1947-68 দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক

1947-68 দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক – ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক ছিল জটিল ও বহুমাত্রিক। এই সময়ে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সাথে তার সম্পর্ক উন্নয়নে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। এই অঞ্চলের দেশগুলির সাথে ভারতের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, যা এই সময়ে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। 

১৯৪৭ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঔপনিবেশিকতা বিরোধী মনোভাব এবং অ-সংযুক্ত আন্দোলনের (Non-Aligned Movement) নীতির ওপর ভিত্তি করে। স্বাধীনতা লাভের পর ভারত এই অঞ্চলের দেশগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল এবং এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে একতা ও সহযোগিতা স্থাপনের চেষ্টা করে।

প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই নীতির প্রধান রূপকার ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দিল্লিতে “এশীয় সম্পর্ক সম্মেলন” (Asian Relations Conference) আয়োজন করে তিনি এই অঞ্চলের দেশগুলোকে একত্রিত করেন। এরপর ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং শহরে আয়োজিত সম্মেলনে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সম্মেলনে ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তৈরি হয় এবং শীতল যুদ্ধের দুই পরাশক্তির সামরিক জোটে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আরও দেখুন- তোষণ নীতি

              

1947-68 দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক

ভূমিকা:-

পৃথিবীর ইতিহাসে ভারতবর্ষ একটি অতি আলোচিত নাম। দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজদের উপনিবেশ হিসেবে শাসিত এবং শোষিত হবার পর ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত বর্ষ তার রাজনৈতিক নীতি, যুদ্ধনীতি, সামাজিক নীতি, সাংস্কৃতিক নীতি এই সবকিছুর জন্য বিশ্ব ইতিহাসে বিশেষ ভাবে আলোচিত হয়েছে। ভারতবর্ষ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছে। কখনো বাংলাদেশ, কখনো পাকিস্তান, কখনো শ্রীলংকা, কখনো নেপাল, ভুটান প্রভৃতি দেশের সঙ্গে ভারতবর্ষে সম্পর্কের উত্থান পতন ঘটেছে। সর্বোপরি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারতবর্ষ একটি প্রভাবশালী অবস্থান বজায় রেখেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক :-

ক) পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক :-

ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সময় আরেকটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যায় সেটি হল পাকিস্তান। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময় থেকেই পাকিস্তান বিভিন্নভাবে ভারতের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছে। 1947 সালের দেশভাগের পরবর্তীতে পাকিস্তান ব্যাপকহারে ধর্মভিত্তিক আক্রমণ শুরু করলে পাকিস্তানের হিন্দু জনগণ উদ্বাস্তু হয়ে ভারতবর্ষে চলে আসতে শুরু করে। এ বিষয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরোধিতা করে। পরবর্তীকালে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কাশ্মীরের এক অংশ পাকিস্তানকে ছেড়ে দেওয়ার পরও ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান শত্রু মনোভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। সর্বমোট ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত নিম্নমানের।

খ) ভারত নেপাল সম্পর্ক :-

ভারত ও নেপালের মধ্যে সম্পর্ক বহু-বিস্তৃত এবং ঐতিহাসিক, যেখানে রয়েছে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, এবং ভৌগোলিক বন্ধন। উভয় দেশ একে অপরের প্রতিবেশী এবং তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে।  ১৯৫০ সালের শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও নেপালের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, উভয় দেশ তাদের নিজ নিজ নাগরিকদের একে অপরের দেশে বসবাস, সম্পত্তি অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রদানে সম্মত হয়েছে।

এছাড়াও, দুই দেশের মধ্যে একটি উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, যা মানুষের অবাধ চলাচল এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। উভয় দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সফর এবং সংলাপ নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে সহায়ক।  ভারত ও নেপালের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ। উভয় দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে, যেমন জলবিদ্যুৎ, পর্যটন, এবং অবকাঠামো উন্নয়ন।

গ) ভারত ভুটান সম্পর্ক :-

ভারত ও ভুটানের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে খুব ঘনিষ্ঠ এবং এটিকে “বিশেষ সম্পর্ক” হিসেবে ধরা হয়। ভুটান ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং উভয় দেশই একে অপরের সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে থাকে।

