ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের ইতিহাস

ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের ইতিহাস – ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব বা কর্নাটিক যুদ্ধ ছিল ১৭৪০ থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যে একটি সিরিজ যুদ্ধ, যা মূলত ঔপনিবেশিক ক্ষমতা এবং ভারতের প্রভাব বিস্তারের লড়াই ছিল। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কর্নাটিক যুদ্ধের মাধ্যমে এই সংঘাত বিস্তৃত হয়। তৃতীয় কর্নাটিক যুদ্ধের ওয়ান্ডিওয়াশের যুদ্ধ (১৭৬০) ফরাসিদের চূড়ান্ত পতন ঘটায় এবং ভারতে ব্রিটিশদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। 

ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের ইতিহাস অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দুটি ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ের প্রতিফলন। এই দ্বন্দ্ব প্রধানত তিনটি কর্ণাটকের যুদ্ধের (১৭৪৬-১৭৬৩) মাধ্যমে প্রকাশ পায়। প্রথম যুদ্ধটি শুরু হয় ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সংঘাতের জেরে, যেখানে ফরাসিরা মাদ্রাজ দখল করে তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। তবে ১৭৪৮ সালে এক্স-লা-শাপেল সন্ধি অনুসারে তারা মাদ্রাজ ইংরেজদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

READ MORE – সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলি আলোচনা করো

ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের ইতিহাস।

উত্তর:-

অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে যেসব ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সাহায্য করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হল দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দু। কর্নাটকে ইংরেজদের প্রধান খাঁটি ছিল মাদ্রাজ আর ফরাসিদের প্রধান ঘাঁটি ছিল পণ্ডিচেরী। এই সময় কর্নাটকের সিংহাসন দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শাসকদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, এই সুযোগে ইংরেজ ও ফরাসিরা নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেশীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে।

(ক) ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের কারণ:-

ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধে ইংল্যান্ড অস্ট্রিয়াকে এবং ফ্রান্স প্রাশিয়াকে সমর্থন করে। সেই যুদ্ধের প্রভাব ভারতেও এসে পড়ে। ভারতে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে দ্বন্দু শুরু হয়। এই দ্বন্দ্ব চলে ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

(খ) কর্নাটকের প্রথম যুদ্ধ:-

১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ নৌসেনাপতি বানের্ট আচমকা ফরাসিদের কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ দখল করলে ফরাসি সেনাপতি ডুপ্লে তার প্রত্যুত্তর দিলেই প্রথম কর্নাটক যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে পণ্ডিচেরী ফরাসি গর্ভনর ডুপ্লেকে সাহায্য ‘ করার জন্য মরিশাস দ্বীপের ফরাসি গভর্নর লা বুর্দনে আটটি জাহাজ নিয়ে মাদ্রাজের অদূরে উপস্থিত হলে ইংরেজরা ভয়ে পালিয়ে যায়। ইংরেজরা কর্নাটকের নবাব আনোয়ারউদ্দিনের শরণাপন্ন হয়। নবাব ডুপ্লেকে মাদ্রাজ ইংরেজদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

নবাবের নির্দেশ ডুপ্লে মেনে নিতে অস্বীকার করায় ক্ষুব্ধ নবাব ফরাসিদের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনি পাঠান। নবাবের বিশাল সৈন্যবাহিনি মুষ্টিমেয় ফরাসি সৈন্যের কাছে পরাজিত হয়। এরপর ইংরেজ সেনাপতি রিয়ার বিশাল নৌবহর নিয়ে ফরাসিদের ঘাঁটি মাদ্রাজ অবরোধ করেন। কিন্তু ডুপ্লে আবারও ইংরেজদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তবে ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে ‘আই-লা-শ্যাপেলের’ সন্ধি দ্বারা ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে, ভারতেও ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের অবসান হয়। ফলে প্রথম কর্নাটক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

