দলিত আন্দোলন

দলিত আন্দোলন হলো ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার দলিত সম্প্রদায় দ্বারা পরিচালিত একটি সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম, যার মূল লক্ষ্য হলো শতাব্দী প্রাচীন বর্ণভিত্তিক বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, ও নাগরিক অধিকার অর্জন। ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর এই আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন, যিনি দলিতদের সংগঠিত করে তাদের শিক্ষা, রাজনৈতিক অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। এই আন্দোলনের মধ্যে দলিত সাহিত্য এবং দলিত বৌদ্ধ আন্দোলনও অন্তর্ভুক্ত, যা দলিত পরিচয় ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

দলিত আন্দোলন ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ। এই আন্দোলনের মূলে ছিল তথাকথিত “অস্পৃশ্য” বা দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি সমাজের উচ্চবর্গীয়দের দ্বারা চাপানো কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অপমান। দলিতরা সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থিত ছিল, যাদের ন্যূনতম মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হতো। তাদের মন্দির প্রবেশাধিকার ছিল না, সাধারণ কুয়ো থেকে জল তুলতে পারতো না, এবং এমনকি তাদের ছায়াও “অপবিত্র” বলে গণ্য হতো।

READ MORE – অসহযোগ আন্দোলনে পটভূমি ব্যাখ্যা করো

দলিত আন্দোলন

দলিত আন্দোলনের কারণ কী ছিল? দলিত আন্দোলন ও আম্বেদকরের ভূমিকা কী ?

উত্তর :-

বর্ণবিভক্ত ভারতীয় হিন্দুসমাজে উচ্চবর্ণের দ্বারা শোষিত ও অত্যাচারিত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলিত বলে পরিচিত। ‘দলিত’ শব্দটি এসেছে দলন থেকে। হিন্দুসমাজের এই অনগ্রসর, পশ্চাৎপদ, শ্রেণি যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় সবক্ষেত্রে উচ্চবর্ণের মানুষদের দ্বারা শোষিত, অত্যাচারিত বা পদদলিত হয়েছে। এই শোষণ ও অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সেইসব পশ্চাৎপদ শ্রেণি দলিত আন্দোলন শুরু করেছিল।

দলিত আন্দোলনের কারণসমূহ:

দলিত আন্দোলনের কারণগুলি হল নিম্নরূপ-

১) উচ্চবর্ণের অত্যাচার:

ভারতীয় সমাজের উচ্চবর্ণের লোকেরা বিভিন্নভাবে নিম্নবর্ণের মানুষদের বা দলিতদের শোষণ ও অত্যাচার করত। উচ্চবর্ণের মানুষরা দলিতদের দিয়ে জমি ও বাড়ির বিভিন্ন কাজ করাত। বিনিময়ে তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিত না এবং বিভিন্ন অজুহাতে তাদের শারীরিক নির্যাতন করত।

২)  সামাজিক বৈষম্য:

সমাজে দলিতদের স্থান ছিল নিম্নস্তরে।তারা বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও অপমানের শিকার হত। উচ্চবর্ণের লোকেরা তাদের সঙ্গে বিশেষ দূরত্ব বজায় রেখে চলত।

৩) ধর্মীয় বৈষম্য:

দলিতরা হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মন্দিরে তাদের প্রবেশ করার অধিকার ছিল না। তারা দেবতার পুজোও করতে পারত না। ফলে দলিতদের মধ্যে ধর্মীয় অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছিল।

৪)  শিক্ষাগ্রহণে বঞ্চনা:

দলিত পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্কুলে উচ্চবর্ণের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পড়াশোনার সুযোগ পেত না। অনেকক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাগ্রহণকে অশাস্ত্রীয় বলেও ব্যাখ্যা করা হত। আবার অনেকক্ষেত্রে অতি আগ্রহী দলিত সন্তানদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে বসে শিক্ষাগ্রহণ করতে হত।

৫) জলাশয় ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা:

দলিতরা উচ্চবর্ণের মানুষের ব্যবহার করা জলাশয় বিশেষত পুকুর, কুয়ো ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারত না। এইসব জলাশয় থেকে পানীয় জল সংগ্রহের অধিকারও তাদের ছিল না। অধিকাংশ জলাশয় শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের মানুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই জলাশয়গুলি দলিতরা ব্যবহার করে ফেললে তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হত। কত বছ

৬)  রাজনৈতিক বঞ্চনা:

ভারতে দলিতরা বিপুল সংখ্যায় বসবাস করলেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল অত্যন্ত নগণ্য। দলিতদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তারা রাজনৈতিক সুযোগসুবিধা থেকেও ছিল বঞ্চিত।

৭) অস্পৃশ্যতা:

দলিতরা উচ্চবর্ণের মানুষদের কাছে ছিল অস্পৃশ্য। তাদের ছোঁয়া লাগলে উচ্চবর্ণের মানুষেরা স্নান করে প্রায়শ্চিত্ত করত। অথচ দলিতদের উৎপাদিত ফসল ও অন্যান্য সামগ্রী তারা ভোগ করতে দ্বিধা করত না।

আম্বেদকরের ভূমিকা:

