শব্দদূষণ-উৎস/কারণ Sound Pollution-Sources/Causes

শব্দদূষণ-উৎস/কারণ Sound Pollution-Sources/Causes – শব্দদূষণ হলো এমন এক ধরনের পরিবেশ দূষণ যা মানুষের কান এবং স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকর। এটি কেবল শহরের কোলাহল নয়, বরং বিভিন্ন যান্ত্রিক ও সামাজিক উৎস থেকে সৃষ্ট অবাঞ্ছিত শব্দের সমষ্টি। যানবাহনের তীব্র হর্ন, কলকারখানার যন্ত্রপাতির ঘর্ঘরানি, নির্মাণকাজের বুলডোজার ও ড্রিলের শব্দ, এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে মাইকের উচ্চ আওয়াজ—এগুলো সবই শব্দদূষণের প্রধান কারণ। এই দূষণ মানুষের মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তির হ্রাস এবং স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর উৎস ও কারণগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Table of Contents

READ MORE – জলদূষণ-উৎস Water Pollution-It’s Sources

শব্দদূষণ-উৎস/কারণ Sound Pollution-Sources/Causes

শব্দদূষণের সংজ্ঞাঃ

মানুষের গ্রহণযোগ্যতার অতিরিক্ত সূরবর্জিত কর্কশ শব্দ যা মানুষের শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটায় এবং শরীর ও মনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তাকে শব্দদূষণ বলে।

কোলাহল পরিমাপের মূল একক হল বেল (Bel)। বেলের এক-দশমাংশকে ডেসিবেল বলে (1) বেল 10 ডেসিবেল।

ডেসিবেল (db) 10 log10

নির্ণীত শব্দ প্রাবল্য (1)

প্রামাগ্যের শব্দ প্রাবল্য (10)

দূরভাষের আবিষ্কর্তা আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের নামানুসারে শব্দের এককের নাম বেল নামকরণ হয়েছে।

কোলাহলের মাত্রা পরিমাপের পদ্ধতি (Noise level measurement process):

Sound Level Meter:

(1)এই যন্ত্রের সাহায্যে রৈখিকভাবে শব্দের চাপ পরিমাপ করা যায়।

② Noise Dosimeters: বাসস্থানে শব্দদূষণের মাত্রা নির্ণয় করার ক্ষেত্রে এই যন্ত্র ব্যবহৃত হয়।

Calibrators: সাউন্ড লেভেল মিটার থেকে পাওয়া শব্দ মাত্রা নিখুতভাবে নির্ধারণ করার জন্য Calibrators ব্যবহার করা হয়।

এছাড়াও④ Magnetic Tape Recorder, Statistical Analyser |

কোলাহলের মাত্রা নির্ধারণ (Determination of noise level):

সাধারণত কোলাহল পরিমাপের একক হল ডেসিবেল (dB)। এটি লগারিদমিক্ স্কেলে প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রত্যেক 10 ডেসিবেল বৃদ্ধি পেলে শব্দের তীব্রতার 10 গুণ বৃদ্ধিকে সূচিত করে। ভারতে ISI-এর নির্ধারিত মাত্রা অনুসারে জনবসতিপূর্ণ অম্বুলে কোলাহলে সর্বোচ্চ সহনশীলতা মাত্রা 35-45 dB। সুস্থ মানুষ দিনে সর্বোচ্চ ৪0 dB মাত্রার শব্দ সহ্য করতে পারে। যদি কোনো মানুষ ৪ ঘণ্টারও বেশি সময় 90 dB-র মাত্রার শব্দের মধ্যে থাকে তবে বধিরতায় আক্রান্ত হবে। শব্দের ডেসিবেল স্কেলে 0-140 পর্যন্ত ভাগ আছে। 65 dB-এর বেশি শব্দের তীব্রতাকে কোলাহল বা Noise বলে।

