মুঘল এবং শিখ সম্পর্ক

মুঘল এবং শিখ সম্পর্ক প্রথম দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ থাকলেও, পরে তা রাজনৈতিক কারণে তিক্ত হয়ে ওঠে। মুঘল সম্রাটরা শিখ গুরুদের হত্যা করে, যা শিখদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের সূচনা করে। তবে, এই সম্পর্ক সবসময় খারাপ ছিল না, কারণ কিছু মুঘল সম্রাট শিখদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও রেখেছিলেন। 

মুঘল-শিখ সম্পর্ক ছিল জটিল এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে, শিখরা মুঘলদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করত এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের সমর্থনও করত। উদাহরণস্বরূপ, সম্রাট আকবরের শাসনামলে শিখ ও মুঘলদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল এবং আকবর শিখ গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি শিখদের জমি দান করেছিলেন এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। 

আরো জানুন – PGHI 2025 1st Paper Suggestion

মুঘল এবং শিখ সম্পর্ক

সূচনা:

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে ধর্মসংস্কার-আন্দোলন শুরু হয়, তারই সূত্র ধরে উত্তর-পশ্চিম ভারতে গুরু নানক তাঁর বাণী প্রচার শুরু করেন। গুরু নানকের শিক্ষা ও আদর্শকে ভিত্তি করেই শিখধর্মের উদ্ভব হয় এবং কালক্রমে এই শিখসম্প্রদায় একটি শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে পরিণত হয়। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত-পথ ধরে তুর্কী, আফগান, মোঙ্গল প্রভৃতি মুসলমান জাতি ভারতে প্রবেশ করেছে। ফলে ঐ অঞ্চলে ইসলাম-সংস্কৃতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পরন্তু হিন্দুধর্মের বাহ্যিক অনুষ্ঠানের কঠোরতা ও জাতিভেদপ্রথা ঐ অঞ্চলের পরিশ্রমী জাঠদের হিন্দুধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। এমতবস্থায় গুরু নানকের উদার ধর্মমত খুব সহজেই পাঞ্জাববাসীদের আকৃষ্ট করে।)

ধর্মমত শিখ গুরুগণ:

অবশ্য নানক স্বতন্ত্র কোন ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যেই তাঁর বাণী প্রচার করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারও মতে, তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের সংস্কারক মাত্র। কারণ হিন্দুধর্মের আদর্শ বা ঐতিহ্যকে তিনি অস্বীকার করেন নি। বেদ, পুরাণের দার্শনিক তত্ত্বের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তবে হিন্দুধর্মের বাহ্যিক আড়ম্বর, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা প্রভৃতি কয়েকটি কু-প্রথার তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। পাইন (Payne)-এর মতে, “শুরু নানক হিন্দুধর্মের অবসানের পরিবর্তে তার প্রাচীন ঐতিহ্য ও শুচিতা পুনঃপ্রবর্তনের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

‘ তাঁর ভাষায়: “The aim of Guru Nanak was not to sweep away Hinduism, but to restore it to its ancient purity.” অপরপক্ষের মতে, নানক ছিলেন বিপ্লবী। কুসংস্কার-জর্জরিত হিন্দুসমাজকে ভেঙে এক প্রগতিশীল ও কুসংস্কারমুক্ত সমাজগঠনে তিনি প্রয়াসী হয়েছিলেন। যাই হোক, গুরু নানক হয়তো পূর্বপরিকল্পনামত কোন নতুন ধর্মমত গঠনে প্রয়াসী হননি। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাঁর অনুগামীরা এক নতুন ধর্মবিশ্বাসের অধীন হয়, যা ‘শিখধর্ম’ নামে খ্যাত।

GURUNANAK

অঙ্গদ, অমরদাস, রামদাসঃ

গুরু নানকের মৃত্যুর পরে (১৫৩৮ খ্রীঃ) যথাক্রমে গুরু অঙ্গদ (১৫৩৮-‘৫২ খ্রীঃ), গুরু অমরদাস (১৫৫২-‘৭৪ খ্রীঃ) ও গুরু রামদাস (১৫৭৫-৮১ খ্রীঃ) নানকের উত্তরাধিকারী মনোনীত হয়। তাঁদের সময়ে ও শিখগণ একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। শুরু অঙ্গদের দুটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল গুরু নানকের বাণী ও উপদেশগুলিকে লিপিবদ্ধ করা ও স্বতন্ত্র গুরুমুখী ভাষার প্রবর্তন করা।

