খিলাফত আন্দোলন 1919

খিলাফত আন্দোলন 1919 ছিল ব্রিটিশ ভারতে ভারতীয় মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। এটি ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত চলেছিল। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় খিলাফত (তুরস্কের সুলতানের পদ) এবং খলিফার মর্যাদা রক্ষা করা। 

১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ভারতে খিলাফত আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কের অটোমান খিলাফতের মর্যাদা এবং ক্ষমতা রক্ষা করা, যা মিত্রশক্তির হাতে হুমকির মুখে পড়েছিল। ভারতীয় মুসলমানরা তুরস্কের সুলতানকে তাদের খলিফা (ধর্মীয় নেতা) হিসেবে দেখতেন, তাই তাঁর ক্ষমতা খর্ব করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে তারা নিজেদের ধর্মীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে মনে করতেন।

এই আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অনুপ্রেরণা থেকে জন্ম নেয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন আলি ভাতৃদ্বয় (শওকত আলি ও মহম্মদ আলি) এবং আবুল কালাম আজাদ। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা তুরস্কের প্রতি কঠোর নীতি পরিবর্তন করে। ১৯১৯ সালে নিখিল ভারত খিলাফৎ কমিটি গঠিত হয় এবং এর মাধ্যমে আন্দোলনটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

আরও জানুন – ঠান্ডা লড়াই

খিলাফত আন্দোলন 1919 

খিলাফত আন্দোলন ১৯১৯ কেন সংগঠিত হয়েছিল এই আন্দোলনে কংগ্রেসের ভূমিকা আলোচনা কর।

ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে খিলাফৎ আন্দোলন এক বিশেষ অধ্যায়। এ আন্দোলনের ওপর ভরসা করেই গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জাতীয় আন্দোলনরে খিলাফৎ নামক অক্সিজেন দিয়ে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন জাতীয় নেতৃবর্গ। যদিও খিলাফং আন্দোলনকারীরা ভারতমাতার শৃঙ্খল মোচন অপেক্ষা তুরস্কের খলিফা পদ নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। তবুও এ আন্দোলন হিন্দু-মুসলিম মৈত্রী প্রচেষ্টার এক সুবর্ণ সুযোগরূপে চিহ্নিত হয়েছিল। (জওহরলাল নেহরু মনে করেন-খিলাফৎ আন্দোলন জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি ও ধর্মের অপূর্ব মেলবন্ধন ছিল।

অর্থ:

‘খিলাফৎ’ শব্দটি খলিফা (Calipha) শব্দের সঙ্গে সংযুক্ত। ‘খিলাফৎ’-এই শব্দটির অর্থ হল ‘উত্তরাধিকারী’। আব্বাসীয় বংশের পতন ঘটার পর তুর্কিরা রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করলে তুর্কি সুলতান মুসলমানদের ‘খলিফা’ (ধর্মগুরু) রূপে পরিচিতি পান তত্ত্বগত দিক থেকে এই খলিফা ছিলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক নেতা (বিংশ শতকে এই তুরস্কের সুলতান একাধারে ছিলেন অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রধান এবং সমগ্র মুসলিম জগতের ধর্মগুরু।

প্রথম আন্দোলনের কারণ:

① প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তুরস্ক জার্মানির পক্ষ নেয় ও ইংল্যান্ডের বিরোধিতা করে। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানি হেরে যাওয়ার পর মিত্রশক্তি তুরস্কের ব্যবচ্ছেদ করে ও খলিফা পদ কেড়ে নেয়। এতে বিশ্বে মুসলিম সমাজ ক্ষুথ হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ঘোষণা করেন (১৯১৮ খ্রি., ৫ জানুয়ারি) ব্রিটেন, ফ্রান্স তুরস্ক সাম্রাজ্য থেকে এশিয়া মাইনর, থ্রেস ইত্যাদি অঞ্চল বিচ্ছিন্ন করবে না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বেইমান ব্রিটিশ তার কথা রাখেনি। ফলে ভারতের মুসলিমরা শওকত আলি ও মহম্মদ আলির নেতৃত্বে শুরু করে খিলাফৎ আন্দোলন।

উদ্দেশ্য ও দাবি:

জাতীয় কংগ্রেস ও লিগের নেতারা দিল্লিতে এক বৈঠকে একজোট হন (১৯১৮খ্রি. ডিসেম্বর)। তাঁরা বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলির অখণ্ডতা রক্ষার দাবি জানান এবং সমগ্র আরব অঞ্চল (জাজিরাত উল-আরব) তুরস্কের খলিফার হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এছাড়াও খিলাফৎ কমিটির নেতারা দাবি জানিয়ে বলেন খলিফার সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। পবিত্র মক্কা-মদিনার ওপর বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখতে হবে। খলিফার পার্থিব ও ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করা চলবে না। [iv] মেসোপটেমিয়া, আরব, সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনে খলিফার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে হবে।

নিখিল ভারত খিলাফৎ কমিটি গঠন:

