জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement বা NAM) হল একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য হল কোনো বৃহৎ শক্তি জোটের সাথে যুক্ত না হয়ে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা।
আরো জানুন – PGHI 2025 1st Paper Suggestion
Table of Contents

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম কি অবসম্ভাবী ছিল ? এই আন্দোলনের প্রধান পর্যায়ে গুলি বিশ্লেষণ কর।
, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম অনেকাংশে অবসম্ভাবী ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব যখন দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত ছিল, তখন তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি পৃথক পথ বেছে নিতে চেয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম হয়।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম নিম্নলিখিত কারণে অবসম্ভাবী ছিল: –
দ্বি-মেরু বিশ্ব:-
স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্ব দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত ছিল – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্র। এই পরিস্থিতিতে, উন্নয়নশীল দেশগুলি কোনো একটি শিবিরের সাথে যুক্ত না হয়ে নিজেদের পথ বেছে নিতে চেয়েছিল।
উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব:-
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতারা উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের কঠোর বিরোধী ছিলেন। তারা মনে করতেন, এই দুটি ব্যবস্থা বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য হুমকিস্বরূপ।

স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি:-
জোট নিরপেক্ষ দেশগুলি নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে চেয়েছিল এবং কোনো পরাশক্তির হাতের পুতুল হতে রাজি ছিল না।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন:-
জোট নিরপেক্ষ দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল এবং তারা উভয় শিবিরের কাছ থেকে সমভাবে সাহায্য পেতে চেয়েছিল। তারা মনে করত, কোনো একটি শিবিরে যোগ দিলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে।
জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য:-
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতারা মনে করতেন, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি ছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, এবং উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রধান পর্যায় :-
প্রথমে আফ্রিকার ও এশিয়ার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলিকে নিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে এর আত্মপ্রকাশ ঘটলেও লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপের কোনো কোনো দেশ অচিরেই এই নির্জোট আন্দোলনে শামিল হতে চায়। ১৯৫৬ সালে ব্রাইয়োনিতে প্রধান ত্রয়ী-নেহরু, নাসের ও টিটো-তিন মহাদেশের প্রতিভূ হিসেবে যে বৈঠক করেন, সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় জোট নিরপেক্ষতাকে দেশভিত্তিক বিদেশনীতির উর্ধ্বে একটি বিশ্বজোড়া আন্দোলনে পরিণত করার।
এই উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালে যুাগোশ্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে নিরপেক্ষ ২৫টি দেশের শীর্ষ সম্মেলন বসে এবং সেখানেই নির্জোট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা। বেলগ্রেড শীর্ষ সম্মেলনের আগেই কায়রোয় ২২ দেশের বিদেশমন্ত্রীদের প্রস্তুতি বৈঠকে জোট নিরপেক্ষতার স্বরূপ ও নির্জোর্ট আন্দোলনের সদস্য হওয়ায় যোগ্যতা সম্বন্ধে আলোচনায় স্থির হয় :
১) সদস্য পদপ্রার্থী দেশকে স্বাধীন নীতি অনুসরণে আগ্রহী হতে হবে। ২) রাজনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থা ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন রাষ্ট্রের সহাবস্থানে বিশ্বাসী হতে হবে। ৩) ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির আন্দোলনকে সর্বতোভাবে সমর্থন করতে হবে। ৪) ঠান্ডা লড়াই প্রভাবিত কোনো জোটের শরিক হবে না.
১৯৯২ সালের নির্জোট আন্দোলনের নিস্তেজ হয়ে আসা দীপশিখা কিছুকালের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে জাকার্তায় দশম সম্মেলনে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধুমাত্র সাহায্য দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বনির্ভরতা সৃষ্টি করার দ্বারাই নিশ্চিত হতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। একটি বার্তায় পৃথিবীব্যাপী অশান্তি, আধিপত্য ও জাতিগত সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ সহযোগিতাকে জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
কলম্বিয়ার রাজধানী কার্টাজেনীতে NAM-এর একাদশ শীর্ষ সম্মেলন বসে। শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে যে বিষয়গুলি প্রধান্য পায় সেগুলি হল ক) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের -আসনে উন্নয়নশীল দেশের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব; খ) ব্যয়বহুল শান্তিরক্ষাবাহিনীর ব্যয়সঙ্কোচ করে দারিদ্র দূরীকরণে অর্থ বরাদ্দ; গ) জাতিধর্ম নির্বিশেষে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ; ঘ) জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ঙ) উন্নয়নকে বহনযোগ্য করে তোলা।

