মার্কিন যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বন্দ্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তা স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত। এই সময়ে উভয় দেশ সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে বিভিন্ন দেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। একে অপরের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ (Proxy war) চালায় এবং একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে থেকে যায়। 

এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল দুটি বিপরীত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শের সংঘাত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের পক্ষে ছিল, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মডেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ভবিষ্যৎ এবং পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। 

আরও জানুন- জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন

মার্কিন যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বন্দ্ব

মার্কিন যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতি আলোচনা কর।

• ভূমিকা:-

১৯৪৭ সালের ১২ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যানের মার্কিন কংগ্রেসে ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তার আগেই দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরের উন্মেষ ঘটেছিল। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ স্যার উইনস্টন চার্চিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী প্রদেশের ফালটনে ওয়েস্টমিনিস্টার কলেজে সম্মানমূলক ডিগ্রি গ্রহণকালে প্রদত্ত ভাষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসী দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতা সম্পর্কে সাবধান করে দেন। তাঁর মতে পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন কালো লৌহ যবনিকার অন্তরালে আচ্ছাদিত।

ঠিক একই সময়ে ১৯৪৬ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারী রাশিয়ার কর্ণধার স্টালিন এক ভাষণে সাম্যবাদ ও পুঁজিবাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন। দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সংগ্রামের কথা ব্যক্ত করেন। এরপর মার্কিন সরকারি মহল সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি নমনীয় মনোভাব ত্যাগ করে।

               জার্মানির ব্যাপারে এই স্থায়ী বন্দোবস্ত করা নিয়েই ঠান্ডা লড়াইয়ের সবচেয়ে বিস্ফোরক দিকটি সঞ্জাত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানি থেকে কীভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় হবে সে প্রশ্ন ছাড়াও ঐ দেশের। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ অত্যন্ত কণ্টকিত, জটিল এক সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। একটি দুর্বল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সপক্ষে ছিলেন ফরাসিরা, ব্রিটিশরা চেয়েছিল একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র আর রুশের তরফে প্রথমদিকে ঐক্যবদ্ধ জার্মানি ও পরে দ্বিধাবিভক্ত জার্মানিই সুবিধাজনক মনে হয়।

দ্বিধাবিভক্ত জার্মানির পুনর্মিলন ছাড়া এসব প্রশ্নের স্থায়ী মীমাংসা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় ব্রিটেন ও আমেরিকা দখলীকৃত অংশে জোরদার প্রয়াস শুরু হয় একটি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সেইসঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংসদের আয়তন বৃদ্ধি, রুর শিল্পাঞ্চলের আন্তর্জাতিকীকরণ, জার্মান মুদ্রা মার্কের নতুন মূল্য নির্ধারণ, আলাদা শান্তিচুক্তি এবং ত্রিশক্তির মোতায়েন করা সেনাবাহিনীর স্থায়ী অবস্থান পশ্চিম জার্মানিতে Federal Republic of Germany নামক আলাদা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় জ্ঞাপন করে। অন্যদিকে বুশের তরফেও তোড়জোড় শুরু হয় পূর্ব জার্মানিকে সোভিয়েত ধাঁচে গড়ে তোলার।

               এরপর যুদ্ধে পরাভূত শত্রুপক্ষীয় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শান্তিচুক্তি প্রস্তুত করার ব্যাপারে পটসডাম সম্মেলনে (১৯৪৫) পঞ্চ মিত্রশক্তির (আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন) পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত পর্ষদে প্রায় প্রতিটি বিষয় নিয়ে সোভিয়েত প্রতিনিধির বিতণ্ডা চলতে থাকে। ইতালির দখলে আসা ট্রিয়েস্ট (Trieste)-কে যুগোশ্লাভিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা এবং আফ্রিকায় ইতালীয় উপনিবেশ ত্রিপলি-কে সোভিয়েত অছি শাসনে আনার প্রস্তাব পশিমি পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের তীব্র বিরোধিতায় নাকচ হয়ে যায়।

অন্যান্য ক্ষেত্রেও শান্তিচুক্তি সম্পাদনে তিক্ততা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে গ্রিসে বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের ওপর হানাদারির জন্য ব্রিটিশ সেনাপ্রেরণেরও তীব্র সমালোচনা করেন সোভিয়েত প্রতিনিধি মলোটভ। একটি মিত্রপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ পরিষদ (Allied Control Council) গঠন সত্ত্বেও জাপানের পুনর্গঠন এবং নতুন সংবিধান রচনার ব্যাপারে একচেটিয়া মার্কিন কর্তৃত্ব সোভিয়েত সরকারকে অসন্তুষ্ট করে তোলে। অন্যদিকে চিনের গৃহযুদ্ধ শেষে মূল ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত জাতীয়তাবাদী চিয়াং কাইশেক সরকারকে সমর্থন জানাতে থাকে পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলি এবং গণবিপ্লবী চিন সরকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। এইভাবে যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধানের অভাব, দুই শিবিরের বৈরী সম্পর্ককে বিদ্বিষ্ট করে তোলে।

