ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে 1942 সালের আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্ব – 1942 সালের আগস্ট আন্দোলন, যা ভারত ছাড়ো আন্দোলন (Quit India Movement) নামেও পরিচিত, ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনটি মহাত্মা গান্ধীর ডাকে শুরু হয়েছিল এবং এর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন। এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি চূড়ান্ত এবং সর্বব্যাপী গণ-আন্দোলন।
Table of Contents
READ MORE – উনিশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রকৃতি ও তাৎপর্য
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে 1942 সালের আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্ব

আন্দোলনের পটভূমি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই ভারতকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অসহযোগিতা শুরু করে এবং স্বাধীনতার দাবি জানায়। ব্রিটিশরা কোনো ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় গান্ধীজি ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ (করব অথবা মরব) স্লোগান দিয়ে এই আন্দোলনের ডাক দেন।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের পটভূমি গড়ে ওঠে কয়েকটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতের জনগণের মতামত বা অনুমতি ছাড়াই দেশকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে দেয়। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্রিপস মিশন পাঠালেও সেই প্রস্তাবে পূর্ণ স্বাধীনতার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, বরং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কিছু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম নেয়।
এ সময় দেশজুড়ে স্বাধীনতার দাবি তীব্র হতে থাকে, যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশদের অবিলম্বে দেশ ছাড়ার দাবি জানায় এবং “করো বা মরো” (Do or Die) স্লোগানে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জাপানের অগ্রযাত্রা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপনিবেশগুলোয় ব্রিটিশদের পরাজয়ও আন্দোলনের পেছনে প্রভাব ফেলেছিল, কারণ এতে ব্রিটিশ শক্তি দুর্বল হয়েছে বলে মনে করা হয়। এসব পরিস্থিতিই আগস্ট আন্দোলনের জন্ম দেয় এবং ভারতের স্বাধীনতার পথে এটি হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক বাঁক।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে 1942 সালের আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্ব
(১) ক্রিস্ মিশনের ব্যর্থতার পর ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে এপ্রিল গান্ধীজি ‘হরিজন’ পত্রিকা মারফৎ ব্রিটিশ সরকারকে অবিলম্বে ভারত ত্যাগের পরামর্শ দেন। এটিই হল গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ পরিকল্পনার প্রথম উল্লেখ।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুলাই কংগ্রেস কার্যনির্বাহক কমিটি ওয়ার্ধায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। এই প্রস্তাবে বলা হয় যে, কেবলমাত্র ভারতের স্বার্থেই নয়-ফ্যাসীবাদ, নাৎসীবাদ ও অপরাপর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্যও ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন প্রত্যাহৃত হওয়া প্রয়োজন। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে নিয়ে ভারতে একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং এই সরকার ভারতের সকল শ্রেণীর গ্রহণযোগ্য একটি সংবিধান রচনা করবে।
(২) বাংলা, : বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র, গুজরাট, কেরালা প্রভৃতি স্থানের সর্বস্তরের কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভূমিহীন দরিদ্র কৃষক, ক্ষেত মজুর, ধনী কৃষক ও জমিদাররা হাতে হাত মিলিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। বিহারে কৃষকরাই ছিল আন্দোলনের প্রধান শক্তি। বিহারের পালামৌ জেলায় কৃষ্ণরা যদুবংশ সাহারের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। কাটিহারে তালেবর সারার শত শত সাঁওতালকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
বোম্বাই-এর গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে গেরিলা তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বোম্বাই-এর খান্দেশ ও সাতারা এবং গুজরাটের ব্রোচ জেলায় ব্যাপক কৃষক আন্দোলন দেখা দেয়। বহু স্থানে শুরু হয় খাজনা বন্ধ আন্দোলন। আগস্ট আন্দোলনের কালে কৃষকরা জমিদারের বিরুদ্ধে কোন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় নি। যে-সব জমিদার ইংরেজ-পক্ষ অবলম্বন করেছিল কৃষকরা কেবলমাত্র তাদের ওপরেই আক্রমণ চালায়।

(৩)নারী সমাজ প্রবল উৎসাহের সঙ্গে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত। মেয়েদের গোপনে সংগঠিত করার কাজে অরুণা আসফ আলি ও সুচেতা কৃপালনী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এ সময় ঊষা মেহতা গোপনে কংগ্রেসের বেতার কেন্দ্র চালাতেন। মেদিনীপুরের ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’-এ মহিলারা নারী সমাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহিলা স্বেচ্ছাসেবিকাদের নিয়ে গঠিত ‘ভগিনী সেনা’ এর প্রমাণ। মেদিনীপুরের ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা, আসামের ১৩ বছরের কিশোরী কনকলতা বড়ুয়া, পঞ্জাবের গৃহবধূ ভোগেশ্বরী ফুকোননী প্রমুখ বীরাঙ্গনা নারীর নাম আগস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
(৪) শ্রমিক শ্রেণীর ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কমিউনিস্টরা এই আন্দোলনের বিরোধিতা করায় যে-সব শিল্প-শহরে তাদের প্রভাব ছিল যেখানে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে দূরে সরে ছিল। এই কারণে বোম্বাই ও কলকাতায় শিল্পে মোটামুটি , শান্তি ছিল। ‘ভারতের স্ট্যালিনগার্ড’ আমেদাবাদে শিল্প-শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করত গান্ধীপন্থী শ্রমিক সংগঠন ‘মজুর মহাজন’। ৯ই আগস্ট নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে কারখানাগুলি প্রায় সাড়ে তিনমাস বন্ধ ছিল। বিহারের জামসেদপুরে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ১৩ দিন ধরে ধর্মঘট চালায়।

