বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতীয় অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব

বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতীয় অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব- প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উভয়ই ভারতীয় অর্থনীতির উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, যুদ্ধের খরচ মেটাতে ভারত সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে জনগণের উপর করের বোঝা বাড়ে, সেইসাথে মূল্যবৃদ্ধিও ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যুদ্ধের জন্য ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক ছিল, তবে যুদ্ধের পর ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং দেশভাগের শিকার হয়।

আরও জানুন – ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি

বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতীয় অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব

ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯২৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বিশ্লেষণ করুন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী দেশগুলির মধ্যে আমেরিকার অর্থনীতি ভীষণভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আমেরিকান অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ জনগণ মনে করতে শুরু করেন যে এই অর্থনৈতিক তীব্রতার দীর্ঘদিন কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু এই অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণিত করে, ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার শেয়ার বাজারে (ওয়াল স্ট্রিট) ধস নামে। বাজারের এই অপ্রত্যাশিত পতন দেখে বিনিয়োগকারীরা ভীত হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, বাজারের পতন দেখে চিন্তিত হয়ে আমেরিকান জনগণ ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তুলতে শুরু করেন। ব্যাংকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ মজুত না থাকার কারণে ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে ৫৭০০টি ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় এবং ৩৫০০০টি ব্যাংক তাদের কাজকর্ম বন্ধ রাখে। মার্কিন অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং এর প্রভাব ইয়োরোপ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

মহামন্দার কারণ:

১৯২১ সালের আমেরিকার মহামন্দার কারণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কয়েকটি কারণে ইতিহাসবিদরা সহমত পোষণ করেন। সেগুলি হল-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্য ও শিল্পদ্রব্য রপ্তানি করত। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে শিল্প উৎপাদন শুরু করে এবং নিজ উৎপাদনে জোর দেয় ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কমে যায়।

আমেরিকা নিজ উৎপাদিত শিল্পপণ্য বেশি বিক্রির তাগিদে বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করে, অনুরুপভাবে অন্য দেশগুলিও মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করে। এর ফলে বিদেশের বাজারে মার্কিন পণ্যের বিক্রি হ্রাস পায়।

প্রাথমিকভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে মার্কিন শিল্পপতিরা প্রয়োজনের অধিক পণ্য উৎপাদন করে। এরপর বিক্রি কমে গেলে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয় এবং শ্রমিক ছাঁটাই অথবা বেতন হ্রাস হয়। এই জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে বাজার আবার বিপর্যস্ত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে স্বর্ণবিনিময় মানের অবনতি হয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মার্কিন অর্থনীতিতে। আবার অপর দিকে রাশিয়ার নতুন বলসেভিক সরকার, পূর্বতন জারের নেওয়া সমস্ত ঋণ ফেরত দিতে অস্বীকার করে, এর ফলে মিত্রশক্তির দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয় এবং তাদের ঋণ ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

মহামন্দার প্রভাব:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই মহামন্দা শুরু হলেও এর প্রভাব ছিল বিশ্বব্যাপী।

প্রথমত,

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেউৎপাদন হ্রাস পায় এবং শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। অপর দিকে সরকার বেকারত্ব হ্রাস করার উদ্দেশ্যে রাস্তাঘাট ও বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ করে।

দ্বিতীয়ত,

ভার্সাই চুক্তি জার্মানির অর্থনৈতিক কাটামো ভেঙে দেয়, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে জার্মানিকে বিপুল অর্থ বিজয়ী দেশগুলিকে দিতে হত। এই অর্থ তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঋণ নিত। মহামন্দার ফলে আমেরিকার পক্ষে জার্মানিকে অর্থ ঋণ দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই জার্মানি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।

তৃতীয়ত,

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইয়োরোপের অধিকাংশ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল অর্থ ঋণ নিয়েছিল। এই ঋণ তারা জার্মানির থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া অর্থ থেকে পূরণ করত। জার্মানির অর্থনৈতিক কাটামো ভেঙে গেলে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশ ক্ষতির মুখে পড়ে।

চতুর্থত,

ইয়োরোপের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে গেলে, এই সুযোগে জার্মানিতে হিটলার এবং ইতালিতে মুসোলিনির মতো একনায়ক শাসকের আবির্ভাব হয়।

