মানুষের বিকাশ ও বিবর্তন

মানুষের বিকাশ ও বিবর্তন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বানরের মতো পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই বিবর্তনের ফলে মানুষের দ্বিপদতা, উন্নত মস্তিষ্ক, এবং জটিল ভাষা ব্যবহারের মতো বৈশিষ্ট্যগুলো বিকশিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় অনেক প্রজাতি যেমন Australopithecus, Homo habilis, Homo erectus, এবং Homo neanderthalensis পরিবর্তিত হয়ে অবশেষে আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়েছে।

READ MORE – ষোড়শ মহাজনপদ

মানুষের বিকাশ ও বিবর্তন

মানুষের বিকাশ ও বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

উত্তর:-

পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব এক বিস্ময়কর ঘটনা। পৃথিবীর কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছিল তা সঠিকভাবে অনুসন্ধান খুবই কষ্টদায়ক। তবে ভূ-তাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণাদির সাহায্যে একথা জানা গেছে যে, পৃথিবীতে আদি প্রাণ ছিল এককোষী জীব। কালক্রমে এই এককোষী জীবন ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে বহুকোষী জীবে রূপান্তরিত হল। বহুযুগের এই দীর্ঘকাল ব্যাপী পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হল মানুষ। পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব বিষয়ে সম্যক জ্ঞানলাভকরতে হলে আমাদের ভূতাত্ত্বিক এবং প্রত্নজীববিদ্যা বিশারদদের প্রত্যক্ষ সাহায্য নিতে হয়।

           প্রাণীতত্ত্ববিদ, নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্মতাত্ত্বিকগণ মানবপ্রজাতির পূর্বপুরুষদের সন্ধানের পর্যায়গুলিকে মোটামুটি ভাবে তিনভাগে ভাগ করেছেন: A. সিমিয়ান: বানরসদৃশ B. হোমিনিড: বন-মানুষ বা এপ্ ম্যান C. হোমো স্যাপিয়েন্স: মানুষ

A. সিমিয়ান:-

প্রথম স্তরে বানরসদৃশ জন্তু। বিশেষ করে গরিলা, শিম্পাঞ্জী ও ওরাংওটাং-এর উদ্ভব ঘটে। এরা চতুষ্পদ জন্তু, সম্পূর্ণ খাড়া হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করত না। এদের মাথার খুলি ছিল পিছনের দিকে প্রলম্বিত এবং মগজের পরিমাণ ছিল স্বল্প। তাদের হাতের ব্যবহারই ছিল প্রধান। কারণ বৃক্ষসম্বন্ধীয় স্তরে এই প্রজাতির জন্তুরা তাদের দীর্ঘ হাতের সাহায্যে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফ দিয়ে যেতে পারত। এই প্রজাতির জন্তুদের বলা হত সিমিয়ান।

B. হোমিনিড:-

দ্বিতীয় স্তরে আবির্ভূত হয় বনমানুষ বা এপ্ ম্যান যা অ্যানথ্রপয়েড নামেও পরিচিত। এই বনমানুষের প্রজাতিকে হোমিনিডও বলা হয়ে থাকে। তাদের ছুঁচালো মুখ, মাথার পশ্চাতে প্রলম্বিত খুলি এবং স্বল্প মগজ থাকলেও মুখ ও হাতের ব্যবহার এবং মেরুদণ্ডের সোজা অবস্থানের দিক থেকে প্রথম স্তর অপেক্ষা দ্বিতীয় স্তরে মানুষের আবির্ভাবের জন্মকথা লুকিয়ে আছে।

C. হোমো স্যাপিয়েন্স:-

তৃতীয় স্তরে মানুষের আবির্ভাব ঘটে। উন্নত মস্তিষ্কের গঠন ও পর্যাপ্ত মগজের পরিমাণ এবং হাতের ব্যবহারের জন্য মানবজাতি অন্যান্য হোমিনিড থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। প্রাণীকুলের বংশাবলী তৈরি হয় বৃহৎ থেকে সংকীর্ণতার ভাগে। যেমন মানুষের শ্রেণী স্তন্যপায়ী (Mammal) বর্গ-প্রাইমেট (Primate) গোত্র-হোমিনিড, গণ-হোমো (Homo)। সম্পূর্ণ মানুষ স্যাপিয়েন্স প্রজাতিভুক্ত। এইভাবে মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয় হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo Sapiens)। লাতিন শব্দ ‘Homo’ অর্থাৎ মানুষ। আর ‘Sapiencs’ অর্থাৎ যে ভাবতে জানে বা বুদ্ধিসম্পন্ন।