প্রথমে (১৯১৩ খ্রি.) মৌলানা আবদুল বারি, মৌলানা মুহম্মদ আলি এবং মৌলানা সওকত আলি (আলি ভ্রাতৃদ্বয়) মুসলিম তীর্থস্থানগুলির পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠন করেন ‘অঞ্জুমান-ই-খুদ্দাম-ই-কাবা’। একই লক্ষ্যে মৌলানা ওবেদুল্লা সিম্মি দিল্লিতে গঠন করেন ‘নজরাতুল মারিফ’ নামক একটি সংগঠন। বোম্বাইয়ের কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ী গড়ে তোলেন ‘মজলিস-ই-খিলাফৎ’। অবশেরে লক্ষ্ণৌতে মৌলানা আবদুল বারি ও আলি ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রচেষ্টায় এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খাঁর সহযোগিতায় নিখিল ভারত খিলাফৎ কমিটি গঠিত হয় (১৯১৯ খ্রি., ২৪ নভেম্বর)। এই কমিটির প্রধান কার্যালয় গড়ে ওঠে বোম্বাইয়ে। ফজলুল হকের সভাপতিত্বে এর প্রথম অধিবেশন বসে দিল্লিতে।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মহাত্মা গান্ধীর সমর্থন। তিনি এই আন্দোলনকে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। গান্ধীজি খিলাফত আন্দোলনকে তাঁর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন, যা ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়ে এক অভূতপূর্ব হিন্দু-মুসলিম ঐক্য তৈরি করে। এই দুটি আন্দোলন একযোগে চলতে থাকে এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিকে ত্বরান্বিত করে। যদিও তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের খিলাফত বিলুপ্তির পর এই আন্দোলন তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তবুও এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

গান্ধিজি ও খিলাফৎ আন্দোলন:

(ব্রিটিশ-বিরোধী খিলাফৎ আন্দোলনকে গান্ধিজি হিন্দু-মুসলিম মৈত্রী প্রচেষ্টার এক সুবর্ণ সুযোগরূপে গ্রহণ করেন) এ প্রসঙ্গে তিনি মহম্মদ আলিকে লেখেন-মুসলিম প্রশ্নের ঠিকমতো সমাধান করা গেলে স্বরাজ লাভ সম্ভব। তিনি খিলাফৎ কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন-আমরা যদি মুসলিমদের প্রকৃতই ভাই বলে মনে করি, তাহলে তাদের বিপদ উপস্থিত হলে এবং ন্যায় তাদের পক্ষে আছে বুঝতে পারলে তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করাই আমার কর্তব্য। (সর্বভারতীয় খিলাফৎ সম্মেলনের এক বিশেষ অধিবেশনে গান্ধিজি সভাপতির পদ গ্রহণ করেন এবং খিলাফৎ দাবির প্রতি সমর্থন জানান। গান্ধিজি প্রচন্ডভাবেই চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে কাজে লাগাতে, তাই তিনি বলেন-হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এমন সুযোগ একশো বছরেও আর আসবে না)

জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থন:

(কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে (১৯২০ খ্রি., সেপ্টেম্বর) জাতীয় কংগ্রেস খিলাফৎ প্রশ্নকে সমর্থন জানায় এক প্রস্তাব গ্রহণ করে বলা হয়, খিলাফৎ প্রশ্নে যতদিন কোনো মীমাংসা না হচ্ছে এবং পাঞ্জাবের প্রতি যতদিন না অন্যায়ের প্রতিকার করা হচ্ছে, ততদিন ভারত শান্ত হবে না। জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ খিলাফৎ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য দৃঢ় করার চেষ্টা করেন।

ব্যর্থতার কারণ:

খিলাফৎ আন্দোলন শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ এই আন্দোলন শেষপর্যন্ত অহিংস ছিল না, মালাবারের মোপালা বিদ্রোহের মতো হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। ② বেশিরভাগ মুসলমান নেতৃবর্গ খিলাফৎ প্রশ্নের সমাধান নিয়েই বেশি ব্যগ্র ছিলেন, তাঁদের কাছে স্বরাজের দাবি উপেক্ষিত ছিল। ③ খলিফা তথা মুসলিম জগতের ধর্মগুরু নিজের দেশেই ততটা জনপ্রিয় ছিলেন না, এ ব্যাপার ভারতের খিলাফৎ নেতৃবর্গ জানতেন না। এ চরম সত্য উন্মোচিত হয় যখন দেখা যায় কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কে খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ভারতে মুসলমান সম্প্রদায় এর কোনো প্রতিবাদ করেন না। এক শ্রেণির উলেমা, মোল্লা, মৌলবাদী প্রচারের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিভেদে মদত দেওয়ায় এই আন্দোলন তার চরিত্র হারায়, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হয়।

মূল্যায়ন:

ভ্যাটিকান সিটিতে পোপের ওপর অন্যায় করা হলে সারা বিশ্বের ক্যাথোলিক খ্রিস্টানদের ধর্মবিশ্বাসে যেমন আঘাত লাগে, তেমন তুরস্কের খলিফার অপমানে ভারতের মুসলমানরাও অপমানিত বোধ করেছিল, এতে অন্যায় কিছু নেই। কিন্তু অন্যায় যেটা তা হল স্বদেশভূমির মুক্তিচিন্তাকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র খলিফার মুক্তিচিন্তায় বিভোর থাকা। তাই জুডিথ ব্রাউন সমালোচনার সুরে লিখেছেন-গান্ধি যে কৌশল দ্বারা ব্যাপক মুসলিম সমর্থন লাভকরেন তা পরে বৃহৎ বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। ১৯১৯ সালের খিলাফত আন্দোলন ছিল ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঘটনা। তুরস্কের খলিফার মর্যাদা রক্ষার জন্য ভারতীয় মুসলিমদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন শুরু হলেও, এর মূল্যায়ন বেশ জটিল। এর কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে।

খিলাফত আন্দোলন ১৯১৯

Leave a Reply