ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব ছিল ১৮৩০ সালের একটি তিন দিনের বিদ্রোহ, যা রাজা দশম চার্লসের রক্ষণশীল শাসনকে উৎখাত করে এবং তার চাচাতো ভাই লুই ফিলিপের অধীনে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। এই বিপ্লবটিকে ‘দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব’ বা ‘Trois Glorieuses’ নামেও ডাকা হয় এবং এর ফলে ফ্রান্সে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
Table of Contents
READ MORE – পেলোপনেসীয় যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লবের কারণগুলি আলোচনা করো। এই বিপ্লবের তাৎপর্য কী?

• ভূমিকা:-
১৮৩০ খ্রিঃ জুলাই মাসে চরম স্বৈরাচারী ফরাসী সম্রাট দশম চার্লসের জনস্বার্থ বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে ফ্রান্সে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়, তাহা সমসাময়িক যুগের ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। চার্লস সিংহাসনে বসে মেটারনিক তন্ত্রের অনুকরণে ফ্রান্সে রক্ষণশীল নীতি প্রয়োগ করে নিজের খেয়াল-খুশিমত স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। ফরাসী জনগণ এই রক্ষণশীল নীতির বিরুদ্ধে যে বিপ্লব সৃষ্টি করেন, তাহা ইউরোপের ইতিহাসে জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত।
• বিপ্লবের প্রারম্ভিক অবস্থা:-
১৭৮৯ খ্রিঃ ফরাসী বিপ্লবের পর ১৮০৪ খ্রিঃ নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফরাসী সম্রাট হিসাবে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। ১৮১৪ খ্রিঃ ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর প্যারিসের দ্বিতীয় সন্ধি অনুসারে অষ্টাদশ লুই ফ্রান্সের সিংহাসনে অভিষিক্ত হন।
• মধ্যপন্থা নীতি গ্রহণ:-
অষ্টাদশ লুই ছিলেন বুরবোঁ বংশধর এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তি। সিংহাসনে বসেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্রজাদের অবজ্ঞা করে শাসন চালাবার দিন শেষ হয়ে গেছে। এজন্য তিনি ফরাসী বিপ্লবের পূর্ব ও পরের ন্যায় নীতিকে একত্রে অনুসরণ করে একটি মধ্যপন্থা নীতি গ্রহন করেন।
• ভিলেলের হাতে ক্ষমতা অর্পন:-
কিছু দিনের মধ্যেই উগ্র রাজতন্ত্রী দল এই শাসন-ব্যবস্থার বিরোধীতা করায় লুই প্রবর্তিত মধ্যপন্থা নীতিতে ভাটা পড়ে। এই উগ্র রাজতন্ত্রী দল উদারপন্থীদের উপর শ্বেত সন্ত্রাস চালাতে থাকায় ফ্রান্স বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যায়। এই সময় গৃহ যুদ্ধের আশঙ্কায় ভীত হয়ে অষ্টাদশ লুই তাঁর নীতিকে পরিচালনার দায়িত্ব মন্ত্রী ভিলেলের হাতে অর্পন করেন।
• নতুন বিপ্লবের সংকেত:-
ইতিমধ্যে অষ্টাদশ লুই এর মৃত্যু হলে তাঁর মধ্যপন্থা নীতি ব্যর্থ হয়। এর ফলে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ায় ফরাসী জনমনে ফরাসী বিপ্লবের পরিপূরক আর একটি বিপ্লবের সংকেত দেখা দেয়।

• দশম চার্লসের সিংহাসন লাভ:-
দশম চার্লস ছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল এবং দৈব বিশ্বাসী। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অষ্টাদশ লুই-এর মধ্যপন্থা নীতি ত্যাগ করে পুরাতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা। ফলে স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি নিজের খেয়াল-খুশিমত স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করলে ১৮৩০ খ্রিঃ জুলাই মাসে এই স্বৈরতন্ত্রের প্রতিবাদে জুলাই বিপ্লব দেখা দেয়।
∆ বিপ্লবের প্রধান কারণ:-
• ধনতান্ত্রিকতার সৃষ্টি:-
দশম চার্লস অভিজাত শ্রেণির লুপ্ত ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি আইন প্রতিষ্ঠা করেন। বিপ্লবের সময় দেশ-ত্যাগী অভিজাতদের বাজেয়াপ্ত জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রত্যেককে এক হাজার মিলিয়ন ফ্রাঁ প্রদান করেন। বুর্জোয়া শ্রেণিকেও সুদ-সহ ঋনের টাকা শোধ করেন। এর ফলে দেশে ধনতান্ত্রিকতা প্রশয় পায় এবং গরীব শ্রেনিকে নির্যাতন করা হয়।
• যাজকগণের প্রতিষ্ঠা:-
ন্যায়-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা প্রভৃতি সকল ব্যাপারে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত ধর্ম-যাজকদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। চার্চের বিরুদ্ধে সমালোচনার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে ধর্মীয় কু-সংস্কারে দেশ ছেয়ে যাওয়ায় শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনী অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে।

