সুশীল সমাজ

সুশীল সমাজ বলতে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সংগঠিত গোষ্ঠী, যেমন বেসরকারি সংস্থা, ট্রেড ইউনিয়ন, এবং অন্যান্য নাগরিক সংগঠনকে বোঝায়, যারা নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে। এটি মূলত সরকার এবং ব্যক্তি বা জনগণের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  

Table of Contents

READ MORE – মহাদেব গোবিন্দ রানাডে

সুশীল সমাজ

∆ সুশীল সমাজ আন্দোলনের সংজ্ঞা:-

সুশীল সমাজ আন্দোলন হল এমন এক সংগঠিত প্রয়াস, যেখানে ব্যক্তি, সংস্থা ও গোষ্ঠীসমূহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সামাজিক অসাম্যর বিরুদ্ধে বা পক্ষে নিজেদের মত প্রকাশ করে এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। সুশীল সমাজ বলতে বোঝানো হয় সেই ক্ষেত্রটিকে, যা রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরের, কিন্তু উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এটি এমন একটি পরিসর, যেখানে নাগরিকগণ স্বেচ্ছায় সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকারের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করে, মতামত প্রদান করে এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদ করে।

                জাঁ কোহেন ও অ্যান্ড্রু আরাটো (Jean Cohen & Andrew Arato) তাঁদের গ্রন্থ Civil Society and Political Theory (1992)-এ সুশীল সমাজকে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি সমাজের মধ্যবর্তী একটি মুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। ভারতের প্রেক্ষিতে এই সুশীল সমাজ আন্দোলন বিভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে, যেমন-পরিবেশ আন্দোলন, স্বচ্ছ প্রশাসনের দাবি, আদিবাসীদের অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, সমকামিতা প্রভৃতি ক্ষেত্রগুলিতে।

∆ সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক:-

সুশীল সমাজ আন্দোলনকে অনেকসময় সামাজিক আন্দোলনের একটি উপশ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে উভয়ের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সামাজিক আন্দোলন সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে ভিত্তিশীল হয়, অন্যদিকে সুশীল সমাজ আন্দোলন তুলনামূলকভাবে শহরভিত্তিক, মধ্যবিত্ত নেতৃত্বাধীন এবং নির্দিষ্ট নীতি বা প্রশাসনিক প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হয়।

                তবে ভারতীয় প্রেক্ষিতে সুশীল সমাজ আন্দোলন ও সামাজিক আন্দোলনের সীমারেখা প্রায়শই মিশে যায়। যেমন-চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, তথ্য জানার অধিকার আন্দোলন-সবই একটি নির্দিষ্ট সামাজিক দাবি থেকে উদ্ভূত হলেও পরবর্তীতে সুশীল সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণে বৃহৎ আন্দোলনের রূপ নেয়।

∆ সুশীল সমাজ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য:-  

[1] রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উপর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস:-

সমকালীন ভারতে সুশীল সমাজ আন্দোলনের প্রথম ও অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল-রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উপর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। ২০০৫ সালে পাস হওয়া তথ্যের অধিকার আইন (Right to Information Act-RTI)-এর পেছনে সুশীল সমাজের দীর্ঘ আন্দোলনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘মজদুর কিষান শক্তি সংঘঠন’ (MKSS) নামক একটি গ্রামীণ সংগঠন রাজস্থানে এই দাবিকে জনপ্রিয় করে তোলে। আর তার ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় স্তরে আইনি স্বীকৃতি লাভ করে তথ্য জানার অধিকার। অর্থাৎ, এই আন্দোলন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার দাবি উত্থাপন করে এবং তাতে সফল হয়।

[2] বহুমাত্রিকতা:-

সুশীল সমাজ আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর বহুমাত্রিকতা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রজুড়ে বিস্তার। শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ সুরক্ষা, আদিবাসীদের অধিকার, নারীর অধিকার, যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকারের ক্ষেত্রেও সুশীল সমাজ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’-এর মাধ্যমে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ও জলাধার নির্মাণে বিপন্ন জনজীবনের সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়। এই আন্দোলনের নেত্রী মেধা পাটিকর রাষ্ট্রের উন্নয়ন মডেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল বাস্তুচ্যুতি, জীবিকার অধিকার ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার দাবি।

[3] নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ:-

সুশীল সমাজ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ, সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত প্রচার এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সক্রিয় জড়িত থাকা। এই আন্দোলন শুধু দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য দিয়েই থেমে থাকেনি, বরং তা রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি তোলে। এই আন্দোলন দেখায় যে, সুশীল সমাজ কেবল প্রতিবাদী নয়, বরং রাজনৈতিক বিকল্প গড়ার শক্তিও রাখে।

