মৌর্য শাসনব্যবস্থার বিবরণ – মৌর্য শাসনব্যবস্থা একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত এবং দক্ষ ব্যবস্থা ছিল, যেখানে সম্রাট ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং সামরিক ও বিচারিক প্রধান। প্রশাসনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক এবং স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন বিভাগ ও কর্মকর্তা ছিল। এই শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল ‘অর্থশাস্ত্র’ এবং মেগাস্থেনিসের ‘ইনডিকা’, যেখানে প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
মৌর্য শাসনব্যবস্থার বিবরণ
Table of Contents
READ MORE – মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

• মৌর্য শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:-
প্রাচীন ভারতে সর্বপ্রথম একটি দক্ষ ও সুপরিকল্পিত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন মৌর্য সম্রাটগণ। সমকালীন ও বর্তমানকালের বিভিন্ন পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ এই শাসনব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন। ড. ভিনসেন্ট স্মিথ মনে করেন যে, মৌর্য শাসনব্যবস্থা আকবর-প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থার চেয়েও উন্নত ছিল। এই শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামোটি পঠন করেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। পরবর্তীকালে অশোক তাতে কিছু সংযোজন করেন।
• প্রশাসনিক স্তরবিন্যাস:-
বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যে সুদক্ষ শাসনব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য সাম্রাজ্যটি কতকগুলি প্রশাসনিক স্তরে বিভক্ত ছিল। সমগ্র সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। প্রদেশগুলি আবার কতকগুলি ‘বিষয়’ বা ‘আহর’ বা জেলায় বিভক্ত ছিল। জেলাগুলি অসংখ্য গ্রাম বিভক্ত ছিল। স্বায়ত্তশাসিত গ্রাম ছিল মৌর্য প্রশাসনের সর্বনিম্ন স্তর।

• কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা:-
① রাজার ক্ষমতা:-
মৌর্য শাসনব্যবস্থায় সম্রাট ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি আইন, শাসন, বিচার, রাজস্ব ও সামরিক বিভাগের কাজকর্মের তত্ত্ববধান করতেন। এজন্য মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্তের শাসনব্যবস্থাকে ‘কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র’ (Centralized Bureaucracy) বলে অভিহিত করেছেন। তবে স্বৈরাচারী হলেও সম্রাট কখনোই স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না। তিনি শাসনকার্য পরিচালনায় ‘মন্ত্রিণ’, ‘মন্ত্রীপরিষদ’ ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের পরামর্শ নিতেন মন্ত্রীমন্ডলী ছাড়াও অধ্যক্ষ, বলাধ্যক্ষ, নগরাধ্যক্ষ প্রমুখ রাজকর্মচারী রাজাকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।
② বিভিন্ন রাজকর্মচারী:-
বিভিন্ন রাজকর্মচারী মৌর্য শাসনব্যবস্থায় সহায়তা করতেন মৌর্য সম্রাটকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহায্য করতেন ‘সচিব’ নামে এক শ্রেণির কর্মচারী। সচিবদের মধ্যে যাঁরা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় অগ্রবর্তী ছিলেন তাঁরা ‘মন্ত্রিণ’ বা মন্ত্রী পদে নিযুক্ত হতে পারতেন। তাঁরা রাজাকে শাসন ও পররাষ্ট্র বিষয়ে পরামর্শ দিতেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রাজার সঙ্গী হতেন। ‘মন্ত্রিণ’দের নীচের স্তরে ছিল ‘মন্ত্রীপরিষদ’ নামে একটি পরামর্শদাতা সভা। এর সদস্যরা রাজাকে জরুরি অবস্থার সময় পরামর্শ দিত। তবে এই পরামর্শ গ্রহণ করা বা না করা রাজার ইচ্ছাধীন ছিল। ‘অমাত্য’রা রাজস্ব, অর্থ, বিচার, প্রশাসন প্রভৃতি বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন। ‘অধ্যক্ষ’ ছিলেন সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান। রাজস্ব বিভাগের প্রধান ছিলেন ‘সমাহর্তা’। ‘সন্নিধাতা’ নামে কর্মচারী ছিলেন রাজার কোশাধ্যক্ষ। এ ছাড়া, অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজকর্মচারীদের মধ্যে ছিলেন করণিক, পুরোহিত, দৌবারিক, প্রতিবেদক, দুর্গপাল, গুপ্তচর প্রমুখ।