নীচে একটি সারণিতে শব্দের তীব্রতা পরিমাপ ডেসিবেল উল্লেখ করা হল

শব্দের উৎস ডেসিবেল

  1. ক্ষীণতম শ্রবণযোগ্য শব্দ 0
  2. পাতা নড়ার শব্দ 10
  3. 4 ফুট দূরত্বের ফিশফিশ শব্দ 20
  4. রাতের শয়নকক্ষ 30
  5. শহরের নিঃশব্দ রাস্তাঘাট বা পাঠাগার 40
  6. শান্ত অফিস 50
  7. 12 ফুট দূরত্বের স্বাভাবিক কথাবার্তা 60

শব্দদূষণের উৎস (Sources of Noise Pollution):

বাজ পড়ার শব্দ এবং মেঘের গর্জন প্রভৃতি প্রাকৃতিক কারণ ছাড়া বেশিরভাগ শব্দদূষণ মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন ক্রিয়ায় ঘটে। শব্দদূষণের প্রধান কারণ বা উৎসগুলি নিম্নরূপ-

① যানবাহনের দ্বারা শব্দদূষণ:

শব্দদূষণের একটি অন্যতম কারণ হল যানবাহন। বাস, লরি, মোটরগাড়ি, ট্রাম, টেম্পো প্রভৃতি চলাচলের অস্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টিকারী শব্দ এবং বিভিন্নপ্রকার বৈদ্যুতিক হর্নের তীব্রতাও মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

② রেল পরিবহণের মাধ্যমে শব্দদূষণ:

রেলগাড়ি একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার সময় এবং রেলস্টেশনে যাত্রী ওঠানামার সময় শব্দদূষণ ঘটে।

③ বিমান পরিবহণের দ্বারা শব্দদূষণঃ

এরোপ্লেন, হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ার সময় এবং আকাশপথে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পরিবহণের সময় বিকট শব্দ সৃষ্টি করে।

④ বিভিন্ন শিল্পকলকারখানার যন্ত্রের মাধ্যমে শব্দদূষণঃ

যন্ত্রের আওয়াজ কারখানার শ্রমিকসহ কারখানা অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে শব্দদূষণ সৃষ্টি করে। এই সমস্ত কারখানার মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা, টেক্সটাইল লুম, নিউজপেপার প্রেস, চাবি পাঞ্চিং মেশিন, গাড়ি সারাই কারখানা প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মানুষের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব (Effects of Sound Pollution on Human being):

শব্দদূষণ মানবস্বাস্থ্যের ওপর বা মানবজীবনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। অত্যধিক শব্দের ফলে মানুষের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক হয়। অনেক সময় শব্দদুষণের ফলে মানবদেহে অস্থায়ী বা স্থায়ী শারীরিক বা মানসিক রোগ সৃষ্টি হয়।

শব্দদূষণের অস্থায়ী প্রভাব:

① কোনো কারণে উচ্চমাত্রার শব্দ মানুষের কানের পর্দার সাময়িক ক্ষতি করে। এর ফলে অস্থায়ীভাবে মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট হয়। দীর্ঘ সময় 90 ডেসিবেল শব্দের মধ্যে থাকলে আংশিক বধিরতা দেখা দেয়।

② দীর্ঘ সময় ধরে 125 ডেসিবেল শব্দের নিকটে থাকলে কানের মধ্যে যন্ত্রণার উদ্রেক হয়।

③ অনেক সময় জেট বিমানের শব্দ, মাইকের আওয়াজ প্রভৃতি শব্দ শ্রবণে বাধা সৃষ্টি করে। একে মাস্কিং বলে।

শব্দদূষণের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব:

(1) দীর্ঘদিন 100 ডেসিবল শব্দের মধ্যে কাটালে বধিরতা দেখা দেয়। এই মাত্রা অতিক্রম করলে কানের পর্দা ছিঁড়ে যায়।

② দীর্ঘস্থায়ী বিকট আওয়াজ হৃদ্‌স্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দেয়, ধমনির রক্তের চাপ বাড়িয়ে দেয়।

(3)অতিরিক্ত যন্ত্রণাদায়ক শব্দ স্মৃতিশক্তির বিনাশ ঘটায়, নার্ভযন্ত্রের ক্ষতি করে, মানসিক অবসাদ বাড়ায়।

