মধ্য প্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য – মধ্য প্রস্তর যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো ছোট পাথরের হাতিয়ার (মাইক্রোলিথ) ব্যবহার, আধা-স্থায়ী বসতি, এবং শিকার ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতা। এই সময়ে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসে, এবং তারা আগের যুগের তুলনায় উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে। এই যুগের মানুষ গুহা এবং কুঁড়েঘরের মতো আধা-স্থায়ী বাড়িতে থাকত, যেখানে গুহা ও কুঁড়েঘর উভয়েরই বৈশিষ্ট্য ছিল।
Table of Contents
READ MORE – ঐতিহ্য বলতে কী বোঝায়
মধ্য প্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো।

• মধ্যপ্রস্তর যুগের সংস্কৃতি:-
বরফ যুগের অবসানের পর মানুষ নতুনভাবে আবার প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্থাপন করে। তারা একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেয়। সভ্যতার ইতিহাসে এ যুগের সংস্কৃতি মধ্যপ্রস্তর যুগের সংস্কৃতি নামে পরিচিত। এ যুগের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা হল।
• খাদ্য সংস্কৃতি:-
মধ্যপ্রস্তর যুগের মানুষের প্রধান খাদ্য ছিল মাছ ও মাংস। এযুগের মানুষেরা সাগর উপকূলে বসবাস করত। তারা মাছ শিকারের জন্য একটি গাছকে মধ্যভাগে গোলাকার করে কেটে ‘ক্যানু’ (Conoe) তৈরি করত এবং বৈঠার সাহায্যে তারা হ্রদে মাছ শিকার করত। এযুগের মানুষ সমুদ্র ছাড়াও হ্রদ এবং নদীতে মিষ্টি জলের মাছ শিকার করত। শূকর ও নীল হরিণের মতো মাঝারি আকারের পশু তাদের শিকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তারা ফাঁদ পেতে বীবর, নেউল, শৃগাল, বনবিড়াল ইত্যাদি ছোটো পশু ধরত। জলচর পাখিও তাদের খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফ্লিন্টের কুঠার দিয়ে গাছ কেটে আগুন জ্বালানো হত। মাছ, মাংস পুড়িয়ে খাওয়া হত-কারণ এই যুগে রান্নার সরঞ্জাম, মৃৎপাত্র তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়নি। ভবিষ্যৎ খাবারের জন্য তারা সংগ্রহ করত শামুক। মাছের মধ্যে শীল, স্যামন, ট্রাউট ছিল খুব প্রিয়।
• বাসস্থান:-
মধ্যপ্রস্তর যুগে মানুষ গুহায় বসবাস না করলেও প্রচণ্ড শীতের মরশুমে সাময়িকভাবে গুহায় কিংবা মাটির নীচে গর্তে আশ্রয় নিত। তবে অন্যান্য ঋতুতে তারা হ্রদ বা জলাশয়ের তীরে খোলা সমতলভূমিতে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করত। তারা চার-পাঁচটি করে কুঁড়ে ঘর তৈরি করে পারিবারিক তথা সামাজিক পরিবেশ তৈরি করত। গম্বুজাকৃতি এই সমস্ত চালাঘরের নিদর্শন পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার ও ডেনমার্কে।
• যানবাহন:-
মধ্যপ্রস্তর যুগের মানুষ বরফের ওপর চলার জন্য স্কী বা স্লেজগাড়ি জাতীয় পুরানো কৌশল ব্যবহার করার পদ্ধতি জানত। গাছের গুঁড়ি কেটে নৌকো বানানোর কৌশল রপ্ত করেছিল তারা। স্লেজ গাড়ি জাতীয় (পুরান কৌশল) টানার জন্য মধ্য প্রস্তর যুগের মানুষেরা কুকুর ব্যবহার করত।

• পশুপালন:-
মধ্যপ্রস্তর যুগে প্রথম কুকুরকে গৃহপালিত করা হয়। তবে কুকুর তখনও শিকারে অংশ নিত না। গরু, মহিষ বা অন্য কোনো বন্য প্রাণীদের গৃহ পালিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের কৃষিকার্যে লাগানো হত না, কারণ কৃষিকাজ তখনও চালু হয়নি।
• অলঙ্কারের প্রচলন:-
ন: মধ্যপ্রস্তর এযুগের মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের মতো শৌখিন ছিল। তারা পশুর হাড় ও হরিণের শিং-এর তৈরি বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কার তৈরি করতে জানত। এছাড়া ঝিনুক এবং জন্তর দাঁত ব্যবহার করে তারা আকর্ষণীয় অলঙ্কার তৈরির কৌশল রপ্ত করেছিল।
• মৃতের সৎকার:-
মধ্যপ্রস্তর যুগে মৃতের সৎকার একটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়। আলজিরিয়া থেকে মধ্যপ্রস্তর যুগের মানুষের কয়েকটি মাথার খুলি আবিষ্কৃত হয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এগুলির বেশিরভাগই বিকৃত অবস্থায় সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ধারণা করা হয় যে তৎকালীন সমাজে হত্যাকে গৌরবজনক কর্মকাণ্ড বলে মনে করা হত। ব্যাভেরিয়ায় একটি গণকবর থেকে ৩৩টি মাথার খুলি পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ২৪টি মহিলার এবং ৯টি শিশুর। এদের নৃশংসভাবে হত্যা করে কবর দেওয়া হয়েছিল।