বোম্বাই-এর শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রাখে এক সপ্তাহেরও বেশি। আহমদনগর, পুণার শ্রমিকরা বেশ কয়েকমাস ধরে সক্রিয় ছিল। বিহারের কয়লাখনি, বাংলা ও অসামের চা-বাগানে আন্দোলনের বিশেষ কোন প্রভাব পড়ে নি। বাংলায় ট্রাম, বন্দর, রেল বা চটকলে কোন ধর্মঘট হয় নি। এখানে ধর্মঘটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হাওড়া, হুগলি ও মেটিয়াব্রুজের বস্ত্রশিল্প এবং কলকাতা-হাওড়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানাগুলির বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের ধর্মঘট।
(৫) ডঃ বিপান চন্দ্র বলেন যে, জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ৪২-এর আন্দোলন হল চূড়ান্ত পর্যায়। (১) এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, জনমনে কংগ্রেসের প্রভাব ব্যাপক ও সর্বাত্মক। (২) এই আন্দোলন দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্বাধীনতার জন্য জনসাধারণ প্রস্তুত এবং তা অর্জনের জন্য জনসাধারণ সর্বপ্রকার অত্যাচার, চরম লাঞ্ছনা-এমনকী মৃত্যুবরণেও প্রস্তুত। (৩) মুসলিম লীগ এই আন্দোলনে যোগ না দিলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল এই আন্দোলনের বিশাল সম্পদ। এ সময় কোন সাম্প্রদায়িক বিরোধ বাধে নি। ডঃ ডি. এন. পানিগ্রাহী (Dr. D. N. Panigrahi) লিখছেন যে, মুসলিম লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও উত্তরপ্রদেশ, বিহার, চট্টগ্রাম, শিলচর প্রভৃতি স্থানের বহু মুসলিম এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং নানা ভাবে আন্দোলনকারীদের সাহায্য করেন।

(৬)প্রকৃত অর্থে, এই আন্দোলন ালন ছিল গণ-বিপ্লব। জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমিক-কৃষক সামিল হলেও, আগস্ট আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক, সর্বাত্মক ও স্বতঃস্ফূর্ত। ডঃ সুমিত সরকার বলেন যে, বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের অংশগ্রহণের ফলেই আগস্ট-বিদ্রোহ দুর্দমনীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। পন্ডিত জওহরলাল নেহরু এই আন্দোলনকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে লেখেন যে, “নেতা নেই, সংগঠন নেই, উদ্যোগ-আয়োজন নেই, কোন মন্ত্রবল নেই, অথচ একটা অসহায় জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মপ্রচেষ্টার আর কোন পন্থা না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল-এ দৃশ্য প্রকৃতই বিস্ময়ের ব্যাপার।
(৭)ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন-“১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের গণবিদ্রোহ প্রকৃত অর্থেই ছিল সৈনিকের যুদ্ধ। সেনাপতি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কিন্তু সৈনিকদের ভূমিকা ছিল গৌরবময়। কারণ তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হয়েছিলেন।” সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বলেন-ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে এ ধরনের ব্যাপক বিদ্রোহ ইতিপূর্বে আর কখনো সংঘটিত হয় নি। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি-র মতে, এই আন্দোলন ছিল ‘গণযুদ্ধ’। জওহরলাল নেহরু একে ‘স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান’ (‘Spontaneous mass upheaval’) বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক ফ্রান্সিস হাটচিনস্ (Francis Hutchins)-ও এই আন্দোলনকে ‘স্বতঃস্ফূত বিপ্লব (‘Spontaneous revolution’) বলে চিহ্নিত করেছেন।
(৮)বড়লাট লিলিঙ্গো এই বিদ্রোহকে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের পর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেছেন। অরুণচন্দ্র ভূঁইয়া তাঁর ‘The Quit India Movement’ গ্রন্থে বলেছেন যে, এই আন্দোলনের ফলে একটি অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ ও জাতীয় ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে এবং এর ফলে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা ভারত-ত্যাগে বাধ্য হয়। তাঁর মতে, এই আন্দোলন ছিল ‘যুবকদের আন্দোলন’ (‘a movement of the youth’)। ডঃ অম্বা প্রসাদ বলেন যে, ১৯৪২-এর বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তি প্রস্তুত করে।
(৯)বড়লাট ওয়াভেল ব্রিটিশ সরকারকে লেখেন যে “ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দিন শেষ হয়েছে। পুনরায় এই রকম একটি আন্দোলন শুরু হলে তা মোকাবিলা করার শক্তি সরকারের নেই। আয়ারল্যান্ড ও মিশরে যেভাবে ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে, ভারতে এখনই তা করা দরকার।” এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, মুক্তি সংগ্রামে ভারতের জয় অনিবার্য। কখন ও কী অবস্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ভারতে কী ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে কেবলমাত্র এটুকুই অমীমাংসিত রইল।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে 1942 সালের আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্ব- এই আন্দোলনের ফলে ভারতীয়দের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্পের জন্ম হয়। এটি প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতবাসী ঐক্যবদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন কেবল একটি প্রতিবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক entscheidende (চূড়ান্ত) অধ্যায়।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে 1942 সালের আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্ব