ঔরঙ্গজেবের আমলে মারাঠাদের সঙ্গে মুঘল চুক্তি সংঘাত

ঔরঙ্গজেবের আমলে মারাঠাদের সঙ্গে মুঘল চুক্তি সংঘাত ছিল মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক। ঔরঙ্গজেব মারাঠা শক্তির উত্থানকে ভালোভাবে নেননি এবং শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠারা মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলস্বরূপ দীর্ঘ ও রক্তাক্ত যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধগুলির মধ্যে পুরন্দরের চুক্তি এবং শিবাজীর মুঘল দরবারে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। 

ঔরঙ্গজেব ও মারাঠাদের মধ্যেকার সংঘাতের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক এবং সামরিক। মারাঠারা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, বিশেষ করে শিবাজীর নেতৃত্বে। ঔরঙ্গজেব, যিনি মারাঠা শক্তির উত্থানকে ভালোভাবে গ্রহণ করেননি, তিনি মারাঠাদের দমন করার চেষ্টা করেন। এর ফলস্বরূপ দীর্ঘ ও রক্তাক্ত যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুরন্দরের চুক্তি, যা ১৬৬৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তিতে শিবাজীকে কিছু দুর্গ মুঘলদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল এবং মুঘল দরবারে উপস্থিত হতে হয়েছিল। যদিও এই চুক্তিটি ছিল সাময়িক, কিন্তু এটি মারাঠা ও মুঘলদের মধ্যেকার সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে।

আরো জানুন – History 2025 PGHI-III Suggestion

ঔরঙ্গজেব

ঔরঙ্গজেবের আমলে মারাঠাদের সঙ্গে মুঘল চুক্তি সংঘাতের পরিচয় দাও।

ভূমিকা:-

ঔরঙ্গজেব তাঁর দীর্ঘ 50 বছরের রাজত্বকালে (1658-1707 খ্রি.) বিভিন্ন কার্যাবলীর দ্বারা নিজেকে এক বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত করেন। তাঁর ত্রুটিপূর্ণ দাক্ষিণাত্য নীতির ফলে মহারাষ্ট্রে শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা জাতি এক দুর্ধর্ষ শক্তিতে পরিণত হয়। ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘ 50 বছরের রাজত্বকালের একটি বড়ো অংশই দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে ব্যয়িত হয়েছে।

[1] শিবাজীর উত্থান:

ঔরঙ্গজেব 1658 খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসার পূর্বে তিনি দাক্ষিণাত্যের সুবাদার ছিলেন। তখন থেকেই মহারাষ্ট্রে শিবাজীর নেতৃত্ব মারাঠাদের দুরন্ত উত্থান শুরু হয়। ঔরঙ্গজেবের সিংহাসন লাভের পরপরই শিবাজী মুঘলদের সঙ্গে সংঘাতের পথে যাননি। বরং ঔরঙ্গজেবের বিজাপুর দখলের উদ্যোগে শিবাজী তাঁকে সাহায্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি শীঘ্রই উপলব্ধি করেন যে, মুঘলদের সঙ্গে মৈত্রীর পরিবর্তে বিজাপুরের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন মারাঠাদের পক্ষে বেশি লাভজনক হবে। এই রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের হিসেব কষে শিবাজী ক্রমে মুঘল বিরোধী হয়ে ওঠেন।

[2] শিবাজীর শক্তিবৃদ্ধি:

মুঘল রাজদরবারে সিংহাসনের অধিকার নিয়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এই সুযোগে শিবাজী 1659 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিজাপুরের কল্যাণ, কোঙ্কন, মাহুলি, ভীওরানিমণ্ডি প্রভৃতি স্থান ও বহু দুর্গ দখল করে মারাঠা সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ঘটান। বিজাপুরের সেনাপতি আফজল খাঁ পুনা আক্রমণ করে শিবাজীকে বন্দি করার পরিকল্পনা করলে শিবাজী কৌশলে আফজল খাঁ-কে হত্যা করেন (1659 খ্রি.)। শিবাজীকে দমন করার উদ্দেশ্যে ঔরঙ্গজেব তাঁর মাতুল শায়েস্তা খাঁ-কে পাঠান। শিবাজী অতর্কিতে পুনায় শায়েস্তা খাঁ-র শিবির আক্রমণ করে তাঁকে পরাস্ত করেন এবং শায়েস্তা খাঁ-র পুত্র আবুল ফৎ-কে হত্যা করেন। এরপর মুঘলদের সুরাট বন্দর লুণ্ঠন করে শিবাজী বহু লক্ষ টাকা অধিকার করেন। এভাবে শিবাজী ক্রমে নিজ শক্তি বৃদ্ধি করেন।

