You are currently viewing আকবরের শাসনব্যবস্থা

আকবরের শাসনব্যবস্থা

আকবরের শাসন ব্যবস্থা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি একটি সুসংহত ও দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান। তার সংস্কারগুলি সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। 

আকবরের শাসনব্যবস্থা ছিল একটি কেন্দ্রীভূত, দক্ষ এবং প্রগতিশীল প্রশাসন ব্যবস্থা। তিনি সাম্রাজ্যকে সুসংহত করতে এবং প্রজাদের মধ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেন। তাঁর শাসনকালে প্রশাসন, অর্থনীতি, সামরিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। 

আরো জানুন – History 2025 PGHI-II Suggestion

আকবরের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে যা জানো লেখো অথবা মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আকবরের কৃতিত্ব আলোচনা কর।

ভূমিকা:

মধ্যযুগে ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে সকল সম্রাট শাসনকার্যে প্রভূত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সাম্রাজ্যবাদী শাসক। তিনি মনে করতেন, ‘একজন রাজা সর্বদাই রাজ্য বিস্তারে সচেষ্ট থাকবেন। নতুবা তাঁর প্রতিবেশীরা তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে’। আকবরের সিংহাসনে আরোহণ কালে মুঘল শাসন কেবল দিল্লী, আগ্রা ও পাঞ্জাবের একাংশেই সীমাবদ্ধ ছিল। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ সাফল্য লাভের পর আকবর রাজ্য বিস্তারের দিকে মনোনিবেশ করেন। এরপর একে একে তিনি বিভিন্ন রাজ্য জয় করে এক বৃহৎ ও সুসংহত সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

সম্রাট আকবর

আকবরের শাসনব্যবস্থা

(1) কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসন:

আকবর প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। যথা- [1] কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ও [2] প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা।

কেন্দ্রীয় শাসন:

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগ ছিল। মুঘল শাসন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন সম্রাট স্বয়ং। তারপরেই স্থান ছিল উকিল বা প্রধানমন্ত্রীর। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নীচে থাকত আরো চারজন মন্ত্রী। এঁরা হলেন-দেওয়ান বা উজির (রাজস্ব বিভাগীয় প্রধান), মির বকশি (সামরিক বিভাগীয় প্রধান), মির সামান (রাজদরবারে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী), সদর উস সুদুর (প্রধান বিচারপতি)।

প্রাদেশিক শাসন:

প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থার প্রধান ছিলেন সুবাদার। মুঘল শাসনকালে সাম্রাজ্যকে শাসনতান্ত্রিক সুবিধার কারণে ১৫টি সুবা বা প্রদেশে ভাগ করা হয়। সুবাদার ছাড়াও প্রতিটি সময় একজন করে দেওয়ান, বকশি, সদর কাজি নিয়োগ করা হত। প্রদেশগুলি আবার কতকগুলি সরকারে, সরকারগুলি পরগনায় ও পরগনাগুলি গ্রামে ভাগ করা হত।

(2) জাতীয় সম্রাট:

ভারতের প্রথম জাতীয় সম্রাট ছিলেন আকবর। আকবর প্রথম ভারতে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রশাসন পদ্ধতির সূচনা করেন। মুসলিম শাসক হয়েও তিনি ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু প্রজাদের রাজদরবারে সম্মানীয় পদ দান করেন। তিনি হিন্দু প্রজাদের প্রতি উদার নীতি গ্রহণ করেন। শাসক হিসেবে তিনি হিন্দু-মুসলমান সকল সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গকে সমান চোখে দেখতেন। আবুল ফজল তাঁর ‘আকবরনামা’ গ্রন্থের আকবরকে জাতীয় সম্রাট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

(3) মানবতাবাদী শাসক:

মানবিক শাসক হিসেবে আকবর যথেষ্ট কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। স্ত্রী, পুত্র, বন্ধু, আত্মীয় পরিজন, প্রতিবেশী প্রত্যেকের প্রতি আকবর ছিলেন স্নেহপ্রবণ ও উদার। তিনি হিন্দুদের ওপর থেকে জিজিয়া কর তুলে নেন। অপরাধীদের প্রতি কঠোর শাস্তি প্রদানের বিধান থাকলেও অনেকের উপর থেকে তিনি এই বিধান তুলে নেন।

(4) ধর্মীয় নীতি:

প্রথম জীবনে আকবর ইসলাম ধর্মের সুন্নি মতবাদের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন।পরবর্তীকালে আবুল ফজল ও ফইজির সংস্পর্শে এসে তিনি সুফি মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ধর্ম সম্পর্কে উদার মনোভাব গ্রহণ করেন। আকবর ধর্ম সম্পর্কে আলোচনা করবার জন্য ফতেপুর সিক্রিতে ইবাদৎখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে হিন্দু, মুসলমান, জৈন, খ্রিস্টান সকল ধর্মের পণ্ডিতেরা মিলিত হয়ে আকবরের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মমত সম্পর্কে আলোচনা করতেন। এর প্রভাবে আকবর দীন-ই-ইলাহী নামে এক নতুন ধর্মনীতির প্রবর্তন করেন।

(5) মনসবদারি প্রথা:

আকবরের শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল মনসবদারি প্রথা। ‘মনসব’ কথার অর্থ হল ‘পদমর্যাদা’। মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বরখাস্ত সবই সম্রাটের ইচ্ছাধীন ছিল। তাঁর শাসন ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এবং অভিজাতদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের মধ্যে সংহতি গড়ে তুলতে ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে মনসবদারি প্রথা চালু করেন।

(6) রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার:

মুঘল অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য আকবর রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করেন। রাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল জমি জরিপ করা। তিনি রাজস্ব বিভাগের কর্মচারী টোডরমলের সাহায্যে জমি জরিপের ব্যবস্থা করেন। সম্রাট আকবর যে তিন প্রকার ভূমি রাজস্ব প্রথা চালু করেন তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘জাবতি প্রথা’। এই প্রথা অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের ফসল উৎপাদনের গড় হিসেব হত এবং ওই গড়ের ১/৩ অংশ ভূমি রাজস্ব হিসেবে নির্দিষ্ট হয়েছিল।

(7) অন্যান্য সংস্কার:

প্রজা কল্যাণের উদ্দেশ্যে আকবর কিছু কিছু জনহিতকর ও সামাজিক‌ সংস্কার সাধন করেন। মধ্যকালীন ভারত যখন বিভিন্ন কুসংস্কারের জর্জরিত তখন শাসক হিসেবে আকবরই প্রথম হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। রামমোহনের বহু আগেই আকবর সতীদাহ প্রথাকে রদ করার জন্য আইন জারি করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি ১৬ বছরের নীচে ছেলেদের ও ১৪ বছরের নীচে মেয়েদের বিবাহ নিষিদ্ধ করেন। তিনি গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন, পতিতাবৃত্তি, শিশু কন্যা হত্যা এবং মদ্যপানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করশোমড়া

ফতেপুর সিক্রি

মূলয়ায়ণঃ-

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে যিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি হলেন মুঘল সম্রাট আকবর। মহান ব্যক্তিত্ব, প্রতিভা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার জন্য তিনি যথার্থ অর্থেই কৃতিত্বের দাবি রাখেন। শাসন ব্যবস্থায় মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করেছিলেন। মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের ইতিহাসে শাসক হিসেবে আকবর যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা চিরস্মরণীয়।

আকবরের শাসনব্যবস্থা

Leave a Reply