বিশ্বায়ন (Globalization) হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ পারস্পরিকভাবে আরও বেশি সংযুক্ত হয়, বিশেষ করে ব্যবসা, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া যা বিভিন্ন দিক যেমন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
বিশ্বায়ন (Globalization) হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পৃথিবীকে একটি একক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে, যেখানে মানুষ, পণ্য, তথ্য, প্রযুক্তি এবং ধারণা অবাধে এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবাহিত হয়।
বিশ্বায়ন (Globalization)
Table of Contents
আরো জানুন – উপনিবেশিকতা বাদ
বিশ্বায়ন বলতে কী বোঝায় ? এর প্রধান সূচক গুলি কী ?
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিশ্বায়ন বা Globalization। বর্তমানে সমস্ত কিছু মূলে বিশ্বায়নের প্রভাব অনিবার্য। তাই বিশ্বায়ন সম্পর্কিত ধারণা ব্যতীত যে কোনো কিছুকেই ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। পৃথিবীতে অর্থ, সম্পদ, মানবসমাজ, কারিগরি বিদ্যা এমন কী মানবিক আদর্শ এখন আর কেবলমাত্র কোনো দেশের বা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়-সবকিছুরই বিস্তার এখন বিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে স্থানীয় সমাজ সংস্কৃতি (Local culture) এবং প্রান্তি মানব গোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো স্থানীয় ঘটনাকে এখন আর বিছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বায়নের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। বিশেষ করে, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ বিশ্বকে অনেক ছোট করে দিয়েছে। এর ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই পৌঁছে যায়। এছাড়া, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি, যেমন দ্রুতগতির উড়োজাহাজ ও উন্নত জাহাজের ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজ করেছে। রাজনৈতিক দিক থেকে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা হ্রাস এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতি গ্রহণও বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি তাদের উৎপাদন ও বাজার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে, যা অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের একটি বড় দিক।

বিশ্বায়ন কথাটির অর্থ নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী তথা ঐতিহাসিকগণ একমত হতে পারেননি। তবে বিশ্বায়নের কোনো একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সে কারণে বিশ্বায়ন বলতে ঠিক কী বোঝায় সে সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। পুঁজি (Capital), ব্যবসা, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি অতিদ্রুত বর্তমানে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক পন্যায়নের যুগ। পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিভিন্ন বিষয়ের জটিলতম রূপই বর্তমান বিশ্বরাজনীতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে যা বর্তমান মানবসভ্যতার বিকাশকে পরিচালিত করছে। একেই আমরা বিশ্বায়ন বলতে পারি।
বিশ্বায়ন প্রতিটি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সীমানা ও জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকাকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর একটি ইতিবাচক দিক হল আন্তর্জাতিকতার প্রসার।
বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বা সূচক হল তথ্য বিনিময়ের অভূতপূর্ব উন্নয়ন। তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যন্ত্র ও পদ্ধতি হল কম্পিউটার, সেলুলার ফোন এবং ইন্টারনেটের মতো আধুনিক প্রযুক্তি। সে ফোন এখন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। তার বিহীন ও সহজে বহন যোগ্য এই যন্ত্রটির সংখ্যা বাড়ছে অতি দ্রুত গতিতে। এই যন্ত্র যে কোনো জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিকে আমূল পালটে দিয়েছে যা 1990 এর আগে ভাবাই যেত না।
অন্যদিকে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা হল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রতীক। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বা সংস্কৃতি কোনো কিছুই এখন ইন্টারনেটের প্রভাবের বাইরে নয়। print Electronic media-র। উন্নয়ন ও বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে গতিময় করে তুলেছে।

