∆ ঠান্ডা লড়াই (Cold War) বলতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এবং আদর্শগত দ্বন্দ্বকে বোঝায়, যা সরাসরি যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংঘাত ছাড়াই চলত। এই সময়ে, উভয় পক্ষই একে অপরের প্রতিপক্ষ ছিল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করত, তবে তারা কখনও সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি।

Table of Contents
তৃতীয় বিশ্বে কিভাবে ঠান্ডা লড়াই ছড়িয়ে পড়ে ?
∆ তৃতীয় বিশ্বে ঠান্ডা লড়াই :-
• কোরিয়া সমস্যা:-
প্রায় তিনদশক পরে দ্বীপরাষ্ট্র কোরিয়া জাপানি সাম্রাজ্যের কবল থেকে মুক্ত হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে জাপানি অধ্যায়-এর পরিসমাপ্তি ঘটলেও মুক্তিবাদী মিত্রশক্তিপুঞ্জের ‘প্রভাব-এলাকার’ তত্ত্ব পৌঁছোল সুদূর কোরিয়ায়। যুদ্ধের শর্ত অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার এবং দক্ষিণ প্রান্ত আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকল। দেশটি দুটি দখলি এলাকায় বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সেখানে দুটি আলাদা ধরনের সরকার ও ভিন্ন দুই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা কায়েম হতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবানুসারে ৩৮০ অক্ষরেখার সীমানা ধরে কোরিয়াকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দু’ভাগে ভাগ করা হয়।
১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মস্কোয় কোরিয়া সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এক আলোচনা বৈঠক বসে। এই আলোচনায় স্থির হয় যে সোভিয়েত-মার্কিন যুক্ত কমিশন গঠন করা হবে। এই কমিশন কোরিয়ার সব গণতান্ত্রিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করবে। কোরিয়া পাঁচ বছরের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিন, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে। এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিষয়টি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে উত্থাপন করলে জাতিপুঞ্জ কোরিয়া সম্পর্কিত এক অস্থায়ী কমিশন নিযুক্ত করে। এই কমিশনকে সমগ্র কোরিয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া জাতীয় পরিষদ প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় সৈন্যবাহিনী গঠন করে সমগ্র কোরিয়ার শাসনক্ষমতা দখল সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ করবার অধিকার প্রদত্ত হয়। কমিশনকে আরও দায়িত্ব দেওয়া হয় বিদেশি সৈন্য অপসারণের জন্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই কমিশন গঠনের প্রস্তাবে বিরোধিতা করে। কমিশন শুধু দক্ষিণ কোরিয়াতে নির্বাচন-পর্ব অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। সমগ্র কোরিয়াকে ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই ও মতপার্থক্যের ফলে উক্ত প্রচেষ্টা সাফল্যলাভ করেনি।
১৯৪৮ সালে সীংম্যান রী’র নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক দক্ষিণপন্থী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। রী’র একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থায় কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দমন করা হতে লাগল এবং এই কমিউনিস্ট সংগঠনকে সরাসরি দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হল। তিনি কমিউনিস্টদের সতর্ক করে দিলেন যে তারা যদি তাঁর মত সমর্থন না করে তাহলে সৈন্য দ্বারা দ্বীপরাষ্ট্রটির উত্তর সীমান্ত বন্ধ করে দেবেন। আমেরিকা স্ত্রী’র এই হুমকিকে যুদ্ধের প্রাক্-ঘোষণা হিসেবে গুরুত্ব দিল এবং তাঁর এই উগ্র জাতীয়তাবোধকে ঠেকানোর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্যবাহিনীকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র পাঠাল।
উত্তর কোরিয়াতে এক নির্বাচন হয়। কিম ইল সুং-এর নেতৃত্বে এক কমিউনিস্ট সরকার উত্তর কোরিয়াতে কার্যভার গ্রহণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। উত্তর কোরিয়া প্রধানত শিল্পপ্রধান এবং দক্ষিণ কোরিয়া কৃষিপ্রধান। আমেরিকা সীংম্যান সরকারকেই একমাত্র আইনসঙ্গত কোরিয়া সরকার বলে ঘোষণা করে। নতুন এক কমিশন গঠন করে উভয় কোরিয়ায় সংযুক্তির প্রচেষ্টা চালাতে বলা হয়। উভয় কোরিয়াই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার আবেদনপত্র জাতিপুঞ্জ গ্রহণ করেনি। দক্ষিণ কোরিয়ায় আবেদন সোভিয়েত ‘ভেটো’ প্রয়োগের ফলে বাতিল হয়ে যায়।
