কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র একটি প্রাচীন ভারতীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গ্রন্থ, যা মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি ও কূটনীতি বিষয়ক। এতে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসন বিষয়ক বিভিন্ন নীতি ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে কৌটিল্য পরিচিত হলেও, তিনি চাণক্য ও বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত। এর মূল উদ্দেশ্য হল কীভাবে একটি সফল এবং সমৃদ্ধ রাজ্য পরিচালনা করা যায়, তার একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা দেওয়া।
Table of Contents
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র
ক্ষুদ্র নিবন্ধ লেখো: কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও প্রাচীন ভারতে এর প্রভাব

• কৌটিল্য ও অর্থশাস্ত্র:-
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার একটি মূল্যবান ও প্রামাণ্য উপাদান। এই গ্রন্থ থেকে সমকালীন যুগের ভারতের সমাজ, অর্থনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতির বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায়।
রচনার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট:-
কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ রচিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, অর্থাৎ চন্দ্রগুপ্ত মौर্যের শাসনামলে (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ থেকে ৩০০ সালের মধ্যে)। এই সময় ভারতবর্ষ ছিল নানা ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত। বিদেশী আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ কলহ ও অরাজকতা দেশকে দুর্বল করে তুলেছিল। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। কৌটিল্য সেই সময়ে রাষ্ট্রসংগঠন, প্রশাসন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সুসংহত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন, যার ফলাফলই ‘অর্থশাস্ত্র’।
গ্রন্থের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য:-
‘অর্থশাস্ত্র’ মূলত রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এতে রাষ্ট্রজীবনের প্রায় সমস্ত দিকই আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজা ও প্রজার সম্পর্ক, প্রশাসনিক কাঠামো, আইন ও বিচার, গুপ্তচর ব্যবস্থা, করনীতি, যুদ্ধনীতি, কূটনীতি এবং বাণিজ্যব্যবস্থা। কৌটিল্য রাষ্ট্রকে দেখেছেন এক জীবন্ত অঙ্গ হিসেবে, যার প্রতিটি অঙ্গ — রাজা, মন্ত্রী, জনসাধারণ, ভূমি, সম্পদ ও সেনা — একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
অর্থশাস্ত্রের মূল ভাবনা:-
‘অর্থশাস্ত্র’-এর মূল ভাবনা হল রাষ্ট্র পরিচালনার বিজ্ঞান। কৌটিল্যের মতে, রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য প্রজাদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, “প্রজার সুখই রাজ্যের সুখ, প্রজার দুঃখই রাজ্যের দুঃখ।” এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর রাষ্ট্রনীতিকে অন্য সকল সমসাময়িক চিন্তাধারার থেকে আলাদা করেছে। তবে তিনি আদর্শবাদী নন, বরং বাস্তববাদী। তাঁর মতে, নীতি নির্ভর করবে সময়, স্থান ও পরিস্থিতির উপর। এজন্য তিনি কখনও কৌশল ও গোপন নীতির ব্যবহারের কথাও বলেছেন, যা আজকের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে “রিয়ালপলিটিক” নামে পরিচিত।

রাজা ও প্রশাসন ব্যবস্থা:-
কৌটিল্যের মতে, একজন আদর্শ রাজা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ন্যায়পরায়ণ, দূরদর্শী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও প্রজাহিতৈষী। রাজাকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রজার মঙ্গল চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেছেন, “রাজা যদি ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তবে পুরো রাজ্য ধ্বংসের মুখে পড়ে।” রাজাকে সহায়তা করার জন্য তিনি মন্ত্রিপরিষদ, গুপ্তচর ও বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের কথা উল্লেখ করেছেন।
অর্থনীতি ও করব্যবস্থা:-
‘অর্থশাস্ত্র’-এ অর্থনীতি একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। কৌটিল্য মনে করেন, রাষ্ট্রের শক্তি তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল। তিনি কর আদায়ের সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করেন, যেখানে রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য, কৃষি, খনন, লবণ উৎপাদন, বনসম্পদ ইত্যাদিকে তিনি রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গণ্য করেছেন।
গুপ্তচর ও কূটনীতি:-
রাষ্ট্র রক্ষায় গুপ্তচর ব্যবস্থার গুরুত্ব কৌটিল্য বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, শত্রুর গতিবিধি, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও প্রজাদের মনোভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তাছাড়া কূটনীতি বা বিদেশনীতি বিষয়েও তিনি বিস্তৃত ধারণা দেন— কখন যুদ্ধ করতে হবে, কখন মিত্রতা স্থাপন করতে হবে এবং কখন প্রতারণার আশ্রয় নিতে হবে— এই সব বিষয় তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।
অর্থশাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রভাব:-
‘অর্থশাস্ত্র’ শুধু প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক দলিল নয়, এটি আধুনিক প্রশাসনিক চিন্তারও ভিত্তি। এর বাস্তবধর্মী ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ আজও রাজনৈতিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। কৌটিল্যের চিন্তা ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’-এরও পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত।
অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু:-
অর্থশাস্ত্র-তে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা, রাজস্বব্যবস্থা, রাজকর্তব্য, সমাজে দাসপ্রথা, তৎকালীন ভারতীয় সমাজজীবন, নারীদের অবস্থা, বিবাহ, পতিতাদের জীবন প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। (2) রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে শাসকের কেমন নীতি গ্রহণ করা উচিত তার ব্যাখ্যাও এতে রয়েছে। অর্থাৎ সমকালীন যুগের সমাজ ও রাজনীতিতে অর্থশাস্ত্রের যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
① রাষ্ট্রদর্শন:-
অর্থশাস্ত্র-তে বলা হয়েছে যে, অরাজক অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য জনগণ মনুকে রাজা হিসেবে নির্বাচন করেন। জনগণ রাজাকে কর প্রদানের আশ্বাস দেয় এবং রাজা তাঁর রাজধর্ম পালনের প্রতিশ্রুতি দেন। অর্থশাস্ত্রের এই রাষ্ট্রদর্শন থেকে প্রাচীন ভারতে চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কৌটিল্য বলেছেন যে, রাষ্ট্রে বা শাসনব্যবস্থায় রাজাই একমাত্র সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী।
② রাজকর্তব্য:-
অর্থশাস্ত্র-তে রাজার অধিকারের পাশাপাশি তাঁর কর্তব্যেরও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- (1) রাজার অবাধ ক্ষমতা থাকলেও তিনি কখনোই স্বেচ্ছাচারী হবেন না। (2) কৌটিল্য রাজাকে কঠোর পরিশ্রম করার নির্দেশ দেন। (3) রাজার কর্তব্য সম্পর্কে অর্থশাস্ত্র-তে বলা হয়েছে যে, রাজা রাজ্যের এবং জনগণের নিরাপত্তা বিধান করবেন, ধনী-দরিদ্র সবাইকে শোষণের হাত থেকে রক্ষা করবেন। কৌটিল্য বলেছেন, প্রজার সুখেই রাজা সুখী, প্রজার মঙ্গলেই রাজার মঙ্গল।