ন্যাটো :-

ন্যাটো (NATO) এবং কমিকন দুটি ভিন্ন জিনিস। ন্যাটো হল একটি সামরিক জোট, আর কমিকন হল একটি বার্ষিক সম্মেলন বা উৎসব যেখানে কমিকস, সিনেমা, ভিডিও গেম এবং অন্যান্য পপ সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা ও প্রদর্শনী হয়। NATO এর পুরো নাম North Atlantic Treaty Organization। এটি একটি আন্তঃসরকার সামরিক জোট।এই জোটের সদস্য দেশগুলো রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে।এর প্রধান উদ্দেশ্য হল সদস্য দেশগুলোর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।ন্যাটোর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থিত।

কমিকন:-

কমিকন হল একটি সম্মেলন বা উৎসব যেখানে কমিকস, সিনেমা, ভিডিও গেম, অ্যানিমে, মাঙ্গা এবং অন্যান্য পপ সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, প্রদর্শনী ও কেনাকাটা করা হয়।

             এটি সাধারণত একটি বার্ষিক ইভেন্ট এবং বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।কমিকন-এ সাধারণত কসপ্লে, প্যানেল আলোচনা, গেমিং টুর্নামেন্ট এবং অন্যান্য আকর্ষণীয় কার্যক্রম থাকে। সবচেয়ে বিখ্যাত কমিকন হল সান দিয়েগো কমিক কন।সুতরাং, ন্যাটো একটি রাজনৈতিক ও সামরিক জোট, যেখানে কমিকন হল একটি বিনোদনমূলক উৎসব। এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বিষয়।

ট্রুম্যান নীতি:-

ট্রুম্যান নীতি, যা ট্রুম্যান ডকট্রিন নামেও পরিচিত, ছিল ১৯47 সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস. ট্রুম্যান কর্তৃক ঘোষিত একটি বৈদেশিক নীতি। এই নীতি অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেইসব দেশকে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়, যারা বহিরাগত বা অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ববাদী শক্তির হুমকির সম্মুখীন। মূলত, এটি ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদ মোকাবেলা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশল।

           ট্রুম্যান নীতি ছিল মূলত দুটি দেশের জন্য: গ্রিস এবং তুরস্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দুটি দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবাধীন হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। ট্রুম্যান বিশ্বাস করতেন যে, এই দুটি দেশকে সহায়তা করা না হলে, তারা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, অথবা নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হবে।

এই নীতির মূল বিষয় ছিল:- 

কমিউনিজম বা অন্যান্য কর্তৃত্ববাদী শক্তির বিস্তার রোধ করা। গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে তাদের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সহায়তা করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা।

         ট্রুম্যান নীতি ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির একটি নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সমর্থনে তাদের অবস্থান সুসংহত করে।

         এই নীতির মাধ্যমে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিস ও তুরস্কে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করে, যার ফলে উভয় দেশই সোভিয়েত প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। পরবর্তীতে, এই নীতি অন্যান্য দেশেও সম্প্রসারিত হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও উন্নয়নে সহায়তা করতে থাকে।

মার্শাল পরিকল্পনা :-

মার্শাল পরিকল্পনা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগ। এই পরিকল্পনা অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করে, যা যুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এই পরিকল্পনাটি “ইউরোপীয় পুনরুদ্ধার কর্মসূচি” নামেও পরিচিত ছিল।

             এই পরিকল্পনাটি ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছিল এবং চার বছর ধরে চলেছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তার রোধ করা।

            মার্শাল পরিকল্পনায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ১৩৩ বিলিয়নের সমান) সহায়তা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রদান করে। এর মধ্যে ছিল খাদ্য, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এই পরিকল্পনাটি কেবল অর্থনৈতিক সাহায্য ছিল না, বরং এটি রাজনৈতিক এবং কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি ইউরোপে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল এবং ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মার্শাল পরিকল্পনা ছিল একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা ইউরোপের অর্থনীতি এবং রাজনীতিকে নতুন পথে চালিত করেছিল।