শীবাজী

[3] পুরন্দরের সন্ধি:

ঔরঙ্গজেব এরপর শিবাজীকে দমন করার জন্য 1664 খ্রিস্টাব্দে জয়সিংহ-কে দাক্ষিণাত্যে পাঠান। জয়সিংহ মারাঠা দুর্গগুলি একে একে দখল করে শিবাজীকে কোণঠাসা করেন। শিবাজী শেষপর্যন্ত মুঘল সেনাপতি জয়সিংহ ও দিলীর খাঁ-র কাছে পরাজিত হয়ে মুঘলদের সঙ্গে 1665 খ্রিস্টাব্দে পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন। এই সন্ধি শর্ত অনুসারে, শিবাজী মুঘলদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেন। তাঁর 35টি দুর্গের মধ্যে 23টি দুর্গ মুঘলরা লাভ করে। মারাঠা রাজ্যের বৃহদংশ মুঘল অধিকারে চলে যায়। শিবাজীর পুত্র শম্ভুজীকে মুঘল দরবারে পাঁচ হাজারি মনসবদারের পদ দেওয়া হয়।

[4] শিবাজীকে নজরবন্দি:

পুরন্দরের সন্ধির পর শিবাজী জয়সিংহের আমন্ত্রণে শিশুপুত্র শম্ভুজি-সহ আগ্রায় আসেন (1666 খ্রি.)। কিন্তু ঔরঙ্গজেব আগ্রায় শিবাজীকে যোগ্য মর্যাদা দানের পরিবর্তে তাঁকে আগ্রা দুর্গে নজরবন্দি করেন। কিন্তু ও মাস পর পুত্র-সহ শিবাজী সুকৌশলে দুর্গ থেকে পালিয়ে মহারাষ্ট্রে পৌঁছান। এরপর কিছুদিন চুপচাপ থেকে 1670 খ্রিস্টাব্দে শিবাজী 1670 খ্রিস্টাব্দে মুঘলদের বিরুদ্ধে পুনরায় অশান্ত হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর হাতছাড়া দুর্গগুলি একে একে পুনরুদ্ধার করেন এবং মুঘল অধিকৃত অঞ্চল থেকে ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখী’ নামে দুই প্রকার কর বলপূর্বক আদায় করে নিজ শক্তি বৃদ্ধি করেন। 1674 খ্রিস্টাব্দে রায়গড়ে শিবাজীর অভিষেক হয়। তিনি ‘গো-ব্রাহ্মণ প্রজাপালন’ ও ‘ছত্রপতি’ উপাধি গ্রহণ করেন। 1680 খ্রিস্টাব্দে শিবাজীর মৃত্যু হয়।

[5] শিবাজীর উত্তরাধিকারীগণ:

শিবাজীর মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে মারাঠা শক্তি কিছুদিনের জন্য দুর্বল হয়ে পড়ে। শিবাজীর পুত্র শম্ভুজী 1689 খ্রিস্টাব্দে মুঘল বাহিনীর হাতে পরাজিত ও বন্দি হয়ে নিহত হন। দাক্ষিণাত্যে মুঘলদের শত্রু বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার পতন এবং শম্ভুজীর মৃত্যুদণ্ড মারাঠাদের মনোবল সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু শম্ভুজীর মৃত্যু মারাঠাদের মনে প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্র আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে শম্ভুজীর ভ্রাতা রাজারাম (শিবাজীর কণিষ্ঠ পুত্র) মারাঠা সিংহাসনে বসলে (1689 খ্রি.) মুঘল বাহিনী মারাঠাদের রাজধানী রায়গড় অভিযান করে। মুঘলরা রায়গড়-সহ মারাঠাদের বিভিন্ন দুর্গ একে একে দখল করে নেয়। শম্ভুজীর নাবালক পুত্র শাহু-সহ রাজপরিবারের অনেক সদস্য মুঘলদের হাতে বন্দি হন। রাজারাম পালিয়ে যান।

