শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) হলো একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া যেখানে কৃষি ও হস্তশিল্প-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে যন্ত্রচালিত উৎপাদন পদ্ধতির দিকে পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনটি গ্রেট ব্রিটেন থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রযুক্তি, অর্থনীতি, এবং সমাজের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিল্প বিপ্লব ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনে শুরু হওয়া এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া ছিল, যেখানে কৃষিভিত্তিক ও হস্তশিল্প নির্ভর সমাজ থেকে আধুনিক শিল্প ও যন্ত্রচালিত উৎপাদন ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটে।
Table of Contents
SEE MORE: PGHI COMPLETE SUGGESTION 2025 5th PAPER NSOU M.A by expert
শিল্প বিপ্লব
অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডের সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব সংগঠনের কারণ আলোচনা কর।

ভূমিকাঃ
মানুষের কায়িক শ্রমের পরিবর্তে যন্ত্রের সাহায্যে শিল্পের ক্ষেত্রে যে আমূল পরিবর্তন এসেছিল তাহা সাধারণভাবে শিল্পবিপ্লব নামে পরিচিত। সপ্তদশ শতক থেকে ইউরোপে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। এই শিল্পবিপ্লব সর্বপ্রথম ঘটেছিল ইংল্যান্ডে।
ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্প-বিপ্লবের কারণঃ
প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সুবিধাঃ
ইংল্যান্ডের ভেজা, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া বস্ত্রশিল্পের যেমন- সহায়ক ছিল তেমনি মানুষের কায়িক পরিশ্রমও লাঘব হত। এছাড়া ইংল্যান্ডের মাটির নীচে প্রচুর কয়লা ও লোহা থাকায় ভারী শিল্প গড়ার সুবিধা হয়।
মূলধনের সরবরাহঃ
ইংল্যান্ডের মূলধনের যোগান থাকায় শিল্প স্থাপনের কাজ সহজতর হয়। ইংল্যান্ডের বণিকরা বিভিন্ন উপনিবেশগুলি থেকে বিভিন্ন দ্রব্য ইউরোপের বাজারে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। বণিকরা এই মুনাফা শিল্পে বিনিয়োগ করতে থাকে। ব্যাঙ্কগুলিও অধিক মুনাফা লাভের আশায় শিল্পের উন্নয়ণ ও প্রসারে অর্থ লগ্নি করতে থাকে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাবঃ
অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে লোকসংখ্যা প্রচুর পরিমানে বৃদ্ধি পায়। এরফলে শিল্পজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এর সাথে গড়ে ওঠে শিল্পজাত দ্রব্যের বাজার। গ্রামের বাড়তি মানুষ শহরে চলে এসে শিল্প-কারখানায় শ্রমিকের কাজ শুরু করে। ফলে কারখানায় সুলভ শ্রমিকের সুবিধা হয়।
কৃষির উন্নতিঃ
ইংল্যান্ডে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথেই কৃষির তথা খাদ্য উৎপাদনের উন্নতি ঘটে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য বাড়তি লোকের খাদ্য সমস্যার সমাধান করে। কৃষকেরা উদ্বৃত্ত শস্য বিক্রি করে যে অর্থ পায় তা শিল্প উৎপাদনে ও শিল্পদ্রব্য ক্রয়ে বিনিয়োগ করে। এর ফলে শিল্পের প্রসার ঘটে এবং শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
বাজারের সম্প্রসারণঃ
ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হওয়ার ইংল্যান্ডের পক্ষে একটি শক্তিশালী বহির্বাজার গড়ে তোলা সম্ভবপর হয়েছিল। কাঁচামাল আমদানি এবং শিল্পজাত দ্রব্যের রপ্তানির পক্ষে এই বাজারগুলি ছিল খুবই উপযুক্ত।
পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতিঃ
ইংল্যান্ডের পরিবহন ব্যবস্থা ছিল বেশ উন্নত। অনেক বন্দর গড়ে ওঠায় সমুদ্রপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। নৌ-পথ ছাড়াও রেলপথ পরিবহনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

বিভিন্ন যন্ত্রপাতির আবিষ্কারঃ
এই পরিস্থিতিতে অষ্টাদশ শতকে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির আবিষ্কার শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল। এই আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতিগুলির মধ্যে প্রথমে বস্ত্রবয়ন শিল্পের উপযোগী যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হয়েছিল। এর ফলে ইংল্যান্ডেই প্রথম বস্ত্র শিল্পের মাধ্যমে শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল। যেমন-
বস্তুবয়ন শিল্পের আবিষ্কারঃ
সূতা কাটা ও কাপড় বোনার জন্য দ্রুতগতিসম্পন্ন উড়ন্ত মাকু আবিষ্কার হয়। উন্নত মানের সূতো কাটার জন্য হারগ্রীভস্ স্পিনিং জেনি আবিষ্কার করেন। এরপর জন কার্টরাইট আবিষ্কার করেন পাওয়ার লুম। এভাবে যন্ত্রপাতির আবিষ্কারে বস্ত্রবয়ন শিল্পে যুগান্তর ঘটে।

বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারঃ
জেমস ওয়াট ‘বাষ্পীয় ইঞ্জিন’ আবিষ্কারকরলে শিল্পোৎপাদনে যথার্থই বিপ্লব ঘটে। এর পূর্বে জলশক্তির দ্বারা যন্ত্রগুলি চালানোয় কিছুটা অসুবিধা দেখা দিত। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারের ফলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হল। বড়ো বড়ো কলকারখান চালু করাও এর ফলে সহজসাধ্য হল। জেমস ওয়াটকে এই কারণে বাষ্পযুগের প্রবর্তক বলে অভিহিত করা হয়।
ডারী শিল্পের উন্নতিঃ
ইঞ্জিন, বয়লার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি করতে প্রচুর লোহার প্রয়োজন ছিল। ১৭৬০ খ্রীঃ জন স্মিটন ‘ব্ল্যাস্ট ফার্নেস’ বা লোহা গালানোর চুল্লি আবিষ্কার করেন। এরফলে আকরিক লোহাকে শোধন করে উৎকৃষ্ট লোহা তৈরী করা শুরু হয়। অন্ধকার খনিগর্ভে শ্রমিকদের কাজের জন্য হামফ্রে ডেভি আবিষ্কার করেন সেফটি ল্যাম্প বা নিরাপদ বাতি।

পরিবহন ব্যবস্থার বিপ্লবঃ
জর্জ স্টিফেনসন তাঁর বিখ্যাত বাষ্পচালিত রেল ইঞ্জিন ‘রকেট’ তৈরী করে যাতায়াত ব্যবস্থার এক যুগান্তর আনেন। রেলের মাধ্যমে মাল পরিবহনের কাজ সহজ হয়। ফুলটন বাষ্পচালিত নৌকা বা জাহাজ নির্মান করেন। জেমস ব্রিন্ডলি উদ্ভাবন করেন খাল কাটার নতুন পদ্ধতি। এতে ইংল্যান্ডে পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সৃষ্টি করে।
উপসংহারঃ
সবশেষে বলা যায় যে, শিল্পের প্রসারের জন্য যে সকল উপাদান ও উপকরণের প্রয়োজন যেমন- সুলভ শ্রমিক, মূলধন, খনিজ দ্রব্য, উপযুক্ত বাজার, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা প্রভৃতি তাহা ইংল্যান্ডে সুলভে ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যেত। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। ফলে ইংল্যান্ডেই সর্বপ্রথম শিল্পবিপ্লব হওয়া ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।