শক-সাতবাহন সংঘর্ষের বর্ণনা দাও – শক-সাতবাহন সংঘর্ষ খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে মধ্য এশীয় যাযাবর শক এবং দাক্ষিণাত্যের সাতবাহন রাজবংশের মধ্যে ঘটেছিল, যা মূলত অঞ্চল ও ক্ষমতার দখল নিয়ে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই কিছু সময়ের জন্য জয়লাভ করে, তবে শেষ পর্যন্ত সাতবাহনরা জয়ী হয়েছিল। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মতো সাতবাহন রাজাদের অধীনে শক, পাহলব এবং যবনদের পরাজিত করে সাতবাহনরা নিজেদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে।
Table of Contents
READ MORE – মৌর্য শাসনব্যবস্থার বিবরণ
শক-সাতবাহন সংঘর্ষের বর্ণনা দাও

• শক-সাতবাহন সংঘর্ষ:-
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তীকালে ভারতে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। মৌর্য ও গুপ্ত শাসনের মধ্যবর্তীকালে উত্তর ভারতে কুষাণ ও দক্ষিণ ভারতে সাতবাহন রাজবংশ প্রাধান্য বিস্তার করে। এ ছাড়া, এসময়ে আরও একাধিক ক্ষুদ্র রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। আধিপত্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে এই সময় দাক্ষিণাত্যে সাতবাহনদের সঙ্গে শকদের সংঘর্ষ একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনা।
• সংঘর্ষের সূত্রপাত:-
উত্তর কোঙ্কন বা অপরাস্ত অঞ্চলের বন্দরগুলি এবং মালবের হীরের খনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এজন্য অপরান্ত ও মালবে নিজ নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শক ও সাতবাহন শক্তি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম সাতকণী ও গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মধ্যবর্তী প্রায় ১০০ বছরে সাতবাহনরা ক্রমে হীনবল হয়ে পড়ে পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব উপকূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সাতবাহনদের এই স্থানচ্যুতির কারণ হিসেবে ইতিহাস-গবেষকরা শকদের আক্রমণকেই দায়ী করেন।

প্রধান ঘটনা
- শুরু: খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে সাতবাহন এবং পশ্চিমা স্যাট্রাপ (শক) রাজবংশের মধ্যে এই ধারাবাহিক যুদ্ধ শুরু হয়।
- নহপানের পরাজয়: সাতবাহন রাজা গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী শক শাসক নহপানের পরাজিত ও হত্যা করেন।
- কার্দমক শকদের উত্থান: নহপানের পতনের পর, কার্দমক শক, যেমন চষ্টন ও রুদ্রদামন, তাদের শক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে এবং সাতবাহনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে।
- রুদ্রদামনের বিজয়: রুদ্রদামনের নেতৃত্বে শক শক্তি পুনরায় শক্তিশালী হয় এবং তারা সাতবাহনদের ওপর অনেক বিজয় লাভ করে।
- সাতবাহনদের চূড়ান্ত জয়: গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী, তার মা গৌতমী বালাশ্রীর নাসিক শিলালিপি অনুসারে, শক, পাহলব এবং যবনদের পরাজিত করে সাতবাহনদের গৌরব পুনরুদ্ধার করেন।
• দ্বিতীয় সাতকর্ণীর আমলে:-
প্রকৃতপক্ষে সাতবাহন শাসক দ্বিতীয় সাতকণীর আমলেই শক-সাতবাহন সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে বলে জানা যায়। দ্বিতীয় সাতকর্ণী পশ্চিম উপকূলের কল্যাণ বন্দর দীর্ঘকাল নিজের অধীনে রাখতে পারেননি বলে পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সী থেকে জানা যায়। আবার শক শাসন নহপানের আমলে মহারাষ্ট্রের উত্তরাংশ, কোঙ্কন, মালব, কাথিয়াবাড় প্রভৃতি অঞ্চল তাঁর অধীনে ছিল বলে নহপানের বিভিন্ন মুদ্রা ও লেখ থেকে প্রমাণ মেলে। পশ্চিম উপকূলে (নাসিক) শক শাসক নহপানের অনেক মুদ্রা পাওয়া গেছে।

• গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর আমলে:-
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর (১০৬-১৩০ খ্রি.) আমলে শক-সাতবাহন সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠে। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী তাঁর রাজত্বের অষ্টাদশ বর্ষে শক শাসক নহপানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে সাতবাহনদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন বলে নাসিক লেখ থেকে জানা যায়। জোগালথাম্বি-তে প্রাপ্ত নহপানের মুদ্রাগুলির ২/৩ অংশই পরে সাতকর্ণীর দ্বারা পুনর্নির্মিত হয়েছিল। নাসিক প্রশস্তিতে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীকে ‘শক-যবন-পহ্লব-নিসূদন’ এবং ‘সাতবাহন কূল-যশঃ প্রতিষ্ঠানকর’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী কর্তৃক শকদের পরাজয়ের প্রমাণ মেলে।
• শক শাসক রুদ্রদামনের আমলে:-
শকদের বিরুদ্ধে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তাঁর রাজত্বের শেষদিকে শকদের কার্দমক শাখার রুদ্রদামনের হাতে তিনি পরাজিত হন বলে মনে করা হয়। ১৫০ খ্রিস্টাব্দের জুনাগড় লেখ-তে বুদ্রদামনের অধিকারভুক্ত স্থান হিসেবে আকর, অবস্তী, অনুপ, সৌরাষ্ট্র, কুকুর প্রভৃতি স্থানের নাম পাওয়া যায়। উক্ত স্থানের নামগুলি নাসিক প্রশস্তিতেও পাওয়া যায়। তাই মনে করা হয় যে, সাতবাহনদের কাছ থেকে এই স্থানগুলি রুদ্রদামন দখল করেন। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী তাঁর পরাজয়ের কলঙ্ক ঢাকতে নিজপুত্র বশিষ্ঠীপুত্র-কে শক শাসক রুদ্রদামনের কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেন। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন যে, রুদ্রদামন যে সাতবাহন শাসককে পরাজিত করেন তিনি গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী নন, অন্য কোনো সাতবাহন শাসক।

• পরবর্তী সংঘর্ষ:-
ইতিহাসবিদ ড. গোপালাচারি মনে করেন যে, পুলমায়ীর পরবর্তী শাসক শিবশ্রী-র সময় শকদের সঙ্গে সাতবাহনদের পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে সাতবাহন শক্তি পরাজিত হয়ে অনুপ ও অপরান্তের উপর অধিকার হারায়। এরপর যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণীর আমলে আবার শক-সাতবাহন সংঘর্ষ শুরু হয়। যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী শকদের পরাজিত করে অপরান্ত উদ্ধার করেন এবং নর্মদা উপত্যকা ও পশ্চিম ভারতের একাংশ থেকে শকদের বিতাড়িত করেন।
• উপসংহার:-
শক রাজা রুদ্রদামনের পর শক শক্তি এবং সাতবাহন রাজা যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণীর পর সাতবাহন শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শক-সাতবাহন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষের তীব্রতা হ্রাস পায়। পরবর্তীকালে গুপ্ত বংশের উত্থানের ফলে শক শাসনের অবলুপ্তি ঘটে এবং সাতবাহন রাজ্যও আঞ্চলিক শাসকদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।