• পলিকন্যাকের প্রধানমন্ত্রিত্ব পদ গ্রহণ:-
চার্লস এর সাথে ভিলেলের বিরাগ-ভাজন হওয়ায় তাঁর পরিবর্তে এক সময় নেপোলিয়নের সাথে বিশ্বাস-ঘাতকতা করে যিনি দেশদ্রোহিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, সেই পলিকন্যাককে যথোপযুক্ত উপটৌকন সহকারে দশম চার্লস প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করলে জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়।
• চার্লসের ফার্মান জারি:-
স্বৈরতন্ত্রকে দৃঢ়মূলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জনগনের সংগ্রামকে দমন করতে তিনি জরুরী চারটি ফার্মান জারি করেন। এগুলি হল- ক) তৎকালীন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সে প্রতিনিধিসভার কোনো প্রয়োজন নেই, এই সাথে তিনি আইন-সভা ভেঙে দেন, খ) সম্পত্তির মালিককেই কেবল নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার দেওয়া হয়, গ) সংবাদ পত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয় এবং ঘ) নতুন নির্বাচনের আদেশ দেওয়া হয়।
• জুলাই বিপ্লবের সূচনা:-
জুলাই ফার্মান জারি হবার সাথে সাথে সমগ্র ফ্রান্সে বিক্ষোভ দেখা দেয়। ফ্রান্সে স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসার আশঙ্কায় এই ফার্মানের বিরুদ্ধে উদারপন্থী ও প্রজাতন্ত্রী দলগুলি বিদ্রোহ ঘোষনা করে। সরকারী সেনাদলও এই বিদ্রোহে যোগ দেয়। এই অবস্থায় বিদ্রোহকে দমন করতে না পেরে চার্লস সিংহাসন ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে আশ্রয়ের জন্য যাত্রা করেন।
এই সকল উপরিউক্ত কারনে দশম চার্লসের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব দেখা দেয়।
∆ জুলাই বিপ্লবের ফলাফল বা গুরুত্ব:-

• বুরবোঁ বংশের পতন:-
এই বিপ্লবের ফলে একভাবে চলে আসা বুরবোঁ রাজ বংশের চিরতরে পতন হয়। সেই স্কুলে অর্লিয়েন্স বংশের লুই ফিলিপ সিংহাসন আরোহন করেন।
• সার্মভৌমত্ব নীতি প্রতিষ্ঠা:-
ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লবের ফলে ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ন্যায্য অধিকারের পরিবর্তে পার্লামেন্ট নির্বাচিত সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পত্তন এবং রাজার ক্ষমতাকে সীতিত করা হয়। ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতার পরিবর্তে সার্বভৌম নীতি গ্রহন, করে রাজা জনগণের শাসক রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।
• গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা:-
এই বিপ্লবের ফলে সামন্ত অভিজাত শ্রেনির ক্ষমতা লোপ করা হয়। সেই সাথে শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থায় ধর্ম-যাজকদের প্রাধান্য হ্রাস করা হয়। সংবাদ-পত্রকে নিয়ন্ত্রনমুক্ত করা হয় এবং স্বাধীন চিন্তা ও মতামত প্রকাশের অধিকারকে ফিরিয়ে আনা হয়। এভাবে ফ্রান্সে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
• ফ্রান্সের বাইরে প্রভাব:-
তৎকালীন যুগে ফ্রান্সে সর্দি হলে সমগ্র ইউরোপে হাঁচি আরম্ভহয়ে যেত। সেই কারনে ফ্রান্সের জুলাই বিপ্লবের প্রভাব সমগ্র ইউরোপে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বেলজিয়াম গভীর জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে হল্যান্ডের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। এছাড়া ইতালী, পোল্যান্ড, জার্মানী প্রভৃতি দেশ স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ ঘোষনা করে।
• মূল্যায়ন:-
জুলাই বিপ্লব সম্পূর্ন হতে পারে নি। ফ্রান্সে এই বিপ্লবের ফলে মধ্যবিত্ত ধনী বুর্জোয়া শ্রেনী বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও সরকারী ক্ষমতা লাভ করে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেনী বিপ্লবের পরবর্তী শাসন ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট হয়। সেজন্য সম্পূর্ন উদারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ফ্রান্সে আর একটি বিপ্লবের প্রয়োজন হয়। দেখা দেয় ১৮৪৮ সালে ফ্রেব্রুয়ারী বিপ্লব। তবুও বলা যায়, জুলাই বিপ্লব সমগ্র ইউরোপে একটি নতুন ধ্যান-ধারনা প্রতিষ্ঠা করে।