[6] বিরোধের শেষ পর্যায়:

রাজারামের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা পত্নী তারা বাঈ তাঁর শিশুপুত্র তৃতীয় শিবাজী-কে সিংহাসনে বসিয়ে মুঘল বিরোধী তুমুল লড়াই শুরু করেন। তারা বাঈ মুঘল অঞ্চলে অতর্কিত আক্রমণে মুঘলদের বিপর্যস্ত করে তোলেন। ইতিমধ্যে দাক্ষিণাত্যে কর্ণাটক মুঘলদের দ্বারা আক্রান্ত হলে কর্ণাটকের যোদ্ধা সম্প্রদায় মারাঠাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তীব্র মুঘল বিরোধী লড়াই শুরু করে। চাপের মুখে মুঘল বাহিনী আক্রমণের পরিবর্তে ক্রমে আত্মরক্ষার পথ গ্রহণ করে। এভাবে মুঘলদের ক্রমিক সাফল্য আসতে থাকে।

তথ্যগুলো থেকে ঔরঙ্গজেবের আমলে মুঘল-মারাঠা সংঘাত, চুক্তি এবং তার পরিণাম সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

ঔরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং দাক্ষিণাত্য বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা মারাঠা শক্তির উত্থানের সাথে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করে। শিবাজী একটি স্বাধীন মারাঠা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলে, ঔরঙ্গজেব একে তার সাম্রাজ্যের প্রতি একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখেন। এছাড়াও, ঔরঙ্গজেবের গোঁড়া ধর্মীয় নীতি মারাঠাদের প্রতিরোধকে আরও জোরদার করে।

সংঘাতের প্রথম দিকে মুঘল সেনাপতি জয় সিংয়ের নেতৃত্বে পুরন্দর দুর্গ অবরোধের পর ১৬৬৫ সালে শিবাজীর সঙ্গে পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্তানুসারে, শিবাজী ২৩টি দুর্গ মুঘলদের হাতে তুলে দেন এবং মুঘলদের অধীনতা স্বীকার করে আগ্রায় ঔরঙ্গজেবের দরবারে যেতে বাধ্য হন। তবে, সেখানে শিবাজীকে বন্দি করা হলে তিনি কৌশলে পালিয়ে এসে আবার মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করেন। এরপর থেকে মুঘল ও মারাঠাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলে।

উপসংহার:-

ঔরঙ্গজেব তাঁর মৃত্যুর (1707 খ্রি.) আগে আর মারাঠাদের বিরুদ্ধে মুঘল সেনাদের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। নব্বই বছরের বৃদ্ধ সম্রাটের হতাশা, শোক ও দুঃখগুলিকে আরও তীব্র করে তুলেছিল মারাঠাদের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা নিয়েই ঔরঙ্গজেব ভঙ্গ হৃদয়ে 1707 খ্রিস্টাব্দে ওরা মার্চ দাক্ষিণাত্যে মৃত্যুবরণ করেন।মারাঠাদের দমন করার জন্য ঔরঙ্গজেব তার জীবনের শেষ ২৭ বছর দাক্ষিণাত্যে কাটিয়েছিলেন। তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডার মতো দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলিকে দখল করে মারাঠাদের মিত্রহীন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধের কারণে মারাঠাদের শক্তি দমন করা সম্ভব হয়নি। মারাঠা প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের আর্থিক ও সামরিক দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয় এবং মারাঠারা একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সংঘাত ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতিকে একটি ব্যর্থ নীতিতে পরিণত করে।

ঔরঙ্গজেব

Leave a Reply