             ‘হোমিনিড’ থেকে ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ প্রজাতির মানবসন্তানের আবির্ভাব ঘটেছিল, শতসহস্র বছরব্যাপী প্রাণীজগতের বিবর্তনের মাধ্যমে।

A. প্রথম মানবসদৃশ এপ্ এবং হোমিনিড:-

ক্রমবিকাশের পথে মানুষের সাথে ও সম্পর্ক তৈরি করা যায় কিছু প্রাইমেটের বৃক্ষবাসী প্রাইমেটদের। ফসিল বা জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে আফ্রিকার কেনিয়া ও ভারত উপ-মহাদেশে।

• ড্রায়োপিথেকাস:-

মানুষের আরো কাছাকাছি মনে করা হয় ড্রায়োপিথেকাসের ধারাটিকে। গিবনের মতোই এরা আধা-সোজা হয়ে দাঁড়াত এবং হাত দিয়ে ঝুলত গাছের ডালে। ১৮৫৬ সালে ফ্রান্সে ড্রায়োপিথেকাসের জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া গেছে। ক্রমে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে এদের দেহাবশেষ পাওয়া যায়।

• হোমো হ্যাবিলিস:-

কেনিয়ার কুবিফোরা এবং ওলডুভাই গিরিখাত থেকে কিছু হোমিনিড জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৬৪ সালে নৃবিজ্ঞানী লুই লিকি, ফিলিপটোবায়াস ও জন নেপিয়ার এই হোমো হ্যাবিলিস প্রজাতি সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশ করেন। ল্যাটিন ভাষায় ‘হ্যাবিলিস’ শব্দের অর্থ হল ‘দক্ষ’ বা Skilful। হোমো হ্যাবিলিসরা দক্ষ শিকারি ছিল এবং এরা আয়ুধ বা হাতিয়ার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। অস্ত্র ছুঁড়তে এরা হাত ও আঙুল-এর ব্যবহার করত।

B. হোমো ইরেকটাদের আবির্ভাব:-

প্রাক্-মানব গোষ্ঠীর অভিব্যক্তির ধারায় কোনো একটি প্রাণী বিশেষভাবে উন্নত হয়ে প্রথম মানুষ হোমো ইরেকটাসের জন্ম দিয়েছিল। অস্ট্রালোপিথেকাস এবং হ্যাবিলিস গোষ্ঠী অন্তর্হিত হতে থাকলে তার জায়গায় স্থান করে নিল এই হোমো ইরেকটাসের দল-এরা পূর্ণভাবে ঋজু ভঙ্গিমার অধিকারী হয়েছিল। যবদ্বীপের ত্রিনিল এবং চীনের চৌকৌতিয়েন হোমো ইরেকটাস সংক্রান্ত জীবাশ্ম আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। এরা প্রস্তরায়ুধ (পাথরের অস্ত্র) তৈরিতে মনোনিবেশ করেছিল। হোমো ইরেকসটাসরা তৈরি হাতিয়ারের সাহায্যে দক্ষ শিকারি হতে পেরেছিল। এরা ছোটো ছোটো দলে বাস করত এবং জন্তু-জানোয়ারের পেছনে ছুটে শিকার করত। মাঝে মাঝে শিকার শিবির গঠন করেও ভালো শিকারের জন্য অপেক্ষা করত। ক্লার্ক হাউওয়েল আবিষ্কৃত আমব্রোনের হোমো ইরেকটাসদের শিকার শিবিরের নিদর্শনটি খুবই উল্লেখযোগ্য।

• হোমো ইরেক্টাস বা জাভা মানব:-

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত যবদ্বীপের সোলো নদীর তীরে অবস্থিত ত্রিনিল গ্রামের কাছে প্রাচীন মানবের কয়েকটি প্রস্তরীভূত দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। ১৮৯০-৯১ সালে ইউজিন ডুবয় সর্বপ্রাচীন শিলাভূত বনমানুষের জীবাশ্মের সন্ধান পান। জাভামানব নামে খ্যাত এই আদিম আধা মানবের মাথার খুলি, কয়েকটি দাঁত এবং উরুর একটি হাড়ের অংশবিশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এই বিশেষ প্রজাতির মানবের নামকরণ করা হয় পিথেকানথ্রপাস ইরোস্। এরা ছিল সোজা ভাবে হাঁটতে সমর্থ এক বিশেষ প্রজাতির নরবানর।

