মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। তিনি ১৪৮৩ সালে বর্তমান উজবেকিস্তানের আন্দিজানে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫২৬ সালে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। বাবর ছিলেন তৈমুর লং এবং চেঙ্গিস খানের বংশধর। 

বাবর ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। তিনি ছিলেন একজন সাহসী এবং অভিজ্ঞ যোদ্ধা এবং তার সামরিক কৌশল মুঘল সাম্রাজ্যকে সুসংহত করতে সহায়ক ছিল। 

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ? তার কৃতিত্ব আলোচনা কর।

ভূমিকাঃ

নদীর উৎসমুখে জল নির্মল থাকে। কিন্তু সে যত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তার জলরাশি আবর্জনায় ভারাক্রান্ত হয়। তেমনি 1206 খ্রিস্টাব্দে দিল্লি সুলতানি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তা পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। সেই সুযোগে মুঘল বীর জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর 1526 খ্রিস্টাব্দে পাণিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লি সুলতানির পতন ঘটান এবং ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।

EMPEROR BABAR

আরো জানুন – History 2025 PGHI-II suggetion

[1] সিংহাসন লাভ:

পিতা ওমর শেখ মির্জার মৃত্যুর পর 1494 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 12 বছর বয়সে বাবর ফারগানার সিংহাসনে বসেন। তিনি 1496 খ্রিস্টাব্দের পর থেকে অন্তত পাঁচবার সমরখন্দ আক্রমণ করেও তা দখল করতে ব্যর্থ হন। 1503 খ্রিস্টাব্দে তিনি উজবেক নেতা শাহেবানী খাঁর কাছে আর্চিয়ানের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নিজ রাজ্য ফারগানার সিংহাসন হারান। এরপর রাজ্যহারা বাবর নানা স্থানে ঘুরতে থাকেন। বাবর এই সময়ের দুর্দশা সম্পর্কে তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবরী’-তে লিখেছেন যে, “এই সময় আমি দাবার বোর্ডে রাজার মতো এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ঘোরাফেরা করছিলাম।”

[2] সাম্রাজ্য বিস্তার:

এই সময় আফগানিস্তানের কাবুলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বাবর সহসা আক্রমণ চালিয়ে 1504 খ্রিস্টাব্দে কাবুল জয় করেন। তিনি 1507 খ্রিস্টাব্ে কান্দাহার দখল করে ‘পাদশাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। বাবর ইতিমধ্যে পারস্য সম্রাট শাহ ইসলামের সহযোগিতায় মধ্য এশিয়ার সমরখন্দ ও তাসখন্দ দখল করেন এবং তাঁর পৈতৃক রাজ্য ফারগানা দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু উজবেক নেতারা উবাইদ উল খানের নেতৃত্বে 1512 খ্রিস্টাব্দে বাবরকে সাজগাওয়ানের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। এরপর বাবর কাবুলে চলে আসেন এবং ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে নজর দেন।

[3] ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতা:

বাবরের ভারত আক্রমণের পূর্বে এখানে কোনে কেন্দ্রীয় ও ঐক্যবদ্ধ সার্বভৌম রাজশক্তির অস্তিত্ব ছিল না। দিল্লির লোদী বংশীয় দুর্বল সুলতান ইব্রাহিম লোদীর রাষ্ট্র বিভিন্ন স্বাধীন করদরাজ্য ও জায়গিরে বিভক্ত হয়ে যায়। ঐতিহাসিক ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ বলেছেন যে, এই সময় “কোনো বিদেশি শত্রু ভারত জয়ের উদ্যোগ নিলে তাকে প্রতিহত করার শক্তি ভারতের ছিল না।” এই পরিস্থিতিতে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খ লোদী ও ইব্রাহিম লোদীর কাকা আলম খাঁ লোদী ইব্রাহিম লোদীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বাবরকে ভারত আক্রমণে আমন্ত্রণ জানান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাবর ভারত আক্রমণ করেন। [4] ভারত আক্রমণের উদ্দেশ্য: ভারতের বিপুল সম্পদরাশি বাবরকে ভারত আক্রমণে উৎসাহিত করেছিল বলে অনেকে মনে করেন।

