মৃত্তিকা দূষণ (Soil Pollution)

মৃত্তিকা দূষণ (Soil Pollution) – মৃত্তিকা পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অজৈব উপাদান। জল ও বাতাসের মধ্যে মৃত্তিকাও ক্রমশ দূষিত, কলুষিত হয়ে পড়ছে। মৃত্তিকা দূষণের ফলে কিছু ক্ষতিকারক পদার্থ দ্বারা মৃত্তিকার গুণমান হ্রাস পায় এবং মৃত্তিকায় বসবাসকারী সকল জীব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৃত্তিকার উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

মৃত্তিকা দূষণ বা মাটি দূষণ বলতে মাটির ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈব বৈশিষ্ট্যের অবাঞ্ছিত ও ক্ষতিকর পরিবর্তনকে বোঝায়, যা মূলত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, বর্জ্য এবং অন্যান্য দূষকের কারণে ঘটে। এটি একটি গুরুতর পরিবেশগত সমস্যা, যা মানুষ এবং জীবজগতের জন্য নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়ে আনে।

Table of Contents

READ MORE – পরিবেশ ও উন্নয়ন Environment and Development PART-3

মৃত্তিকা দূষণ (Soil Pollution)

মুক্তিকা দূষণের সংজ্ঞা (Definition of Soil Pollution):

পৃথিবীপৃষ্ঠে নানাপ্রকার অবাঞ্ছিত দূষক পদার্থ জমার ফলে যে অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি করে, যাতে মাটির জীবদের জীবনধারণ বিঘ্নিত হয়, তাকে মৃত্তিকা দূষণ বলে। যেসব পদার্থ মৃত্তিকাদুষণ করে তাদের মৃত্তিকা দূষক বলে।

মৃত্তিকা দূষকের প্রকারভেদ (Classification of Soil Pollutants):

মৃত্তিকা দূষককে তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

① সজীব দুষক:

জীবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, কৃমি ইত্যাদি। উৎস: পৌর প্রতিষ্ঠানের আবর্জনা, মানুষ ও প্রাণীর মলমূত্র প্রভৃতি।

② অজীব দূষক:

সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ফসফেট, সালফেট, অ্যাসিড, লবণ ইত্যাদি।

উৎস: চাষের কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, খনিজ তেলের দহন, কারখানার ছাই, অ্যাসিড বৃষ্টি ইত্যাদি।

③ জৈব দূষক: প্লাস্টিক দ্রব্য, পলিথিন দ্রব্য, কীটনাশক ও পতঙ্গনাশক ইত্যাদি।

উৎস: বিভিন্ন কৃষিক্ষেত্র এবং কারখানা ইত্যাদি।

মৃত্তিকা দূষণের কারণ (Causes of Soil Pollution):

মৃত্তিকা দূষণের কারণকে দুটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হল- A. প্রাকৃতিক কারণ, B, মনুষ্যসৃষ্ট কারণ।

A. প্রাকৃতিক কারণ:

① অগ্ন্যুৎপাত:

আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ছাই। পাইরোক্লাস্ট পদার্থ ইত্যাদি উড়ে ভূমিভাগ ভরাট করে ও মৃত্তিকার গুণমান নষ্ট হয়।

② অম্লবৃষ্টি:

বাতাসে ভাসমান নাইট্রোজেন, সালফার, হাইড্রোজেন, কার্বন যৌগ জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে আঅ্যাসিড উৎপন্ন করে, যা বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে অন্ন অ্যাসিড উৎপন্ন করে। তার মৃত্তিকা পতিত হলে মৃত্তিকা দূষিত করে।

(3)অ্যাসিড বৃষ্টি:

বায়ু দূষণের কারণে সৃষ্ট অ্যাসিড বৃষ্টি মাটিতে মিশে তার অম্লতা বৃদ্ধি করে এবং দূষণ ঘটায়।

(4)প্রাকৃতিক কারণ:

