পেলোপনেসীয় যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল – পেলোপোনেশীয় যুদ্ধের মূল কারণ ছিল স্পার্টা এবং এথেন্সের মধ্যে ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এথেন্সের সাম্রাজ্যবাদ এবং স্পার্টার ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের ভয়। এর ফলাফলে স্পার্টা বিজয়ী হয় এবং গ্রিসের ক্ষমতা এথেন্স থেকে স্পার্টার কাছে স্থানান্তরিত হয়, তবে যুদ্ধ গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করে দেয় এবং অনেক সম্পদ ও মানুষের ক্ষতি হয়।
Table of Contents
READ MORE – মৌর্য শাসনব্যবস্থার বিবরণ
পেলোপনেসীয় যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
উত্তর:-
এথেন্স ও তার মিত্ররাষ্ট্রগুলি এবং স্পার্টা ও তার মিত্ররাষ্ট্রগুলির মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১-৪০৪ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত সাময়িক বিরতিসহ সুদীর্ঘ সাতাশ বছর ব্যাপী যে যুদ্ধ হয়েছিল ইতিহাসে তা পেলোপনেসীয় যুদ্ধ নামে খ্যাত। পেলোপানেসীয় যুদ্ধের কারণ নির্ণয় করা আজও মত পোষণ করেছেন। ঐতিহাসিক থুকিডাইডিসের রচনা থেকে পেলোপনেসীয় যুদ্ধের দুটি কারণ জানা যায়। যথা- (১) মূল কারণ, (২) তাৎক্ষণিক কারণ।

• মূল কারণ:-
পেলোপনেসীয় যুদ্ধের মূল কারণগুলি হল-
(১) স্পার্টার ঈর্ষা:-
ঐতিহাসিক থুকিডাইডিসের মতে, “এথেন্সের ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধিতে আশাঙ্কিত হয়েই ল্যাকিডেমোনীয়রা যুদ্ধ সৃষ্টিতে বাধ্য হয়েছিল।” এথেন্সের প্রতি স্পার্টার যে বিদ্বেষ, তার সঙ্গে স্পার্টার মান-সম্মানের প্রশ্নও জড়িত ছিল। সামরিক শক্তি সামর্থ্যের জন্যই পারসিক যুদ্ধের সময় গ্রিকরা স্পার্টাকে নেতৃত্বভার স্বেচ্ছায় অর্পণ করেছিল। কিন্তু পারসিক যুদ্ধের পর আইওনীয়ান এথেন্স নৌশক্তি ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির দ্বারা স্পার্টাকে ওই নায়কপদ থেকে অপসারিত করে নিজেই সমগ্র গ্রিক জাতির নায়ক হয়ে বসল। সুতরাং এথেন্সের প্রতি স্পার্টার বিদ্বেষের অবধি রইল না।
(২) মেগারার অভিযোগ:-
এথেন্সের নিকট প্রতিবেশী মেগারার বাণিজ্য সমৃদ্ধি ও সম্পদ সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু এই সময় এথেন্স মেগারার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাতিল করে দিয়ে ঘোষণা করে যে, এথেনীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে মেগারার কোনো জিনিস ঢুকতে পারবে না। মেগারা স্বভাবতই ক্ষুদ্ধ হল এবং এথেন্সের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আকাঙ্খায় এথেন্স বিরোধী রাষ্ট্রসংঘে যোগ দিতে প্রস্তুত হল।
(৩) করিন্থের ইর্ষা:-
এথেন্স ও করিন্থের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেলোপনেসীয় যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যেহেতু আমদানিকৃত খাদ্যশস্যের উপর এথেন্সকে নির্ভর করতে হত, তাই বাণিজ্য ও বাণিজ্য পথের উপর একচেটিয়া আধিপত্য স্থাপন এথেন্সের মুখ্যনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাণিজ্যের ব্যাপারে করিন্থ ছিল এথেন্সের সবচেয়ে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী। এথেন্স যখন এশিয়া মাইনর ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বাণিজ্য বিস্তারে ব্যস্ত ছিল, করিন্থ তখন পশ্চিম দিকে করিন্থ উপসাগর অঞ্চলে ও সাইরাকিউজ অঞ্চলে অপ্রতিহত গতিতে বাণিজ্য বিস্তার করেছিল। এথেন্স যেমন করিন্থের শক্তি খর্ব করে নিজের প্রাধান্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখত, তেমনি করিন্থও ভাবত যে, এথেন্সের পতন ঘটাতে পারলে সারা গ্রিক দুনিয়া আর তার আশে পাশে সওদাগরী করার একচেটিয়া অধিকার সে পাবে। সুতরাং এথেন্সের শক্তিবৃদ্ধিতে করিন্থের ভীতি ও ঈর্ষা তাকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল।

