হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা – হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার একক কোনো স্রষ্টা নেই; এটি বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা। এই সভ্যতার স্রষ্টা কারা ছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন পণ্ডিতের ভিন্ন মত রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন দ্রাবিড়রা এর স্রষ্টা, আবার কেউ কেউ আর্যদের এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করেন।
হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা
Table of Contents
READ MORE – সিন্ধু সভ্যতার অবলুপ্তির বিভিন্ন কারণগুলি আলোচনা কর

• হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা:-
ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথ মন্তব্য করেছিলেন যে, বৈদিক যুগ থেকে হিন্দু সভ্যতার শিকড় লক্ষ করা যায়। কিন্তু ১৯২১-১৯২২ খ্রিস্টাব্দে হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার ভারতীয় ইতিহাসচর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রমাণিত হয়, আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য নদী-অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সমকালীন বিশ্বের সুমেরীয়, আক্কাদীয়, মেসোপটেমীয়, ব্যাবিলনীয়, আসিরীয় প্রভৃতি সভ্যতার তুলনায় এই সভ্যতা সবদিক থেকেই অগ্রবর্তী ছিল। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের ফলে ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনত্ব ও মৌলিকত্ব প্রমাণিত হয়।
• উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ:-
ভারতের এই প্রাচীন সভ্যতা কারা গড়ে তুলেছিল তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক লক্ষ করা যায়। হরপ্পা সভ্যতায় যে সিম্পলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলির পাঠোদ্ধার হলে হয়তো এই বিষয়ে অনেক বিতর্কের অবসান হতে পারত। কিন্তু সিম্পলিপির পাঠোদ্ধার আজ পর্যন্ত সম্ভব না হওয়ায় অন্যান্য অনেক বিতর্কের মতো এই সভ্যতার স্রষ্টা কারা তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তাই হবল্লা সভ্যতার পত্তন কারা করেছিল সে সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করলেও এগুলির কোনো-একটিকে নিশ্চিতরূপে বা সর্বসম্মতরূপে গ্রহণ করার সময় সম্ভবত এখনও আসেনি।
হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত এবং তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল-

[1] সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব:-
স্যার মাটিমার হইলার ও অন্যান্য কয়েকজন পণ্ডিত মনে করেন যে, প্রাচীন সুমেরীয়রা হরপ্পা সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। হরপ্পা সভ্যতার সলো সমেরীয় সভ্যতার অনেক সাদৃশ্য লক্ষ করে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে সিন্ধু ও সুমের উভয় সভ্যতাই ছিল নদীমাতক। সুমেরীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীর তীরে এবং সিন্ধু সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল সিন্ধু নদের অববাহিকায়। সূমের ও সিন্ধু উভয় সভ্যতাতেই মাতৃপূজার প্রচলন ছিল।
উভয় সভ্যতাতে উন্নত জলনিকাশী ব্যবস্থা ছিল। উভয় সভ্যতায় পোড়া ইট দিয়ে বাড়ি তৈরি হত এবং এদের গৃহনির্মাণ রীতিতেও যথেষ্ট মিল ছিল। হটয়ার মতো সুমেরেও শস্যাগার ছিল বলে জানা গেছে। দুটিই ছিল তাম্রমুগের সভ্যতা। এসব যুক্তির অবতারণা করে তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, সিন্ধু সভ্যতা সুমেরীয়রাই গড়ে তুলেছিল। এজন্য মার্টিমার তুইলার মন্তব্য করেছেন যে, সিন্ধু সভ্যতা বিদেশ থেকে আগত বলেই তা ভারতের অভ্যন্তরভাগে প্রসারিত না হয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল।
বিরোধী যুক্তি:-