এই সম্মেলনে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বেনজির ভুট্টো কাশ্মীরের প্রশ্ন তুলে নির্জোট আন্দোলনের মধ্যেই সংঘাত নিবারণ ও বিবাদ নিরসনের একটি বন্দোবস্ত সৃষ্টির আবেদন জানান। দক্ষিণ এশিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল বলে ঘোষণারও তিনি দাবি করেন।
এরপর দ্বাদশ সম্মেলন বসে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে। উদ্বোধক নেলসন ম্যান্ডেলা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ, জাতিপুঞ্জের পুনর্গঠন, নারীদের অধিকার ও মর্যাদারক্ষা এবং সুশাসন এই কয়টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে চান। এই সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ, পরমাণু অস্ত্র ছাড়াও বিশ্বায়নের চাপে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রান্তিকীকরণ, HIV-AIDS জাতীয় মারণ ব্যাধির প্রসার, আন্তর্জাতিক মাদক চালান নিয়েও -উদ্বিগ্ন আলোচনা হয়। সর্বাত্মক পরমাণু অস্ত্রপরীক্ষা নিষিদ্ধকরণের (Comprehensive Test Ban Treaty) চুক্তির সপক্ষে এবং আফগানিস্তান, সুদান প্রভৃতি দেশে বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে মত প্রকাশ করা হয়।
ডারবানের পর ২০০৩ সালে NAM-এর ত্রয়োদশ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। ১১৬ সদস্যের এই বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের হুমকি, আতঙ্কবাদের প্রসার ও বিশ্ববাণিজ্যে বৈষম্য প্রাধান্য পায়। শুধু পরিতাপের বিষয় এই যে, ইরাকে আগ্রাসন অবাঞ্ছিত হলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকাশ্যে কোনো সদস্য নিন্দা করেনি-মুসলিম দেশগুলিও না।৫) আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকলেও সেই চুক্তির সঙ্গে ঠান্ডা লড়াইয়ের কোনো সংস্রব থাকবে না।
১৯৬৪ সালে কায়রোয় নির্জোট আন্দোলনের দ্বিতীয় সম্মেলনে দেখা গেল ৪৭টি জাতিরাষ্ট্র এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং আরও দশটি দেশ পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পেয়েছে। কায়রো ঘোষণায় বিশেষ জোর দেওয়া হয় নিরাপত্তা, সহাবস্থান, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ মীমাংসা এবং নিরস্ত্রীকরণের ওপরে।
১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ নির্জোট আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালে জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকাতে তৃতীয় নির্জেটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রিত ৭০টি দেশের মধ্যে ৫৪টি দেশ প্রতিনিধি পাঠায়। লুসাকায় মূল আলোচ্য বিষয় ছিল তিনটি-নয়া সাম্রাজ্যবাদ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নতিশীল দেশগুলির মধ্যে যে স্বার্থের সংঘাত অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছিল, সেই প্রেক্ষিতে উত্তর-দক্ষিণের আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে জরুরি কাঠামোগত পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম এখন থেকে সমান্তরাল খাতে বইতে থাকে।
১৯৭৩ সালে চতুর্থ নির্জেটি শীর্ষ সম্মেলন আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে সদস্যদের উপস্থিতি ছিল বিশাল আকারে। ৭৫টি সদস্যরাষ্ট্র, ৯টি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র ও ৩টি অতিথি রাষ্ট্র ছাড়াও UN, OAS, Arab League এবং অনেকগুলি শ্রমিক সংগঠন এবং তিন মহাদেশের মুক্তি আন্দোলনকারীরা এই সম্মেলনে যোগ দেয়।
সবরকম আধিপত্যকেই পরিহার করে তৃতীয় দুনিয়ার স্বার্থে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাবি উত্থিত হল আলজিয়ার্সে। ১৯৭৬ সালে পঞ্চম নির্জেটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল এর পর কলম্বোয়। এবার উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়ে হল ৮৬, যার মধ্যে ৭টি নতুন সদস্যএই সম্মেলনে সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, উপনিবেশবাদ এবং ইহুদি প্রভুত্ববাদকে এক শ্রেণিভুক্ত করে তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান জানানো হয়।
১৯৭৯-এ হাভানায় নির্জোট আন্দোলনের ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন নানাকারণে চাঞ্চল্যকর হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানও এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। ১৯৮২-তে নতুন দিল্লিতে নির্জোট আন্দোলনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব নেওয়া হয় যাতে আন্দোলনের ঝোঁক নিয়ে কোনো ভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। প্রতিকূল আবস্থায় টিকে থাকার প্রয়োজনে উৎপাদন ও বিপণনে দক্ষ সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়।
১৯৮৬ সালে হারারে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল: ক) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক মহাকাশ যুদ্ধের ভীতি প্রদর্শনের প্রেক্ষিতে শান্তির প্রয়াসকে সংহত করা, খ) অর্থনৈতিক সমস্যাবলী গ) দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী জোট।
১৯৮৯ সালে নবম সম্মেলনের জন্য নির্বাচিত বেলগ্রেডে দ্বিতীয়বারের জন্য নির্জোট শীর্ষসম্মেলনের আয়োজন হল। হারারে সম্মেলনের সূত্র ধরে বেলগ্রেডে পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আন্তঃরাষ্ট্র সহযোগ বৃদ্ধির আবেদন জানানো হয়। স্পষ্টতই বেলগ্রেড সম্মেলনের মূল সুরটি খুব নীচু পর্দায় বাঁধা ছিল।