ইংরেজ ও টিপুর সম্পর্ক – টিপু সুলতান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কট্টর শত্রু ছিলেন এবং তার সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্ক ছিল মূলত যুদ্ধ ও সংঘাতের। তিনি তার রাজ্য মহীশূরের শাসনকর্তা থাকাকালীন ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং তাদের সম্প্রসারণ নীতিকে প্রতিহত করেন। তার বীরত্বপূর্ণ লড়াই ব্রিটিশদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এবং শেষ পর্যন্ত চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি মারা যান।
Table of Contents
READ MORE – 1940 এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন

ইংরেজ ও টিপুর সম্পর্ক
ইংরেজ ও টিপুর সম্পর্ক কি? ইংরেজদের কাছে মারাঠাদের পতনের কারণ।
ভূমিকা:-
টিপু সুলতান ছিলেন মহীশূরের শাসক হায়দার আলীর বীর পুত্র। শাসক হিসেবেও তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও বিচক্ষণ। ভারতের বুকে বিদেশি ইংরেজদের আধিপত্য তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি। তাই জন্মভূমি রক্ষার জন্য তিনি অস্ত্র হাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তাঁর বীরত্বের জন্য তিনি ‘মহীশূরের বাঘ’ নামে পরিচিত।
• ইংরেজদের সঙ্গে টিপু সুলতানের সম্পর্ক:-
[1] দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:-
দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ চলাকালীন হায়দার আলী মৃত্যুবরণ করেন। হায়দারের মৃত্যুর পর মহীশূরের শাসক হন তাঁর পুত্র টিপু সুলতান। তিনি বীরত্বের সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। অবশেষে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি’ দ্বারা এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। উভয়পক্ষ পরস্পরের অধিকৃত অঞ্চল ও যুদ্ধবন্দী ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়। টিপু সুলতান উপলব্ধি করেন যে, ক্ষমতার জন্যই ইংরেজরা মহীশূর দখল করার চেষ্টা করবে। তাই তিনি গোপনে ফ্রান্স, কাবুল, তুরস্ক প্রভৃতি দেশের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন।
[2] তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:-
দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের পর টিপু সুলতান বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে জোর দেন। ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস টিপু সুলতানের এই কার্যাবলিতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। এজন্য তিনি মারাঠা পেশোয়া ও হায়দ্রাবাদের নিজামের সঙ্গে ‘মিত্র চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। কিন্তু মহীশূরকে এই জোটের বাইরে রাখেন। ফলে টিপু সুলতান ক্ষুব্ধ হয়ে কোম্পানির মিত্র রাজ্য ত্রিবাঙ্কুর আক্রমণ করলে তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের (১৭৯০-৯২ খ্রি.) সূচনা হয়। এই যুদ্ধে ইংরেজদের ত্রিশক্তি জোটের কাছে টিপু পরাজিত হন।

[i] শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি:-
ইংরেজরা টিপুর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তম অবরোধ করলে টিপু সুলতান শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি (১৭৯২ খ্রি.) স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই সন্ধির শর্তানুসারে- [i] ইংরেজরা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ৩৩০ লক্ষ পাউন্ড দাবি করে।
[ii] জামিন স্বরূপ টিপুর দুই পুত্রকে ইংরেজদের হাতে সমর্পণ করতে হয়।
[iii] কুর্গ, মালাবার, বরমহাল ও ডিন্ডিগুল অঞ্চল ইংরেজরা লাভ করেন।
[iv] টিপু তার রাজ্যের অর্ধেক অংশ ইংরেজ, নিজাম, মারাঠাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
[v] উভয় পক্ষ একে অপরকে যুদ্ধবন্দী প্রত্যর্পণ করেন।
[3] চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর-:
শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির অপমানজনক শর্ত মেনে নেওয়া টিপুর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই ইংরেজ শক্তিকে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য টিপু ফ্রান্সের সাহায্য লাভের জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেন। কাবুল, কনস্ট্যান্টিনোপল, আরব, মরিশাস প্রভৃতি দেশে সাহায্য চেয়ে তিনি দূত পাঠান। এই সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮-১৮০৫ খ্রি.)। ফরাসিদের সঙ্গে টিপু সুলতানের যোগাযোগের সংবাদে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। এজন্য লর্ড ওয়েলেসলি টিপু সুলতানকে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে আহ্বান জানান। কিন্তু স্বাধীনচেতা টিপু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে লর্ড ওয়েলেসলি ও হায়দ্রাবাদের নিজামের সম্মিলিত বাহিনী মহীশূর রাজ্য আক্রমণ করে। শুরু হয় চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯৯ খ্রি.)। এই যুদ্ধে টিপু সুলতান পরাজিত ও নিহত হন।
[i] ফলাফল:-
বিজয়ী ইংরেজরা মহীশূরের বৃহৎ অঞ্চল দখল করে এবং রাজ্যের একাংশ নিজাম লাভ করে। মহীশূরের এক ক্ষুদ্র অংশ প্রাচীন হিন্দু রাজার জনৈক বংশধরকে দেওয়া হয়। এইভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী মহীশূর রাজ্যের অবলুপ্তি ঘটে। দাক্ষিণাত্যে কোম্পানির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