আবার ঐতিহাসিক রাসব্রুক উইলিয়ামস, অধ্যাপক কুরেশী প্রমুখ মনে করেন যে, ভারতে রাজপুতদের অত্যাচার থেকে মুসলিমদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বাবর ভারত আক্রমণ করেন। বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “হিন্দুস্থান অধিকার করার বিষয়টি সর্বদাই আমার হৃদয়ে বিরাজ করত।… আমি এগুলিকে নিজ রাজ বলেই ভাবতাম এবং শান্তি বা যুদ্ধ- যে পথেই হোক না কেন তা দখল করতে চাইতাম।”। [5] ভারত আক্রমণ: বাবর 1519 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1524 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মোট 4 বার সামরিক অভিযান পাঠিয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বাজৌর, ভেরা, শিয়ালকোট, লাহোর ও দীপালপুর জয় করেন। এরপর দিল্লির শাসক ইব্রাহিম লোদির শত্রু দৌলত খাঁ লোদি ও আলম খাঁ লোদির সহায়তায় বাবর 1525 খ্রিস্টাব্দে বিশাল বাহিনী নিয়ে ভারত আক্রমণ করেন।

[4] পাণিপথের প্রথম যুদ্ধঃ

1526 খ্রি: বাবরের বাহিনীর গতিরোধ করার উদ্দেশ্যে ইব্রাহিম লোদীর সেনাদলও অগ্রসর হয়। অবশেষে 1526 খ্রিস্টাব্দের 21 শে এপ্রিল দিল্লির নিকটবর্তী পাণিপথের প্রান্তরে বাবর ও ইব্রাহিম লোদির মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এটি ‘পাণিপথের প্রথম যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে বাবর 000, 12 সৈন্য, কিছু বন্দুক ও কামান নিয়ে যুদ্ধ করে সাফল্য লাভ করেন। ইব্রাহিম লোদির পক্ষে। লক্ষ 20 হাজার সৈন্য যুদ্ধে অংশ নিলেও তিনি যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন। বাবরের সামরিক দক্ষতা, সেনাবাহিনীর বন্দুক ও কামানের সঠিক ব্যবহার, ‘রুমী’ যুদ্ধ কৌশল, দ্রুতগামী সুদক্ষ অশ্বারোহী সেনাদল প্রভৃতির সমন্বয় এই যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর জয়কে সহজ করে দেয়। বাবর দিল্লি ও আগ্রা দখল করেন, নিজ নামে ‘খুত্ৰা’ পাঠ করেন এবং ‘বাদশাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন।

[5] পাণিপথের প্রথম যুদ্ধের গুরুত্ব:

ভারতের ইতিহাসে পাণিপথের প্রথম যুদ্ধ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল- ইব্রাহিম লোদীর পরাজয়ের ফলে ভারতে লোদী বংশের পতন ঘটে এবং দিল্লির সুলতানি শাসনের অবসান হয়। 1526 খ্রিস্টাব্দের এই যুদ্ধে বাবরের জয়লাভের ফলে ভারতে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারতে ‘জাতীয় রাষ্ট্র’ গঠনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অবশ্য ড. এস. রায়ের মতে, পাণিপথের প্রথম যুদ্ধের দ্বারা শুধু লোদী শাসনের অবসান ঘটে, এর বেশি কিছু নয়। ড. সতীশ চন্দ্র মনে করেন যে, রাজনৈতিক দিক থেকে পাণিপথের যুদ্ধ কখনোই চূড়ান্ত যুদ্ধ ছিল না।

[6] খানুয়ার যুদ্ধ, 1527 খ্রি.:

পাণিপথের যুদ্ধে জয়লাভের পর বাবরের সামনে বড়ো বাধা ছিল আফগান ও রাজপুত শক্তি। বাবরের পুত্র হুমায়ুন কনৌজের আফগানদের দমনের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। বাবর কালান, বিয়ানা ও চোলপুরের আফগান শক্তিকে প্রতিহত করেন। রাজপুত বীর মেবারের রানা সঙ্গ বা সংগ্রাম সিংহ আজমীর, গোয়ালিয়র, মাড়োয়ার, অম্বর, চান্দেরী প্রভৃতি রাজপুত শক্তি ও মামুদ লোদিকে নিয়ে বাবরের বিরুদ্ধে এক বিশাল শক্তিজোট গড়ে তোলেন। এই শক্তি জোটের বিরুদ্ধে বাবর 1527 খ্রিস্টাব্দে (17ই মার্চ) খানুয়ার প্রান্তরে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এটি খানুয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করেও এই যুদ্ধে সংগ্রাম সিংহ পরাজিত ও আহত হন। কিছুকাল পর তিনি তাঁর সহকর্মীদের দ্বারা নিহত হন। খানুয়ার যুদ্ধের পর বাবর চান্দেরীর রাজপুত রানা মেদিনী রায়কে পরাজিত করেন এবং চান্দেরী দুর্গ দখল (1528 খ্রি.) করেন।

