Causes and consequences of the Battle of Plassey
1757 পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি অতি আলোচিত অধ্যায়। 1775 খ্রিস্টাব্দের পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল এই বিষয়টি অষ্টাদশ শতকের একটি অতি আলোচিত বিষয়। পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে খুবই বিস্তারিত বর্ণনা করতে হয় । প্রত্যেক ইতিহাসের ছাত্রছাত্রী অবশ্যই পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল এই বিষয়টি সম্পর্কে যত্নশীল ভাবে জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কারণ পলাশীর যুদ্ধের পর থেকেই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা তথা ভারতের উপর বিশেষভাবে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছে। 1775 খ্রিস্টাব্দের পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল ইতিহাসের চর্চিত বিষয় ।
১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে সিরাজউদ্দৌল্লা যখন বাংলার নবাব হন তখন তিনি ছিলেন বয়সে নবীন এবং শাসনকার্যে প্রায় অনভিজ্ঞ। স্বভাবতই ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তির পতনের ফলে রাজনীতি ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণ করার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা সিরাজের ছিল না। তদুপরি বাংলার মসনদে আলিবর্দীর অপর দুই জামাতার লোভজনিত ষড়যন্ত্র একদিকে যেমন সিরাজকে দুর্বল করেছিল তেমনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ প্রশস্ত করেছিল। সেই কারণে পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়। এইরূপ সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার মধ্যে সিরাজ সিংহাসনে আরোহণ করেন।
Battle of Plassey, Causes, Significance, Impacts, History…
Table of Contents
1757 পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
ক) পলাশীর যুদ্ধের কারণ
সিরাজের সাথে ইংরেজদের বিচ্ছেদ ও পরে বিরোধের কথা জানা যায় উভয়ের মধ্যে চিঠিপত্রের মারফত এবং তৎকালীন রেকর্ড বুক থেকে। কিন্তু আলিবর্দীর উত্তরাধিকারী মনোনীত হবার পর সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের অসদ্ভাব ছিল না; বরঞ্চ সিরাজ তাদের খুব বেশি করে সম্মান প্রদর্শন করতেন, যা তিনি অন্যান্য বণিকদের করতেন না। এই বক্তব্য যে সঠিক তা জানা যায় Long Selections-এর বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে। এর অষ্টম খণ্ডে বলা হয়েছে, ওলন্দাজ বা ফরাসীদের তুলনায় অনেক বেশি সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে গ্রহণ করা হয়েছিল (The English president was received with utmost politeness and distinction far superior to one that was paid either to the Dutch or the French)। কিন্তু এই সদ্ভাবের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে বেশ কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

- সিরাজ যখন নবাব হন তখন ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ ড্রেক তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে ‘নজরানা’ প্রদান করেননি, ফলে খুব স্বাভাবিক কারণে ইংরেজগণ সিরাজের বিরাগভাজনে পরিণত হয়।
- আলিবর্দীর সময়ে সিরাজ যখন নবাব হননি সিরাজ একদিন কাশিমবাজার কুঠি পরিদর্শনে গেলে তাঁকে কুঠি পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরন্তু বলা হয় যে, তিনি মত্ত অবস্থায় আছেন এবং তাঁর দ্বারা কারখানার ক্ষতিসাধন হতে পারে। এই ব্যবহারে সিরাজ অপমানিত হন।
- ইউরোপে যখন সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ চলছে সেই সূত্র ধরে ইংরেজ ও ফরাসীরা এদেশে নতুন নতুন দুর্গ নির্মাণ প্রবৃত্ত হয়। কিন্তু এই কাজ থেকে উভয় বণিক সম্প্রদায়কে নিবৃত্ত হবার জন্য সিরাজ এক পরোয়ানা জারি করেন। এই প্রস্তাব ফরাসীরা মেনে নিলেও ইংরেজরা এতে কর্ণপাত করল না। এর ফলে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।
- আইনের চোখে দোষী রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে ইংরেজরা পরম আত্মীয়ের ন্যায় আশ্রয় প্রদান করে। স্বভাবতই সিরাজ ইংরেজদের এই কাজকে মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি কৃষ্ণদাসকে নবাবের কাছে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দেন। কিন্তু এই আদেশ ইংরেজরা প্রত্যাখ্যান করে।
- ঘসেটি বেগম এবং সৌকৎ জঙ্গকে ইংরেজরা সিরাজ-বিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করলে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের মনোমালিন্য দেখা দেয়।
