শাহজাহান (1592-1666)

শাহজাহান 1592-1666 ছিলেন মুঘল সম্রাট যিনি ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ সাল পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছেন। তিনি তার স্থাপত্য কীর্তির জন্য বিখ্যাত, যার মধ্যে তাজমহল অন্যতম। তিনি ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর ও তার হিন্দু রাজপুত স্ত্রী তাজ বিবি বিলকিস মাকানির সন্তান এবং সিংহাসনে বসার আগে “শাহজাদা খুররম” নামে পরিচিত ছিলেন। 

শাহজাহান 1592-1666

Table of Contents

আরও জানুন – ঠান্ডা লড়াই

শাহজাহানের (1592-1666) রাজত্বকাল কি মুঘল সাম্রাজ্যের ‘সুবর্ণ যুগ’ ছিল?/শাহজাহানের উত্তরসূরীদের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধের জন্য কাকে সবথেকে বেশি দায়ী বলে মনে হয়? যুক্তি দ্বারা ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকাঃ-

জাহাঙ্গীরের পুত্র খুররম বহু আত্মীয়-পরিজনের হত্যাকাণ্ডের রক্তে নিজের হাত রাঙিয়ে 1628 খ্রিস্টাব্দে ‘শাহজাহান’ নাম নিয়ে দিল্লির মুঘল সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকাল (1658-1628 খ্রি.) ভারতের শিল্প-সংস্কৃতির উৎকর্ষতার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই সময় দেশের রাজনৈতিক ঐক্য ও স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাহিত্য, সঙ্গীত, স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চিত্রকলায় অগ্রগতি প্রভৃতির জন্য অনেক ঐতিহাসিক শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল আমলের ‘সুবর্ণ যুগ’ বা ‘Golden Age’ বলে অভিহিত করেছেন। ড. ভিনসেন্ট স্মিথ মনে করেন যে, “শাহজাহানের রাজত্বকাল ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের চরম উৎকর্ষতার যুগ।”

[1] রাজনৈতিক ঐক্য:

আকবর সারা ভারত জুড়ে যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা‌ করেছিলেন, সেই ধারা শাহজাহানের আমলে বজায় ছিল। ভারতের সীমানা অতিক্রম করে মুঘল সাম্রাজ্য এই সময় মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত হয়। দাক্ষিণাত্যেও মুঘল আধিপত্য সুদৃঢ় হয়। শাহজাহানের আমলে বড়ো ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট বা বৈদেশিক আক্রমণের ঘটনা না ঘটায় দেশে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঐক্য ও সংহতি এই সময় সাংস্কৃতির অগ্রগতিতে সহায়তা করে।

[2] অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি:

শাহজাহানের রাজত্বকালে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। কৃষির ক্ষেত্রে শাহজাহানের রাজত্বকাল চরম শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ ছিল বলে ড. ইরফান হাবিব উল্লেখ করেছেন। কৃষির উন্নতির ফলে কৃষি থেকে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পায়। রাজকোশে বিপুল অর্থ সঞ্চিত হওয়ায় শাহজাহানের পক্ষে সাংস্কৃতিক কাজে অর্থব্যয় করা সহজ হয়। এই সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। সুরাট বন্দরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি শুল্ক থেকে সম্রাটের বার্ষিক আয় হত 228 কোটি টাকা।

[3] সাহিত্যে অগ্রগতি:

শাহজাহানের রাজত্বকালে বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যে যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে। সম্রাট নিজে ছিলেন আরবি, ফারসি ও হিন্দি ভাষায় সুপণ্ডিত। তিনি ফারসি ভাষাকে দরবারি ভাষার স্বীকৃতি দিলে এই ভাষার চর্চা বৃদ্ধি পায়। শাহজাহানের সভাকবি আবু তালিব কালিম ফারসি ও হিন্দি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। বিকানীরের পণ্ডিত জগন্নাথ ও জনার্দন তাঁর রাজসভায় উপস্থিত থাকতেন। জগন্নাথের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ‘গঙ্গাধর’ ও ‘গঙ্গালহরী’।