কিছু ক্ষেত্রে, বজ্রপাত বা অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণেও মাটিতে কিছু রাসায়নিক পদার্থ জমা হতে পারে।

(5)তেল উপচে পড়া:

তেল বা পেট্রোলিয়ামের মতো পদার্থ মাটিতে মিশে দূষণ ঘটাতে পারে।

B. মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:

মানুষের কৃতকর্মের ফলে মৃত্তিকাদূষণ ঘটে। যেমন-

① শিল্পজাত দূষণ:

বিভিন্ন শিল্পকলকারখানা থেকে নির্গত কঠিন বর্জ্য পদার্থ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ফ্লাই অ্যাশ, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি মৃত্তিকাদূষণের উল্লেখযোগ্য কারণ।

② গৃহস্থালির আবর্জনা:

গৃহস্থালির বর্জ্য পদার্থ যেমন-পলিথিন, প্লাস্টিক দ্রব্য, কাচের বোতল, প্লাস্টিক বোতল প্রভৃতি ভূপৃষ্ঠে সঞ্চিত হয়ে মৃত্তিকাদূষণ ঘটায়।

③ কীটনাশক প্রয়োগ:

কৃষিজমিতে DDT, BHC প্রভৃতি কীটনাশক এবং সিমাজিন, 2-4-D প্রভৃতি আগাছানাশক

প্রয়োগের ফলে মৃত্তিকা দূষণ ঘটছে।

④ রাসায়নিক সার প্রয়োগ:

অত্যধিক ফলনের আশায় রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার নাইট্রোজেন আবন্ধকরণ

ও বিয়োজনে সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীবদের মৃত্যু ঘটায়।

⑤ শিল্প কার্যকলাপ:

শিল্প কারখানা থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক বর্জ্য, ইলেকট্রনিক বর্জ্য, এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ মাটিতে মিশে দূষণ ঘটায়।

(6)কৃষি কার্যক্রম:

কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক, আগাছানাশক এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং বিষাক্ত করে তোলে।

(7) বর্জ্য নিষ্পত্তি:

অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ডাম্পিং বা ল্যান্ডফিল থেকে নিঃসৃত তরল পদার্থ (লিচেট) মাটিকে দূষিত করে।

(8)তেল উপচে পড়া:

তেল বা পেট্রোলিয়ামের মতো পদার্থ মাটিতে মিশে দূষণ ঘটাতে পারে।

(9)তেজস্ক্রিয় পদার্থের সঞ্চয়:

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত হওয়া বা পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলে স্ট্রনসিয়াম-90, প্লুটোনিয়াম-239, ইউরেনিয়াম-235 মৃত্তিকায় এসে মেশে। এগুলি মৃত্তিকায় দৃঢ় সংঘবন্ধ অবস্থায় থেকে মৃত্তিকার সজীব উপাদানকে মেরে ফেলে।

(10)গাড়ির নিষ্কাশন গ্যাস:

যানবাহনের নিষ্কাশন গ্যাস থেকে নির্গত সীসা এবং অন্যান্য ভারী ধাতু মাটিতে জমা হয়।

এছাড়াও মাটির লবণতা, অম্লতা বৃদ্ধি পেলে এবং মানুষসহ প্রাণীর মলমূত্র, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া মিশলে মৃত্তিকা দূষিত হয়।

মৃত্তিকা দূষকের প্রভাব (Effects of Soil Pollutants):

মৃত্তিকা দূষণ নানাভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে-

① কীটনাশক ব্যবহার:

কৃষিক্ষেত্রে অত্যধিক পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটিতে বসবাসকারী উপকারী জীবদের জীবনহানি ঘটে, ফলে উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায়।

② জলসেচ:

অধিক জলসেচের ফলে মাটির লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, ফলে মাটি অনুর্বর হয়ে যায়।

③ বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি:

