ক্ষুদ্র নিবন্ধ লেখো-বৈদিক সাহিত্য – বৈদিক সাহিত্য বলতে মূলত চারটি বেদ (ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ) এবং এদের সাথে যুক্ত ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ ও বেদাঙ্গকে বোঝায়। এটি হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ এবং প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বৈদিক সাহিত্য মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হতো বলে একে “শ্রুতি” নামেও পরিচিত।
Table of Contents
READ MORE – প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদান
ক্ষুদ্র নিবন্ধ লেখো-বৈদিক সাহিত্য।
∆ বৈদিক সাহিত্য:-
আর্যদের ‘বেদ’ হল ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য। আনুমানিক ১,৪০০-১,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত ‘বেদ’-কে কেন্দ্র করে ভারতে বৈদিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। বৈদিক যুগে মূলত ধর্মীয় সাহিত্য রচিত হয়েছিল এবং সাহিত্যের ভাষা-মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। বৈদিক যুগে চার প্রকার বেদ যথা ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ এবং ব্রাহ্মণ, সংহিতা, আরণ্যক ও উপনিষদ নিয়ে বিশাল বৈদিক সাহিত্য গড়ে উঠেছিল।

• বেদ:-
বেদ হল আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য। সংস্কৃত ‘বিদ’ শব্দ থেকে ‘বেদ’ কথাটির উৎপত্তি হয়েছে। ‘বেদ’ শব্দের অর্থ হল ‘জ্ঞান’। বেদ হল হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, ‘বেদ’ স্বয়ং ঈশ্বরের বাণী। তাই বেদকে নিত্য ও অপৌরুষেয় বলে মনে করা হয়। আর্য-ঋষিরা প্রথমে দৈববাণীর মতো বেদ শুনতে পান। তখন থেকে তা বংশপরম্পরায় শুনে শুনে মুখস্থ রাখা হত, এজন্য বেদের অপর নাম ‘শ্রুতি’।
• বেদের চারটি ভাগ:-
বেদ চারভাগে বিভত্ত্ব-ঋক্, সাম, যজু ও অগর্ব। ঋক্, সাম ও যজুর্বেদকে একসঙ্গে ‘ত্রয়ী’ বা ‘ত্রয়ীবিদ্যা’ বলা হয়। এগুলি সামগ্রিকভাবে চতুর্বেদ সভ্যতা তথা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের সর্বাধিক পুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
[1] ঋগ্বেদ:-
(1) ঋগ্বেদে বিভিন্ন ঋক্, সুপ্ত ও মন্ডল আছে। ঋগবেদে প্রায় ১০,৬০০টি কক্ বা পদ্যময় মন্ত্র, ১,০২৮টি সূক্ত এবং ১০টি মণ্ডল আছে। ঋগ্বেদের বিষয়বস্তু হল প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক শক্তির উপাসানার বিবরণ।

(2) ঋগ্বেদের রচয়িতা কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিশ্বমিত্র, ব্যাসদেব, অত্রি, ভরদ্বাজ ও বশিষ্ঠ।
[2] সামবেদ:-
সামবেদের অধিকাংশ স্তোত্র ঋগ্বেদ থেকে সংকলিত হয়েছে। সামবেদের স্তোত্রপুলি পূজা ও যজ্ঞের সময় সুর করে গাওয়া হত। তাই এই স্তোত্রগুলি ‘সামগান’ নামেও পরিচিত। সোমদেবের উদ্দেশ্যে এই গানগুলি গাওয়া হত। সামবেদে ১.৫৪৯টি মন্ত্র আছে।
[3] যজুর্বেদ:-
যজুর্বেদ গদ্যে রচিত। এতে যজ্ঞানুষ্ঠানের সময় পুরোহিতদের মন্ত্রাদি এবং অনুষ্ঠানের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা রয়েছে।
[4] অথর্ববেদ:-
অথর্ববেদ হল বেদের শেষ ভাগ। একে ‘ক্ষাত্রবেদ’ও বলা হয়। এতে প্রকৃতির সৃষ্টি রহস্য, চিকিৎসাবিদ্যা, ইন্দ্রজাল, অপদেবতা প্রভৃতির আলোচনা রয়েছে। অথর্ববেদে প্রায় ৬,০০০টি মন্ত্র রয়েছে।