• প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা:-
শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে, প্রদেশগুলিকে বিভিন্ন জেলায় এবং জেলাগুলিকে বিভি বিভিন্ন গ্রামে বিভক্ত করা হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে দেশে চারটি প্রদেশ ছিল। এর সঙ্গে অশোক কলিঙ্গ প্রদেশটি যুক্ত করেন।
① বিভিন্ন প্রদেশ:-
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তাঁর সাম্রাজ্যকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন। যথা- (1) উত্তরাপথ: উত্তরাপথ, অবন্তী, দক্ষিণাপথ ও প্রাচ্য। সম্রাট অশোক কলিঙ্গকে তাঁর রাজ্যভুক্ত করাতে তা পঞ্চম প্রদেশে পরিণত হয়। এর রাজধানী ছিল তক্ষশিলা। (2) অবন্তী: এর রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী। (3) দক্ষিণাপথ: এর রাজধানী ছিল সুবর্ণগিরি। (4) প্রাচ্য: এর রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। (5) কলিঙ্গ: সম্রাট অশোক কলিঙ্গকে তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। এর রাজধানী ছিল তোষালী।

② প্রাদেশিক শাসক:-
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সমস্ত প্রদেশে এক বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার প্রচলন করেন। সম্রাট বিভিন্নভাবে প্রদেশগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতেন। প্রদেশের শাসনকর্তাকে বলা হত ‘কুমার’ বা ‘প্রদেশপাল’। যুবরাজ বা রাজার কোনো নিকট আত্মীয় প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদ লাভ করতেন। তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব সংগ্রহ, কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করতেন। কেন্দ্রের মতো প্রদেশগুলিতেও মন্ত্রীসভা ছিল।
.মন্ত্রিপরিষদ
রাজাকে শাসনকার্যে সহায়তা করতেন এক দক্ষ মন্ত্রিপরিষদ। মন্ত্রিপরিষদ ছিল প্রশাসনের মূল সহায়ক সংস্থা।
এদের বলা হত “পরিষদ” বা “মন্ত্রিপরিষদ”।
মন্ত্রিপরিষদের গঠন:-
মন্ত্রীরা সাধারণত রাজপরিবারের সদস্য, অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণ, কৌশলবিদ ও সামরিক কর্মকর্তা হতেন।
তাদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রধান মন্ত্রী বা মহামাত্র।
মন্ত্রিপরিষদের কাজ:-
রাজাকে রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেওয়া।
প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ তত্ত্বাবধান করা।
ন্যায়বিচার, রাজস্ব, যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় সাহায্য করা।
রাজা অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্রের কার্যক্রম বজায় রাখা।
অশোকের সময় “ধর্মমহামাত্র” নামে এক বিশেষ দপ্তর তৈরি হয়, যারা প্রজাদের নৈতিক ও ধর্মীয় কল্যাণ দেখাশোনা করতেন।
• স্থানীয় প্রশাসন:-