হরপ্পা ও সুমেরীয় সভ্যতার মধ্যে আপাত কিছু সাদৃশ্য থাকলেও উভয় সভ্যতার মধ্যে যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল, তা এ. এল. বাসাম, জন মার্শাল প্রমুখ ইতিহাসবিদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তাঁদের মতে- (1) লিপি ও সিলমোহরের ক্ষেত্রে উভয় সভ্যতার মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। (2) উভয় সভ্যতার মৃৎপাত্রও ছিল ভিন্ন ধরনের। (3) দুই সভ্যতার মধ্যে যেটুকু সাদৃশ্য দেখা যায় তার কারণ হল সমকালীন সভ্যতা হিসেবে উভয়ের মধ্যে যোগাযোগ। এই সমস্ত যুক্তি দিয়ে তাঁরা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা হিসেবে সুমেরের দাবি নাকচ করেছেন।
[2] দ্রাবিড় সৃষ্টিতত্ত্ব:-
ফাদার হেরাস, জাঁ ফিলিওজা, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, এ. এল. বাসাম প্রমুখ পন্ডিত যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, দ্রাবিড় জাতির মানুষ হরপ্পা সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। এই প্রসঙ্গে তাঁদের যুক্তি হল-
(1) আর্যদের আগে দ্রাবিড় জাতি সারা ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তাই উত্তর-পশ্চিম ভারতে তাদের অবস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু নয়।
(2) বর্তমানকালেও বালুচিস্তানের ব্রাহুই উপজাতির কথ্যভাষায় দ্রাবিড় ভাষার প্রভাব লক্ষ করা যায়।
(3) ফিলিওজা-র মতে, আর্যদের আগে দ্রাবিড় ও মুন্ডা জাতিই ছিল প্রধান ভারতীয় জাতি। এর মধ্যে দ্রাবিড়রা উন্নত সংস্কৃতির অধিকারী ছিল।
(4) হরপ্পা এবং দ্রাবিড় উভয় সভ্যতাতেই শিব ও লিঙ্গ পুজার প্রচলন ছিল।
(5) দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে যেমন মোঙ্গলীয় ও আত্মীয় জাতির মানুষ দেখা যায়, তেমন শারীরিক গঠনের মানুষের কঙ্কাল হরপ্পা সভ্যতাতেও আবিষ্কৃত হয়েছে।
(6) ফাদার হেরাস সিন্ধুলিপিকে প্রাচীন তামিল লিপির আদিরূপ বলে সনাক্ত করেছেন।
(7) ঋগ্বেদে উল্লেখ আছে যে, আর্যরা অনার্যদের পরাজিত করে ভারতে বসতি স্থাপন করেছিল। এদিকে দ্রাবিড়রাও ছিল অনার্য। এইভাবে বিভিন্ন যুক্তির ভিত্তিতে তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, দ্রাবিড় জাতিই হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা।
বিরোধী যুক্তি:-
হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা হিসেবে দ্রাবিড় জাতির দাবির বিপক্ষেও নানা যুক্তি দেখানো হয়। যুক্তিগুলি হল- (1) দ্রাবিড় জাতি যদি হরপ্পা সংস্কৃতির স্রষ্টা হয়, তবে তারা দক্ষিণ ভারতে কেন সিন্ধুর নগরগুলির মতো কোনো নগর প্রতিষ্ঠা করল না? (2) দ্রাবিড় জাতি মৃতদেহ সমাধি দিত কিন্তু সিন্দুর অধিবাসীরা মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার পাশাপাশি দাহও করত। (3) ‘সিন্ধুলিপি’র যেহেতু এখনও পর্যন্ত পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তাই এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে তা প্রাচীন তামিল লিপিরই আদিরূপ। (4) বালুচিস্তানের ব্রাহই উপজাতির মানুষ তুর্কো-ইরানীয় জাতিগোষ্ঠীভুক্ত। দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের থেকে তারা সম্পূর্ণ পৃথক।

[3] আর্যজাতির সৃষ্টিতত্ত্ব:-
ইতিহাসবিদ এ. ডি. পুলসকার, এস. আর. রাও প্রমুখের মতে, আর্য জাতিই হরপ্পা সভ্যতার সৃষ্টি করেছিল। এই মতের সমর্থকরা মনে করেন যে, আর্যরা বহিরাগত নয়, তারা ভারতেরই স্থানীয় বাসিন্দা। সিন্ধু সভ্যতা আর্যদের সৃষ্টি বলে তাঁরা যেসব যুক্তি দেখান সেগুলি হল- (1) সিন্ধুর বাসিন্দা ও আর্যদের মধ্যে খাদ্য ও পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। (2) এই সভ্যতায় যেসব নরকঙ্কাল পাওয়া গেছে তার মধ্যে আর্যজাতির কঙ্কালও আছে।
বিরোধী যুক্তি:-
স্যার জন মার্শাল হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা হিসেবে আর্যজাতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিকে যুক্তি দিয়ে খন্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, সিন্ধু সভ্যতার চেয়ে বৈদিক সভ্যতা শুধু পরবর্তীই নয়, সম্পূর্ণ বিজাতীয় এবং পৃথকও বটে। অধ্যাপক এ. এল, বাসামও অনুরূপ অভিমত দিয়েছেন। তাঁদের মতে-