(৪) এথেন্সের মিত্ররাষ্ট্রগুলির অসন্তোষ:-
মিত্ররাষ্ট্রগুলির পুঞ্জীভূত বিক্ষোভ এথেনীয় সাম্রাজ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পটভূমিকা তৈরি করেছিল, তা পেলোপনেসীয় যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল। পৌরস্বাতন্ত্র্য প্রিয় অধীনস্থ রাষ্ট্রগুলি থেকে যথেচ্ছভাবে কর আদায় করে, তাদের আভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে, তাদের উপর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে, নিজস্ব প্রয়োজনে তাদের অর্থ ও লোকবল অকাতরে নিয়োগ করে এথেন্স তার মিত্ররাষ্ট্রগুলিকে অত্যন্ত বিরুদ্ধভাবাপন্ন করে তুলেছিল।
• তাৎক্ষণিক কারণ:-
পেলোপনেসীয় যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণগুলি হল-
(১) করিন্থের বিরুদ্ধে এথেন্স কর্তৃক করকাইরাকে সাহায্য দান:-
করিন্থের করকাইরা ও পটিডিয়া-এই দুটি উপনিবেশ নিয়ে এথেন্সের সঙ্গে যে বিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল তারই পরিণতি ঘটল পেলোপনেসীয় যুদ্ধে। উপনিবেশ করকাইরার সঙ্গে করিখের নানা কারণে খুব একটা সম্ভাব ছিল না। করকাইরার নিজস্ব উপনিবেশ এপিডেমনাথে গণতান্ত্রিক দল অভিজাতদের বিতাড়িত করে শাসন ক্ষমতা দখল করে। ফলে অভিজাতরা করকাইরার কাছে সাহায্য চেয়েও না পেয়ে করিন্থের দারস্ত হয়। করিন্থ এপিডেমনাসের সাহায্যার্থে ৭৫টি জাহাজ পাঠায় কিন্তু করকাইরা ১২০টি জাহাজ নিয়ে তাদের পরাজিত করে দেয়। এথেন্সের উপস্থিতির জন্যই করিন্থ করকাইরার নৌশক্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি বলে তার এথেন্সের ওপর প্রতিশোধ নেবার আকাঙ্ক্ষা অত্যুগ্র হয়ে উঠল। থুকিডাইডিসের মতে, করিন্থের এই অভিযোগই হল পেলোপনেসীয় যুদ্ধারম্ভের প্রথম সূত্র।
(২) পটিডিয়ার ঘটনা:-
উত্তর গ্রিসে চ্যালসিডাইস অঞ্চলে অবস্থিত পটিডিয়া ছিল করিন্থের উপনিবেশ অথচ এথেন্সের এক করদ রাষ্ট্র। সিবোটার জল যুদ্ধের পর এথেন্স ও করিন্থের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হলে করিস্থিয়ান ম্যাজিস্ট্রেটগণ পটিডিয়াকে এথেন্সের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করল। এথেন্স পটিডিয়াকে হুকুম করল যে তার দক্ষিণ দিকের প্রাচীর ভেঙে ফেলতে আর করিন্থিয়ান ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ বন্ধ করতে। করিখের প্ররোচনায় পটিডিয়া এথেন্সের ওই হুকুম মানতে অস্বীকার করে এথেন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। যুদ্ধের মধ্যাংশে করিন্থ স্পার্টাকে এথেন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামিল করল। থুকিডাইডিসের ধারণা এই ঘটনা যুদ্ধারম্ভের দ্বিতীয় ঘটনা। অবশেষে স্পার্টা পেলোপনেসীয় লীগের এক সভায় এথেন্সকে পটিডিয়া থেকে অবরোধ তুলে দিতে বলল এবং ইজিয়ানকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিতে বলল। পেরিক্লিস স্পার্টার এই দাবীকে কর্ণপাত না করায় ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বে প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হল।
• মন্তব্য:-