◆ মারাঠাদের ব্যর্থতার কারণ:-
ব্রিটিশ শক্তির সম্প্রসারণ প্রতিরোধে মারাঠাদের ব্যর্থতার কারণগুলি নিম্নরূপ-
[1] নেতৃত্বের অভাব:-
দক্ষ ও প্রতিভাবান নেতার ওপর নির্ভর করেই মারাঠা সাম্রাজ্য টিকে ছিল। পেশোয়া প্রথম বাজীরাও মারাঠা শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর মহাদজী সিন্ধিয়া ও নানা ফড়নবীশ ছিলেন প্রতিভাবান নেতা। কিন্তু ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে এই দুই নেতার মৃত্যু হলে মারাঠা জাতির যে অপরিমেয় ক্ষতি হয় তা আর পূরণ হয়নি। ফলে উপযুক্ত নেতার অভাবে মারাঠা শক্তির পতন নিশ্চিত হয়ে পড়ে।
[2] স্বার্থপরতা ও পারস্পরিক বিরোধ:-
মারাঠা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও ছিলেন ষড়যন্ত্রপরায়ণ ও স্বার্থপর। ক্ষমতার লোভে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে ‘বেসিনের চুক্তি’ (১৮০২ খ্রি.) স্বাক্ষর করে মারাঠাদের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেন। দৌলত রাও সিন্ধিয়া এবং যশবন্ত রাও হোলকার ছিলেন স্বার্থপর ও ক্ষমতালোভী। ফলে মারাঠা নেতাদের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ লেগে থাকত। জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে মারাঠা নেতাদের নিজ স্বার্থ সিদ্ধির চেষ্টা এবং পারস্পরিক বিরোধ মারাঠাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
[3] অর্থনৈতিক দুর্বলতা:-
মারাঠা সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল ছিল। মহারাষ্ট্রের পাথুরে ও অনুর্বর জমিতে ভালো ফসল না হওয়ায় রাজস্ব আদায় কম হত। ফলে বিশাল সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহের জন্য মারাঠা শাসকরা প্রজাদের ওপর চৌথ ও সরদেশমুখী নামে দুই প্রকার অতিরিক্ত কর আদায় করত। ফলে মারাঠা শাসকদের।

[4] মারাঠাদের মিত্রহীনতা:-
মারাঠা সাম্রাজ্যের কোনো প্রতিবেশী মিত্র রাজ্য না থাকায় বৈদেশিক আক্রমণের সময় মিত্র রাজ্যের সহায়তা মারাঠারা পায়নি। ফলে ইংরেজ ও নিজাম বাহিনীর আক্রমণের সময় মারাঠাদের নিজেদের ক্ষমতাতেই লড়তে হয়েছে।
[5] সামরিক দুর্বলতা:-
মারাঠা সৈন্যবাহিনীর রণকৌশল ছিল ভ্রান্ত ও দুর্বল। তারা মূলত অশ্বারোহী সেনা হিসেবে এবং গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী ছিল। কিন্তু মারাঠাদের দুর্বল পদাতিক বাহিনী নৌবাহিনীর অভাব, যোগ্য সেনাপতির অভাব, গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্রের স্বল্পতা প্রভৃতি তাদের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল। অন্যদিকে ইংরেজ বাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল ও যুদ্ধে পটু। এছাড়া ইংরেজের শক্তিশালী নৌবহরের দৌলতে মারাঠারা ধরাশায়ী হয়।
[6] কুটনৈতিক ব্যর্থতা:-
কুটনীতির ক্ষেত্রে ইংরেজরা ছিল মেকিয়াভেলির নীতিতে দক্ষ এবং অপরদিকে মারাঠারা ছিল ব্যর্থ। ইংরেজদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ন্যায় নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করা। আগ্রাসন, পররাজ্য গ্রাস এবং চক্রান্তকেই তারা সারবস্তু হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে কূটনীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে সহজেই ইংরেজরা মারাঠাদের পতন ঘটায়।
[7] রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি:-
পানিপথের যুদ্ধের পর মারাঠা রাজনীতিতে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। ফলে উত্তর ভারতে হিন্দু পাদ-পাদশাহীর আদর্শ মিথ্যা প্রতিপন্ন হয় এবং ভেঙে যায়। বলপূর্বক কর আদায় করায় প্রজাদের কাছে মারাঠাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এই পরিস্থিতিতে মারাঠা জাতির পক্ষে শৃঙ্খলাবদ্ধ ইংরেজ জাতির বিরুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব ছিল না।
[8] উত্তরাধিকারের জন্য গৃহ বিবাদ:-
মারাঠা পেশোয়া পদের উত্তরাধিকার নিয়ে গৃহ বিবাদ শুরু হলে ইংরেজরা মারাঠা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়। মারাঠাদের এই অভ্যন্তরীণ গৃহবিবাদে ইংরেজদের রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়।

[9] ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তার:-
পেশোয়া প্রথম মাধবরাও-এর নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির পুনরুত্থান ঘটলে মারাঠারা উত্তর ভারতে আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করে। ফলে মারাঠা শক্তিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে পুনা সন্ধির দ্বারা ইংরেজরা পেশোয়াকে বৃত্তিভোগী শাসকে পরিণত করে। এর প্রতিবাদে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে মারাঠারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে মারাঠাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।
[10] জায়গীর প্রথা:-
শিবাজির মৃত্যুর পর জায়গীর প্রথা পুনরায় প্রবর্তন করা হলে রাষ্ট্রীয় সংহতি বিপন্ন হয়। জায়গীরদারদের পারস্পরিক স্বার্থপরতা এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি দুর্বল করে।
• উপসংহার:-
মহীশূর রাজ্যের একজন শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা শাসক ছিলেন টিপু সুলতান। সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে ইংরেজদের আক্রমণে তাঁর মৃত্যু হলে মহীশূর রাজ্যের পতনও নিশ্চিত হয়। টিপু নিজের জন্মভূমি বাঁচাতে যেভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন, এজন্য তাঁকে একজন মহান দেশপ্রেমিক শাসক বলা যায়।