এছাড়া তিনি বিভিন্ন স্থানে একাধিক ‘গুরু কালঙ্গর’ (গুরুদ্বার) নির্মাণ করেন। শুরু অমরদাস-এর নেতৃত্বে শিখ-সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি শিখ-পন্থ (সম্প্রদায়)-কে ২২টি মঞ্জিতে (Manjis) বিভক্ত করে প্রতিটি মঞ্জির দায়িত্ব একজন করে ধর্মপ্রাণ শিখের উপর ন্যস্ত করেন। তিনি শিখদের সুরাপান নিষিদ্ধ করেন। গুরু রামদাস সম্রাট আকবরের কাছ থেকে প্রাপ্ত জমির উপর ‘অমৃতসর’ বা অমৃত সরোবর খনন করেন। এই সরোবরের তীরে শিখদের প্রধান মন্দির গড়ে ওঠে। এই শহর ‘অমৃতসর’ নামে পরিচিত হয়।

গুরু অর্জুন:

পঞ্চম গুরু অর্জুন (১৫৮১-১৬০৬ খ্রীঃ) অমৃত সরোবরের মাঝে হরমন্দির তৈরী করেন এবং গুরু নানকের বাণী সংকলিত করে ‘গ্রন্থসাহেব’ রচনা করেন। তিনি অনুগামীদের স্বেচ্ছাদানের নির্দেশ দেন। যেসব শিখ এই অর্থ আদায় করতেন, তাঁদের উপাধি ছিল ‘মসন্দ’। এই অর্থাগমের ফলে শিখ-সংগঠনের আর্থিক ভিত সুদৃঢ় হয়। সেই সময় থেকেই শিখগণ রাজনীতির আবর্তে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। গুরু অর্জুন জাহাঙ্গীরের বিদ্রোহী পুত্র খসরুকে আশ্রয় দান করেন। এই অপরাধে অর্জুনকে বন্দী করে আনা হয় ও অর্থদণ্ড করা হয়। কিন্তু তিনি অর্থ দিতে অস্বীকৃত হলে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে হত্যা কর হয়। এই ঘটনা শিপন্থকে মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তারা মুঘলের শত্রুতে পরিণত হয়।

গুরু হরগোবিন্দ:

ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ (১৬০৬-‘৪৫ খ্রীঃ) শিখদের সামরিক সংগঠনে পরিণত করতে উদ্যোগ নেন। তিনি নিজে ‘সাচ্চা বাদশাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং শিষ্যদের কাছ থেকে অর্থের পরিবর্তে সামর্থ্য অনুযায়ী অশ্ব ও অস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেন। জাহাঙ্গীর হরগোবিন্দর সাময়িক কার্যকলাপে শঙ্কিত হয়ে তাঁকে বন্দী করে গোয়ালিয়র দুর্গে আবদ্ধ করে রাখেন। কয়েক বছর পরে মুক্তি পেয়ে তিনি গোপনে শিখ-সংগঠনকে সংহত করতে থাকেন। শাহজাহানের রাজত্বকালে পুনরায় শিখ-মুঘল সংঘর্ষ শুরু হয়। কর্তারপুর ও অমৃতসর-এর যুদ্ধে শিখবাহিনী মুঘলের হাতে পরাজিত হয়। গুরু হরগোবিন্দ কাংড়ার পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে নিজেকে রক্ষা করেন।) পরবর্তী গুরুদ্বয় যথাক্রমে হররায় (১৬৪৫-‘৬১ খ্রীঃ) ও হরকিষেন (১৬৬১-৬৪ খ্রীঃ)-এর সময়েও শিখ-মুঘল শত্রুতা অব্যহত থাকে।

GURU TEG BAHADUR

গুরু তেগবাহাদুর:

