You are currently viewing জীববৈচিত্র্য
জীববৈচিত্র্য

জীববৈচিত্র্য

জীববৈচিত্র্য হলো পৃথিবীর মাটি, জল ও বায়ুতে বসবাসকারী সমস্ত উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের মধ্যে থাকা জিনগত, প্রজাতিগত এবং পরিবেশগত বৈচিত্র্য। এটি পৃথিবীর জীবজগতের জৈবিক বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তনশীলতা, যা জিনগত বৈচিত্র্য, প্রজাতিগত বৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য — এই তিনটি স্তরে বিভক্ত। জীববৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

Table of Contents

READ MORE – পরিবেশদূষণ এবং বিশ্ব পরিস্থিতি PART – 5

জীববৈচিত্র্য-সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিভাগ কর।

উঃ – রিও-ডি-জেনেরিও-তে ‘Biological Diversity’ নামক সমাবেশে জীববৈচিত্র্যের একটি সার্বিক সংজ্ঞা উপস্থাপিত হয়। এই সংজ্ঞা অনুসারে, ‘যে-কোনো জলাভূমি কিংবা স্থলভূমির বাস্তুতন্ত্রে বা সবরকমের বাস্তুতন্ত্রের অঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন জীবের মধ্যে প্রজাতিগত, আন্তঃপ্রজাতিগত বা বাস্তুতন্ত্রগত দিকে যেরূপ বিভিন্নতা প্রকাশ পায়, তাকে জীববৈচিত্র্য বলে।’ WWF কর্তৃক প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে ‘নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত যেসব অগণিত ক্ষুদ্রজীব, উদ্ভিদ, প্রাণী সজীব পরিবেশ গড়ে তোলে, তাদের সমাহারকে জীববৈচিত্র্য বলে।’

বিজ্ঞানী W. C. Rosen 1985 খ্রিস্টাব্দে প্রথম ‘Biodiversity’ শব্দটির প্রবর্তন করেন।

∆ জীববৈচিত্র্যের শ্রেণিবিভাগ :- 

জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা থেকে এর যেরূপ ব্যাপক বিস্তৃতি লক্ষ করা যায় তাতে জীববৈচিত্র্যের শ্রেণিবিভাগের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা স্বাভাবিক। জীবের গঠনভিত্তিক চরিত্রের বিচারে জীববৈচিত্র্যকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন-① জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic diversity), ② প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species diverstiy) ও ৩) বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য

① জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity):

প্রতিটি জীবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি জিনগত ভিত্তি থাকে। এই কারণে জীবে-জীবে প্রভেদ কিংবা এক প্রজাতির সঙ্গে অন্য প্রজাতির পার্থক্যও লক্ষ করা যায়। সুতরাং, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে জিনগত ভিন্নতার কারণে যে বৈচিত্র্য দেখা যায় তাকে জিনগত বৈচিত্র্য বলে।

② প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity):

কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতিকে প্রজাতি বৈচিত্র্য বলে। কোনো বাস্তুতন্ত্রে অনেকরকম প্রজাতি একসঙ্গে কমিউনিটি (community) গঠন করে।

③ বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecological Diversity):

একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের প্রকারভেদকে বাস্তুতান্ত্রিক

বৈচিত্র্য বলে। বিভিন্ন প্রকার জীবসত্তা ও নানারকম অজৈব উপকরণ নিয়ে কোনো বাস্তুতন্ত্রের চরিত্র গঠিত হয়। জীব ব্যতিরেকে কোনো বাস্তুতন্ত্র হয় না বলে বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্নতাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য তিন প্রকারের হয়-

(i) আলফা বৈচিত্র্য (Alpha Diversity):

একটি অঞ্চলের বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীর মধ্যে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকে আলফা বৈচিত্র্য বলে। বিজ্ঞানী হুইটেকার আলফা সূচক বা আলফা বৈচিত্র্য শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। আলফা বৈচিত্র্য দ্বারা স্থলজ, জলজ, বায়বীয় বাসস্থলের প্রজাতির গড় সংখ্যা নির্ণয় করা হয়।

(ii ) বিটা বৈচিত্র্য (Beta Diversity):

একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের অন্যান্য সংলগ্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বাসস্থানের জীবগোষ্ঠীর মধ্যে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকে বিটা বৈচিত্র্য বলে। বিটা বৈচিত্র্য নির্ণয়ের সূত্রটি হল, B= ।

(iii) গামা বৈচিত্র্য (Gamma Diversity):

একটি বৃহৎ ভৌগোলিক অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত জীবপ্রজাতির সামগ্রিক বৈচিত্র্যকে গামা বৈচিত্র্য বলে। গামা বৈচিত্র্যের সাহায্যে কোনো বিশাল আয়তন ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রজাতির মোট সংখ্যা, স্বল্পতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা যায়।

জীববৈচিত্র্য অবলুপ্তির কারণ কি ?

উঃ – জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু নানা কারণে নানাভাবে জীববৈচিত্র্যের লোপ বা বিলুপ্তি ঘটছে। যেসব কারণে জীববৈচিত্র্যের হ্রাস ঘটছে, সেগুলি হল-

① আবাসস্থলের সংকোচন: –

জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল নানা কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে, গৃহনির্মাণ, শিল্পস্থাপন, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অন্যান্য প্রকল্প রূপায়ণ করতে গিয়ে জীবের আবাসস্থল বিশেষ করে বনাঞ্চল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বনভূমি হ্রাস হওয়ার ফলে বহু প্রাণী তাদের বাসস্থান হারিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে।

② অরণ্য ধ্বংস:

গৃহনির্মাণ, কলকারাখানা নির্মাণ, চাষবাস ইত্যাদির প্রয়োজনে মানুষ অরণ্য ধ্বংস করে চলেছে।

③ শিকার:- 

মানুষ অর্থের লোভে বা নিছক শিকারের আনন্দে পশুপাখি শিকার করে। এক সময়ে আমাদের দেশে হাজার হাজার বাঘ ছিল। বিনোদনের জন্য এদেরকে শিকার করা হত। এর ফলে আজ অনেক বন্যপ্রাণীই অবলুপ্তির মুখে। আফ্রিকা মহাদেশে চোরাশিকারিদের আক্রমণ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় হাতির দাঁতের লোভে প্রচুর পরিমাণ হাতি মেরে ফেলা হয়েছে। 83% আফ্রিকান গন্ডার বিলুপ্ত হয়েছে চোরাশিকারের ফলে। এ ছাড়া জীবিত ও মৃত প্রাণীর দেহাংশ, ছাল, দাঁত, মাংস, গন্ডারের শিং, বিদেশের বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে। প্রাণীহত্যার পাশাপাশি ভেষজ উদ্ভিদ, শাল, সেগুন, মেহগনি, চন্দন প্রভৃতি গাছের মূল্যবান কাঠও চোরাপথে বিদেশের বাজারে চালান করা হচ্ছে।

④ আগন্তুক প্রজাতি:- 

ঘটনাচক্রে বেশ কিছু আগন্তুক প্রজাতির অনুপ্রবেশের ফলে জীববৈচিত্র্যের লোপ ঘটে। এর একটি উদাহরণ হল অস্ট্রেলিয়ার খরগোশের অত্যধিক হারে সংখ্যা বৃদ্ধি। ফলে তৃণজাতীয় উদ্ভিদ ধ্বংসের মুখে এসে যায়।

⑤ দূষণ:- 

কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্যাপক হারে ছত্রাকনাশক ও পতঙ্গনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে যা থেকে বায়ুদূষণ, জলদূষণ ও মৃত্তিকাদূষণ ঘটছে। ফলে একদিকে যেমন কীটপতঙ্গ ধ্বংস হচ্ছে তেমনি তাদের খাদক প্রাণীরাও খাদ্যের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জলদূষণের ফলে জলে বসবাসকারী প্রাণীগুলিও বিলুপ্ত হচ্ছে।

⑥ প্রাকৃতিক বিপর্যয়:

বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যেমন-খরা, বন্যা, তুষারপাত, ভূমিকম্প, সুনামি ইত্যাদি কারণে জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটছে।

⑦ অবৈধ ব্যাবসা:

অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জনের অন্যতম উপায় বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদদের নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে অবৈধ ব্যাবসা। অসাধু ব্যবসায়ীদের অন্যতম কেন্দ্রভূমি হল-এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বনভূমি।