মৌর্য শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর ছিল গ্রাম। গ্রামের প্রধান শাসককে বলা হত গ্রামিক। তাঁর দায়িত্ব ছিল গ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, চুরিডাকাতি ও অন্যান্য সমস্যার বিচার প্রভৃতি। তিনি গ্রামবাসীদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন গ্রামে সম্ভবত স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। গ্রামের ওপরের স্তরে পাঁচ থেকে দশটি গ্রামের শাসনের দায়িত্ব থাকত ‘গোপ’ নামে একজন কর্মচারীর হাতে। তাঁর ওপরে ছিল স্থানিক নামে কর্মচারী। সমাহর্তা ছিলেন জেলার প্রধান শাসক। স্বায়ত্তশাসিত শহরগুলিতে পৃথক ও উন্নত পৌর শাসনব্যবস্থা চালু ছিল। পাটলিপুত্র, উজ্জয়িনী, তক্ষশিলা, কৌশাম্বী, বৈশালী, শ্রাবন্তী, পুণ্ড্রবর্ধন, কাশী প্রভৃতি নগরগুলিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলনিকাশি ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পৃথক শাসন পরিষদ ছিল।
• পাটলিপুত্রের শাসনপ্রণালী:-
বিভিন্ন ইতিহাসবিদ মৌর্য সম্রাটদের নগর-শাসনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গ্রিক লেখক মেগাস্থিনিসের বর্ণনা অনুযায়ী, পাটলিপুত্র ছিল ৯ ১/২ মাইল দীর্ঘ ও প্রায় ২ মাইল প্রস্থবিশিষ্ট এক বিশাল নগরী। পাটলিপুত্রের শাসন পরিচালনার জন্য একটি পৌরবোর্ড বা পৌর পরিষদ ছিল। এই বোর্ডের সদস্যসংখ্যা ছিল ৩০ জন। বোর্ডকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। এর প্রতিটিতে পাঁচজন করে সদস্য ছিলেন। প্রতিটি বিভাগ নগর-শাসনের পৃথক ছয়টি দায়িত্ব পালন করত। এই ছয়টি বিভাগ হল- (1) শিল্প পরিচালনা, (2) বিদেশিদের আপ্যায়ন, (3) জন্মমৃত্যুর হিসাব সংরক্ষণ, (4) ব্যাবসাবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, (5) পণ্যসামগ্রী বিক্রির তদারকি, (6) বিক্রিত দ্রব্যের ওপর ১/১০ ভাগ হারে শুল্ক আদায় করা

• সামরিক ও গুপ্তচর ব্যবস্থা:-
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য দক্ষ ও উন্নত সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সমস্ত বর্ণের মানুষের মধ্য থেকেই সেনা সংগ্রহ করা হত। তিনি সামরিক বিভাগকে ছয়টি ভাগে ভাগ করেন। এই ছয়টি বিভাগ হল- (1) পদাতিক বাহিনী, (2) অশ্বারোহী বাহিনী, (3) রথারোহী বাহিনী, (4) রণহস্তী বাহিনী, (5) রণতরী বাহিনী, (6) রসদপত্র সরবরাহকারী বাহিনী। বিশালায়তন মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসন পরিচালনা ও সংহতি রক্ষার জন্য সমগ্র দেশে অসংখ্য গুপ্তচর ছিল। গুপ্তচররা সাধারণ প্রজা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মচারী, এমনকি প্রাদেশিক শাসকদের গতিবিধির ওপরও নজর রাখত।
• বিচার ব্যবস্থা:-
দেশে একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। স্বয়ং রাজা ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিচারক। গ্রামের বিচারকার্য গ্রামিক এবং নগরের বিচারকার্য নগর-ব্যাবহারিক পরিচালনা করতেন। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে ধর্মাস্থিয় নামে দেওয়ানি ও কণ্টকশোধন নামে ফৌজদারি আদালতের উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া সংগ্রহণ, স্থানিক, দ্রোণমুখ প্রভৃতি নিম্ন আদালতের অস্তিত্ব ছিল। বিচারের দণ্ডবিধি কঠোর ছিল শাস্তি হিসেবে জরিমানা, জেল, অঙ্গচ্ছেদ, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতির ব্যবস্থা ছিল।
• রাজস্ব ব্যবস্থা:-
ভূমিরাজস্ব ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। ভূমিরাজস্ব নগদে বা শস্যের দ্বারা দেওয়া যেত। সাধারণত উৎপন্ন ফসলের ১/৬ বা ১/৪ অংশ রাজস্ব নেওয়া হত। এই করকে বলা হত ‘ভাগ’। এ ছাড়া অন্যান্য করের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পথকর, জলকর, ফেরিকর, চরণকর, বিবাহকর, জন্ম-মৃত্যু কর প্রভৃতি। কৌটিল্য এইসব করকে ‘বলি’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন ধরনের কর আদায়ের ফলে মৌর্য রাজকোশ সবসময় পূর্ণ থাকত কর্মচারী ও সৈন্যদের বেতন, জনকল্যাণমূলক কাজ, সেচ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই অর্থের একটা বড়ো অংশ ব্যয় হত।