শিখদের নবম গুরু ছিলেন তেগবাহাদুর (১৬৬৪-‘৭৫ খ্রীঃ)। তিনি শিখ-পন্থকে প্রচণ্ড শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন এবং প্রকাশ্যে মুঘল বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের হিন্দুবিদ্বেষী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। জিজিয়া করের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দেন। ক্ষুব্ধ ঔরঙ্গজেব তেগবাহাদুরকে বন্দী করেন এবং ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে আদেশ দেন। কিন্তু গুরু তেগবাহাদুর মৃত্যুবরণ করেও নিজধর্মের পবিত্রতা রক্ষা করেন। নবম গুরুর এই নির্মম হত্যা শিখদের মনে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

গুরু গোবিন্দ সিংহ:

তেগবাহাদুরের মৃত্যুর পর শিখ-গুরু (দশম) হন তাঁর পঞ্চদশবর্ষীয় পুত্র গোবিন্দ সিংহ (১৬৭৫-১৭০৮ খ্রীঃ)। পিতার নৃশংস হত্যার জন্য মুঘলের উপর তাঁর প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল। তিনি অনুভব করেন যে, সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া শিখজাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

তিনি এজন্য শিখপন্থকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। তিনি গুরু-পদের অবসান ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ‘খালসা’ই হবে গুরু এবং গুরু হল ‘খালসা’। ‘খালসা’ কথার অর্থ পবিত্র। শিখজাতির এক সম্মেলন ডেকে তিনি ৫ জন শিখকে মনোনীত করেন। এঁদের নাম হয় ‘পঞ্চপিয়ারে’। শিখধর্মে এঁরাই দীক্ষা দেবেন। দীক্ষাগ্রহণের পর প্রতিটি শিখই হবে ‘খালসা’র সদস্য।

মুঘলদের প্রতিহত করার জন্য তিনি আনন্দগড়, কেশগড় প্রভৃতি কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং আনন্দপুর নামক স্থানকে সুরক্ষিত করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। আনন্দপুর শিখজাতির প্রধান কর্মকেন্দ্রে পরিণত হয়। আনন্দপুরের প্রথম যুদ্ধে (১৭০১ খ্রীঃ) শিখবাহিনী জয়লাভ করে।

কিন্তু দ্বিতীয় যুদ্ধে (১৭০৩ খ্রীঃ) বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেও শিখবাহিনী মুঘলের হাতে পরাজিত হয়। গোবিন্দ সিংহের দুই পুত্রকে হত্যা করা হয়। গুরু চক্কোতে তাঁর বাহিনীর সাথে মিলিত হন। মুঘলবাহিনী চক্কো আক্রমণ করে শিখবাহিনীকে আবার পরাজিত করে।

এখানে গুরুর অপর দুই পুত্র নিহত হয়। গোবিন্দ সিংহ পাতিয়ালায় গিয়ে নতুন করে খালসাবাহিনী গঠন করেন। এখান থেকেই তিনি ঔরঙ্গজেবের উদ্দেশ্যে রচিত তাঁর বিখ্যাত খোলা চিঠি ‘জাফর-নামা’ প্রকাশ করেন। পরে ঔরঙ্গজেব গুরু গোবিন্দ সিংহ বাহাদুর শাহের সাথে সাক্ষাৎ করেন। উভয়ের মধ্যে মিত্রতা স্থাপিত হয়। ১৭০৮ খ্রীষ্টাব্দে এক পাঠান আততায়ীর ছুরিকাঘাতে গোবিন্দ সিংহ নিহত হন। দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ‘গুরু’-পদ বিলুপ্ত হলেও ‘খালসা’ ও শিখ-পন্থ শিখজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ চালাতে থাকে।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং শিখ শক্তির উত্থান

১৭১৬ সালে বান্দা সিং বাহাদুরের মৃত্যুর পর মুঘলরা সাময়িকভাবে পাঞ্জাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও শিখদের প্রতিরোধ জারি ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সুযোগ নিয়ে শিখরা মিসল নামে ছোট ছোট সামরিক গ্রুপ গঠন করে এবং ধীরে ধীরে পাঞ্জাবের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। এই মিসলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল সুকেরচকিয়া মিসল, যার নেতা মহারাজা রঞ্জিত সিংহ উনিশ শতকের শুরুতে একটি শক্তিশালী শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই সাম্রাজ্য মুঘলদের দুর্বল শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাঞ্জাবে শিখ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

মুঘল এবং শিখ সম্পর্ক

Leave a Reply