1940 এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন ছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২), যা মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে পরিচালিত হয়। এই দশকে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ (১৯৪০) এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি বিচারকে কেন্দ্র করে গণআন্দোলন (১৯৪৬) এর মতো অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোও ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের অংশ ছিল।
১৯৪০-এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন। এই দশকের শুরুতে, ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ (Quit India) আন্দোলন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই আন্দোলনের ফলে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং অহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে ব্রিটিশদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই গণআন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। একই সময়ে, সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army) ভারতের বাইরে থেকে সামরিক চাপ সৃষ্টি করে। এই সশস্ত্র আন্দোলন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে কাজ করেছিল।
Table of Contents
READ MORE – নেহেরুর শাসনা দিনে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র
1940 এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন

1940 এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলনের প্রকৃতি ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
১৯৪০-এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রকৃতি ছিল তীব্র এবং ব্যাপক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এর প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা এই দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। এই দশকে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মতো গণ-অসহযোগিতা আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়।
১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রকৃতি ছিল: –
গণ-অসহযোগিতা:-
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি গণ-অসহযোগিতা আন্দোলন, যেখানে গান্ধীজি “করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে” (করব অথবা মরব) ডাক দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে ব্যাপক গণ-অসহযোগিতা, ধর্মঘট, এবং আইন অমান্য করার ডাক দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ব্রিটিশ শাসনের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও উৎসাহিত করে।

বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ:-
এই দশকে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মহিলা সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং প্রশাসন যে অত্যাচার এবং শোষণ চালিয়ে এসেছিল তা এই দশকে একদমই অসহ্যকর হয়ে উঠেছিল ভারতীয়দের কাছে। ভারতীয়রা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকে ব্রিটিশ শাসনের এই বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে। এই মুক্তির জন্য ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতন। বিভিন্নভাবে মহিলা, কৃষক, শ্রমিক, সহ সমাজের মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত শ্রেণীও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আদর্শিক পরিবর্তন:-
আন্দোলনের আদর্শে পরিবর্তন দেখা যায়, যেখানে স্বাধীনতার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিও স্থান করে নেয়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম পর্বে লক্ষ্য বা আদর্শ ছিল কেবলমাত্র দেশকে স্বাধীন করা। কিন্তু 1940 এর দশকে যখন শিক্ষা অনেক উন্নত হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুক্তিবাদী এবং উন্নত চিন্তাধারার অধিকারী হয়। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা যখন ভারতীয়দের মধ্যে প্রসারিত হতে শুরু করে তার প্রভাবে মানুষ ধীরে ধীরে শিক্ষিত মনস্ক হয়ে উঠতে শুরু করে। তাই এই দশকে ভারতবাসী কেবলমাত্র স্বাধীনতা অর্জনে নয় দেশকে কুসংস্কার মুক্ত এবং এক উন্নত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়েছিল।

ব্রিটিশদের দুর্বলতা: –
যুদ্ধের কারণে ব্রিটিশদের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভারতবাসীর কাছে একটা বড় সুযোগ হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইংল্যান্ড ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে । সেই দুর্বলতার কারণে ইংরেজরা ভারতবর্ষে যে সামরিক শাসন জারি করে রেখেছিল তার ভিত্তিতে দুর্বলতার চিহ্ন দেখা দেয়। এই সুযোগ নিয়ে ভারতবাসী এই দশকে চিন্তা ভাবনা শুরু করে যে চরম আন্দোলন যদি গড়ে তোলা যায় তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা দেশকে স্বাধীন করে তুলতে পারবো।
চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীনতা: –
এই দশকের আন্দোলনগুলির ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯ ৪০-এর দশকে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলেছিল তা ছিল মূলত চূড়ান্ত পর্যায়ের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ভারতবাসী এই সময় মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে কোনভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতেই হবে। তাই এই সময় আন্দোলন গুলি শক্তিশালীভাবে জন সমর্থন সহ গড়ে উঠেছিল। যেমন ভারত ছাড়ো আন্দোলন , তেভাগা আন্দোলন ইত্যাদির কথা আমরা বলতে পারি।
১৯৪০-এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, যা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। এই দশকে, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজের কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক আলোচনা-সমঝোতার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানো হয়। এই সময়কার ঘটনাগুলি স্বাধীনতা অর্জনের পথকে সুগম করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো:-
ভারত ছাড়ো আন্দোলন:-
১৯৪২ সালের ৮ই আগস্ট গান্ধীজি “করেঙ্গো ইয়ে মরেঙ্গো” (করব অথবা মরব) ডাক দিয়ে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সূচনা করেন। এই গণ-আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকদের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জনগণের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে।

আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম:-
সুভাষ চন্দ্র বসু কর্তৃক গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতে প্রবেশ করে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করে। যদিও এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি, এটি স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে।
রাজনৈতিক আলোচনা:-
ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা প্রদানের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা শুরু করে। এই আলোচনাগুলো ছিল জটিল এবং বিভিন্ন মতবিরোধে জর্জরিত, কিন্তু এগুলো স্বাধীনতা প্রাপ্তির পথকে প্রশস্ত করে।
বিশ্ব পরিস্থিতি:-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয় এবং বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। এর ফলস্বরূপ, ব্রিটিশ সরকার ভারতে স্বাধীনতা প্রদানে বাধ্য হয়।
ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস:-
এই দশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একত্রিত হয়। এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের দৃঢ়তাকে প্রতিফলিত করে।
1940 এর দশকের এই আন্দোলনগুলি শুধুমাত্র ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটায়নি, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভারত গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। এই সময়ের ঘটনাগুলি ভারতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
1940 এর দশকের শেষ দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক ও সামরিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে মনোভাব ব্রিটিশ সরকারকে বুঝতে বাধ্য করে যে ভারতে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এই সম্মিলিত চাপই ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, বরং ভারতীয় জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদের এক প্রবল ঢেউ তৈরি করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা এনে দেয়।
মূল্যায়ন:
1940 এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন ছিল স্বাধীনতার পথে একটি চূড়ান্ত পর্যায়। এই দশকে মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২) দেশের সমস্ত শ্রেণির মানুষকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। যদিও ব্রিটিশরা কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমন করেছিল, কিন্তু এটি ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। একই সময়ে, সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রিটিশদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং এই দুটি আন্দোলনের সম্মিলিত প্রভাবই শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই আন্দোলনগুলো ব্রিটিশ শাসনের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।