প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব-রাজনীতিতে যুক্ত হবার কোন আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু প্রথমবিশ্ব যুদ্ধের শেষের দিকে আমেরিকার সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি মিত্রশক্তিকে যুদ্ধে জিততে সাহায্য করেছিল। এরপর থেকেই বিশ্ব-রাজনীতিতে আমেরিকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এমনকি, যুদ্ধের পরে যে জাতিসংঘ তৈরি হয়েছিল তা ছিল মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন মস্তিস্কপ্রসূত। যদিও মার্কিন বিদেশ নীতির মূলমন্ত্র ছিল ‘চূড়ান্ত নিরপেক্ষতা এবং সাবধানতা’, তাই তারা জাতিসংঘে যুক্ত না হলেও জাতিসংঘের কাজে বিশেষ সহযোগিতা করতে শুরু করে।

বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে জেনেভা নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে যোগদান করে এবং বিশ্বের অন্যতম একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে নেতৃত্ব প্রদান করে।

মহামন্দা ১৯৩০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী সংগঠিত মন্দা। এই মন্দা শুরু হয় ১৯২৯ সালে এবং শেষ হয় ১৯৩৯-এর দশকের শেষের দিকে। এটি বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময়ব্যাপী ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী মন্দা। একবিংশ শতাব্দীতে মহামন্দাকে বিশ্ব অর্থনীতির পতনের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯২৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর স্টক বাজারে দর পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই মন্দা শুরু হয়। পড়ে ১৯২৯ সালের ২৯ অক্টোবর এই খবর বিশ্বব্যাপী স্টক মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে, যা ‘কালো মঙ্গলবার’ নামে পরিচিত। ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জিডিপি প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পায়।

কিছু অর্থনীতি ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝিতে কিছু পূর্বের অবস্থায় এলেও অনেক দেশের অর্থনীতিতে মহামন্দার প্রভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু পর্যন্ত ছিল। ধনী ও দরিদ্র উভয় দেশসমূহে মহামন্দা বিধ্বংসী প্রভাব ছিল। ব্যক্তিগত আয়, কর, মুনাফা ও মূল্যমানের ব্যাপক পতন ঘটে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ৫০ শতাংশ কমে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ বেড়ে যায় এবং কিছু কিছু দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে মহামন্দার প্রভাব তীব্র ছিল, বিশেষ করে যে সব শহর ভারী শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অনেক দেশে নির্মাণকাজ একরকম বন্ধই ছিল। কৃষক সম্প্রদায় ও গ্রাম্য এলাকাসমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, কারণ শস্যের মূল্য ৬০ শতাংশ নেমে এসেছিল।

গুটিকয়েক চাকরির উৎসে অত্যধিক চাহিদার কারণে প্রাথমিক শিল্প, যেমন খনির কাজে চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদেরা ১৯২৯ সালের ২৯ আগস্ট ‘কালো মঙ্গলবার’ নামে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি বাজারের হঠাৎ দরপতনকে মহামন্দার সূত্রপাত বলে অভিহিত করেন। কয়েকজন মনে করেন এই দরপতন ছিল মহামন্দার উপসর্গ, কারণ নয়। ১৯২৯ সালে ওয়াল স্ট্রিট ধসের পরও অর্থনীতিবিদগণ অল্প সময় আশাবাদী ছিলেন। জন ডি. রকফেলার বলেন, ‘এই সময়ে অনেকে হতাশ হয়ে পড়েছিল।

আমার জীবনের ৯৩ বছরে মন্দা এসেছে এবং চলেও গেছে। উন্নতি সবসময় ফিরে এসেছে এবং আবার আসবে।’ ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে পুঁজি বাজারের সূচক উপরে উঠেছিল এবং ১৯২৯ সালের শুরুর দিকে এপ্রিল মাসে তা পূর্বের স্থানে ফিরে আসে। ১৯২৯ সালে সেপ্টেম্বরের সর্বোচ্চ সূচকের তুলনায় তা ৩০ শতাংশ কম ছিল। সরকার ও ব্যবসায়ীরা ১৯৩০-এর দশকের প্রথমার্ধে পূর্বের বছরগুলোর তুলনায় অধিক সময় একসঙ্গে অবস্থান করে।

অন্যদিকে, যে সব পূর্ববর্তী বছরে পুঁজি বাজারে লোকসান হওয়া ভোক্তারা ১০ শতাংশ ব্যয় কমিয়ে আনে। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মারাত্মক খরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূমির কৃষিতে বিপর্যয় দেখা দেয়।

মূল্যায়নঃ

মোটকথা, দুটি বিশ্বযুদ্ধই ভারতীয় অর্থনীতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত স্বাধীনতা অর্জন করে এবং দেশভাগের শিকার হয়, যা ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। 

বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতীয় অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব

Leave a Reply