④ বিকট শব্দের ফলে মাথা ধরা, বমি ভাব, খিঁচুনি প্রভৃতি সৃষ্টি করে।

⑤ শব্দদূষণ পাখি ও প্রাণীর প্রজননে বিঘ্ন ঘটায়।

⑥ উচ্চমাত্রার শব্দ পরিবেশের বাস্তুরীতির ভারসাম্য বিঘ্নিত করে।

⑦ যন্ত্রণাদায়ক শব্দ মানুষের স্নায়ুযন্ত্র বা মস্তিষ্ক ও সুষুমাকান্ডকে প্রভাবিত করে।

⑧ রক্তে ক্যালশিয়ামের মাত্রা কমে গিয়ে হাইপোকেলিমিয়া রোগের সৃষ্টি হয়।

⑨ রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস পেয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া এবং গ্লুকোজ বৃদ্ধি পেয়ে হাইপারগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।

⑩ রক্তে ইওসিনোফিলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ইওসিনোফিলিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় (Process of Control of Sound Pollution):

শব্দদূষণ নিম্নলিখিত উপায়ে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করা যায়। যথা- (a) প্রযুক্তিগত উপায়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, (b) আইনসম্মত

উপায়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

প্রযুক্তিগত উপায়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ:

① বিভিন্ন কলকারখানার বা শিল্পসংস্থার পুরোনো আমলের উচ্চ শব্দ বা কর্কশ শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটিয়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করা যায়।

② অনেকক্ষেত্রে, যেসব যন্ত্রপাতি থেকে অবাঞ্ছিত শব্দ উৎপন্ন হয়, সেইসব যন্ত্রপাতির ওপর শব্দ নিয়ন্ত্রণকারী আচ্ছাদনের ব্যবহারের মাধ্যমে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

③ যেসব মানুষ বিভিন্ন শিল্পে বা অন্যস্থানে যেখানে 40 ডেসিবেলের বেশি শব্দের প্রভাব রয়েছে সেখানে কাজ করেন, তাঁদের জন্য শব্দ-প্রতিরোধক ইয়ার প্লাগ, ক্যানাল কাপ এবং ইয়ার মাফ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে শব্দদূষণ ওইসব মানুষের ওপর তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

④ যেসব শিল্পকলকারখানায় প্রচন্ড শব্দ উৎপন্ন হয়, সেখানে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধের জন্য শব্দ-প্রতিরোধী অঞ্চল তৈরি করার প্রয়োজন হয়। ⑤ গাড়ির হর্নের তীব্র আওয়াজ প্রতিরোধ করার জন্য সাইলেন্সার লাগাতে হবে।

আইনসম্মত উপায়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ:

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শব্দদূষণ-বিরোধী আইন প্রচলিত হয়েছে। ভারতেও হাসপাতাল, বিচারালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে 100 মিটারের মধ্যে শব্দ সৃষ্টি করা আইনত নিষিদ্ধ। এ ছাড়াও অন্যান্য স্থানের জন্য শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকারী কিছু বিধিনিষেধ আছে, কলকাতা হাইকোর্ট এই বিধি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। শুধু তাই নয়, মোটর ভেহিকলস অ্যাক্ট অনুযায়ী বসতি অঞ্চলে গাড়ি চালানোর সময় হর্ন ব্যবহারের মাত্রাও নির্দিষ্ট করা আছে।

ব্যক্তিগত উপায়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ:

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে 65 ডেসিবেলের নীচে মাইক চালালে শব্দদূষণ হয় না।② আতসবাজি পোড়ানোর সময় তীব্র শব্দ উৎপাদনকারী বাজি না ফাটালে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ও যানবাহন চালানোর সময় অযথা হর্নের ব্যবহার না করা। ④ রাস্তার দুপাশে গাছ লাগিয়ে শব্দদূষণ মুক্ত এলাকা গড়ে তোলা উচিত।

শব্দদূষণ-উৎস বা কারণ Sound Pollution-Sources or Causes

Leave a Reply