মাটিতে বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে মাটিতে বসবাসকারী জীবদের বংশবিস্তার ঘটে, ফলে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। যেমন-মাছি কলেরা রোগ, আন্ত্রিক রোগের সংক্রমণ ঘটায়।

④ পরজীবীর উপস্থিতি:

মৃত্তিকায় অবস্থিত বিভিন্ন রোগের জীবাণু অবস্থান করে, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস মানুষের বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে।

মৃত্তিকা দূষণের প্রভাব:

মাটি দূষণের বহুবিধ ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে

১. খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত পদার্থের প্রবেশ:

দূষিত মাটিতে উৎপন্ন ফসল এবং শাকসবজিতে বিষাক্ত পদার্থ যেমন— ভারী ধাতু (সীসা, ক্যাডমিয়াম) প্রবেশ করে। এই বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে তা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

২. মাটির উর্বরতা হ্রাস:

রাসায়নিক পদার্থ মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে, ফলে ফসল উৎপাদন কমে যায়। এর ফলে বিশ্বের বহু দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

৩. বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট:

মাটির অণুজীব ও অন্যান্য জীবের জীবনচক্র নষ্ট হয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্য কমে যায় এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।

৪. ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি:

দূষিত মাটির গুণগত মান কমে যাওয়ায় এটি ভূমিক্ষয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৫. মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব:

দূষিত মাটির সংস্পর্শে এলে মানুষের দেহে বিভিন্ন রোগ হতে পারে। দূষিত মাটি থেকে বিষাক্ত ধুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বা ত্বকের সংস্পর্শে এসে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

মৃত্তিকা দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় (Control measure of Soil Pollution):

মৃত্তিকা দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় নীচে বর্ণনা করা হল-

① DDT, 2-4-D প্রভৃতি কীটনাশক ও আগাছানাশকগুলির যথাযোগ্য ব্যবহারের ফলে মৃত্তিকাদুষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

② কঠিন বর্জ্য পদার্থগুলিকে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দূষণ মুক্ত করে যথাযোগ্য স্থানে ফেলেও মৃত্তিকাদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।

③ পুনঃব্যবহারযোগ্য পদার্থ বা ভঙ্গুর দূষক পদার্থ ব্যবহার করলে মৃত্তিকাদূষণ কম হয়, কিন্তু অভঙ্গুর পদার্থ মৃত্তিকাদূষণ বৃদ্ধি করে।

④ জৈবপ্রযুক্তিতে চাষ করলে এবং কম কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মুক্তিকাদুষণ হ্রাস পায়। মৃত্তিকাদূষণ সৃষ্টিকারী পদার্থগুলিকে ভস্মীভূত করলে যেমন-রোগজীবাণুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, তেমনি মৃত্তিকা দূষণের পরিমাণ হ্রাস পায়। দূষক পদার্থগুলিকে নির্দিষ্ট স্থানে সঞ্চিত রেখে মুক্তিকাদুষণ হ্রাস করা সম্ভব। দূষক পদার্থগুলিকে নিম্নভূমি ভরাট করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, ফলে দূষণ রোধ হবে।

(5) রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো।

(6) শিল্প কারখানার বর্জ্য সঠিকভাবে পরিশোধন করে তা পরিবেশে নিষ্কাশন করা।

(7) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা এবং পুনর্ব্যবহার (Recycling) ও পুনরায় ব্যবহার (Reuse)-কে উৎসাহিত করা।

(8) জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের ব্যবহার কমানো।

(9) বৃক্ষরোপণ এবং বনায়ন বৃদ্ধি করা, যা মাটির ক্ষয় রোধ করে।

(10) দূষিত মাটি পুনরুদ্ধারের জন্য বায়োরিমিডিয়েশন (bioremediation) এবং ফাইটোরেমিডিয়েশন (phytoremediation)-এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা।

মৃত্তিকা দূষণ (Soil Pollution)

Leave a Reply