তোষণ নীতি বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তি বা দলের অন্যায় আবদার বা আগ্রাসনকে প্রশমিত করার জন্য তাদের দাবি মেনে নেওয়া বা তাদের প্রতি নরম মনোভাব পোষণ করা। এর মূল লক্ষ্য থাকে শান্তি বজায় রাখা বা কোনো সংঘাত এড়ানো, তবে এর ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে, তা আরও উৎসাহিত হতে পারে।
Table of Contents
উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জার্মানির সম্প্রসারণবাদী নীতিগুলির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকারের তোষণ নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এই নীতি হিটলারের ক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দিকে দেশকে ঠেলে দেয়।
তোষণ নীতির কিছু বৈশিষ্ট্য:
- নরম মনোভাব:প্রতিপক্ষের দাবি মেনে নেওয়া বা তাদের প্রতি নমনীয় হওয়া।
- সংঘাত এড়ানো:বৃহত্তর সংঘাত এড়ানোর জন্য আপস করা।
- দুর্বলতা প্রদর্শন:প্রতিপক্ষের কাছে নিজেদের দুর্বল হিসেবে তুলে ধরা।
- অনিশ্চিত ফলাফল:তোষণ নীতি সবসময় সফল নাও হতে পারে এবং অনেক সময় তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
তোষণ নীতি কী? এই নীতির পরিণাম কি হয়েছিল ?
উত্তর:- হিটলার কর্তৃক ইউরোপে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ রাশিয়াকে শংকিত করে তোলে। হিটলারকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে রাশিয়া ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে একটি পশ্চিমি জোট গঠনে উৎসুক ছিল এবং এই মর্মে সে প্রস্তাবও দেয়। অপরদিকে, ইঙ্গ-ফরাসি কূটনীতিকরা মনে করতেন যে, তাদের কাছে নাৎসিবাদ ও সাম্যবাদ দুই-ই বিপজ্জনক হলেও সাম্যবাদ আরও বেশি বিপজ্জনক।
তাঁরা হিটলারকে সাম্যবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন যে, ভার্সাই সন্ধিতে যথার্থই জার্মানি ও ইতালির প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। সুতরাং বিশ্বশান্তির তাগিদে তাদের কিছু দাবি মেনে নিলে কোনো অন্যায় হবে না। এইভাবে জার্মানি ধীরে ধীরে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে একদিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। তাতে ইউরোপের শান্তি বজায় থাকবে এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কোনো অসুবিধা হবে না। ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ কর্তৃক অনুসৃত এই নীতি তোষণ নীতি নামে পরিচিত। এর উদগাতা হলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন, যদিও এর সূচনা হয় পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইন (১৯৩৫–১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে) এর আমলে এই তোষণ নীতির ফলে হিটলারের একের পর এক রাজ্যগ্রাস সত্ত্বেও ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ চুপচাপ ছিল।
বিশ শতকের তিনের দশকে ইউরোপের একনায়কতন্ত্রী দেশগুলির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি কোনোরকম প্রতিরোধের বদলে যে আপস নীতি গ্রহণ করেছিল, তাকেই তোষণ নীতি বলা হয়। সোভিয়েতে সাম্যবাদ জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিবাদ ও ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে ভীতি জন্মায় তা থেকে মুক্তি পেতে অবলম্বন করা হয় তোষণ নীতির। যদিও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বল্ডউইন (১৯৩৫-৩৭খ্রিস্টাব্দে) এই নীতির সূচনা করেছিলেন, তবে এর প্রবক্তা হিসেবে তাঁর পরবর্তী টোরি দলের প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেনকেই ধরা হয়। তোষণ নীতি আসলে ছিল এক ভ্রান্তনীতি।
• তোষণ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল:-
→ ভার্সাই সন্ধি:-
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন মনে করতেন ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানি ও ইতালির ওপর যথার্থই অন্যায় করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে চেম্বারলেন বলেছিলেন-হিটলারবাদ ভার্সাই সন্ধির অবিচারেরই কুফল। এর অন্যায় শর্তগুলি সংশোধিত হলে হিটলারবাদের ক্ষতিকারক ও খারাপ দিকগুলিরও বিলোপ হবে। তাই বিশ্বশান্তির তাগিদে ইতালি ও জার্মানির কিছু দাবি তিনি মেনে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন।
→ বলশেভিক ভীতি:-
ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি মনে করত- নাৎসিবাদ ও সাম্যবাদ দুই-ই বিপজ্জনক, কিন্তু সাম্যবাদ নাৎসিবাদের থেকে বেশি বিপজ্জনক। এ ব্যাপারে ফরাসি বুর্জোয়াদের শ্লোগানই ছিল-হিটলার খারাপ, স্টালিন আরও বেশি খারাপ। আরও পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে যে, বলশেভিক ভীতিই ছিল ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির মূলে। তারা আশা করেছিল, হিটলার তার পূর্ব-ঘোষণা মতো পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে একদিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন। তাতে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি ইউরোপে শাস্তিও বজায় থাকবে।
ইতালির প্রতি তোষণ নীতি গ্রহণের পেছনে ইঙ্গ-ফরাসি শক্তির একটা অন্য ধরনের ‘ভয়’ কাজ করেছিল। সেটি হল-ইতালি পাছে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে জোট বাঁধে। তাই যাতে জোট না বাঁধতে পারে সেদিকে নিশ্চিত হতে ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি ইতালিকে তোষণ করেছিল। কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হয়নি।
• তোষণ নীতির প্রয়োগ:-
ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করলে (১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে) জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে অবরোধের ডাক দেয়। জাতিসংঘের একটি প্রথম সারির শক্তিশালী সদস্য হলেও ব্রিটেন কিন্তু ওই ডাক উপেক্ষা করে নানাভাবে ইতালিকে সাহায্য করে যায়।
→ ইঙ্গ-জার্মান নৌচুক্তি:-
ভার্সাই চুক্তির শর্তকে লঙ্ঘন করে জার্মানি যে অস্ত্রসজ্জা করেছিল, ব্রিটেন জার্মানিকে তোষণ করবার জন্য তা মেনে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ইঙ্গ-জার্মান নৌচক্তি (১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে) নামে একটি সামরিক চুক্তিও দুটে দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে জার্মানিকে ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নৌবহর রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
→ রাইন উপত্যকা অধিকার:-
ভার্সাই ও লোকার্নো চুক্তির শর্তাবলি উপেক্ষা করে জার্মানি রাইন উপত্যকা অঞ্চসে অস্ত্রসজ্জা শুরু করে এবং বিনা বাধায় অঞ্চলটি দখল করে নেয় (১৯৩৬ খ্রি.)। ইংল্যান্ড বা ফ্রান্স প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, বরং জার্মানির ও আগ্রাসনকেই সমর্থন করে। চেম্বারলেন বলেন ‘জার্মানির নিজের জনগণের ওপরে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার করেছে।’
→ স্পেনের গৃহযুদ্ধ:-
স্পেনের গৃহযুদ্ধে জার্মানি ও ইতালি বিদ্রোহীদের নেতা জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে এগিয়ে গেলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে, যার জন্য হিটলার ও মুসোলিনি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন।
→ অস্ট্রিয়া অধিকার:-
হিটলার আনঙ্কুশ (সংযুক্তিকরণ) নীতি অনুসারে জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রিয়াকে যুক্ত করলে ব্রিটিশ দূত নেভিল হেন্ডারসন বলেছিলেন, শান্তিপূর্ণভাবে সংযুক্তিকরণ হলে ব্রিটেন বিরোধিতা করবে না। আর ফ্রান্স এ ব্যাপারে সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেও অস্ট্রিয়াকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। ইঙ্গ-ফরাসি তোষণের ফলে হিটলারের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বৃদ্ধি পায়।
→ মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর:-
হিটলার যখন চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল আক্রমণে উদ্যত, তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন স্বয়ং বার্লিনে এসে হিটলারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। পরে মুসোলিনির মধ্যস্থতায় চেম্বারলেন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের, হিটলার ও মুসোলিনির মধ্যে সম্পাদিত হয় মিউনিখ চুক্তি (১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে)। চুক্তি অনুসারে বিনাযুদ্ধেই চেকোশ্লোভাকিয়ার এক বিশাল অঞ্চল (১১,০০০ বর্গমাইল সুদেতান অঞ্চল) জার্মানির হাতে তুলে দেওয়া হয়। চেম্বারলেন হিটলারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল জার্মানির ন্যায্য পাওনা। জার্মানির প্রতি এমন নির্লজ্জ তোষণের উদাহরণ দ্বিতীয়টি নেই। এফ. এল. সুম্যানের মতে-মিউনিখ চুক্তি চূড়ান্ত তোষণ নীতির বহিঃপ্রকাশ এবং পশ্চিমি গণতন্ত্রের মৃত্যু পরোয়ানা (‘The Munich pact was the culmination of appeasement and warrant of death for the western democracies’)।
• দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য তোষণ নীতির দায়িত্ব:-
মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার অবশিষ্ট অংশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই তিনি সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে তোষণ নীতির অসারতা প্রমাণ করে দেন।
তোষণ নীতির মাধ্যমে হিটলারকে খুশি রেখে ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ মনে করেছিল ইউরোপে শান্তি বজায় রাখতে পারবে। কিন্তু এই তোষণ হিটলারের অহমিকা ও রাজ্যস্পৃহা এমনই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। পোল্যান্ড করিডোর-এর দাবি জানিয়ে প্রত্যাখ্যাত হিটলার যখন পোল্যান্ড আক্রমণ করলেন, তখন দেরিতে হলেও, তোষণ নীতি বর্জন করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
হিটলারের সাম্যবাদী বিদ্বেষ ও সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন স্টালিন। তিনি চেয়েছিলেন জার্মান আগ্রাসনকে কিছু দিনের জন্য পিছিয়ে দিতে, আর সেই ফাঁকে রাশিয়ার শক্তি বৃদ্ধি করে নিতে। এদিকে তোষণ নীতিতে আচ্ছন্ন ব্রিটেন ও ফ্রান্স রাশিয়ার সঙ্গে কোনো চুক্তিতেই আবদ্ধ হতে চায়নি। এক্ষেত্রে তাদের ভয় ছিল রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হলে জার্মানি ক্ষুদ্ধ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামবে। এই পরিস্থিতিতে সোভিয়েত রাশিয়া জার্মানির সঙ্গে রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে (১৯৩৯ খ্রি., ২৩ আগস্ট)। হিটলার এই চুক্তি অমান্য করে রাশিয়া আক্রমণ করেছিল।
তোষণ নীতির সুযোগ নিয়ে মুসোলিনির আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) আক্রমণের সময় (১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে) পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলি নীরব ছিল। হিটলার এতে আরও উৎসাহিত হয়ে রাইন অঞ্চলে সেনা সমাবেশ করলেন (১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে)। এতেও জাতিসংঘ নীরব রইল। এর ফলে জাতিসংঘের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমাধি রচিত হয়।
সাহসের সঙ্গে তোষণ নীতিকে ঝেড়ে ফেলে ইঙ্গ-ফরাসি নেতৃবৃন্দের উচিত ছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় (১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে) হিটলার ও মসোলিনিকে মুখোমুখি দাঁড়ানো। তা যদি তাঁরা পারতেন তবে মুসোলিনি বা হিটলার এতখানি সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠতে পারতেন না। কাজেই তোষণ নীতি নিশ্চিতভাবেই ছিল ভ্রান্ত ও অদূরদর্শী। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসনের মতে, “যে যুক্তিগুলির ওপর তোষণ নীতি দাঁড়িয়েছিল সেগুলি চূড়ান্ত ভ্রান্ত হিসেবে প্রমাণিত” (This polic (appearement) rested upon a theory that proved to be utterly erroneous)।
• জার্মান নৌশক্তি বৃদ্ধি:-
ভার্সাই সন্ধির ৫ নং অনুচ্ছেদ দ্বারা জার্মানির উপর যে নিরস্ত্রীকরণের শর্ত জাপিয়ে দেওয়া হয়, হিটলার তা মানতে রাজি ছিলেন না। তাঁর দাবি ছিল যে এই শর্ত সবার উপরেই আরোপিত হোক। নানা আলাপ-আলোচনার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বল্ডউইন ইঙ্গ জার্মান নৌচুক্তি (১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে) স্বাক্ষর করে জার্মানির অস্ত্রসজ্জার দাবি মেনে নেন। স্থির হয় যে, জার্মানি ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নৌবহর রাখতে পারবে। এই চুক্তি হিটলারের আগ্রাসী মনোভাবকে পরোক্ষ সমর্থন জানায়। জার্মানির বিদেশমন্ত্রী রিবেনট্রপ ঘোষণা করেন যে, “ইঙ্গ জার্মান নৌচুক্তির অর্থই হল ভার্সাই চুক্তির বিলোপ।”
• ইতালির আবিসিনিয়া দখল:-
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করলে লিগ অব নেশনস্ ইতলিকে ‘যুদ্ধ অপরাধী’ বলে ঘোষণা করে, এবং লিগ চুক্তিপত্রের ১৬ নং ধারা অনুযায়ী ইতালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক দেয়। ব্রিটেন এই ডাক উপেক্ষা করে ইতালিকে নানাভাবে সাহায্য করে। এর ফলে আইনভঙ্গকারী আগ্রাসী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লিগের অর্থনৈতিক অবরোধের প্রথম পরীক্ষা ব্যর্থ হয়। ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ মনে করত যে, ইতালি বা জার্মানির বিরোধিতা করলে তারা ঐক্যবদ্ধ হবে।
• স্পেনে বিদ্রোহ:-