- সিরাজ কর্তৃক নিযুক্ত গুপ্তচর নারায়ণ দাসকে ইংরেজ গভর্নর তিরস্কার করে কলকাতা থেকে ফেরৎ পাঠালে সিরাজের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়।
- বাণিজ্য-সংক্রান্ত ব্যাপারেও ইংরেজদের সাথে সিরাজের বিবাদ শুরু হয়। সিরাজ বলেন যে, কোম্পানির কর্মচারীগণ ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্য ‘দস্তক’ ব্যবহার করে নবাব তথা স্থানীয় বণিকদের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করছে। সুতরাং সিরাজ কঠোর ভাষায় বলেন যে, কোম্পানি দস্তকের অপব্যবহার বন্ধ করবে এবং মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে যে শর্তে ব্যবসাবাণিজ্য করে আসছিল সেই শর্ত পালনে যত্নবান হবে। কিন্তু ইংরেজগণ নবাবের এই আদেশ মানতে রাজী না-হলে সিরাজ ইংরেজদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ক্রমে উভয়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ক্লাইভ ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বুদ্ধিমান সৈনিক। বাংলার নবাবের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তার কাছে দ্রুত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই বাংলার নবাবকে সম্পূর্ণ বশীভূত করার পরিকল্পনা তখনই তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল এবং এই কাজে তিনি সিরাজের বিরোধী আত্মীয়-পরিজন যথা-সেনাপতি মীরজাফর, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ প্রমুখকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে ক্লাইভ উপরিলিখিত ব্যক্তিদের সাথে এক হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তাছড়া ইউরোপে ‘সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ’ আরম্ভ হলে এখানকার ইঙ্গ-ফরাসী সংঘর্ষেবও নতুন পর্যায় আরম্ভহয়েছিল।
১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে ক্লাইভ এবং ওয়াটসন ফরাসীদের চন্দননগর কুঠী দখল করলেন। ফরাসীরা মুর্শিদাবাদে সিরাজের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। সিরাজের এই কাজে ইংরেজরা ক্ষুব্ধ হন। ক্ষুব্ধ ইংরেজরা যে ভাবেই হোক সিরাজকে রাজ্যচ্যুত করতে প্রয়াসী হয়। এই সংকট মুহূর্তে সিরাজ-এর চরিত্রের সমস্ত দুর্বলতা যেন উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ল। মনস্থির করার ক্ষমতা যেন তাঁর রইল না, কর্মশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেললেন। এবং যে ফরাসীদের দুঃসময়ে সাহায্য করেছিলেন, সেই ফরাসীদের এই সঙ্কটময় অবস্থায় তিনি পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
ষড়যন্ত্রকারীগণ যখন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত তখন ধূর্ত ক্লাইভ অতি সামান্য অজুহাতে সিরাজের বিরুদ্ধে সসৈন্যে অগ্রসর হন। অবশেষে ১৭৫৭ খ্রীঃ-এর ২৩শে জুন ভাগীরথীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে উভয় পক্ষের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে নবাব-বাহিনীর উপযুক্ত দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মীরজাফর প্রমুখ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে সিরাজের পরাজয় ঘটে। পরে তাঁকে বন্দী ও হত্যা করা হয়। এই ঘটনা ছিল পলাশীর যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

খ) 1757 পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল
• ফলাফল:-
পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল ছিল গভীর ও সুদুরপ্রসারী। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন, পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাবীর অবসান ঘটেছিল এবং ইংরেজ-কর্তৃত্বের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এ-মত গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পলাশীর পরও বাংলার শাসনতান্ত্রিক প্রধান ছিলেন বাংলার নবাব। এবং এই যুদ্ধের পরে কিছু অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়া কোনরূপ শাসনতান্ত্রিক অধিকার ইংরেজরা পায়নি।
তাছাড়া রবার্ট ক্লাইভ ও ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী পিটের মধ্যে লিখিত পত্রাবলী থেকেও জানা যায়, সেই মুহূর্তে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বাংলার কোনরূপ সার্বভৌম ক্ষমতালাভে আগ্রহী ছিল না। পরবর্তীকালে নবাব মীরকাশিম কর্তৃক রাজধানী স্থানান্তরিতকরণ, শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন প্রভৃতি কাজ বাংলার নবাবের সার্বভৌম ক্ষমতার কথাই প্রমাণ করে। এই কারণে ম্যালেসন (Malleson) লিখেছেন: “Plassey, though decisive, can never be considered a great battle.”