বর্ণবিভক্ত ভারতীয় হিন্দুসমাজের নিম্ন সম্প্রদায়ভুক্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দলিত নামে পরিচিত। ‘দলিত’ নামকরণ করেন ড. বি আর আম্বেদকর। ‘দলন’ শব্দটি থেকে ‘দলিত’ কথাটি এসেছে। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নতির জন্য আম্বেদকর বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

‘বাবাসাহেব’ নামে পরিচিত ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। নৃতত্ত্ববিদ্যা, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন ও আইনশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। মহারাষ্ট্রের এক অস্পৃশ্য মাহার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা একজন সামরিককর্মী ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার সুযোগ পান। তাঁর মেধার পরিচয় পেয়ে বরোদার মহারাজা তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা পাঠান। শিক্ষাশেষে তিনি বরোদা রাজ্যের সামরিক সচিব ও পরে বোম্বাই-এর সিডেনহাম কলেজে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হন।

এরপর আম্বেদকর দলিতদের অধিকারের জন্য বিভিন্ন আন্দোলন শুরু করেন। এগুলি হল-দলিত সম্মেলন: ইতিপূর্বে দলিতদের উন্নতির জন্য জাস্টিস পার্টি গঠিত হয়েছিল ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। এই দলের উদ্যোগে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে নাগপুরে দলিত নেতাদের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে সর্বভারতীয় নিপীড়িত শ্রেণির সমিতি গঠিত হয়। সমিতির সভাপতি হন এম সি রাজা এবং সহ-সভাপতি হন আম্বেদকর।

এই আন্দোলনকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে এবং দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাবা সাহেব ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। আম্বেদকর নিজেই একজন দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন এবং এই অভিজ্ঞতা তাকে দলিত মুক্তির সংগ্রামে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শুধুমাত্র সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়, বরং এর জন্য আইনগত ও সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

আম্বেদকর দলিতদের শিক্ষা গ্রহণের উপর জোর দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষাই মুক্তির পথ। তিনি দলিতদের সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যেমন “বহিষ্কৃত হিতকারিনী সভা” এবং “ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি”। তার নেতৃত্বেই ১৯২৭ সালের মহাদ সত্যাগ্রহ সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে দলিতরা প্রকাশ্যভাবে একটি সাধারণ কুয়ো থেকে জল তুলে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।

আম্বেদকর ভারতের সংবিধান রচনার মূল স্থপতিদের একজন হিসেবে দলিতদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সংবিধানে এমন অনেক ধারা অন্তর্ভুক্ত করেন যা অস্পৃশ্যতাকে বিলুপ্ত করে, সংরক্ষণ নীতি চালু করে এবং সকলের জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত করে। তার প্রচেষ্টা দলিতদের জন্য শিক্ষা, চাকরি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ উন্মুক্ত করে। আম্বেদকর হিন্দু ধর্মের মধ্যে বর্ণপ্রথার সংস্কারের ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে শেষ জীবনে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন, এবং তিনি দলিতদেরও এই পথে চলার আহ্বান জানান। তার এই পদক্ষেপ ছিল বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতীকী প্রতিবাদ। দলিত আন্দোলন এবং আম্বেদকরের সংগ্রাম ভারতের সামাজিক ন্যায় ও সমতার ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং আজও তার আদর্শ লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।

অস্পৃশ্য আন্দোলন:

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে আম্বেদকর অস্পৃশ্য আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি ‘বহিষ্কৃত ভারত’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি প্রচার করেন, হিন্দুধর্ম হল নিম্নবর্ণের মানুষদের উপর আধিপত্য স্থাপনকারী একটি ধর্ম। অস্পৃশ্যতার মূল হল ‘মনুস্মৃতি’। এজন্য তিনি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ‘মনুস্মৃতি’ গ্রন্থ পুড়িয়ে দেন।

সত্যাগ্রহ আন্দোলন : তিনি মহারাষ্ট্রের কোলাবা জেলায় অস্পৃশ্যদের পানীয় জল ব্যবহারের দাবিতে মাহার সত্যাগ্রহ করেন ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে। কলারাম মন্দিরে প্রবেশের দাবিতে সত্যাগ্রহ করেন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে।

সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা:

লন্ডনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে আম্বেদকর যোগ দেন। তাঁর চেষ্টায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নিম্নবর্ণের মানুষদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। গান্ধিজি প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন। পুনা চুক্তির মাধ্যমে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে এই সমস্যার সমাধান করা হয়। স্থির হয় বাঁটোয়ারা নীতি দ্বারা প্রাপ্ত আসনসংখ্যার দ্বিগুণ আসন দিতে হবে এই তফশিলিদের।

দল গঠন:

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আম্বেদকর সর্বভারতীয় নিপীড়িত শ্রেণির কংগ্রেস (AIDCC), ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন শ্রমিক দল (ILP) ও ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে নিখিল ভারত তফশিলি সংগঠন (AISCF) প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়।

মূল্যায়ন:

এভাবে আম্বেদকর দলিতদের অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম করেন। কংগ্রেস আম্বেদকরের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে জগজ্জীবন রামকে তুলে ধরে স্বার্থসিদ্ধি করে। আম্বেদকর সংবিধানের খসড়া কমিটির সভাপতিও ছিলেন। ফলত, তিনি সংবিধানে দলিতদের অধিকারগুলি সুরক্ষিত করেন।

দলিত আন্দোলন

Leave a Reply