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জুলাই মাসে রাশিয়ার মদতপুষ্ট স্পেনের প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর একটি গোষ্টী জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। জার্মানি ও ইতালি ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে এগিয়ে এলেও ইংল্যন্ড ও ফ্রান্স চুপচাপ থাকে। এ সময় ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ যদি রাশিয়ার সঙ্গে মিলিত হত তাহলে ফ্যাসিবাদ বিরোধী একটি জোট গড়ে উঠত এবং হিটলার বা মুসোলিনি বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারতেন না।
• অস্ট্রিয়ার সংযুক্তি:-
১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রিয়ার সংযুক্তি ব্যাপারেও ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। হিটলারের অস্ট্রিয়া আক্রমণের প্রাক্কালে ব্রিটেন এ ব্যাপারে একই সঙ্গে ইতালি ও জার্মানির সঙ্গে আলোচনায় বসে। ব্রিটেনের বক্তব্য ছিল যে, জার্মানি যদি তার জাতীয়তাবাদী আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য জার্মান ভাষা-ভাষী অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তাতে আপত্তির কিছু নেই। হতাশ ফ্রান্স অস্ট্রিয়ার ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও অস্ট্রিয়াকে রক্ষা করতে অগ্রসর হয়নি। রোম-বার্লিন অক্ষচুক্তির ফলে মুসোলিনিও কোনো বাধা দেননি। তিনি বলেন যে, ‘অস্ট্রিয়াকে পাহারা দিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।”
• চেকোশ্লোভাকিয়া জয়:-
এরপর হিটলারের নজর পড়ে রাশিয়া ও ফ্রান্সের মিত্র চেকোশ্লোভাকিয়ার দিকে। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের প্রবেশদ্বার এই দেশটি ছিল শিল্পসমৃদ্ধ এবং স্কোডার অস্ত্র কারখানার জন্য বিখ্যাত। সুতরাং নিজ শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়া সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন। এছাড়া, এখানকার সুদেতান অঞ্চল ছিল জার্মান প্রধান এবং জার্মানির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। হিটলারের প্ররোচনায় স্থানীয় জার্মানরা সরকার বিরোধী দাঙ্গা শুরু করে। সুদেতানে জার্মানদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে হিটলার যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন।
বিচলিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন বার্লিনে উপস্থিত হয়ে হিটলারকে বিরত হওয়ার অনুরোধ জানান। এতে কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত মুসোলিনির মধ্যস্থতায় মিউনিখে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের, হিটলার ও মুসোলিনির মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা মিউনিখ চুক্তি নামে পরিচিত (২৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ)। এই চুক্তি অনুসারে সুদেতান অঞ্চল জার্মানিকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত হয় এবং হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার বাকি অংশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
এইভাবে ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির ফলে চেকোশ্লোভাকিয়ার এক বিরাট অংশ হিটলার বিনা যুদ্ধে দখল করেন। চেম্বারলেন মিউনিখ চুক্তিকে ‘সম্মানজনক শান্তি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইলস্টান চার্চিলের মতে মিউনিখ চুক্তি ছিল ইংল্যন্ডের পক্ষে সম্পূর্ণ পরাজয়, কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষরের ছয় মাস পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মার্চ হিটলার সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেন। এর ফলে তোষণ নীতির অসারতা প্রমাণিত হয়্যায়ন
মূল্যায়নঃ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির তোষণ নীতির যুদ্ধ হয়ে আত্মরক্ষার স্বার্থে রাশিয়া জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। শেষ পর্যন্ত ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ তোষণ নীতি ত্যাগ করে পোল্যান্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় অগ্রসর হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্বারন্বিত হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্স যদি প্রথম থেকেই সক্রিয় প্রতিরোধ নীতি গ্রহণ করত বা রাশিয়ার সঙ্গে নাৎসি বিরোধী জোট গড়ে তুলত তাহলে হিটলার যুদ্ধের ঝুঁকি নিতেন না। গ্যার্থর্ন হার্ডি, ট্রেভার রোপার প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা তোষণ নীতিকে ভ্রান্ত ও অদুরদর্শী নীতি বলে মনে করেন। এই নীতি অনুসরণ করে ইউরোপীয় নেতৃবর্গ জার্মানির শক্তিবৃদ্ধিতে সাহায্য করেন এবং এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়।