কোরীয় যুদ্ধ:-

প্রায় তিনদশক পরে দ্বীপরাষ্ট্র কোরিয়া জাপানি সাম্রাজ্যের কবল থেকে মুক্ত হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে জাপানি অধ্যায়-এর পরিসমাপ্তি ঘটলেও মুক্তিবাদী মিত্রশক্তিপুঞ্জের ‘প্রভাব-এলাকার’ তত্ত্ব পৌঁছোল সুদূর কোরিয়ায়। যুদ্ধের শর্ত অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার এবং দক্ষিণ প্রান্ত আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকল। দেশটি দুটি দখলি এলাকায় বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সেখানে দুটি আলাদা ধরনের সরকার ও ভিন্ন দুই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা কায়েম হতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবানুসারে ৩৮০ অক্ষরেখার সীমানা ধরে কোরিয়াকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দু’ভাগে ভাগ করা হয়।

               ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মস্কোয় কোরিয়া সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এক আলোচনা বৈঠক বসে। এই আলোচনায় স্থির হয় যে সোভিয়েত-মার্কিন যুক্ত কমিশন গঠন করা হবে। এই কমিশন কোরিয়ার সব গণতান্ত্রিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করবে। কোরিয়া পাঁচ বছরের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিন, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে।

এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিষয়টি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে উত্থাপন করলে জাতিপুঞ্জ কোরিয়া সম্পর্কিত এক অস্থায়ী কমিশন নিযুক্ত করে। এই কমিশনকে সমগ্র কোরিয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া জাতীয় পরিষদ প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় সৈন্যবাহিনী গঠন করে সমগ্র কোরিয়ার শাসনক্ষমতা দখল সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ করবার অধিকার প্রদত্ত হয়। কমিশনকে আরও দায়িত্ব দেওয়া হয় বিদেশি সৈন্য অপসারণের জন্য।

সোভিয়েত ইউনিয়ন এই কমিশন গঠনের প্রস্তাবে বিরোধিতা করে। কমিশন শুধু দক্ষিণ কোরিয়াতে নির্বাচন-পর্ব অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। সমগ্র কোরিয়াকে ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই ও মতপার্থক্যের ফলে উক্ত প্রচেষ্টা সাফল্যলাভ করেনি।

               ১৯৪৮ সালে সীংম্যান রী’র নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক দক্ষিণপন্থী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। রী’র একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থায় কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দমন করা হতে লাগল এবং এই কমিউনিস্ট সংগঠনকে সরাসরি দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হল।

তিনি কমিউনিস্টদের সতর্ক করে দিলেন যে তারা যদি তাঁর মত সমর্থন না করে তাহলে সৈন্য দ্বারা দ্বীপরাষ্ট্রটির উত্তর সীমান্ত বন্ধ করে দেবেন। আমেরিকা স্ত্রী’র এই হুমকিকে যুদ্ধের প্রাক্-ঘোষণা হিসেবে গুরুত্ব দিল এবং তাঁর এই উগ্র জাতীয়তাবোধকে ঠেকানোর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্যবাহিনীকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র পাঠাল। উত্তর কোরিয়াতে এক নির্বাচন হয়। কিম ইল সুং-এর নেতৃত্বে এক কমিউনিস্ট সরকার উত্তর কোরিয়াতে কার্যভার গ্রহণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

উত্তর কোরিয়া প্রধানত শিল্পপ্রধান এবং দক্ষিণ কোরিয়া কৃষিপ্রধান। আমেরিকা সীংম্যান সরকারকেই একমাত্র আইনসঙ্গত কোরিয়া সরকার বলে ঘোষণা করে। নতুন এক কমিশন গঠন করে উভয় কোরিয়ায় সংযুক্তির প্রচেষ্টা চালাতে বলা হয়। উভয় কোরিয়াই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার আবেদনপত্র জাতিপুঞ্জ গ্রহণ করেনি। দক্ষিণ কোরিয়ায় আবেদন সোভিয়েত ‘ভেটো’ প্রয়োগের ফলে বাতিল হয়ে যায়।

             ১৯৫০-এর জুন মাসে অভিযোগ ওঠে উত্তর কোরিয়া থেকে নাকি কমিউনিস্ট ফৌজ সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়া ভূখণ্ড আক্রমণে উদ্যত। প্রসঙ্গটি অচিরেই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হয় এবং আগ্রাসনের ঘটনা হিসেবে একে চিহ্নিত করে যৌথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা, অর্থাৎ উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সম্মিলিত আক্রমণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সোভিয়েতের প্রবল আপত্তি, ঘন ঘন ভিটো প্রদান ও শেষে সভাকক্ষ ত্যাগের পর অচল নিরাপত্তা পরিষদ থেকে বিষয়টি সাধারণ সভায় তোলা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে কোরিয়ায় UN সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই অভিযানে ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশের সহযোগিতা থাকলেও, সদ্য-দখল জাপানের ভূখণ্ড থেকে যুদ্ধ পরিচালনার সিংহভাগ দায় বহন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরের চেষ্টাতেও এই যৌথ অভিযান শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

