মনসবদারি ব্যবস্থা

মনসবদারি ব্যবস্থা ছিল মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক ১৫৭১ সালে প্রবর্তিত একটি প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থা, যা কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা, বেতন এবং সামরিক দায়িত্ব নির্ধারণ করত। “মনসব” একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পদ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের একটি গ্রেড বা পদ দেওয়া হত, যা তাদের বেতন ও দায়িত্ব নির্ধারণ করত এবং মুঘল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা ও শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। 

READ MORE – আকবরের শাসনব্যবস্থা

মনসবদারি ব্যবস্থা

মনসবদারি ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো? এই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর। এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা লেখ।

• মনসবদারী প্রথা:-

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তথা প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মনসবদারি প্রথা। মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর শাসন ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এবং অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ করতে ও তাদের মধ্যে সংরতি গড়ে তুলতে ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে যে শুদ চালু করেন তা ‘মনসবদারি প্রথা নামে পরিচিত। ‘মনসর’ কথার অর্থ ‘পদমর্যাদা’। বি এই পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন তাঁকে বলা হত ‘মনসবদার’। সামরিক ও প্রশাসনিক কা সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন স্তরের মনসবদার পদ গঠন করা হয়। ইতিহাসবিদ আতাহার আলী এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “মনসব হল কেনো ব্যক্তিকে প্রদত্ত মর্যাদা এবং তার কর্তব্য ও দায়িত্বের পরিচয় পত্র”।

• মনসবদারী প্রথার বৈশিষ্ট্য:-

মনসবদারি ব্যবস্থা ছিল মুঘল সম্রাট আকবরের চালু করা একটি প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থা। ‘মনসব’ শব্দের অর্থ পদমর্যাদা, আর এই ব্যবস্থার অধীনে প্রত্যেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে একটি নির্দিষ্ট পদমর্যাদা বা ‘মনসব’ প্রদান করা হতো। এই পদমর্যাদা কেবল সম্মানসূচক ছিল না, এটি একজন কর্মকর্তার বেতন ও দায়িত্বও নির্ধারণ করত। মনসবদারদের দুটি অংশ ছিল: জাত এবং সাওয়ার। জাত পদমর্যাদা দিয়ে একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও বেতন নির্ধারিত হতো, আর সাওয়ার পদমর্যাদা দিয়ে বোঝা যেত তাকে কত সংখ্যক ঘোড়সওয়ার সৈন্য রাখতে হবে। একজন মনসবদারকে তার নির্ধারিত বেতন থেকে সৈন্য ও ঘোড়া রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে হতো।

মুঘল শাসন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে মনসবদারী প্রথার প্রচলন ছিল। ১৮৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাসন ব্যবস্থার অনুকরণে সম্রাট আকবর এই প্রথার প্রচলন ঘটান। এ৫ মনসবদারী প্রথার বৈশিষ্ট। গুলি নীচে আলোচনা কর হল-

[1] মনসবদারি ব্যবস্থার প্রবর্তক:-

সম্রাট আকবরই ছিল মনসবদারি ব্যবস্থার প্রবর্তক। মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বরখাস্ত সবই সম্রাটের উপর নির্ভরশীল ছিল। মনসবদারদের সাধারণভাবে সেনাবাহিনী পোষণ করতে হত এবং যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী দিয়ে সম্রাটকে সাহায্য করার প্রয়োজন হত। তবে সকল মনসবদারের ক্ষেত্রে সামরিক কর্তব্য বাধ্যতামূলক ছিল না। মনসবদারদের কোনো বংশানুক্রমিক দাবি স্বীকৃত ছিল না।

[2] বেতন:-

মনসবদারদের বেতন দেওয়া হত দুভাবে। কিছু মনসবদার তাদের বেতন বাবদ জমি বন্দোবস্ত পেতেন। এই জমিকে বলা হত ‘জায়গীর জমি’। যিনি এই জমির অধিকারী ছিলেন তাকে বলা হত ‘জায়গীরদার’। কিছু মনসবদার নগদে বেতন পেতেন। তাদের বলা হত ‘মনসবদার-ই-নগদি’। আবার কোনো মনসবদার পদমর্যাদা অনুযায়ী কাজ করতে না পারলে তাদের পদ কেড়ে নেওয়া হত।

[3] স্তর:-

অশ্ব ও সেনা সংখ্যার ভিত্তিতে মনসবদারি ব্যবস্থা ৩৩টি স্তরে বিভক্ত ছিল। জাট ও সওয়ার সংখ্যার ভিত্তিতে এই শ্রেণীবিভাগ করা হত। মনসবদারের সর্বনিম্ন স্তর ছিল দশ মনসবদারী এবং সর্বোচ্চ স্তর ছিল দশ হাজার মনসবদারী। উচ্চপদগুলি মূলত রাজ পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট থাকত। মানসিংহ, জয়সিংহ প্রমুখ রাজপুতরা উচ্চপদস্থ মনসবদার ছিলেন।

[4] পদমর্যাদা:-

সম্রাট আকবর বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকেদের যোগ্যতা অনুযায়ী মনসবদার পদে নিযুক্ত করতেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্রাটের কাছ থেকে এই পদ পেতে হত। এই পদ বংশানুক্রমিক ছিল না।