এই সময়ের সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নাকিব খাঁ, নিয়ামৎ উল্লাহ, মীর্জা গিয়াস বেগ প্রমুখ। শাহজাহানের পুত্র দারা ছিলেন সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় পণ্ডিত। তিনি ‘অথর্ব বেদ’, ‘উপনিষদ’, ‘গীতা’ প্রভৃতি গ্রন্থ ফারসি ভাষায় অনুবাদে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ইতিহাস চর্চায়ও এই সময় অগ্রগতি ঘটে। আব্দুল হামিদ লাহোরীর ‘পাদশাহনামা’, এনায়েৎ আলি খাঁ-র ‘শাহজাহাননামা’, কাফি খাঁ-র ‘মুন্তাখাব-উল-লুবার’ প্রভৃতি এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ।

[4] স্থাপত্য শিল্পে অগ্রগতি:

শাহজাহানের আমলে সর্বাধিক অগ্রগতি লক্ষ করা যায় স্থাপত্যশিল্পে। তাঁর আমলে নির্মিত স্থাপত্যকীর্তিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘দেওয়ান-ই-আম’, ‘দেওয়ান-ই-খাস’, ‘জামি মসজিদ’, ‘মোতি মসজিদ’, ‘লালকেল্লা’, ‘খাস-মহল’, ‘শিশ-মহল’ প্রভৃতি। এছাড়া লাহোরে জাহাঙ্গীরের সমাধি ও নওলাখা মসজিদ, দিল্লির দুর্গ প্রভৃতিও উল্লেখযোগ্য। সম্রাট বিশ্ববিখ্যাত ‘কোহিনুর মণি’ ধারণ করতেন। তাঁর স্থাপত্য কীর্তিগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ‘তাজমহল’ ও ‘ময়ূর সিংহাসন’ পৃথকভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

তাজমহল:

শাহজাহান তাঁর প্রিয়তম পত্নী মমতাজের মৃত্যুর (1631 খ্রি.) দুই বছর পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে সুবিখ্যাত তাজমহলটি নির্মাণ করেন। প্রায় 20 হাজার শ্রমিক দীর্ঘ 22 বছর (1653-1633 খ্রি.) পরিশ্রম করে মমতাজের সমাধির উপর অনুপম তাজমহলটি নির্মাণ করেন। এর প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ ঈশা খাঁ। প্রায় 22 বিঘা জমির উপর 3 কোটি টাকা ব্যয় করে পৃথিবীর পঞ্চম আশ্চর্য তাজমহলটি নির্মাণ করেন। শাহজাহানের এই অমরকীর্তি সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শাহজাহান’ কবিতায় লিখেছেন-এক বিন্দু নয়নের জল কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল এ তাজমহল।

ময়ূর সিংহাসন:

শাহজাহান প্রায় 7 বছর ধরে বহু মূল্যবান হীরে ও মণি-মুক্তার সমন্বয়ে বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনটি নির্মাণ করেন। 1 কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ময়ূর সিংহাসনের প্রধান শিল্পী ছিলেন পারস্যের বেবাদল খাঁ। চারটি সোনার স্তম্ভের উপর সিংহাসনটি অবস্থিত ছিল। পৃথিবীর আর কোথাও এত কারুকার্যময় ও মূল্যবান সিংহাসন নেই বলে তেভার্নিয়ার উল্লেখ করেছেন। 1739 খ্রিস্টাব্দে পারস্যের অধিপতি নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনুর মণিটি পারস্যে নিয়ে যান।

[5] চিত্রশিল্প ও সঙ্গীতচর্চায় অগ্রগতি:

শাহজাহানের আমলে চিত্রশিল্প ও সঙ্গীতচর্চায় যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল। এই সময় বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ছিলেন নাদির সমরকান্দি, মির হাসান, অনুপ চিত্রা, চিত্রামণি প্রমুখ। শাহজাহানের রাজদরবারে প্রতি সন্ধ্যায় সঙ্গীত ও নৃত্যের আসর বসত। শাহজাহান নিজেও ছিলেন সুগায়ক। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য সঙ্গীতশিল্পীরা ছিলেন সুরসেন, সুখসেন, জগন্নাথ, জনার্দন ভট্ট, সুন্দর দাস প্রমুখ। সঙ্গীতচর্চা-বিষয়ক ‘সঙ্গীত কৌমুদী’, ‘সঙ্গীতসরণী’, ‘সঙ্গীতবাজ’, ‘গীত-প্রকাশ’ প্রভৃতি গ্রন্থ এই সময় রচিত হয়।