অন্যদিকে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম চালিকা শক্তি হল বাণিজ্য। জাতীয় বাণিজ্যকে বিশ্ববাণিজ্যের স্তরে উন্নয়নের পেছনে কাজ করে চলেছে বিশ্বের রাষ্ট্র সমূহের সম্মিলিত প্রয়াস, বিশেষ করে শুল্ক হ্রাসের প্রক্রিয়া ও অবাধ বাণিজ্যের নীতি।
1990 এর দশকে বিশ্বায়ন শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে বিশ্বায়নের প্রধান সূচকগুলি হল :-
1. অর্থনৈতিক বিষয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানো বা deregulation
2. ব্যক্তিমালিকানায় উৎপাদন ও সরকার নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা বা privatization
3. সরকারি বাজেট নিয়ন্ত্রণ বা Austerity।
4. যুক্ত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা বা Trade Libaratization বিশ্বায়নের এই লক্ষণগুলি বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।
বিশ্বায়ন কী ? বিশ্ব শতকের নয়ের দশক থেকে গোটা পৃথিবীতে একটি ধারণা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। একে বলা হচ্ছে বিশ্বায়ন। এই বিশ্বায়নের ধারণাটি অত্যন্ত বিতর্কিত। আধুনিকভাবে উন্নত প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে বিশাল এই ভুবন যেন একটি ক্ষুদ্র ও গোলকে পরিণত হয়েছে। স্থান কালের এই চমকপ্রদ রূপান্তর প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির জগতে। কোনো বিশেষ, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো দেশের নির্বাচনে ভোটদাতাদের নির্বাচনী আচরণ বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়-গোটা বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিষয়।

বিশ্বজোড়া যুক্ত বাজার ও যুক্ত অর্থনীতি হল বিশ্বায়নের লক্ষ্য। বিশ্বায়নের বিকাশ সম্ভবপর হয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির জন্য। বিশ্বায়ন যে আন্তর্জাতিকীকরণেণ নামান্তরতা বলাই বাহুল্য। তবে তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির সুযোগ নিয়ে উত্তর গোলার্ধের কয়েকটি দেশ ও মুষ্টিমেয় বহুজাতিক সংস্থা তাদের আধিপত্য ও কায়েমি স্বার্থ বিস্তার অক্ষুন্ন রাখার উদ্দেশ্যে বিশ্বায়নের প্রভাব তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উপর কার্যকর করার চেষ্টা করে। বিশ্বায়নের এই প্রধান সহায়ক হল এই বহুজাতিক সংস্থাগুলি।
এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাদের দেশের সরকারের বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের একটি গভীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। প্রায়ই দেখা যায় যে একটি সংস্থা অপর একটি সংস্থাকে কিনে নিচ্ছে অথবা দুটি সংস্থা মিলিত হয়ে একটি সংস্থায় পরিণত হচ্ছে। এর ফলে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর সংগতি ও ক্ষমতা বহু গুনে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাড়ছে। এদের মূল লক্ষ্য হল ব্যবসায় মুনাফা বৃদ্ধি করা এবং তার জন্য বিশ্বের যতখানি সম্ভব বাজার দখল করা।
বিশ্বায়নকে যদি সত্যিই অর্থবহ করে তুলতে হয়, অর্থাৎ তার ইতিবাচক সুফল গুলি ভোগ করতে হয় তবে এক্ষেত্রে সমস্ত জাতির আন্তরিক স্বতঃস্ফূর্ততা আনতে হবে।
বিশ্বায়নের প্রভাব
বিশ্বায়নের প্রভাব বহুমুখী এবং এটি ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের ফলাফল বয়ে এনেছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
- সুবিধা: বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলো উন্নত প্রযুক্তি ও পুঁজির সুবিধা পাচ্ছে।
- অসুবিধা: এর ফলে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং শ্রমিকের অধিকার ক্ষুন্ন করে কম মজুরিতে কাজ করিয়েছে।
সাংস্কৃতিক প্রভাব
- সুবিধা: বিশ্বায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতি একে অপরের কাছাকাছি এসেছে। খাদ্য, ফ্যাশন, সঙ্গীত ও ভাষা সহজেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করছে।
- অসুবিধা: সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পাশাপাশি এটি একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির (যেমন পশ্চিমা সংস্কৃতি) আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। এর ফলে অনেক স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
- বিশ্বায়নের ফলে জাতি-রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কিছুটা দুর্বল হয়েছে এবং জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, মানুষ ও শ্রমিকদের অবাধ চলাচল ও অভিবাসনের কারণে বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজের (multicultural society) উদ্ভব হয়েছে, যা একদিকে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি অন্যদিকে সামাজিক সংঘাতের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়ন একটি জটিল ও চলমান প্রক্রিয়া যা মানব সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এটি সুযোগ ও সম্ভাবনা যেমন নিয়ে এসেছে, তেমনি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।