জী বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তা

জী বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তা – ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জ্যাঁ বোঁদা (Jean Bodin) ষোড়শ শতকের একজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন এবং তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মূল কথা ছিল সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) ধারণা। তিনি মনে করতেন, সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, যা আইনের ঊর্ধ্বে এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী ও বলবৎকারী হিসেবে কাজ করে। তাঁর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা অসীম ও অবিভাজ্য এবং এটি সাধারণত রাষ্ট্রের হাতেই থাকে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের জন্য অপরিহার্য। 

READ MORE – নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি

জী বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তা

উত্তর:-

প্রখ্যাত ফরাসি রাষ্ট্রনীতিবিদ জী বোঁদা (Jean Bodin) তাঁর ‘মেথড ফর দ্য ইজি কম্প্রিহেনশান অব হিস্ট্রি’ ও ‘সিক্স বুকস অব দ্য কমনওয়েলথ’ গ্রন্থে আধুনিক রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি তুলে ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রে ধারণা, সার্বভৌমিকতার ধারণা, নাগরিকতার ধারণা, সরকারের প্রকৃতি ও বিপ্লবের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

        শক্তিশালী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে এসবের গুরুত্ব তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন-

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা:-

বোঁদা মনে করেন, রাষ্ট্র হল বহু পরিবার ও তাদের বিষয়-সম্পত্তিকে নিয়ে গঠিত এক শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র তার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজিত বা পরাজিত শ্রেণিকে একদিকে যেমন ক্রীতদাসে পরিণত করে, তেমনি আবার তার অধীন মানুষজনের স্বার্থে প্রতিরক্ষা, ন্যায় বিচার ও জনকল্যাণের আদর্শ অবশ্যই পালন করবে। এটা আধুনিক রাষ্ট্র কর্তব্য বলে তিনি মনে করেন।

সার্বভৌমিকতা:-

এক অবাধ, চরম ও অহস্তান্তরযোগ্য সার্বভৌম ক্ষমতা হল আধুনিক রাষ্ট্রের আর এক হাতিয়ার। বোঁদা বলেন, একমাত্র রাষ্ট্রই এই চরম ও পরম সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে তার অধীনস্য সব সংগঠন ও জনগণের ওপর। তবে সাগ্রিকভাবে জনকল্যাণের স্বার্থে রাষ্ট্র এই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী।

নাগরিকতা:-

নাগরিকতার বিষয়ে বোঁদা তিনটি কথা বলেছেন- প্রথমত, রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তির অধীন সকল মানুষই নাগরিক, দ্বিতীয়ত, ক্রীতদাসরা রাষ্ট্র ও সার্বভৌম শক্তি দ্বারা চালিত হলেও নাগরিক বলে গণ্য হবে না এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের অধীন পরিবারের একমাত্র প্রধান ব্যক্তিকে নাগরিক বলে ধরা হবে। বোঁদার এ হেন নাগরিকতার ধারণা রক্ষণশীল ও সংকীর্ণ বুচিবোধের পরিচায়ক বলে অনেকে মনে করেন।

সরকারের প্রকৃতি:-

সোঁদা সরকারের গঠন ও প্রকৃতি ব্যস্ত করতে গিয়ে তিন ধরনের সরকার গঠনের কথা বলেছেন। যেমন- (১) রাজতান্ত্রিক সরকার, (২) অভিজাততান্ত্রিক সরকার ও (৩) গণতান্ত্রিক সরকার। কোনো একজন ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনা করলে তাকে ‘রাজতান্ত্রিক সরকার’ বলে। বৌদা মনে করেন, এই তিন সরকারের সংমিশ্রণে গঠিত বলে ‘মিশ্র রাষ্ট্র, থাকে রাষ্ট্র না বলে ‘নৈরাজ্য’ বা ‘নেইরাজ্য’ বলা ভালো বলে বোঁদে মনে করেন।

বিপ্লবের ধারণা:-

আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বোঁদা বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পরিবর্তন হয়। ফলে এক কর্তৃপক্ষের হাত থেকে সার্বভৌম ক্ষমতা অন্য কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাওয়াকে বলে বড়ো ধরনের পরিবর্তন বা বিপ্লব। বোঁন মনে করেন জীব দেহের মতো রাষ্ট্রে জন্ম, বৃদ্ধি, মৃত্যু ইত্যাদি হয় বলে এ হেন বিপ্লব ঘটে থাকে।

সীমাহীন ক্ষমতা:

সার্বভৌম ক্ষমতাকে তিনি ‘সর্বোচ্চ’ ও ‘অবিভাজ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর মানে হল রাষ্ট্র বা সার্বভৌম সত্তা কোনো নিয়মের অধীন নয় এবং এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান:

বোঁদার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পরিবার, সম্পত্তি এবং সার্বভৌম ক্ষমতা—এই মৌলিক উপাদানগুলো অপরিহার্য। 

আইনের মূল উৎস:

তিনি মনে করতেন যে রাষ্ট্রের সকল আইন ও নীতি সার্বভৌম ক্ষমতার মাধ্যমেই তৈরি হয় এবং এটিই আইনের চূড়ান্ত উৎস। 

শাসনতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা:

যদিও সার্বভৌম ক্ষমতা সীমাহীন, বোঁদা বিশ্বাস করতেন যে এটি কিছু নৈতিক ও প্রাকৃতিক আইনের অধীনে থাকতে পারে এবং এটি অবশ্যই ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবহার করা উচিত। 

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা:

তিনি সার্বভৌমত্বের ধারণা দিয়ে ফ্রান্সে ১৬শ শতকের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যা সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে। 

• মূল্যায়ন:-

জাঁ বোঁদা শুধু প্যারিস পার্লামেন্টের সদস্য নন, তিনি তুলোস (Toulouse) বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ছিলেন। রাষ্ট্র সংক্রান্ত তাঁর সার্বভৌম তত্ত্ব ও আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণাতে যুক্তি ও বাস্তবতা থাকলেও তা ত্রুটিমুক্ত নয়। কারণ ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম হওয়ায় মধ্যযুগীয় সংকীর্ণতা কিছুটা হলেও তাঁর মধ্যে ছিল। প্রথমত, তিনি ‘সম্পত্তির অধিকার পবিত্র অধিকার’ বলে চিহ্নিত করে তার ওপর হস্তক্ষেপকে বরদাস্ত করেননি।

দ্বিতীয়ত, সার্বভৌম ক্ষমতাকে চরম বলেও তার বিরোধিতা করে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের শক্তিকে দুর্বল করেছেন বলে বোঁদাকে আধুনিক রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি স্থাপনের কারিগর বলতে রাজি নন অধ্যাপক এইচ. কে. এল. স্যাবাইন। তৃতীয়ত, নাগরিকতার বিষয়ে সম্পত্তিকে মাপকাঠি করে ক্রীতদাসদের প্রতি তিনি অমানবিক মনোভাব পোষণ করেছেন। তবে বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তার অবদান কৃতজ্ঞ চিত্তের স্মরণ করতে গিয়ে বলতেই হবে যে, তিনি মঞ্চ্যযুগের ভাবধারায় বড়ো হলেও আধুনিক স্বরূপ, সার্বভৌমিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। ড. মুরে বলেছেন, ‘বোঁদা হলেন আধুনিক সার্বভৌমত্বের ধারণার জনক’।

সংক্ষেপে, জ্যাঁ বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তা সার্বভৌমত্বের ধারণাটিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আইন ও স্থিতিশীলতা নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। 

জী বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তা

Leave a Reply