত উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি হল- আগ্রার তাজমহল, মোতি মসজিদ, জামি মসজিদ এবং দিল্লির দেওয়ান-ই-আম ও দেওয়ান-ই-খাস এবং লাহোরের শীষমহল। তাঁর পত্নী মমতাজের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত তাজমহল সৌধটি ছিল শিল্পনৈপুণ্যের বিচারে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তাঁর আমলের অপর একটি বিখ্যাত স্থাপত্য কীর্তির নিদর্শন হল ময়ূর সিংহাসন।

ঔরঙ্গজেবের আমলেঃ
ঔরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তিটি হল ঔরঙ্গাবাদের ‘বিবি-কা-মকবরা’ মসজিদ। এছাড়া তাঁর আমলে তেমন কোনো স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যায়নি।
মূল্যায়ন:-
চিত্রকলা, সাহিত্য ও স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষের ক্ষেত্রে মুঘল যুগ এক স্মরণীয় অধ্যায়। সামগ্রিকভাবে, ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মুঘল স্থাপত্য ও চিত্রকলা ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে। তাদের নির্মিত স্থাপনা এবং অঙ্কিত চিত্রগুলি আজও বিশ্বের শিল্পপ্রেমীদের মুগ্ধ করে রেখেছে এবং ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।মুঘল যুগে চিত্রকলা ও সাহিত্যের যে সম্ভার পাওয়া যায়, তা ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যদিকে মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় যে সকল স্থাপত্য কীর্তি নির্মিত হয়, সেগুলির নির্মাণশৈলি, সূক্ষ্ম কারুকার্য ও সৌন্দর্য ছিল ভুবন বিখ্যাত।