• প্রতিটি বেদের অংশসমূহ:-
ঋক্, সাম, যজু, অথর্ব-প্রতিটি বেদ আবার চারটি অংশে বিভক্ত। যথা- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ।
[1] সংহিতা:-
যজ্ঞের মন্ত্রাদি এবং দেবদেবীর আরাধনা সংহিতার বিষয়। এটি পদ্যে রচিত।
[2] ব্রাহ্মণ:-
ব্রাহ্মণ অংশে যাগযজ্ঞের বিধান ও যজ্ঞের মন্ত্রাদির অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। এটি গদ্যে রচিত।

[3] আরণ্যক:-
বানপ্রস্থ গ্রহণ করে যাঁরা অরণ্যে আশ্রয় নিতেন তাঁদের জন্য ধ্যান, উপাসনা পদ্ধতি প্রভৃতির আলোচনা রয়েছে আরণ্যক অংশে।
[4] উপনিষদ:-
উপনিষদ হল বেদের শেষ ভাগ। সেইজন্য একে বেদান্তও বলা হয়। উপনিষদগুলির মধ্যে অন্যতম হল কঠ, কেন, ঈশ, মাণ্ডুক্য, ঐতরেয় প্রভৃতি। সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে বেদের ‘কর্মকাণ্ড’ এবং আরণ্যক ও উপনিষদকে বেদের ‘জ্ঞানকাণ্ড’ বলে অভিহিত করা হয়।
• বেদাঙ্গ:-
বৈদিক সাহিত্য পরবর্তীকালে ক্রমে বৃহদায়তন ও জটিল হয়ে পড়ে। ফলে বেদের অধ্যয়নের সহায়করূপে কিছু সাহিত্যের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এগুলিকে বেদাঙ্গ বলে। বেদাঙ্গ বৈদিক সাহিত্যের অঙ্গ হলেও তা বৈদিক যুগের পরবর্তীকালের রচনা। বেদাঙ্গ ছয় ভাগে বিভক্ত। যথা- (1) শিক্ষা, (2) ছন্দ, (3) ব্যাকরণ, (4) নিরুক্ত, (5) জ্যোতিষ ও (6) কল্প। বেদাঙ্গের ছন্দের মধ্যে নিদানসূত্র ও পিঙ্গলছন্দসূত্র এবং ব্যাকরণের মধ্যে পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।

• কল্পসূত্র:-
বেদাঙ্গের শেষ বিভাগ অর্থাৎ কল্প বা কল্পসূত্র সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। কল্পসূত্রের চারটি অংশ-শ্রৌতসূত্র, শুল্কসূত্র, গৃহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্র। এগুলিতে যাগযজ্ঞের নিয়মাবলি, জীবনযাপনের নিয়মবিধি ও দশকর্মবিধি, সমাজ, রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিধি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
• ষড়দর্শন:-
বৈদিক যুগের দর্শন সাহিত্যের ছয়টি শাখা রয়েছে। এগুলিকে একত্রে ‘ষড়দর্শন’ বলা হয়। যথা- (1) সাংখ্য, (2) যোগ, (3) ন্যায়, (4) বৈশেষিক, (5) পূর্ব মীমাংসা ও (6) উত্তর মীমাংসা। ছয়জন ঋষি এই ষড়দর্শনের রচয়িতা। এঁরা হলেন কপিল (সাংখ্য), পতঞ্জলি (যোগ), গৌতম (ন্যায়), কণাদ (বৈশেষিক), জৈমিনী (পূর্ব মীমাংসা) এবং বেদব্যাস (উত্তর মীমাংসা)। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের মধ্যে ষড়দর্শন রচিত হয়। বেদাঙ্গ ও ষড়দর্শন একত্রে সূত্রসাহিত্য নামে পরিচিত।)
• অন্যান্য সাহিত্য:-
উপরোক্ত সাহিত্যগুলি ছাড়াও পরবর্তীকালে বিভিন্ন রচনা বৈদিক সাহিত্যরূপে পরিচিতি লাভ করে। আয়ুর্বেদ, অর্থনীতি, শিল্পকলা, সংগীত, নাট্যশাস্ত্র, অশ্ববিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে নানা গ্রন্থ রচিত হয়।