১৯৫০-এর জুন মাসে অভিযোগ ওঠে উত্তর কোরিয়া থেকে নাকি কমিউনিস্ট ফৌজ সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়া ভূখণ্ড আক্রমণে উদ্যত। প্রসঙ্গটি অচিরেই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হয় এবং আগ্রাসনের ঘটনা হিসেবে একে চিহ্নিত করে যৌথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা, অর্থাৎ উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সম্মিলিত আক্রমণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সোভিয়েতের প্রবল আপত্তি, ঘন ঘন ভিটো প্রদান ও শেষে সভাকক্ষ ত্যাগের পর অচল নিরাপত্তা পরিষদ থেকে বিষয়টি সাধারণ সভায় তোলা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে কোরিয়ায় UN সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই অভিযানে ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশের সহযোগিতা থাকলেও, সদ্য-দখল জাপানের ভূখণ্ড থেকে যুদ্ধ পরিচালনার সিংহভাগ দায় বহন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরের চেষ্টাতেও এই যৌথ অভিযান শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়। বরং ৩৮তম অক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশোদ্যত জাতিপুঞ্জ বাহিনী, চিন-সোভিয়েত সাহায্যপুষ্ট উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের মুখে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শেষপর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বাধ্য হয় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এবং জেনিভা শাস্তি সম্মেলনের (১৯৫৪) শর্তসাপেক্ষে উভয়পক্ষের বন্দিবিনিময় সম্পন্ন হয়।

• সুয়েজ সঙ্কট:-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে মিশর অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ শেষে মিশর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ লাভ করে। যুদ্ধোত্তরকালে মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবের ফলে মিশরে যে গঠনমূলক জাতীয়তাবোধ জন্মায়, পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক শক্তিগুলি তাকে উপেক্ষা করতে থাকে। ১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে কর্নেল গামাল আব্দেল নাসের সর্বসম্মতিক্রমে মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি নাসেরের বৈদেশিক নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র আরব জগতকে ঐক্যবদ্ধ করা, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দূর করা, সামন্তবাদের উচ্ছেদ সাধন করে আমূল ভূমি সংস্কার প্রবর্তন করা। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য নাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনা অবলম্বন করেন। পশ্চিমি বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন প্রমুখ এবং বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন নাসের। কিন্তু তাঁর এই আবেদন গৃহীত হয়নি। তাদের এই অসম্মতি নাসেরকে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
নাসের ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই সুয়েজ খাল জাতীয়করণের কথা ঘোষণা করেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে জাতীয়করণের পরে সুয়েজ খাল থেকে যে অর্থ সংগৃহীত হবে তাই আসোয়ান বাঁধ নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং এইভাবে মিশরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে রূপায়িত করা হবে। সুয়েজ জাতীয়করণে ইঙ্গফরাসি শক্তি মিশরের ওপর বিশেষভাবে ক্রুদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
এরপর মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসের সুয়েজ খাল থেকে ব্রিটিশ সৈন্য অপসারণ এবং পুরনো চুক্তি বাতিল করে সুয়েজ খালের কর্তৃত্ব মিশরের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করায় ইঙ্গ-ফরাসি তরফে সশস্ত্র যুগ্ম আক্রমণ (১৯৫৬) চালানো হয়। নির্জোট নীতির পক্ষপাতী নাসেরের সঙ্গে সোভিয়েত দেশের সুসম্পর্ক লক্ষ করে নীলনদের ওপর নির্মীয়মাণ আসোয়ান বাঁধ প্রকল্প থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুত সাহায্য প্রত্যাহার করে নেয়। সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিম অনুগামী কয়েকটি দেশ (ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও পাকিস্তান)-কে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করা মধ্যপ্রাচ্যে এ পর্যন্ত অনাগত ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পথ উন্মুক্ত করে দিল।

• ভিয়েতনাম যুদ্ধ:-
আনাম, কাম্বোডিয়া ও লাওস এই তিনটি রাজ্যকে নিয়ে ছিল ইন্দোচীন। উনিশ শতকে এই তিনটি রাজ্যের ওপর ফ্রান্স তার আধিপত্য স্থাপন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান যখন ইন্দোচীনে প্রবেশ করে তখন এখানে ফরাসি শাসনের অবসান ঘটে। এই সময় ভিয়েৎমিন্ নামে একটি বিপ্লবী দল স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করে। জাপানের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দলটি আনামে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এবং এর নাম দেয় ভিয়েতনাম। এই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হলেন হো চি মিন।