. মধ্যপ্রস্তর যুগের শিল্পকলা:-
মধ্যপ্রস্তর যুগের মানুষদের শিল্পকলার নিদর্শনও সীমাবদ্ধ ছিল কতিপয় রেখার মধ্যে। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ মনে করেন যে, এই সমস্ত শিল্পকলায় ‘গতানুগতিক মানব প্রকৃতিতে ঐশ্বরিক গুণাবলি আরোপ সম্পর্কিত নকশা’, প্রতিফলিত হয়েছে। এ ধরনের জ্যামিতিক নকশাবলিতে পুরুষ হরিণ-এর হাড়ে মানুষের প্রতিকৃতি রেখার মাধ্যমে খোদিত হয়েছে। ডেনমার্কে প্রাপ্ত এই শিল্পের নিদর্শন আদিম মানুষের শিল্পবোধের পরিচায়ক।
• চিত্রকলা:-
মধ্যপ্রস্তর যুগে চিত্রের উপজীব্য বিষয় ছিল তাদের দৈনন্দিন দ্রব্যসামগ্রী ও হাতিয়ার। মৎস্য শিকারের বিভিন্ন হাতিয়ার ও হরিণের মাথার শিং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ যুগের চিত্রকররা জ্যামিতিক নকশার ঢঙে ত্রিকোণ, চতুষ্কোণ, বৃত্তাকার ইত্যাদি আঙ্গিকে তাদের চিত্রাঙ্কন করেছিলেন। এ যুগের শিল্পীরা মানুষ ও পশুর মূর্ত চিত্রও গুহার দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলতেন। ইউরোপে পীতাভ স্ফটিক পাথরের গায়ে শূকরের চিত্র পাওয়া গেছে। এর গা অলঙ্কৃত করা হয়েছে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা এঁকে। সুইডেনে প্রাপ্ত কিছু মাছের আকৃতির ছবিতে জ্যামিতিক নকশা লক্ষ করা যায়।
. মধ্যপ্রস্তর যুগের হাতিয়ার সংস্কৃতি:-
বাস্তব প্রয়োজনে মধ্যপ্রস্তর যুগের মানুষ বেশকিছু হাতিয়ার বা অস্ত্র (Tool) বা আয়ুধ ব্যবহার করত। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই মধ্যপ্রস্তর যুগের মানুষের হাতিয়ার ব্যবহারে কিছুটা পরিবর্তন আসে।
এই যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শিকারের জন্য সর্বপ্রথম তির ও ধনুকের ব্যবহার। উত্তর ইউরোপে তির ও ধনুকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছিল বলে ধরা হয়। হাত দিয়ে তির বা বর্শা নিক্ষেপ না করে নিপুণ হাতে শিকারি ধনুক ব্যবহার করে তির দিয়ে অব্যর্থ লক্ষ্যে শিকার বধ করত।

• মাইক্রোলিথ:-
মধ্যপ্রস্তর যুগের আয়ুধ সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল মাইক্রোলিথ বা ক্ষুদ্রাকার পাথরের হাতিয়ারের অস্তিত্ব। ফ্রান্সের কুইবেকন উপদ্বীপের টেভিস দ্বীপে প্রাপ্ত ছুঁচালো পাথরের তৈরি তিরের ফলা ব্যবহার করে শিকার করা হত। পশুর ছাল ছাড়ানোর জন্য ম্যাগলেমোসিয়ান নামক এক গোষ্ঠী এক ধরনের ধারালো পাথর ব্যবহার করত। এই ম্যাগলেমোসিয়ান গোষ্ঠী পূর্ব বাল্টিক রাষ্ট্রে বসবাস করত এবং তারা হ্রদের নিকটবর্তী স্থানে বসতি স্থাপন করেছিল। সমগ্র ইউরোপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর তীক্ষ্ণ করে হাপুনের ফলা তৈরি করা হত।
মধ্যপ্রস্তর যুগের শেষ দিকে বড়শি ও হাপুনের ফলা তৈরি করা হত। পাথরের পাশাপাশি হরিণের শিং ও পশুর হাড় দিয়ে শিকারিরা নানা ধরনের হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। যেমন-হাড়ের ছুঁচালো মাথা, ত্রিকোনাকার পাথরের ফলা বা তির, খাঁজকাটা শিং ইত্যাদি। তাদের শিকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল লাল হরিণ ও বন্য শূকর। এযুগে মৎস্য শিকার যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল বলে প্রচুর বড়শি, চাঁই, টানা জাল, নৌকা ও বৈঠার সন্ধান পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রস্তর যুগে মানুষ তাদের অস্ত্রের হাতল হিসাবে কাঠের ব্যবহার করেছিল।
• বিভিন্ন হাতিয়ার:-
হাতিয়ার নির্মাণে মধ্যপ্রস্তর যুগের মানবগোষ্ঠী বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কাঠের বিভিন্ন উপকরণ যেমন-হাতল ও ধনুকের ব্যবহার করত তারা। ডোঙ্গাজাতীয় কাঠের নৌকা তৈরি করেছিল। খোদাইকরা কাঠের নিক্ষেপক এবং ভোঁতা পাথরের তির তারা ব্যবহার করত। মধ্যপ্রস্তর যুগে যে সমস্ত যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-বিভিন্ন ধরনের কুঠার, খাঁজকাটা বর্শা, ছাল ছাড়াবার যন্ত্র, মাছ ধরার বড়শি, সূচ, তুরপুন ইত্যাদি। হরিণের শিং ও হাড়ের সঙ্গে পাথরের সংযোগে প্রস্তুত কাঠ কাটার কুঠার মধ্যপ্রস্তর যুগের প্রযুক্তির একটি অভিনব পন্থা।