বিরাট পরিবর্তন না আনলেও, পলাশীর যুদ্ধের পরোক্ষ ফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধে ভারতীয় শক্তির দুর্বলতা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারাচাঁদ যথার্থ বলেছেন, “The defeat at Plassey exposed all the Indian weakness.” এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ভারতীয় রাজন্যবর্গ ও য়ুরোপীয় বণিক সম্প্রদায়ের চোখে ইংরেজদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এযাবৎ ইংরেজ কোম্পানি ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর অনুগ্রহের পাত্র ছিল কিন্তু অতঃপর ইংরেজরাই অনুগ্রহ বিতরণের অধিকার অর্জন করল। দ্বিতীয়ত, পলাশীর যুদ্ধ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল, কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাত্র। কোনরূপ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। অথচ পলাশীর পরবর্তীকালে কোম্পানির প্রভাবমুক্ত থেকে বাংলার প্রশাসন চালানো বাংলার নবাবদের পক্ষে সহজসাধ্য ছিল না।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিজনিত শূন্যতা বাংলার পক্ষে ক্ষতির কারণ হয়েছিল। তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে “পলাশীর যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মধ্যযুগ শেষ হয়ে আধুনিক যুগের পত্তন হয়েছিল।’ তিনি উৎসাহভরে আরো বলেছেন- “দেশ ধর্মভিত্তিক শাসনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে আরম্ভ করেছিল পশ্চিম থেকে নতুন ভাবধারার সঞ্জীবনী স্পর্শে যেন শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, রাজনৈতিক জীবন সর্বত্র আবার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল।
ঈশ্বর প্রেরিত যাদুকর যেন প্রাচ্যদেশের সমাজের মৃত কঙ্কালগুলিকে জীবন্ত করে তুলল।” অবশ্য এই বক্তব্য সর্বাংশে মানা যায় না। চতুর্থত, পলাশীর যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল গভীর। এর ফলে বাংলার ব্যবসাবাণিজ্যে ইংরেজদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব স্থাপনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল এবং দেশীয় ও অপরাপর য়ুরোপীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়েছিল। তাই জনৈক ঐতিহাসিক বলেছেন, “পলাশীর যুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ভাবে ভারতে ফরাসীদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল।” (“The battle of Plassey may be truly said to have decided the fate of the French in India”)। ভারতে ইংরেজদের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ যদি সুদীর্ঘ ক্রমবিবর্তন পরিণত হয়, তা হলে পলাশীর যুদ্ধ সেই ধারার সূচনা করেছিল বলা যেতে পারে।
• মূল্যায়ন:-
তাই বাংলা তথা ভারত-ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ একেবারেই গুরুত্বহীন ছিল একথা বলা যায় না। এই যুদ্ধে নিঃসন্দেহে ইংরেজদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বাংলার নবাবী অতঃপর ইংরেজের কৃপার পাত্রে পরিণত হয়েছিল। ইংরেজ কোম্পানি গ্রহণ করেছিল ‘নৃপতি স্রষ্টার’ (King Makers) ভূমিকা।