বক্সারের যুদ্ধের কারণ ও তাৎপর্য লেখ- মিরকাশিম স্পষ্টই উপলব্ধি করেন যে, মিরজাফরের পতনের প্রধান কারণ হল তাঁর আর্থিক দুর্বলতা। এই কারণে নিজ রাজ্যের আর্থিক অবস্থা সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে তিনি নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং রাজস্ব ব্যবস্থা ঢেলে সাজান। (১) তিনি ভূমিরাজস্ব ১২ আনা বৃদ্ধি করেন এবং (২) জমিদারদের ওপর তিনি কয়েকটি বাড়তি কর বা ‘আবওয়াব’ আরোপ করেন। (৩) এই বাড়তি রাজস্ব-সহ জমিদারদের নিয়মিত রাজস্ব প্রদানে বাধ্য করা হয়। (৪) তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের বরখাস্ত করেন বা তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। (৫) মিরজাফরের দুর্বল শাসনকালে যে সব সরকারি কর্মচারী রাজস্বের অর্থ আত্মসাৎ করেছিল, তাদের সেই অর্থ পরিশোধে বাধ্য করা হয়। (৬) তিনি সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করেন এবং নবাবি দরবারের ব্যয় সংকোচ করা হয়।
বক্সারের যুদ্ধ ছিল ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বাংলা, অযোধ্যা এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত একটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, যা নবাবদের ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করছিল। যুদ্ধের ফলে, ব্রিটিশরা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে, যা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে এবং ভারতে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ সুগম করে। বক্সারের যুদ্ধ
Table of Contents
আরো জানুন – History 2025 PGHI-III suggetion

বক্সারের যুদ্ধের কারণ ও তাৎপর্য লেখ
স্বাধীনচেতা নবাব মিরকাশিম ইংরেজদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে রাজি ছিলেন না। (১) তিনি বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকার করে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে নবাবি ‘ফরমান’ আনেন এবং এর দ্বারা তিনি দিল্লির বাদশাহের অধীনে আইনসম্মত নবাবে পরিণত হন। (২) ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মচারীদের বিতাড়িত করে তিনি নিজ শাসনকে সুদৃঢ় করেন। (৩) মুর্শিদাবাদ কলকাতার খুব কাছে হওয়ায় দৈনন্দিন শাসনকার্য পরিচালনায় সেখানে কোম্পানির হস্তক্ষেপ অতি সহজ ছিল। তাই ইংরেজদের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার উদ্দেশ্যে তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারের মুঙ্গেরে তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।
বক্সারের যুদ্ধের মূল কারণ ছিল নবাব মিরকাশিম-এর স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। নবাব হিসেবে তিনি মুঘল সম্রাট এবং অযোধ্যার নবাবের সঙ্গে জোট বাঁধেন, যা ব্রিটিশদের ক্ষুব্ধ করে। এছাড়াও, ব্রিটিশ কোম্পানি এবং তাদের কর্মচারীরা বাণিজ্য শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার জন্য দস্তক নামক একটি ছাড়পত্রের ব্যাপক অপব্যবহার করত। এর ফলে দেশীয় বণিকদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য মিরকাশিম দেশীয় বণিকদের ওপর থেকে সমস্ত বাণিজ্যিক শুল্ক তুলে নিলে ইংরেজরা নিজেদের বাণিজ্যিক একচেটিয়া সুবিধা হারায় এবং তাদের সঙ্গে নবাবের সরাসরি সংঘর্ষ বেঁধে যায়।
১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ফারুখশিয়র প্রদত্ত ‘ফরমান’ অনুযায়ী কোম্পানি সে বাংলাদেশে বিনাগুস্কে বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। কোম্পানির কর্মচারী এবং তাদের অনুগৃহীত ভারতীয় বণিকেরা নিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্যও ‘দস্তক’ বা এই ছাড়পত্রের অপব্যবহার করত। এর ফলে একদিকে নবাব যেমন তাঁর বৈধ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতেন, তেমনি অপর দিকে ভারতীয় বণিকেরা এই অসম প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হত। এছাড়া, কোম্পানির কর্মচারীরা নবাবের কর্মচারী ও জমিদারদের কাছ থেকে নানাভাবে উৎকোচ এবং নজরানা আদায় করতে শুরু করে। নবাবের একচেটিয়া বাণিজ্য, যথা-লবণ, সোরা প্রভৃতিতে তারা অংশ নিতে থাকে এবং গ্রামে-গঞ্জে ঢুকে পড়ে তারা সুপারি, চাল, ঘি, মাছ, চিনি, বাঁশ প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবসা শুরু করে। ইংরেজ ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পিয়ার এই যুগকে ‘প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ লুণ্ঠনের যুগ’ (‘the period of open and unashamed plunder’) বলে আখ্যায়িত করেছেন।