বরং ৩৮তম অক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশোদ্যত জাতিপুঞ্জ বাহিনী, চিন-সোভিয়েত সাহায্যপুষ্ট উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের মুখে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শেষপর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বাধ্য হয় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এবং জেনিভা শাস্তি সম্মেলনের (১৯৫৪) শর্তসাপেক্ষে উভয়পক্ষের বন্দিবিনিময় সম্পন্ন হয়।

সুয়েজ সংকট:-

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে মিশর অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ শেষে মিশর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ লাভ করে। যুদ্ধোত্তরকালে মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবের ফলে মিশরে যে গঠনমূলক জাতীয়তাবোধ জন্মায়, পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক শক্তিগুলি তাকে উপেক্ষা করতে থাকে। ১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে কর্নেল গামাল আব্দেল নাসের সর্বসম্মতিক্রমে মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

             রাষ্ট্রপতি নাসেরের বৈদেশিক নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র আরব জগতকে ঐক্যবদ্ধ করা, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দূর করা, সামন্তবাদের উচ্ছেদ সাধন করে আমূল ভূমি সংস্কার প্রবর্তন করা। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য নাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনা অবলম্বন করেন। পশ্চিমি বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন প্রমুখ এবং বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন নাসের। কিন্তু তাঁর এই আবেদন গৃহীত হয়নি। তাদের এই অসম্মতি নাসেরকে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

             নাসের ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই সুয়েজ খাল জাতীয়করণের কথা ঘোষণা করেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে জাতীয়করণের পরে সুয়েজ খাল থেকে যে অর্থ সংগৃহীত হবে তাই আসোয়ান বাঁধ নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং এইভাবে মিশরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে রূপায়িত করা হবে। সুয়েজ জাতীয়করণে ইঙ্গফরাসি শক্তি মিশরের ওপর বিশেষভাবে ক্রুদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এরপর মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসের সুয়েজ খাল থেকে ব্রিটিশ সৈন্য অপসারণ এবং পুরনো চুক্তি বাতিল করে সুয়েজ খালের কর্তৃত্ব মিশরের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করায় ইঙ্গ-ফরাসি তরফে সশস্ত্র যুগ্ম আক্রমণ (১৯৫৬) চালানো হয়। নির্জোট নীতির পক্ষপাতী নাসেরের সঙ্গে সোভিয়েত দেশের সুসম্পর্ক লক্ষ করে নীলনদের ওপর নির্মীয়মাণ আসোয়ান বাঁধ প্রকল্প থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুত সাহায্য প্রত্যাহার করে নেয়।

সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিম অনুগামী কয়েকটি দেশ (ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও পাকিস্তান)-কে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করা মধ্যপ্রাচ্যে এ পর্যন্ত অনাগত ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পথ উন্মুক্ত করে দিল।

কিউবা সংকট:-

কিউবা সংকট বলতে ১৯6২ সালের অক্টোবরে ঘটে যাওয়া একটি সংকটকে বোঝায় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি স্থাপনকে কেন্দ্র করে এই সংকট তৈরি হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময়, সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় তাদের মিত্র রাষ্ট্র, ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট সরকারের সমর্থনে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি স্থাপন করতে চেয়েছিল।আমেরিকান U-2 গোয়েন্দা বিমান কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি স্থাপন করছে বলে জানতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি কিউবার উপর নৌ অবরোধ আরোপ করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেন।

            সংকট সমাধানে উভয় দেশ কূটনৈতিক আলোচনায় বসে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সরিয়ে নিতে রাজি হয়। বিনিময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হয়।

           কিউবা সংকট স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত ছিল, যা পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারত। তবে, শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছিল। এই সংকটের ফলে উভয় দেশই পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে চেষ্টা করে।

বার্লিন সংকট:-

বার্লিন সংকট বলতে জার্মানির বার্লিন শহরকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধের সময় সৃষ্ট কয়েকটি সংকটকে বোঝায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি সংকট হল: বার্লিন অবরোধ (১৯৪৮-১৯৪৯) এবং বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ (১৯৬১)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির বার্লিন শহরটি মিত্রশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন) কর্তৃক অধিকৃত ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমা মিত্রদের বার্লিনে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে এবং তাদের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা মিত্ররা বার্লিন এয়ারলিফ্টের মাধ্যমে শহরটিতে বিমানযোগে রসদ সরবরাহ করে। 