(1) আর্যরা হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা হলে মেনে নিতে হবে যে, তারা খ্রিস্টপূর্ব ৩,০০০ অব্দের আগে থেকেই ভারতে ছিল। কিন্তু ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে ভারতে আর্যদের বসবাসের কোনো প্রমাণ নেই।
(2) সিন্ধু সভ্যতায় লোহার ব্যবহার অজানা ছিল, কিন্তু আর্যরা লোহার ব্যবহার জানত।
(3) আর্যরা বর্ম, শিরস্ত্রাণ প্রভৃতি ব্যবহার করত, কিন্তু হরপ্পা সভ্যতায় এগুলি পাওয়া যায়নি।
(4) জীবিকা ও ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে সিন্ধুবাসী ও আর্যদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল।
(5) সিন্ধুবাসী ও আর্যদের মৃৎপাত্র ছিল ভিন্ন ধরনের।
(6) হরপ্পা সভ্যতার মানুষ ঘোড়াকে পোষ মানাতে শেখেনি, কিন্তু আর্য সমাজে ঘোড়া ছিল গৃহপালিত পশু।
(7) এই প্রশ্নেরও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না যে, পূর্ববর্তী সভ্যতা হয়েও হরপ্পা সভ্যতা কীভাবে এক সুসভ্য নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার জন্ম দিল আর পরবর্তী সভ্যতা হয়েও আর্যসভ্যতা কেন গ্রামীণ সভ্যতার নির্দশন হয়েই রইল।
(8) আর্যদের যুদ্ধ মানসিকতা একটি পরিচিত বিষয়, সিন্ধুর অধিবাসীদের ক্ষেত্রে তার প্রমাণ একেবারেই অনুপস্থিত।
(9) হরপ্পা সভ্যতায় লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে, ঋবৈদিক যুগের কোনো হরফের সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাদের জ্ঞানভান্ডার ছিল ‘স্মৃতি’ ও ‘শ্রুতি’ নির্ভর।
[4] মিশ্র জাতিতত্ত্ব:-
কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, হরপ্পার মতো একটি বৃহৎ সভ্যতায় একাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি মিশ্র-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে অনেকের ধারণা। এই ধারণাটি যে কটি পৃথক তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়, সেগুলি হল-

(1) অসুর, নাগ প্রভৃতি জনগোষ্ঠী তত্ত্ব:-
অসুর, নাগ, পণি, ব্রাত্য, দাস প্রভৃতি জাতিকেও কেউ কেউ হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টারূপে তুলে ধরতে চান। কিন্তু তাদের বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি খুবই কম বা দুর্বল।
(2) চার জাতিগোষ্ঠী তত্ত্ব:-
নৃতাত্ত্বিকরা হরপ্পা সভ্যতায় পাওয়া কঙ্কালগুলির হাড়, খুলি প্রভৃতি পরীক্ষা করে অভিমত দিয়েছেন যে, এখানে অন্তত চারটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত। সেগুলি হল-[i] ককেশীয়, [ii] ভূমধ্যসাগরীয়, [iii] আল্লীয়, [iv] মোঙ্গলীয়। হরপ্পায় পাওয়া খুলির সঙ্গে মেসোপটেমিয়া ও তুর্কীস্থানে পাওয়া খুলির মিল রয়েছে।
(3) স্থানীয় আদিম জনগোষ্ঠী তত্ত্ব:-
নৃতত্ত্ববিদ ড. ডি. কে. সেন মনে করেন যে, হরপ্পা, মহেন-জো-দারো, লোথাল, চানহৃদরো প্রভৃতি শহরে একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত। তারা ছিল এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের উত্তরসূরি। তাদের উচ্চতা ছিল মাঝারি, মাথার খুলি উঁচু এবং নাক চওড়া। সেই আদিম জনগোষ্ঠী হরপ্পা সভ্যতার পত্তন করে থাকতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
• উপসংহার:-
হরপ্পা সভ্যতার সর্বনিম্ন স্তরগুলি জলমগ্ন থাকায় একেবারে প্রথম দিকের সভ্যতার স্বরূপ এখনও সম্পূর্ণ জানা যায়নি। তাই কেউ কেউ মনে করেন যে, এই সভ্যতার আদি বিকাশকেন্দ্রটি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এই সভ্যতার আদি বিকাশকেন্দ্রটি কোনোদিন আবিষ্কৃত হলে এবং সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হলে হরপ্পা সংস্কৃতির পত্তন ঠিক কাদের হাত ধরে হয়েছিল সে সম্পর্কে হয়তো আরও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে।