সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি হলো একটি বিল সংসদের উভয় কক্ষে (লোকসভা এবং রাজ্যসভা) উত্থাপন করা, যেখানে একটি বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (সাধারণত দুই-তৃতীয়াংশ) প্রয়োজন হয়। সংশোধনের জন্য প্রস্তাবটি সংসদে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির প্রয়োজন হয়। সংশোধনের পদ্ধতিটি সাধারণত সাধারণ আইন পাসের প্রক্রিয়ার চেয়ে কঠোর হয় এবং এর মধ্যে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন অন্তর্ভুক্ত থাকে।
Table of Contents
READ MORE – দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা
সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি
সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে দেশের সংবিধানে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন করা যায়। সংবিধান একটি রাষ্ট্রের মৌলিক আইন, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। তাই সংবিধানকে যুগোপযোগী রাখার জন্য সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ভারতের সংবিধান রচয়িতারা এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদে সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন।

ভারতের সংবিধান সংশোধনের তিনটি ধারা রয়েছে—একটি সহজ পদ্ধতি, একটি বিশেষ পদ্ধতি, এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতির সঙ্গে রাজ্য বিধানসভার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সহজ পদ্ধতিতে কিছু ধারায় পরিবর্তন আনতে কেবল সংসদের উভয় কক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংশোধন করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সংসদের কার্যপ্রণালী বা সংবিধানের কিছু তুচ্ছ প্রশাসনিক ধারা এইভাবে সংশোধিত হতে পারে।
বিশেষ পদ্ধতিতে সংশোধনের জন্য সংসদের উভয় কক্ষে মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পরেই সেই সংশোধন কার্যকর হয়। যেমন মৌলিক অধিকার, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ক্ষমতা বণ্টন, বিচারবিভাগের গঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রযোজ্য।
সংবিধান সংশোধনের গুরুত্ব :-
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি উইলসন (Wilson) বলেছেন, সংবিধান হল জাতীয় জীবনের একটি লিখিত দলিল। বিশেষ সময়ে সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি তৈরি হয়। কিন্তু সমাজ এক জায়গায় থেমে থাকে না। এর পরিবর্তন ঘটে। সময়ের এবং মানুষের চাহিদার পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে। তা যদি না করা হয়, তাহলে সেই সংবিধান যুগের প্রয়োজন মেটাতে পারবে না। ফলে সংবিধান মানুষের শ্রদ্ধা হারাবে। তাদের মনে ক্ষোভজমা হবে। তাই সব দেশেই সংবিধান সংশোধন করা হয়।
সংবিধান সংশোধন দুইভাবে হতে পারে। এটি খুব সহজে পরিবর্তন করা যায়। যে সংবিসংবিধান সংশোধন হতে পারে। খুব সহজে করা যায়। যে দিকে, যে সংবিধান সহজে পরিবর্তন করা যায় না অর্থাৎ পরিবর্তন করতে গেলে জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়, তাকে বলে দুষ্পরিবর্তনীয় বা অনমনীয় সংবিধান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয় হয়। অঙ্গরাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা স্বীকৃত হয়েছে।

ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি:-
ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র। তাই এই সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুষ্পরিবর্তনীয় নয়। কারণ, পণ্ডিত নেহরু গণপরিষদে বলেছিলেন, “সংবিধান খুব বেশি দুষ্পরিবর্তনীয় হলে, জাতির অগ্রগতি ব্যাহত হবে। আবার অতিমাত্রায় সুপরিবর্তনীয় হওয়া কাম্য নয়।” এই চিন্তাভাবনা মাথায় রেখে সংবিধান রচয়িতারা ৩৬৮ নং ধারায় সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিন ধরনের পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।
প্রথম পদ্ধতি:-
এই পদ্ধতি অনুসারে পার্লামেন্টের যে-কোনো কক্ষে সরকার অথবা যে-কোনো সদস্য কোনো সংশোধনী প্রস্তাব তুলতে পারে। প্রস্তাবটি উভয়কক্ষ পৃথকভাবে মোট সদস্যের অন্তত অর্ধেক এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ দ্বারা অনুমোদিত হওয়া দরকার। এইভাবে উভয়কক্ষ দ্বারা অনুমোদিত হবার পর সেটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে সংবিধান সংশোধন হবে। তবে এই পদ্ধতিতে সংশোধনের ক্ষেত্রে যদি উভয়কক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তখন বিলটি বাতিল হয়ে যাবে। মৌলিক অধিকার, নির্দেশমূলক নীতিগুলি সংশোধনের জন্যে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।
দ্বিতীয় পদ্ধতি:-
এই পদ্ধতি অনুসারে সংশোধনী প্রস্তাবটি প্রথম পদ্ধতি অনুসারে প্রথমে পার্লামেন্টের প্রতিটি কক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে হবে। তারপর সেই প্রস্তাবটি অন্তত অর্ধেক অঙ্গরাজ্যের আইনসভা দ্বারা অনুমোদিত হওয়া দরকার। অনুমোদিত হওয়ার পরে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে সংবিধানের সংশোধন হবে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন, সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের ক্ষমতার পরিবর্তন, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন প্রভৃতি বিষয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
তৃতীয় পদদ্ধতি:-
সংবিধানে এমন কতকগুলি ধারা আছে, যেগুলির সংশোধন অতি সহজেই করা যায়। তার জন্যে বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয় না। পার্লামেন্টে উভয় কক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে সংবিধান সংশোধন করা যায়। এখানে দুই-তৃতীয়াংশের বা অঙ্গরাজ্যের সমর্থনের প্রয়োজন নেই। নতুন রাজ্যের সৃষ্টি বা পুনর্গঠন, নাগরিকতা, বিধান পরিষদের সৃষ্টি বা বিলোপ, আইনসভার সদস্যদের বিশেষ অধিকার, ভাষা প্রভৃতির সংশোধনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।

নমনীয় ও অনমনীয় পদ্ধতির সংমিশ্রণ:-
ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এই পদ্ধতি নমনীয় ও অনমনীয় পদ্ধতির সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে। এই পদ্ধতি কিছুটা দুষ্পরিবর্তনীয়। কারণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন করতে গেলে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশের এবং অন্তত অর্ধেক অঙ্গরাজ্যের সমর্থন প্রয়োজন। তবে আমাদের সংশোধন পদ্ধতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুষ্পরিবর্তনীয় নয়। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধন করতে গেলে তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্যের অর্থাৎ ৩৮ টি অঙ্গরাজ্যের অনুমোদন লাগে।
অন্যদিকে ভারতের সংশোধন পদ্ধতি ব্রিটেনের মতো অতটা নমনীয় নয়। ব্রিটেনে যে-কোনো বিষয় সংশোধন করতে গেলে পার্লামেন্টের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন হলেই চলবে। কিন্তু আমাদের এখানে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। সেদিক থেকে বলা যায়, ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুষ্পরিবর্তনীয় নয়, আবার ব্রিটেনের মতো সুপরিবর্তনীয় নয়। অধ্যাপক কে. সি. হোয়ার (K.C. Wheare) সেই কারণে বলেছেন, “ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি উভয় দেশের সংশোধন পদ্ধতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে।”
সমালোচনা:-
সমালোচকরা বিভিন্নভাবে এই পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন-
প্রথমত:
ভারতের জনগণ সংবিধান তৈরি করেছে। প্রস্তাবনায় সে-কথা বলা হয়েছে। তাহলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে, সেই জনগণের সম্মতি দরকার। কিন্তু তার ব্যবস্থা করা হয়নি। তার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে রাজ্যের স্বার্থ বিপন্ন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত:
রাজ্যের আইনসভা কোনো সংশোধনী প্রস্তাব আনতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্য প্রস্তাব আনতে পারে। কিন্তু এখানে তা নেই।

তৃতীয়ত:
আমাদের সংশোধন পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রীয় আদর্শের বিরোধী। কারণ, কেন্দ্র ইচ্ছা করলে কোনো রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন করতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজ্যের সম্মতি নেবার দরকার হয় না।
মূল্যায়ন:-
সমালোচিত হলেও আমাদের সংশোধন পদ্ধতি প্রশংসার দাবি রাখে। সংবিধান খুব দুষ্পরিবর্তনীয় হলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না। আবার অতিমাত্রায় সুপরিবর্তনীয় হলে যখন-তখন খেয়ালখুশি মতো পরিবর্তন করবে। তাই উভয়ের সংমিশ্রণই কাম্য। ভারতের সংশোধন পদ্ধতি এই সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে বলে অধ্যাপক কে. সি. হোয়ার, দুর্গাদাস বসু প্রভৃতি বিশেষজ্ঞরা প্রশংসা করেছেন।
তবে অনেকে মনে করেন, পদ্ধতির কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন। সংশোধনের ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যকে কিছুটা অধিকার দিতে হবে। যেমন, রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন করতে গেলে তার সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন। রাজ্য যাতে সংশোধনী প্রস্তাব আনতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। তা ছাড়া, সংবিধানের যে-কোনো অংশের সংশোধন করা যাবে কিনা, এ ব্যাপারে সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা নেই। এমনকি সুপ্রিমকোর্টেও একমত হতে পারেনি। বিভিন্ন মামলায় পরস্পর-বিরোধী মন্তব্য করেছে। এ ব্যাপারে স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। তা নাহলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে।
ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও ভারসাম্যপূর্ণ। এটি একদিকে সংবিধানকে দৃঢ় ও স্থিতিশীল রাখে, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তনের সুযোগও দেয়। সহজ, বিশেষ ও যৌথ পদ্ধতির মাধ্যমে সংশোধনের ব্যবস্থা থাকায় সংবিধান অতি কঠোর বা অতি নমনীয় নয়। এর ফলে সংবিধান যুগের প্রয়োজনে অভিযোজিত হতে পারে, অথচ মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে। তবে অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থের কারণে কখনও কখনও সংশোধনের অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবুও সামগ্রিকভাবে এই পদ্ধতি ভারতের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও প্রগতিশীল রাখে।