C. নিয়ানডারথাল মানবগোষ্ঠীর উদ্ভব:-

জার্মানির ডুসেলডর্ফ জেলার নিয়ানডার নদী উপত্যকায় একটি চুনাপাথরের খাদের মধ্য হতে ১৮৫৬ সালে আদিমানবের একটি মাথার খুলি এবং কিছু দীর্ঘাস্থি আবিষ্কৃত হয়। উপত্যকার নামানুসারে এই আদি মানুষটির নাম দেওয়া হয়েছিল নিয়ানডারথাল মানুষ। এদের কঙ্কাল ফ্রান্স, বলকান অঞ্চল, জিব্রাল্টার, প্যালেস্টাইন-মোটকথা সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং পূর্ব আফ্রিকা, রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, এমনকি জাভাতেও পাওয়া গেছে। ১৮৬৪ সালে নৃবিজ্ঞানী কিং সর্বপ্রথম এর নামকরণের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন-একে বলা হয়েছিল হোমো নিয়ানডারথেলেনসিস্। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত সমগ্র নিয়ানডারথাল মানুষের নিদর্শনকে নৃবিজ্ঞানী হুটন দুটি প্রধান পর্যায়ে গোষ্ঠীভুক্ত করেছেন। এদের একটি হল রক্ষণশীল এবং অপরটি প্রগতিশীল।

D. আধুনিক মানুষের আগমন:-

পৃথিবীর বুকে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। হোমো ইরেকটাস এবং হোমো স্যাপিয়েন্স-মিশ্র লক্ষণ সংক্রান্ত কয়েকটি মানব জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। ইউরোপের মধ্য প্লিসটোসিন যুগে উদ্ভুত দুটি জীবাশ্ম- সোয়ানস্কাম্ব এবং স্টায়েনহায়েম এ বিষয়ে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

• সোয়ানস্কাম্ব:-

১৯৩০ সালে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের টেমস নদীর উপত্যকায় সোয়ানস্কাম্ব নামক গ্রামের সন্নিকটে একটি করোটি আবিষ্কৃত হয়।

• স্টায়েনহায়েম:-

১৯৩৩ সালে জার্মানির মূর নদীতীরের একটি গ্রাম স্টায়েনহায়েম থেকে একটি জীবাশ্ম মানব করোটি আবিষ্কৃত হয়েছিল।

              যাই হোক, সোয়ানস্কাম্ব এবং স্টায়েনহায়েম উভয়কেই আধুনিক মানুষের রূপান্তরকরণের পথে একটি আদিম প্রজাতির স্যাপিয়েন্সের বিশিষ্ট প্রতিনিধি বলে মনে করা হয়।

E. হোমো স্যাপিয়েন্সদের উদ্ভব:-

ক্রোম্যাগনন মানুষ পশ্চিম ইউরোপের মাটিতে আবির্ভূত হয়েছিল। একেই হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্সের সর্বপ্রথম প্রজাতির বলে মনে করা হত। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের প্রত্ন-জীবাশ্ম ও নৃতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেখা গেছে যে, ইউরোপের বাইরে আধুনিক মানুষের উদ্ভব ঘটেছিল অনেক পূর্বে। আফ্রিকায় উদ্ভূত হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাসিস রিভার মাউথ গুহা থেকে যে আধুনিক মানুষের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, সেটি অতি প্রাচীন। এছাড়া বর্ডার কেভ, ওথো প্রভৃতি স্থানে এই একই সময়ের আধুনিক মানুষের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছিল।

              সুতরাং বিবর্তনবাদীদের মতবাদ অনুযায়ী একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, বানর থেকে মানব এবং বনমানব থেকে প্রকৃত মানুষের উত্তরণ ঘটে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে মানুষের অভিব্যক্তি সম্পর্কে আমরা যতটুকু উপকরণ সংগ্রহ ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পেরেছি তাতে রামাপিথেকাস, অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো হ্যাবিলিস, হোমো ইরেকটাস, হোমা স্যাপিয়েন্স পর্যায়গুলিকে মোটামুটিভাবে পাশাপাশি রেখে আধুনিক মানুষের উদ্ভব বিষয়ে একটি অস্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারি।

মানুষের বিকাশ ও বিবর্তন

Leave a Reply