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে পেলোপনেসীয় কোনো একটি কারণের জন্য ঘটেনি। বিভিন্ন কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই এই যুদ্ধ হয়েছিল। তবে থুকিডাইডিসের মতে, স্পার্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সৃষ্টির জন্য এথেন্সেই দায়ী। আবার ঐতিহাসিক নিসেন এথেন্সের নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণকেই এই যুদ্ধের মূল কারণ বলে মনে করেন।

∆ পেলোপনেশীয় যুদ্ধের ফলাফল:-
এথেন্সের পতন এবং সমস্ত গ্রীক নগর-রাজ্যের দুর্বলতার ফলে তারা শেষ পর্যন্ত ম্যাসিডোনদের বিজয়ের ঝুঁকিতে পড়েছিল। এর কারণ ছিল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত চাপ এবং গ্রীক ঐক্যের ভাঙ্গন, যদিও স্পার্টা অল্প সময়ের জন্য আধিপত্য অর্জন করেছিল। যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও ছিল, যা গ্রীস জুড়ে শিল্প, দর্শন এবং রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটায়।
ক) রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব :-
I) এথেন্সের পতন:-
এথেন্স তার নৌ ও রাজনৈতিক আধিপত্য হারায় এবং এর শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যদিও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়নি।
II) স্পার্টান আধিপত্য:-
স্পার্টা গ্রীসে সংক্ষিপ্তভাবে প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠে, কিন্তু এটি বিভিন্ন নগর-রাজ্যকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয়, যার ফলে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।
III) ম্যাসিডোনের উত্থান:-
গ্রীক নগর-রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং দুর্বল অবস্থা দ্বিতীয় ফিলিপের অধীনে ম্যাসিডোনিয়ানদের জন্য গ্রীস জয় এবং একত্রিত করার সুযোগ তৈরি করে।
IV ) ঐক্যের ক্ষয়: –
যুদ্ধ প্যানহেলেনিজম (গ্রীক ঐক্য) এর অনুভূতিকে ভেঙে দেয় এবং নগর-রাজ্যগুলির মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।
খ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব :-
I) অর্থনৈতিক দুর্দশা:-
যুদ্ধের ফলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয় এবং এথেন্সে ঐতিহ্যবাহী হপলাইট শ্রেণীর পতন ঘটে।
II ) জনসংখ্যার পরিবর্তন:-
যুদ্ধ, রোগ (যেমন এথেন্সে প্লেগ), এবং অর্থনৈতিক দুর্দশার ফলে অনেক নগর-রাজ্যে জনসংখ্যা হ্রাস এবং দেশত্যাগ ঘটে।
III) বর্ধিত ভাড়াটে সৈনিক:-
ভাড়াটে সৈনিকদের ব্যবহার আরও সাধারণ হয়ে ওঠে, যা যুদ্ধ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের প্রকৃতি পরিবর্তন করে।

গ) সাংস্কৃতিক প্রভাব :-
I) শিল্পে পরিবর্তন:
গ্রীক শিল্প যুক্তিবাদের উপর তার পূর্বের জোর থেকে সরে আসে এবং কিছু শিল্পী সেই সময়ের উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা প্রতিফলিত করার জন্য মানব রূপের মানসিক এবং শারীরিক দিকগুলিতে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে শুরু করে।
II ) দার্শনিক বিকাশ:-
যুদ্ধ দার্শনিক বিকাশকে উৎসাহিত করে, সক্রেটিসের মতো চিন্তাবিদরা মহাজাগতিক প্রশ্ন থেকে মানব নীতিশাস্ত্র এবং নৈতিকতার দিকে মনোনিবেশ করেন।
III) পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি:-
যুদ্ধের ফলে মৃত্যু সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়, এটিকে একটি সাধারণ ট্র্যাজেডি হিসাবে কম এবং জীবনের একটি অনিবার্য অংশ হিসাবে বেশি দেখা হয়, যা সাহিত্য এবং নাটকে প্রতিফলিত হয়।