মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ গুলো হলো দুর্বল উত্তরাধিকারী, প্রশাসনিক শিথিলতা, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক সংকট এবং বাহ্যিক আক্রমণ। অশোকের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা দুর্বল ছিল এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি, যা প্রদেশগুলোর স্বাধীনতা বাড়িয়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়। পুষ্যমিত্র শুঙ্গ শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে শুঙ্গ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এর পতন নিশ্চিত করেন।
Table of Contents
READ MORE – কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলি আলোচনা করো।
সূচনা: মৌর্য সম্রাট অশোকের মৃত্যু হয় আনুমানিক ২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অবশেষে ১৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে তাঁর ব্রাহ্মণ সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মগধের সিংহাসনে বসেন। এইভাবে মগধের সিংহাসনে মৌর্য বংশের অবসান হয় এবং শুঙ্গ বংশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মৌর্য বংশের অবসানের ফলে মগধের এক গৌরবময় যুগের অবসান হয়। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের নানা কারণ ছিল। এ বিষয়ে পণ্ডিতরা নানা মতবাদের অবতারণা করেছেন।
ব্রাহ্মণ্য প্রতিক্রিয়া বা ব্রাহ্মণ্য বিপ্লবের তত্ত্ব:
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মনে করেন, মৌর্য শাসনের প্রতি ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের বিদ্বেষের ফলে মৌর্য কর্তৃত্বের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মগধে দুর্বল মৌর্য কর্তৃত্বের ওপর আঘাত হানেন ব্রাহ্মণ সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ, অন্ধ্রে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রাহ্মণ সাতবাহনদের আধিপত্য এবং ব্রাহ্মণ চেতবংশ কলিঙ্গ দখল করে। ড. শাস্ত্রীর মতে, অশোকের ‘বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা’, ‘ব্যবহার সমতা’ এবং ‘দণ্ড সমতা’-র প্রবর্তন, ধর্মমহামাত্র নিয়োগ প্রভৃতির ফলে ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তি হ্রাস পায়।

তাই তারা অশোকের মৃত্যুর পর পুষ্যমিত্র শুঙ্গের নেতৃত্বে বিদ্রোহে শামিল হয়েছিলেন। কিন্তু ড. হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী মনে করেন না যে, ব্রাহ্মণ শ্রেণির ক্ষোভ ও বিরোধিতা মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল। বিভিন্ন উপাদান থেকে জানা যায় যে, ১৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্রাহ্মণ পুষ্যমিত্র শুঙ্গের বিদ্রোহের বহু পূর্বেই মৌর্য সাম্রাজা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। গান্ধার, কাশ্মীর, বিদর্ভ ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অংশ অনেক আগেই স্বাধীন হয়ে যায়। বৃহদ্রথের আমলে মৌর্য সাম্রাজ্য এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, তাঁকে অপসারণের জন্য কোনো বিদ্রোহের প্রয়োজন ছিল না।
তা ছাড়া পুষ্যমিত্র শুঙ্গ বৌদ্ধবিদ্বেষী ও ব্রাহ্মণ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন এবং তিনি মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণদের নেতৃত্ব দেন এমন প্রমাণ নেই। পুষ্যমিত্র ভারহুতের বৌদ্ধ স্তূপের যে-বেষ্টনী তৈরি করে দেন তা তাঁর বৌদ্ধদের প্রতি শ্রদ্ধার পরিচয় দেয়। পুষ্যমিত্র শুধু ব্রাহ্মণই ছিলেন না, তিনি মৌর্যরাজের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। কোনো ব্রাহ্মণ-বিপ্লব ঘটিয়ে তিনি মগধের সিংহাসন অধিকার করেননি, ব্যক্তিস্বার্থে নিজের পদমর্যাদার অপব্যবহার করেছিলেন মাত্র।
অর্থনৈতিক অবক্ষয়:
রোমিলা থাপার, দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বী প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ মনে করেন যে, অর্থনৈতিক কারণেই মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। বলা হয় যে, বিশাল সেনাবাহিনীর ভরণ-পোষণ, কর্মচারীদের বেতন দান, জনহিতকর কার্যাবলির ব্যয়, নতুন নতুন অঞ্চলে বসতি বিস্তার প্রভৃতির ফলে মৌর্য অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। এই অবস্থার মোকাবিলার জন্য অভিনেতা ও গণিকাদের ওপর কর আরোপ করা হয়, মুদ্রায় খাদের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষি সম্প্রসারণ ঘটলেও সাম্রাজ্যের সর্বত্র তা ছিল না। বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাবার সাধ্য নির্দিষ্ট এলাকার বর্ধিষ্ণু কৃষি অর্থনীতির পক্ষে সম্ভব ছিল না।

গণবিদ্রোহ:
ড. নীহাররঞ্জন রায় এবং অপরাপর কয়েকজন ঐতিহাসিক মনে করেন যে, গণবিদ্রোহের ফলে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। তাঁরা পুষ্যমিত্র শুঙ্গের বিদ্রোহকে ‘গণবিদ্রোহ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, মৌর্য শাসকদের বিদেশি ভাবধারা গ্রহণ, জনগণের ওপর অত্যধিক কর আরোপ, প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অত্যাচার প্রভৃতির বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহী হয়। যাঁরা এই মতের বিরোধিতা করেছেন তাঁরা বলেছেন যে, মৌর্যযুগে করভার অতিরিক্ত ছিল না।
প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অত্যাচার:
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য বিভিন্ন প্রদেশে অমত্যদের অত্যাচারকে বহুলাংশে দায়ী করা হয়।
অশোকের অহিংস শান্তিবাদী নীতি:
ড. হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী, ড. দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভান্ডারকর, ড. রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য অশোকের অহিংস নীতিকেই দায়ী করেছেন। অশোক বিহার যাত্রাকে ‘ধম্মযাত্রা’ ও ভেরীঘোষকে ‘ধম্মঘোষ’-এ পরিণত করেন। ফলে সরকারি প্রশাসকগণ ধম্মপ্রচারকে পরিণত হন। এ ছাড়া দীর্ঘদিন তাঁর সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকার ফলে অশোকের সেনাবাহিনী ক্ষাত্রশক্তি হারিয়ে ফেলে, সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। কিন্তু ড. নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী ও ড. রোমিলা থাপার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে অহিংস নীতি গ্রহণ করলেও অশোক প্রশাসন বা প্রতিরক্ষায় বিন্দুমাত্র শৈথিল্য দেখাননি। ড. শাস্ত্রী বলেন যে, কেবলমাত্র যুদ্ধ করলেই একটি সাম্রাজ্য শক্তিশালী হয় না। সারাজীবন যুদ্ধ করেও মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে পারেননি।

অমাত্যদের বিদ্রোহ:
অশোকের রাজত্বকালে দূরবর্তী প্রদেশগুলির রাজারা এবং অমাত্য শ্রেণি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। সম্রাট অশোক এইগুলি দমন করতে পারেননি। তা ছাড়া বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অশোকের পরবর্তী রাজাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
উপসংহার:
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের আরও কিছু কারণ উল্লেখ করা যায়। চরম কেন্দ্রীভূত মৌর্য শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল একজন শক্তিশালী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শাসকের। কিন্তু অশোক-পরবর্তী সম্রাটরা কেউই দক্ষ না-হওয়ায় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। খ) মৌর্য আমলাতন্ত্র যথেষ্ট সুসংগঠিত ছিল না। আমলাদের আনুগত্য ছিল রাজার প্রতি-রাষ্ট্রের প্রতি নয়। রাজা বদলের সঙ্গে সঙ্গে কর্মচারীদেরও বদল ঘটত। ফলে রাষ্ট্র আমলাদের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হত। গ এই যুগে কোনো জনপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
এর ফলে শাসক ও প্রজাদের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। ঘ) নানা কারণে মৌর্য সাম্রাজ্য যখন বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধে অক্ষম, ঠিক তখনই গ্রিকদের আক্রমণ ঘটল। দিমিত্র বা ডিমিট্রিয়াস পাটলিপুত্র পর্যন্ত তাঁর বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। এই বৈদেশিক আক্রমণের সুযোগ নিয়ে মৌর্য রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে তাঁর ব্রাহ্মণ সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মৌর্য সিংহাসন দখল করেন। তাসনকর্তা কুর্তাদীলত চিকে