(গ) দ্বিতীয় কর্নাটকের যুদ্ধ:-

দ্বিতীয় যুদ্ধটি ছিল মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা দখলের লড়াই। কর্ণাটক ও হায়দ্রাবাদের সিংহাসন নিয়ে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে উভয় পক্ষ নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন করে। এই সময়ে ফরাসি গভর্নর ডুপ্লেক্স ও ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশলগত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা জয়ী হয় এবং ফরাসিদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পায়।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী ডুপ্লে ইংরেজদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে কোনোভাবে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ তিনি ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তিনি যথোপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই ডুপ্লের কাছে সেই সুযোগ আসে। এই সময় হায়দ্রাবাদের নবাব ও কর্নাটকের নবাব মারা গেলে সিংহাসন দখলকে কেন্দ্র করে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ডুপ্লে চাঁদ সাহেবকে কর্নাটকের সিংহাসনে এবং মুজাফফর জঙ্গকে হায়দ্রাবাদের সিংহাসনে বসান। ফলে দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের প্রভাব বৃদ্ধিতে ইংরেজরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। তাই ইংরেজরা চাঁদসাহেব ও মুজাফফর জঙ্গের প্রতিদ্বন্দ্বী যথাক্রমে মোহম্মদ আলি ও নাসির জঙ্গের পক্ষ অবলম্বন করে। রবার্ট ক্লাইভ মাত্র ৫০০ সৈন্য নিয়ে কর্নাটক আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে চাঁদসাহেব পরাজিত হলে ইংরেজরা মোহম্মদ আলিকে নবাব পদে বসান। ফরাসি সরকার ডুপ্লের কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে তাকে স্বদেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়। ডুপ্লে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পর তার জায়গায় আসেন গোদেহ। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে গোদেহু ইংরেজদের সঙ্গে সন্ধি করেন। এই সন্ধির মাধ্যমে দ্বিতীয় কর্নাটক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

(ঘ) তৃতীয় কর্নাটকের যুদ্ধ:-

১৭৫৬ সালে ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলে ভারতে পুনরায় ফরাসি ও ইংরেজদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ ফরাসি ঘাঁটি চন্দননগর অধিকার করে নিলে পণ্ডিচেরীর ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট লালীও ইংরেজদের ফোর্ট সেন্ট ডেভিড দখল করে নেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১৭৬০ সালে ইংরেজ সেনাপতি আয়ার কূট ‘বন্দিবাসের যুদ্ধে’ ফরাসি সেনাপতি লালীকে পরাজিত করলে ফরাসিদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। ইংরেজরা ফরাসিদের পণ্ডিচেরী, মাহে, জিঞ্জি প্রভৃতি স্থানগুলি একে একে দখল করে নেয়। ১৭৬৩ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অবসান হলে ভারতেও ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের অবসান হয়। এই যুদ্ধে ফরাসিরা পরাজিত হয়।

তৃতীয় ও শেষ যুদ্ধটি ছিল ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার চূড়ান্ত পরিণতি। ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলে ভারতেও এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে। ১৭৬০ সালে বন্দিবাসের যুদ্ধে ব্রিটিশরা ফরাসিদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। এই যুদ্ধের পর ১৭৬৩ সালে প্যারিসের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ফরাসিরা তাদের বাণিজ্যকুঠিগুলো ফিরে পেলেও ভারতে সামরিক শক্তি হিসেবে তাদের ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়। এর ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের একমাত্র প্রধান রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।

(ঙ) ইংরেজদের সাফল্য ও ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ:-

ফরাসিদের ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ব্যর্থ এবং ইংরেজদের স্বপ্ন সফল হবার জন্য যেসব কারণগুলি দায়ী ছিল, সেগুলি হল-

> প্রথমত,

ফরাসিরা ইংরেজদের মতো আর্থিক দিক থেকে সমৃদ্ধশালী ছিল না। বাণিজ্যিক উন্নতির অভাবে ফরাসিদের দারুণ অর্থ সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

> দ্বিতীয়ত,

বৃটিশ নৌবাহিনি ফরাসি নৌবাহিনির তুলনায় অধিক শক্তিশালী ছিল। এমনকি ফরাসিদের উপযুক্ত সামরিক ঘাঁটিও ছিল না।

> তৃতীয়ত,

নেতৃত্বের সবলতা ও দুর্বলত জয় ও পরাজয়ের বিশেষ কারণ। ছিল যথাক্রমে ইংরেজ ও ফরাসিদের জয় ও পরাজয়ের বিশেষ কারণ।

• মূল্যায়ন:-

ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের ফলাফল ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই যুদ্ধে ফরাসিরা পরজিত হওয়ার ফলে ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন চিরদিনের মতো বিলীন হয়ে যায়। ইংরেজ অধিকৃত ফরাসি অঞ্চলগুলি ফরাসিরা ফিরে পায়, তবে ফরাসিদের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল যে তারা ঐ অঞ্চলগুলিকে কেবলমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। এইভাবে ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ আরও পরিষ্কার হয়ে যায়।

ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের ইতিহাস

Leave a Reply