উপসংহারঃ-

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য শাহজাহানের রাজত্বকালে ‘সুবর্ণ যুগ’ আখ্যা দেওয়া হলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক এর সমালোচনা করে এই সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চাতগামীতার উল্লেখ করেছেন। শাহজাহানের ধর্মীয় গোঁড়ামি দেশের হিন্দু ও শিয়া সম্প্রদায়কে ক্ষিপ্ত করেছিল। এজন্য বিজাপুর, গোলকুণ্ডা ও আহম্মদনগরের অনেকেই মারাঠাদের পক্ষে যোগ দিয়েছিল। তিনি মাদ্রাজে ইংরেজদের বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের অনুমতি দিয়ে ভারতে ইউরোপীয়দের আধিপত্য স্থাপনের পথ প্রশস্ত করেন।

শাহজাহানের নির্মাণকার্যে বিপুল অর্থ ব্যয়িত হওয়ায় কৃষকদের উপর করের বোঝা বৃদ্ধি পায়। দুর্নীতিগ্রস্ত সুবাদার, মনসবদার ও আমলাদের শোষণে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ভীষণভাবে বেড়ে যায়।

দুর্ভিক্ষ ও আর্থিক শোষণে জর্জরিত হয়ে গুজরাট, দাক্ষিণাত্য-সহ বিভিন্ন স্থানে শাহজাহানের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। মধ্য এশিয়ার আফগানিস্তান, বাল্ব ও বাদখশানে ব্যর্থ অভিযান পাঠিয়ে শাহজাহান 4 কোটি টাকা ব্যয় করেন। প্রচুর অর্থব্যয় করেও তিনি কান্দাহার পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হন। অর্থাৎ, শাহজাহানের আমলে আপাত সমৃদ্ধি ও জাঁকজমকের আড়ালে সাম্রাজ্যের অবক্ষয় শুরু হয়েছিল। তাই বলা যায় যে, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে শাহজাহানের রাজত্বকালকে ‘সুবর্ণযুগ’ বলা হলেও সার্বিক বিচারে একে ‘সুর্বর্ণযুগ’ আখ্যা দেওয়া যায় না।

শাহজাহানের (1592-1666) উত্তরসূরীদের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধের জন্য কাকে সবথেকে বেশি দায়ী বলে মনে হয়? যুক্তি দ্বারা ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকাঃ-

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের জীবদ্দশাতেই তাঁর চার পুত্র দারাশিকো, শাহ সুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ বক্স-এর মধ্যে রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ের যুদ্ধে জয়লাভ করে ঔরঙ্গজেব মুঘল সিংহাসন দখল করেন এবং দীর্ঘ 50 বছর রাজত্ব করেন। তাঁকেই মুঘল বংশের শেষ সফল সম্রাট বলা যায়। শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র ঔরঙ্গজেবই ছিলেন শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে চতুর, সমরকুশলী ও দক্ষ কুটনীতিক।

[1] ঔরঙ্গজেবের ধর্মবোধ:

পিতা শাহজাহান ও অপর তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঔরঙ্গজেবের বিজয় ছিল ঘটনার অনিবার্য পরিণতি। মুসলমান ঐতিহাসিকেরা ঔরঙ্গজেবের বিজয়ের সূক্ষ্ম কারণ হিসেবে তার ধর্মবোধের কথা উল্লেখ করেছেন। বস্তুত একমাত্র না হলেও গোঁড়া সুন্নিবাদী আদর্শ ঔরঙ্গজেবের হাত অনেকটা সুদৃঢ় করেছিল। দারার ধর্মচ্যুত ভাবমূর্তি এবং হিন্দু ও অমুসলমানদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সুবিধাভোগী ও ক্ষমতাশালী মুসলমানদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল করেছিল যে, দারার অধীনে সিংহাসন স্থাপিত হলে ইসলামের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। তাই কিছুটা ধর্মভয়ে এবং কিছুটা অস্তিত্বরক্ষার স্বার্থে বহু মুসলমান ঔরঙ্গজেবের পক্ষ নিয়েছিল।

[2] দারার পক্ষে আন্তরিকতার অভাব:

দারার পক্ষ আন্তরিকভাবে দারার সাফল্য কামনা করেনি। তাই দারা ও ঔরঙ্গজেবের মধ্যে ধর্মাটের যুদ্ধে (1658 খ্রি.) দেখা যায় যে- যশোবন্ত সিংহের নেতৃত্বে রাজপুতরা নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দারার পক্ষে লড়াই করলেও দারার অপর সেনাপতি কাশিম খাঁর নেতৃত্বে মুসলমান সৈন্যরা নিরাপদে থেকে কেবল যুদ্ধের অভিনয় করে গিয়েছিল। যশোবন্ত সিংহ রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়ে দারাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা প্রত্যাহার করে নেন। বস্তুত, রাজপুতরা দারাকে যুদ্ধে জয়ী করতে পারেনি। অথচ রাজপুতদের সাহায্যপ্রার্থী হবার কারণেই তার প্রতি মুসলমানদের ক্ষোভ ও উদাসীনতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