               ভারত ও ভুটানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বহু পুরোনো। ভুটানের স্বাধীনতা লাভের পর, ভারত তার সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। উভয় দেশ একটি বিশেষ সম্পর্ক ভাগ করে নেয়, যেখানে ভারত ভুটানের পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী।  ভারত ভুটানের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার এবং বাণিজ্যিক অংশীদার। ভুটানের তৃতীয় দেশের সাথে আমদানি-রপ্তানি ভারতের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। ভারত ভুটানকে সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং বিমান প্রতিরক্ষা প্রদানে সহায়তা করে। ভুটানের সেনাবাহিনী ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা প্রশিক্ষিত।

ভারত ভুটানে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনা করে, যা উভয় দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। ভারতীয় নাগরিকদের ভুটান ভ্রমণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়, তাদের ঐতিহ্যবাহী ভিসার প্রয়োজন হয় না। ভারত ও ভুটানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক একটি চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা ১৯৪৯ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং পরে ২০০৭ সালে সংশোধিত হয়। ভারত ও ভুটানের মধ্যে প্রায় ৬৯৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের চারটি রাজ্য – অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ এর সাথে যুক্ত।

ঘ) ভারত শ্রীলংকা সম্পর্ক:-

ভারত ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক বহু প্রাচীন এবং দুটি দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ়। বর্তমানে, এই সম্পর্ক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয় দেশের মধ্যে ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গভীর মিল দেখা যায়। বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের ক্ষেত্রেও এই দুটি দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। ভারত শ্রীলঙ্কার অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার।

ঙ) ভারত ও মালদ্বীপ সম্পর্ক:-

ভারত ও মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরে পরস্পর সমুদ্রসীমার মাধ্যমে যুক্ত হওয়া দুটি প্রতিবেশী দেশ। এ দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতায় সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ। ভারত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি নিরাপত্তা বজায় রাখতে অবদান রেখে চলেছে। , মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুইজ্জু “ইন্ডিয়া-আউট” প্রচারণা আরোপ করায় উত্তেজনা বেড়েছে এবং দেশটি চীনের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করছে । এর পাশাপাশি, মালদ্বীপের মন্ত্রীদের লাক্ষাদ্বীপ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অপমান করার সাম্প্রতিক ঘটনা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

              ৫০০ মিলিয়ন ডলারের গ্রেটার মালে প্রকল্পের পর এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলমান বৃক্ষরোপণ অবকাঠামো প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। গ্রেটার মালে প্রকল্পের লক্ষ্য হল ৬.৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সেতুর মাধ্যমে রাজধানীকে সংলগ্ন তিনটি উচ্চভূমির সাথে সংযুক্ত করা। ভারত এবং মালদ্বীপ উভয়ই কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এর প্রজাতন্ত্র ।ভারতের একটি হাই কমিশন মালেতে রয়েছে এবং মালদ্বীপের একটি হাই কমিশন নয়াদিল্লিতে রয়েছে ।

ভারত তার অ-সংযুক্ত নীতি অনুসরণ করে এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সক্রিয় ছিল এবং কোরিয়া বা ইন্দোচীনে (ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়া) শান্তি মিশনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সময়ে, ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্পর্ক ছিল মূলত রাজনৈতিক ও আদর্শগত, অর্থনৈতিক সম্পর্ক তেমন শক্তিশালী ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার অভিন্ন লক্ষ্য এই অঞ্চলের দেশগুলোকে ভারতের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।

উপসংহার

এই সময়কালে ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্পর্ক মূলত রাজনৈতিক এবং আদর্শগত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছিল। এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল ঔপনিবেশিকতা বিরোধী মনোভাব এবং অ-সংযুক্ত আন্দোলন (NAM)। ভারত নবগঠিত এই দেশগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করে এবং তাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটি তৃতীয় শক্তি জোট গঠনের চেষ্টা করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোট থেকে নিজেদের দূরে রাখা এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

১৯৪৭-৬৪ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক

Leave a Reply