[7] খানুয়ার যুদ্ধের গুরুত্ব:

ভারতের ইতিহাসে খানুয়ার যুদ্ধ ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ- খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুত শক্তি পরাজিত হলে তাদের ঐক্য ও মনোবল ভেঙে যায়। ফলে উত্তর ভারতে রাজপুত শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়। ঐতিহাসিক ড. এস. রায়ের মতে, পাণিপথের যুদ্ধের চেয়ে খানুয়ার যুদ্ধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঐতিহাসিক কালীকিঙ্কর দত্তের মতে, “খানুয়ার যুদ্ধ ছিল একটি চূড়ান্ত ফল নির্ণয়কারী যুদ্ধ। এই অর্থে, এই যুদ্ধ পাণিপথের যুদ্ধের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।” ঐতিহাসিক রাশত্রুক উইলিয়ামস মনে করেন যে, বাবর খানুয়ার যুদ্ধে জয়লাভ না করলে তাঁর পাণিপথের প্রথম যুদ্ধজয় নিষ্ফল হত।

[8] ঘর্ঘরার যুদ্ধ:

জৌনপুরের মামুদ লোদি ও বাংলার নসরৎ শাহ-সহ অন্যান্য আফগান শাসকদের ঐক্যবদ্ধ করে বিহারের শের খাঁ বাবরের মুখোমুখি হন। বাবর কনৌজ, বারাণসী ও এলাহাবাদ অধিকার করে বিহারের সীমান্তে উপস্থিত হন। বিহারের ঘর্ঘরা বা গোগরা নদীর তীরে বাবরে আক্রমণে আফগান শক্তি বিপর্যস্ত হয়। এই যুদ্ধ গোগরার বা ঘর্ঘরার যুদ্ধ (1529 খ্রি.) নামে পরিচিত। 1529 খ্রিস্টাব্দে (6ই মে) মামুদ লোদি পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান এবং নসরৎ শাহ বাবরের সঙ্গে সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন। বহু আফগান নেতা বাবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। এর এক বছর পর অর্থাৎ 1530 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 47 বছর বয়সে বাবরের মৃত্যু হয়।

[9] সংস্কৃতি:

শুধু রাজ্য বিজেতা হিসাবে নয়, অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বাবর তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল আন্তরিক। তাঁর উৎসাহে আগ্রা, ঢোলপুর, গোয়ালিয়র ও অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন সৌধ নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ বলেছেন, “রাজপুরুষ, যোদ্ধা ও পণ্ডিত হিসাবে বাবর মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।” বাবর নিজের মাতৃভাষা তুর্কিতে তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবরী বা ‘বাবরনামা’ রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি নিজের জীবনের দোষ-গুণ কিছুই গোপন করেননি। ঐতিহাসিক বেভারিজ-এর মতে, “বাবরের এই আত্মজীবনী সেন্ট অগাস্টাইন ও রুশোর কনফেসন্স, গিবন ও নিউটনের স্মৃতিকথার সমপর্যায়ভুক্ত।” ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, “বাবরের প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ও তার গৌরব অবলুপ্ত হলেও বাবরের জীবনস্মৃতি আজও অক্ষয় ও অমর।”

উপসংহারঃ

যোদ্ধা হিসাবে সফল হলেও সংগঠক হিসাবে বাবর প্রতিভার পরিচয় দিতে পারেননি। তাই ঐতিহাসিক রাশত্রুক উইলিয়ামস্ বলেছেন যে, “বাবর উত্তরাধিকার হিসাবে তাঁর পুত্রের জন্য এক দুর্বল, কাঠামোহীন ও মেরুদণ্ডহীন রাজতন্ত্র রেখে যান।” অবশ্য তাঁর 4 বছরের স্বল্পকালীন রাজত্বে দেশের জন্য শক্তিশালী শাসন কাঠামো গঠনের যথেষ্ট সময়ও তিনি পাননি। তাই ঐতিহাসিক আর. পি. ত্রিপাঠী বলেছেন যে, বাবর “কী করতে পারেননি, তা না দেখে দেখা উচিত তিনি কী করতে চেয়েছেন বা করেছেন। বাবরের মধ্যে তাঁর পূর্ব পুরুষদের সাহসিকতা ও রণদক্ষতা এবং তাঁর উত্তরসূরী আকবরের শান্ত ও শক্ত রাজকীয় শাসন-দক্ষতা লক্ষ করে ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুল বলেছেন যে, “বাবর ছিলেন মধ্য এশিয়া ও ভারতের মধ্যে যোগসূত্রকারী…।””

জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর

Leave a Reply