বার্লিন প্রাচীর ছিল পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে একটি ভৌত বিভাজন যা পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট সরকার বার্লিনকে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই ভাগে বিভক্ত করার জন্য নির্মাণ করে। এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের একটি প্রতীক এবং দুই জার্মানির মধ্যে মানুষের অবাধ চলাচল বন্ধ করে দেয়।  এই দুটি সংকটই স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধি করে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। 

ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ:-

আনাম, কাম্বোডিয়া ও লাওস এই তিনটি রাজ্যকে নিয়ে ছিল ইন্দোচীন। উনিশ শতকে এই তিনটি রাজ্যের ওপর ফ্রান্স তার আধিপত্য স্থাপন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান যখন ইন্দোচীনে প্রবেশ করে তখন এখানে ফরাসি শাসনের অবসান ঘটে। এই সময় ভিয়েৎমিন্ নামে একটি বিপ্লবী দল স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করে। জাপানের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দলটি আনামে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এবং এর নাম দেয় ভিয়েতনাম। এই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হলেন হো চি মিন।

                 যুদ্ধ শেষ হলে ফরাসি সরকার এই অঞ্চলে তার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবার সঙ্কল্প করে। শুরু হল সাম্রাজ্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এইভাবে জাপান থেকে কোরিয়া এবং তারপরেই দক্ষিণ-পূর্বমুখী আক্রমণাত্মক প্রস্তুতির সমর্থনে Domino Theory নামের একটি তত্ত্বের আমদানি করা হয়।

                  ঠান্ডা লড়াইয়ের রাহু অনিবার্যভাবে গ্রাস করল ভিয়েতনামের শাস্তি প্রক্রিয়াকে। পতনোন্মষ ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ না করাটা মার্কিন প্রশাসনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ (tactical retreat) মাত্র এবং জেনিভা সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনামের অভ্যুদয় যে আদৌ তাদের মনঃপূত নয় তার প্রমাণ অচিরেই পাওয়া গেল। ভিয়েতনামের দক্ষিণ অংশকে এবার ‘testing ground for containment on the mainland of Asia’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকল।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের মার্কিন মনোনীত রাষ্ট্রপ্রধান নো দিন দিয়েমকে আশ্বাস দেওয়া হল তাঁর দেশটিকে রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত ও বাইরের সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করবার মতো শক্তিশালী করে তোলা হবে। এইভাবে শুরু হল দক্ষিণ ভিয়েতনামে জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির উপর দমনপীড়ন, প্রতিক্রিয়ায় উত্তরোত্তর গণবিক্ষোভ, স্বেচ্ছাবাহিনী ভিয়েতকঙের উদ্ভব, ক্রমাগত মার্কিন সৈন্যবাহিনীর প্রবেশ এবং অবশ্যই উত্তর ভিয়েতনামে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট সরকারের ওপর বোমারু হামলা যার প্রত্যুত্তরে সমগ্র ভিয়েতনাম জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সাহায্য আসতে থাকে সোভিয়েত ও চিন থেকে।

শত্রু বিনাশের নামে শহরতলি, গ্রাম, শস্যক্ষেত্র, বনাঞ্চলে মার্কিন রাসায়নিক অস্ত্রের ধ্বংসলীলা আর নিরীহ মানুষ নিধন সারা বিশ্বে নিন্দা এবং নিজ দেশে ছাত্র যুব বিক্ষোভের আলোড়ন জাগায়। অবশেষে উত্তর ও দক্ষিণের দীর্ঘ (১৯৬৪-৭৫) মৃত্যুপণ সংগ্রাম সমগ্র ভিয়েতনাম ও সন্নিহিত লাওস ও কাম্বোডিয়া থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ অপসারণে বাধ্য করে এবং স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনামের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

                দেখা গেল কোরিয়ার সংগ্রামের পর আবার এশিয়ারই অন্য একটি দেশে মার্কিন আগ্রাসনের তান্ডব। একে উপলক্ষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অংশত চিনের সঙ্গে তাদের শুধু ছায়াযুদ্ধ নয়, ভালো মতো শক্তির পরীক্ষা হয়ে গেল। সেইসঙ্গে তৃতীয় দুনিয়ার কোন্ দেশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এই সংগ্রামে কী ভূমিকা গ্রহণ করে তারও পরীক্ষা হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও অভাবনীয় পরাজয় ঘটল। ভিয়েতনামের এই সাফল্যে সমগ্র এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে সোভিয়েত দেশের প্রভাব শতগুণ বর্ধিত হল।

মার্কিন যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বন্দ্ব

Leave a Reply