যুদ্ধ শেষ হলে ফরাসি সরকার এই অঞ্চলে তার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবার সঙ্কল্প করে। শুরু হল সাম্রাজ্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এইভাবে জাপান থেকে কোরিয়া এবং তারপরেই দক্ষিণ-পূর্বমুখী আক্রমণাত্মক প্রস্তুতির সমর্থনে Domino Theory নামের একটি তত্ত্বের আমদানি করা হয়।
ঠান্ডা লড়াইয়ের রাহু অনিবার্যভাবে গ্রাস করল ভিয়েতনামের শাস্তি প্রক্রিয়াকে। পতনোন্মষ ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ না করাটা মার্কিন প্রশাসনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ (tactical retreat) মাত্র এবং জেনিভা সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনামের অভ্যুদয় যে আদৌ তাদের মনঃপূত নয় তার প্রমাণ অচিরেই পাওয়া গেল। ভিয়েতনামের দক্ষিণ অংশকে এবার ‘testing ground for containment on the mainland of Asia’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকল।
দক্ষিণ ভিয়েতনামের মার্কিন মনোনীত রাষ্ট্রপ্রধান নো দিন দিয়েমকে আশ্বাস দেওয়া হল তাঁর দেশটিকে রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত ও বাইরের সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করবার মতো শক্তিশালী করে তোলা হবে। এইভাবে শুরু হল দক্ষিণ ভিয়েতনামে জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির উপর দমনপীড়ন, প্রতিক্রিয়ায় উত্তরোত্তর গণবিক্ষোভ, স্বেচ্ছাবাহিনী ভিয়েতকঙের উদ্ভব, ক্রমাগত মার্কিন সৈন্যবাহিনীর প্রবেশ এবং অবশ্যই উত্তর ভিয়েতনামে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট সরকারের ওপর বোমারু হামলা যার প্রত্যুত্তরে সমগ্র ভিয়েতনাম জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
সাহায্য আসতে থাকে সোভিয়েত ও চিন থেকে। শত্রু বিনাশের নামে শহরতলি, গ্রাম, শস্যক্ষেত্র, বনাঞ্চলে মার্কিন রাসায়নিক অস্ত্রের ধ্বংসলীলা আর নিরীহ মানুষ নিধন সারা বিশ্বে নিন্দা এবং নিজ দেশে ছাত্র যুব বিক্ষোভের আলোড়ন জাগায়। অবশেষে উত্তর ও দক্ষিণের দীর্ঘ (১৯৬৪-৭৫) মৃত্যুপণ সংগ্রাম সমগ্র ভিয়েতনাম ও সন্নিহিত লাওস ও কাম্বোডিয়া থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ অপসারণে বাধ্য করে এবং স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনামের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
দেখা গেল কোরিয়ার সংগ্রামের পর আবার এশিয়ারই অন্য একটি দেশে মার্কিন আগ্রাসনের তান্ডব। একে উপলক্ষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অংশত চিনের সঙ্গে তাদের শুধু ছায়াযুদ্ধ নয়, ভালো মতো শক্তির পরীক্ষা হয়ে গেল। সেইসঙ্গে তৃতীয় দুনিয়ার কোন্ দেশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এই সংগ্রামে কী ভূমিকা গ্রহণ করে তারও পরীক্ষা হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও অভাবনীয় পরাজয় ঘটল। ভিয়েতনামের এই সাফল্যে সমগ্র এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে সোভিয়েত দেশের প্রভাব শতগুণ বর্ধিত হল।

আরব ইসরাইল সংঘর্ষ:-
আরব ইসরাইল সংঘর্ষ ঠান্ডা লড়াইয়ের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। ইহুদিদের ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আরবীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইজরায়েলের সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই যুদ্ধের সূচনা হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধ চলে। আরব ইসরায়েল সংঘর্ষ ধীরে ধীরে ঠান্ডা লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এই লড়াইকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ঠান্ডা লড়াই এর আবর্তে দাঁড়িয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরব ইসরাইল সংঘাতকে ইন্ধন যুগিয়েছিল। এই দুই মহা শক্তিশালী দেশ সমাজতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী আদর্শকে হাতিয়ার করে ঠান্ডা লড়াই এর আবর্তে মধ্যপ্রাচ্যকে জড়িয়ে ফেলেছিল। সুতরাং ঠান্ডা লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আরব ইসরাইল যুদ্ধের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বিশ্বের কাছে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত আরব ইসরাইল দ্বন্দ্বের ইতি আসে । কিন্তু ততক্ষণে আরব এবং ইসরাইল উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক সামরিক এবং সামাজিক সবদিক থেকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে গিয়েছিল।