[5] জাট ও সওয়ার:-

আকবরের মনসবদারি ব্যবস্থার দুটি অঙ্গ ছিল ‘জাট’ ও ‘সওয়ার’। একজন মনসবদার ‘জাট’ ও ‘সওয়ার’ এই দুটি পদের অধিকারী হতে পারতেন। ‘জাট’ এর অর্থ হল ‘পদমর্যাদা’। এই পদের ভিত্তিতে একজন মনসবদারের বেতন, পদমর্যাদা ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট হত। ‘সওয়ার’ এর অর্থ হল মনসবদারের অধীনস্থ অতিরিক্ত অশ্বারোহী সেনার সূচক।

[6] বদলি প্রথা ও সম্পত্তি হস্তান্তর:-

মনসবদাররা তাঁদের এলাকার বাইরে জমি পেতেন। সম্রাট তাঁর ইচ্ছে মতো যে-কোনো মনসবদারকে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় বদলি করতে পারতেন। মনসবদারের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি সম্রাটের হস্তগত হত।

[7] জায়গীর প্রদান:-

মুঘল শাসন ব্যবস্থার এক বিশেষ অঙ্গ ছিল জায়গীর প্রথা। মনসবদাররা সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ বেতন বা জায়গীর পেতেন। পরিবর্তে তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা নিয়ে যুদ্ধের সময় মুঘল বাহিনীতে যোগ দিতে হত।

[8] ওমরাহ ও মনসবদার:-

পদমর্যাদা অনুযায়ী মনসবদার নানা শ্রেণীতে বিভক্ত হলেও সাধারণত তাদের দুটি শ্রেণীভেদ ছিল। এক শ্রেণীকে বলা হত ‘ওমরাহ’ এবং অপর শ্রেণীকে বলা হত ‘মনসবদার’। ওমরাহ্ ও মনসবদারের পদমর্যাদার মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য ছিল। যে সকল মনসবদারদের অধীনে এক হাজার, দুই হাজার অথবা বারো হাজার সৈন্য থাকতো তারা ‘ওমরাহ’ নামে পরিচিত ছিল। আর যাদের অধীনে এক হাজারের কম সৈন্য থাকত, তারা ‘মনসবদার’ নামে পরিচিত ছিল।

[9] সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ:-

মনসবদারদের দক্ষতা ও কর্ম নিপুণতা মুঘল সম্রাটদের সন্তুষ্ট করেছিল। এছাড়া যুদ্ধের সময় মনসবদাররা অশ্ব ও সৈন্যের জোগান দেওয়ায় ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুঘল সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হয়।

[10] সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা:-

মনসবদাররা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। এজন্য পর্যটক বার্ণিয়ে উচ্চমর্যাদা বোধসম্পন্ন মনসবদারদের মুঘল সাম্রাজ্যের স্তম্ভ বলে চিহ্নিত করতেন।মনসবদারি ব্যবস্থার কারণে মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, যা সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। মনসবদাররা তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী সৈন্য ও ঘোড়া রাখতেন এবং যুদ্ধের সময় সম্রাটের নির্দেশে তাদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হতেন। এই ব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা সাম্রাজ্যের সীমানা সম্প্রসারণে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সাথে, মনসবদারদের আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য তাদের পদ ও জায়গীর বদলির যে প্রথা ছিল, তা কোনো মনসবদারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে দেয়নি। ফলে সম্রাটের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং কেন্দ্রীয় শাসন সুদৃঢ় হয়।

• মূল্যায়ন:-

আকবরের এই ব্যবস্থাটি মুঘল সাম্রাজ্যকে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি তার অভিজাতদের পদমর্যাদা ও ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করতে সক্ষম হন এবং তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি করে সাম্রাজ্যের প্রতি তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করেন। এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একটি শক্তিশালী, কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী গড়ে তোলা, যা সাম্রাজ্যের বিস্তারে এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। মনসবদাররা তাদের পদের গুরুত্ব অনুযায়ী নগদ বেতন বা জায়গীর (ভূখণ্ডের রাজস্ব আদায়ের অধিকার) পেতেন। জায়গীর পেলেও, এর মালিকানা তাদের কাছে স্থায়ী ছিল না এবং সম্রাট যেকোনো সময় তা বদলি করতে পারতেন। এই ব্যবস্থা মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে মজবুত করে তুলেছিল এবং তা দীর্ঘকাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল।

সম্রাট আকবর মনসবদারদের নগদে বেতন দিতেন, কিন্তু পরবর্তী সম্রাটরা নগদের পরিবর্তে জায়গীর প্রদানের ব্যবস্থা করেন। আর এই জায়গীরদারি ব্যবস্থা পরবর্তী সময়কালে মুঘল রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সৈয়দ নুরুল হাসান তাঁর ‘Jaigirdari cri-sis in Mughal India’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, মনসবদারি ব্যবস্থা রাজ কর্মচারীদের দুর্নীতি, বিলাসিতা ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে বৃদ্ধি করেছিল।

মনসবদারি ব্যবস্থা

Leave a Reply