• সংঘর্ষের সূচনা:-
এই সব কারণে বাংলার অবস্থা জটিলতর রূপ ধারণ করে। দেশীয় বণিকরা শুল্ক না দেবার জন্য নানা ছল-চাতুরির পথ ধরে, বহু ক্ষেত্রে চাষি ও উৎপাদকরা চাষ-বাস ও উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং বহু স্থানে দেশীয় উৎপাদক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাষিরা কোম্পানির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলে আইন-শৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। পাটনা কুঠির অধ্যক্ষ এলিস সাহেব উত্তেজিত হয়ে পাটনা শহর দখল করেন। নবাব পাটনা পুনর্দখল করে ইংরেজ কুঠি ধ্বংস করেন এবং এরই ফলে ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হয় (১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ)।
• বক্সার যুদ্ধের গুরুত্ব:-
অতঃপর ইংরেজ সেনাপতি মেজর অ্যাডামস্ মিরকাশিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালার যুদ্ধে পর পর পরাজিত হয়ে মিরকাশিম অযোধ্যায় পলায়ন করেন। সেখানে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও দিল্লির বাদশাহ শাহ আলমের সঙ্গে মিলিত হয়ে সম্মিলিতভাবে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২২শে অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে এই সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজ সেনাপতি মেজর হেক্টর মনরো-র হাতে পরাজিত হয়। বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজ আধিপত্য এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং মিরকাশিমের সকল আশা নির্মূল হয়।
মিরকাশিমের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় প্রকৃত স্বাধীন নবাবির অবসান ঘটে। পলাতক অবস্থায় ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। (১) পলাশির যুদ্ধের ফলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, বক্সারের যুদ্ধে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনে পলাশির যুদ্ধ। অপেক্ষা বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অনেক বেশি।
১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধটি ছিল এক চরম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ এটি ছিল ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর। এই যুদ্ধে ইংরেজরা শুধুমাত্র মিরকাশিম-কে পরাজিত করেনি, বরং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম এবং অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলার সম্মিলিত বাহিনীকেও পরাজিত করে। এই বিজয়ের পর, ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশরা মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভ করে, যার ফলে তারা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা বাংলার প্রকৃত শাসক হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে আসে। এই যুদ্ধটি পলাশীর যুদ্ধের ত্রুটিপূর্ণ বিজয়ের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ এটি সামরিক শক্তি এবং আইনি অধিকার উভয় দিক থেকেই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পথকে সুগম করে দেয়।

(1) ‘ পলাশিতে কূটনীতি ও বিশ্বাসঘাতকতা এক অনভিজ্ঞ নবাবের ওপর জয়যুক্ত হয়-এই জয় ছিল আকস্মিক ও অনায়াসলব্ধ। তাই এর স্থায়িত্ব সম্পর্কেও যথেষ্ট সন্দেহ ছিল, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হন দিল্লির বাদশা-সহ দু’জন ভারতীয় নৃপতি। তাই এই যুদ্ধ হল চূড়ান্ত ফল-নির্ণয়কারী যুদ্ধ। ম্যালেসন (Malleson) বলেন যে, “ভারতে বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহগুলির মধ্যে বক্সারের যুদ্ধ হল একটি চূড়ান্ত ফল-নির্ণয়কারী যুদ্ধ।” ঐতিহাসিক স্মিথ (Smith)-এর মতে, “পলাশি ছিল কয়েকটি কামানের লড়াই, বক্সার ছিল চূড়ান্ত বিজয়। ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র-র মতে, “ভারতের ইতিহাসে বক্সারের এই যুদ্ধটি ছিল সর্বাধিক যুগান্তকারী ও তাৎপর্যময়।
(2) এই যুদ্ধের ফলে ভারতীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ও ইংরেজদের সামরিক বলের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। এই যুদ্ধের দ্বারা বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নবাব সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির হাতের পুতুলে পরিণত হন। মিরকাশিমের সঙ্গে বিবাদ শুরু হলে কোম্পানি এক চুক্তির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয়বারের জন্য মিরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসায় (১৭৬৩ খ্রিঃ)।
(3) বক্সারের যুদ্ধে কেবল মিরকাশিম-ই নয়-অযোধ্যার নবাব সুজাউদৌলা ও দিল্লিশ্বর শাহ আলম পরাজিত হন। এর ফলে এক রকম বাংলা থেকে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা কোম্পানির হস্তগত হয়। অযোধ্যার নবাব কোম্পানির অনুগত মিত্রে পরিণত হন এবং ‘নামসর্বস্ব’ মোগল বাদশা কোম্পানির বৃত্তিভোগী হন। এইভাবে সমগ্র উত্তর ভারতে কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান রচিত হয়।

(4) বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বাংলার বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার বুকে শুরু হয় কোম্পানির কর্মচারীদের অবাধ ও নির্লজ্জ শোষণ ও লুণ্ঠন। অপরাপর ইওরোপীয় বণিকরা বাংলা থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং দেশীয় বণিকদের দুর্দশা চরমে পৌঁছায়।
(5) এই যুদ্ধের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। এতদিন পর্যন্ত বাংলায় কোম্পানির আধিপত্য স্থাপন, সার্বভৌমত্ব বা রাজস্ব আদায়ের কোনও বৈধতা ছিল না। দেওয়ানি অর্জনের মাধ্যমে বাংলায় কোম্পানির আধিপত্য বৈধতা লাভ করে।