[4] প্রযুক্তি-নির্ভরতা:-

সমকালীন সুশীল সমাজ আন্দোলনের আর-একটি বৈশিষ্ট্য হল এর প্রযুক্তি-নির্ভরতা ও ডিজিট্যাল প্রচারমাধ্যমের ব্যবহার। সাম্প্রতিক ‘MeToo’ আন্দোলন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে সামাজিক মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীরা সরব হয়েছেন। এই আন্দোলন আইনত না হলেও সামাজিক বিচারের দাবিতে, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। এখানে প্রযুক্তি ছিল একপ্রকার আন্দোলনের হাতিয়ার।

সুশীল সমাজের কাজ:

মানবাধিকার সুরক্ষা: 

এটি মানবাধিকারের প্রচার, সুরক্ষা এবং অগ্রগতির জন্য কাজ করে। 

জবাবদিহিতা বৃদ্ধি: 

এটি সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। 

সেবা প্রদান: 

এটি সরাসরি সেবা প্রদানে জড়িত থাকতে পারে এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারে। 

সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করা: 

এটি নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত তুলে ধরে এবং সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। 

মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা

সুশীল সমাজ নারী নির্যাতন, শিশু অধিকার লঙ্ঘন, মানব পাচার, বাল্যবিবাহ, জোরপূর্বক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব থাকে। বিভিন্ন আন্দোলন, গবেষণা, প্রচারণা ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে তারা মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে। দুর্বল জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গণতন্ত্র শক্তিশালী করা

গণতন্ত্রকে গতিশীল রাখতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা জরুরি। সুশীল সমাজ এসব অধিকার রক্ষায় জনমত গঠন করে, নির্বাচনী অনিয়ম তুলে ধরে এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চাপ প্রয়োগ করে। তারা গণতন্ত্রের অপরিহার্য সহায়ক শক্তি।

সরকারের ওপর নজরদারি

সুশীল সমাজ সরকার ও প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তারা প্রতিবাদ করে, প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং জনগণকে সচেতন করে তোলে। তাদের এই নজরদারি রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা বাড়ায় এবং কর্তৃপক্ষকে সতর্ক রাখে।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি

পরিবেশ দূষণ, নারী অধিকার, শিশুশ্রম, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি করে সুশীল সমাজ। তারা সেমিনার, ক্যাম্পেইন, সামাজিক আন্দোলন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সক্রিয় প্রচারণা চালায়। সচেতনতা বৃদ্ধিই সমাজ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

শিক্ষা উন্নয়নে ভূমিকা

সুশীল সমাজ শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং অবহেলিত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করে। তারা গ্রন্থাগার, কোচিং, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা, বৃত্তি সহায়তা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটায়। শিক্ষা-ভিত্তিক সমাজ গঠনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাংস্কৃতিক উন্নয়নে অবদান

নাটক, সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলার মাধ্যমে সুশীল সমাজ মানবিকতা, নৈতিকতা এবং স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটায়। তারা সাংস্কৃতিক চর্চাকে সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মননশীলতা বৃদ্ধি করে এবং সমাজকে সহনশীল ও প্রগতিশীল করে তোলে।

দুর্যোগে মানবিক সহায়তা

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি বা দুর্ঘটনার সময় সুশীল সমাজ ত্রাণ সংগ্রহ, খাদ্য বিতরণ, আশ্রয়দানের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে। তারা স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করে দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে।

পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন

নদী দুষণ, বন উজাড়, প্লাস্টিক দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সুশীল সমাজ আন্দোলন করে। তারা পরিবেশ আইন প্রয়োগে চাপ সৃষ্টি করে এবং মানুষকে পরিবেশ সচেতন হতে উৎসাহিত করে। টেকসই উন্নয়নের জন্য তাদের পরিবেশ রক্ষা প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।

নারী অধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা

সুশীল সমাজ নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা করাই তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

শিশু ও কিশোর অধিকার রক্ষা

শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ইত্যাদির বিরুদ্ধে সুশীল সমাজ সোচ্চার থাকে। তারা উদ্ধার, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা এবং শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে। শিশুদের অধিকার রক্ষায় তাদের ভূমিকা ভবিষ্যৎ সমাজকে উন্নত করে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা

স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। সুশীল সমাজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে, সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকে। সত্য প্রকাশের মূল ভিত্তি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কমাতে সুশীল সমাজ গবেষণা করে, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে জনমত গঠন করে। দুর্নীতি প্রতিরোধ সমাজকে ন্যায়ভিত্তিক করে তোলে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।

উপসংহার:-

সুশীল সমাজ আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ। তারা ন্যায়বিচার, মানবিকতা, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে সমাজে সুশীল সমাজ সক্রিয়, সেই সমাজ অধিকতর সুশৃঙ্খল, মানবিক ও প্রগতিশীল। তাই একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্য সুশীল সমাজকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর হতে হবে। সুশীল সমাজ শুধু রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শক নয়, বরং সাধারণ মানুষের নৈতিক ও মানবিক আশ্রয়স্থল।

সুশীল সমাজ

Leave a Reply