(a) এশিয়া মহাদেশের অবৈধ ব্যাবসা: –

এশিয়ার সুন্দাল্যান্ড হটস্পট, পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, শ্রীলঙ্কা, চিনের অরণ্য অঞ্চল থেকে অবৈধভাবে কোটি টাকার বনজ প্রাণী ও উদ্ভিদ কেনাবেচা হয়। ভারত থেকে রেডপান্ডা, একশৃঙ্গ গন্ডার, কেউটে সাপ প্রভৃতি শিকার করে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি করা হয়।

(b) আফ্রিকা মহাদেশের অবৈধ ব্যাবসা: –

অবৈধ ব্যাবসার অন্যতম ক্ষেত্র হল আফ্রিকা মহাদেশ। এই মহাদেশের আফ্রিকান হাতির দাঁতের জন্য হাতিহত্যা ও শিকারের পরিমাণ ক্রমোর্ধ্ব। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে গন্ডারও বিপুল পরিমাণে শিকার করা হয়। এই সকল পশুর দেহজ অংশ ইউরোপ মহাদেশে পাচার করা হয়।

জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা কি ?

উঃ – নীচে জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হল-

① কৃষিক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের প্রভাব:-

জীববৈচিত্র্যের তারতম্যের জন্য কৃষিজ ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা লক্ষ করা যায়। কৃষিজ বৈচিত্র্যতাকে দুটি প্রকারে ভাগ করা যায়- (a) অন্তঃসম্পর্কীয় বৈচিত্র্য, যেখানে একটিমাত্র প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়, উদাহরণস্বরূপ আলুর একটি প্রজাতি Solanum tuberosum-র ক্ষেত্রে আকার-আকৃতির বৈচিত্র্য দেখা যায়।

② খাদ্যের উৎস হিসেবে সবুজ উদ্ভিদ:

খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি জীব উৎপাদকের কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে পুষ্টিপদার্থ সংগ্রহ করে। বর্তমানে চাষযোগ্য মোট উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা প্রায় 2500। আমরা এদের থেকে খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও নানারকম প্রসাধন বস্তু ও ওষুধ সংগ্রহ করি। বর্তমান পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন উচ্চ ফলনশীল উদ্ভিদ প্রজাতির চাষের ওপর নির্ভরশীল।

③ জিন ভান্ডার হিসেবে:

জীববৈচিত্র্য আসলে নানারকম জিন সম্ভারের পরিচায়ক। জীবের এই জিন সম্ভার মানুষের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। বর্তমানে পছন্দসই জিন আহরণ করে অন্য জীবে প্রবেশ ঘটিয়ে ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ বা প্রাণী তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

④ ড্রাগ ও ওষুধের উৎস হিসেবে:

মানুষের রোগ-নিরাময় ও স্বাস্থ্যরক্ষায় ভেষজ উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম। মরফিন, কুইনাইন, ট্যাক্সল (Taxus baccata উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত Cancer-বিরোধী পদার্থ) প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ড্রাগ আমরা উদ্ভিদ থেকে পাই।

⑤ জীববৈচিত্র্য এবং মানবস্বাস্থ্য:

মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্যের তারতম্যের সঙ্গে বিশেষ ভাবে সম্পর্কিত, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এটি বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্যরূপে গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বৈচিত্র্য, দুর্যোগের মাত্রা বা সম্ভাবনা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা মানবস্বাস্থ্য উন্নতি ও পরিবেশ রক্ষার সহায়ক।

⑥ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়:

বাস্তুতন্ত্রে জীব সম্প্রদায় পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে বসবাস করে। কোনো একটি উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ হল খাদ্যশৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটা এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া।

⑦ অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

জীববৈচিত্র্য একটি দেশের মূল্যবান সম্পদ ও সমৃদ্ধির পরিচায়ক। মূল্যবান উদ্ভিদ বা প্রাণীকে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হয়। জীবাণুদের কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিল্প গড়ে উঠেছে।

⑧ পরিবেশ রক্ষায়:

বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরিবেশ শীতল রাখতে, বৃষ্টিপাত ঘটাতে উদ্ভিদের অবদান অনস্বীকার্য। পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হল সবুজ ধ্বংস হওয়া।

জীববৈচিত্র্য

Leave a Reply