[3] শাহজাহানের (1592-1666) ত্রুটিপূর্ণ কর্মধারা:

আধুনিক ঐতিহাসিকেরা ঔরঙ্গজেবের সাফল্যের জন্য শাহজাহানের ত্রুটিপূর্ণ কর্মধারার উল্লেখ করেছেন। ‘খুলাস-উৎ-তাওয়ারিখ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শাহজাহান কয়েক সপ্তাহ অসুস্থতার পর আবার কর্মক্ষম হয়েছিলেন। তিনি দারাকে বলেও ছিলেন যে, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ রাজধানীতে এলে কোনো ক্ষতিই হবে না। দারা যেন তাদের বাধা না দেন। কিন্তু মৌখিক অনুরোধ ছাড়া শাহজাহান কিছুই করেননি। ঘটনার গুরুত্ব তিনি কিছুটা উপলব্ধি করেছিলেন ঠিকই; কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তকে জোর করে বাস্তবায়িত করার মানসিক দৃঢ়তা তিনি দেখাতে পারেননি।

ধর্মাটের যুদ্ধে মুঘলবাহিনীর ব্যর্থতার পরও তিনি ঘটনার অগ্রগতি যথার্থভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। সম্রাটের মৃত্যুসংবাদ এবং দারার সিংহাসন দখলের গুজব যে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, তাতে সম্রাটের উচিত ছিল সামরিক পরিষদের সভা আহ্বান করে ক্ষমতাবান ও অনুগত অভিজাত বা মনসবদারদের মানসিক দ্বন্দ্ব দূর করা এবং দারাকে সামনে না রেখে স্বয়ং বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করা। কিন্তু তা না-করে তিনি দারার কর্তৃত্ব মেনে নেন এবং ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের আগুনে ঘৃতাহুতি দেন।

[4] শাহজাহানের মৃত্যু:

সম্রাট শাহজাহানকে সুদীর্ঘ আট বছর আগ্রার দুর্গে বন্দি অবস্থায় বহু দুঃখ-দুর্দশা সহ্য করতে হয়। বন্দি অবস্থায় জ্যেষ্ঠা কন্যা জাহানারাই ছিলেন বৃদ্ধ ও অসহায় সম্রাটের একমাত্র সান্ত্বনার স্থল। 1666 খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানের মৃত্যু হয়। কথিত আছে যে, আগ্রা দুর্গে অবরুদ্ধ সকলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে ঔরঙ্গজেব যমুনা থেকে দুর্গে জল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে সেই জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর গরমে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য শাহজাহানকে কূপ থেকে জল সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বৃদ্ধ শাহজাহান ঔরঙ্গজেবকে এক পত্রে লিখেছিলেন, “হিন্দুদের প্রশংসা করি, তারা মৃতকে জলদান করে; কিন্তু তুমি আমার পুত্র ও চমৎকার মুসলমান, জলের জন্য তুমি আমার খেদের কারণ ঘটিয়ে”

উপসংহার:-

বর্তমানে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন যে, ঔরঙ্গজেবের মতো দক্ষ প্রশাসক ও রাজপুত্রকে সমর্থন না করে তার থেকে কম যোগ্য দারাকে সমর্থন করে শাহজাহান উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বকে বাড়তে দিয়েছিলেন। দারা, সুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ যথাক্রমে পাঞ্জাব, বাংলাদেশ, দাক্ষিণাত্য ও গুজরাটের শাসনকর্তার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মুসলিম আইনে যখন জ্যেষ্ঠ পুত্রের সিংহাসনে অগ্রাধিকারের দাবিকে মেনে নেওয়া হয়নি, তখন যোগ্য পুত্র ঔরঙ্গজেবের দাবিকেই শাহজাহান মেনে নিলে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এড়ানো যেত। ঔরঙ্গজেবের প্রতি পিতা হিসেবে শাহাজাহানের নিষ্ঠুর আচরণ যেমন উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের জন্য দায়ী ছিল, তেমনি এ বিষয়ে রাজদরবারে দল ও রাজনীতি কম দায়ী ছিল না।

শাহজাহান (1592-1666)

Leave a Reply