③ রাজকর্মচারী:-
অর্থশাস্ত্র-তে মৌর্য শাসনব্যবস্থার রাজকর্মচারী নিয়োগের উল্লেখ রয়েছে। রাজার সর্বোচ্চ রাজ-কর্মচারী ছিলেন মন্ত্রীণ। তার নীচে ছিল মন্ত্রীপরিষদ। রাজা মন্ত্রীদের মতামত বা পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য ছিলেন না। যোগ্যতা নির্ণায়ক পরীক্ষার দ্বারা শাসন ও বিচার বিভাগে অমাত্য, সমাহর্তা, সন্নিধাতা প্রভৃতি কর্মচারী নিয়োগ করা হত।
④ রাজস্ব:-
অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় যে, ভূমি-রাজস্ব ছিল রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস। প্রথাটিতে তিন প্রকার রাজস্বের কথা বলা হয় সীতা, ভাগ ও বলি। (1) ‘সীতা’ ছিল রাজার খাস জমি। এই জমি থেকে রাজার ভালোই আয় হত। (2) প্রজার ব্যক্তিগত জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর আদায় করা হত। একে বলা হত ‘ভাগ’। (3) ‘বলি’ নামে একপ্রকার বাধ্যতামূলক কর আদায় করা হত। (4) এ ছাড়া বন, খনি, শিল্প, আমদানি-রপ্তানি, পশুচারণ, পানশালা, কসাইখানা, জল, পথ প্রভৃতি থেকেও কর আদায় হত।
⑤ বিচারব্যবস্থা:-
অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় যে, মৌর্য শাসনব্যবস্থায় দক্ষ ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগের অস্তিত্ব ছিল। রাজা ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিচারক। গ্রাম থেকে প্রদেশ পর্যন্ত বিচারালয়ের অস্তিত্ব ছিল। বিচারব্যবস্থায় নিম্ন আদালতগুলির নাম ছিল স্থানীয়, দ্রোণমুখ, সংগ্রহণ প্রভৃতি গ্রামের বিচারকার্য সম্পাদন করত গ্রামিক। দেশে দণ্ডবিধি যথেষ্ট কঠোর ছিল।
⑥ ভেদনীতি:-
কৌটিল্য বলেন যে, যুদ্ধই শান্তির একমাত্র পথ। রাষ্ট্রনীতিতে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই বলেও তিনি মনে করতেন। তাঁর মতে, সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র হল স্বভাবজাত শত্রু এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্র হল স্বভাবজাত মিত্র। এই দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের শত্রু ও মিত্র নির্ধারণ করতে হবে। কৌটিল্যের এই তত্ত্বকে ‘মন্ডলতত্ত্ব’ বলা হয়।
⑦ সমাজব্যবস্থা:-
অর্থশাস্ত্র অনুসারে, সমাজে আগের মতোই চারটি বর্ণ ছিল। যথা-ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এই সময় বৈশ্য ও শূদ্রদের অবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। অর্থশাস্ত্র-তে আট প্রকার বিবাহের উল্লেখ আছে। উচ্চবর্ণের পুরুষ ও নিম্নবর্ণের নারীর মধ্যে অনুলোম ও নিম্নবর্ণের পুরুষ ও উচ্চবর্ণের নারীর মধ্যে প্রতিলোম বিবাহের ফলে সমাজে মিশ্রজাতির সৃষ্টি হয়েছিল। সমাজে উচ্চবর্ণের সঙ্গে শূদ্রদের বৈবাহিক সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
উপসংহার:-
সার্বিকভাবে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসন ও অর্থনীতির এক অনন্য দলিল। এটি শুধু একটি বই নয়, বরং এক যুগান্তকারী চিন্তাধারার প্রতিফলন, যেখানে আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে এক সম্পূর্ণ রাষ্ট্রদর্শন। কৌটিল্যের দৃষ্টিতে রাজনীতি ছিল প্রজাহিতৈষী শাসনের হাতিয়ার, আর ‘অর্থশাস্ত্র’ তারই বাস্তব প্রয়োগের নির্দেশিকা।