মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা কর – ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ছিল মূলত একটি সামরিক বিদ্রোহ যা পরবর্তীতে গণ-বিদ্রোহে রূপ নেয়। এর প্রকৃতি ছিল বহুমুখী: এটি সিপাহীদের অসন্তোষ, কৃষক ও সাধারণ মানুষের ব্রিটিশ বিরোধী বঞ্চনা, অভিজাত ও জমিদারদের ক্ষমতা হারানোর ভয় এবং সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া, এবং কিছু ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার এক জটিল মিশ্রণ ছিল। এই বিদ্রোহ সিপাহীদের নেতৃত্বে শুরু হলেও, পরে তাতে কৃষক, জমির মালিক, এবং বিভিন্ন শ্রেণীর সাধারণ মানুষও অংশগ্রহণ করে, যা একে একটি পূর্ণাঙ্গ গণ-অভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছিল।
Table of Contents
READ MORE – শিল্প বিপ্লব (1820-1880)
মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা কর

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি ও চরিত্র:-
1857 খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে যে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তা ইতিহাসে মহাবিদ্রোহ নামে পরিচিত ।মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি ও চরিত্র সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে ।কোনো কোনো ঐতিহাসিকদের মতে এটা নিছক সিপাহী বিদ্রোহ, কারও মতে এটা সামন্ত বিদ্রোহ, কেউ বলেছেন জাতীয় সংগ্রাম। কেউবা একে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন।
নিছক সিপাহী বিদ্রোহ :–
ঐতিহাসিক চার্লস রেকস , দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ১৮৫৭ খ্রি: বিদ্রোহকে নিছক সিপাহী বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন।এই বক্তব্যের সপক্ষে ঐতিহাসিকদের যুক্তিগুলি হল নিম্নরূপ –(ক) সিপাহীদের অসন্তোষ থেকেই মহাবিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল ।(খ) এই বিদ্রোহের সূচনা ঘটে সেনাছাউনি থেকে ।(গ) ঐতিহাসিকদের মত অনুসারে এই বিদ্রোহের সূচনা যেমন সেনাছাউনি থেকে হয়েছিল তেমনি বিদ্রোহী সিপাহীরাই ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল ।(ঘ) কোথাও কোথাও স্থানীয় মানুষ ,ভূস্বামী ও প্রাক্তন শাসকেরা সিপাহীদের সমর্থন জানালেও এই বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি ছিল সিপাহীরাই ।
জাতীয় বিদ্রোহ :–
অধ্যাপক সুশোভন সরকার, হোমস, আলেকজান্ডার ডাফ, শশীভূষণ চৌধুরী প্রমুখের মতে এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না। এটি ছিল একটি জাতীয় বিদ্রোহ। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের টৌরি দলের সদস্য ডিজরেইলিও মহাবিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলে মনে করেন । তাঁদের মতে –
(ক) তাদের মতে, মুজাফফরনগর, বিহার ও উত্তরপ্রদেশে সিপাহিদের সংযোগ ছাড়াই অসামরিক লোকজন ও জমিদার শ্রেণির ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে।(খ) সিপাহিরা সিংহাসনচ্যুত মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে দেশবাসীর মনে দেশপ্রেমের মনোভাব জেগে ওঠে।
(গ) তারা দেখিয়েছেন, দেশের উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম অংশে বিশেষত অযােধ্যা, দিল্লি, রােহিলখণ্ড প্রভৃতি অঞ্চলে এই বিদ্রোহ কার্যত গণসংগ্রামের রূপ নেয়।(ঘ) ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, নানা সাহেব, কুনওয়ার সিং প্রমুখ রাজন্যবর্গ, তালুকদার ও জমিদার এই বিদ্রোহে যোগ দেন ।কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এই বিদ্রোহকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম আখ্যা দিয়েছেন ।
সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া :–
ডঃ রজনীপাম দত্ত, আর. সি. মজুমদার প্রমুখ মার্কসবাদী ঐতিহাসিকগণ এই বিদ্রোহকে সামন্তশ্রেণীর বিদ্রোহ বলে আখ্যায়িত করেছেন । তাঁদের মতে –(ক) নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, কুনওয়ার সিং প্রমূখ সামন্ত শ্রেণীর মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যএই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন।(খ) ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ ছিল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত শ্রেণি ও মৃতপ্রায় সামন্তশ্রেণির ‘মৃত্যুকালীন আর্তনাদ’।(গ) আবার এরিখ স্টোক্স-এর বিচারে এই বিদ্রোহ ছিল একদল গ্রামীণ ভূস্বামীদের স্বার্থরক্ষার সংগঠিত প্রয়াস।
ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ :–
দেশপ্রেমিক বিনায়ক দামোদর সাভারকর তার “ইন্ডিয়ান ওয়ার অফ ইনডিপেনডেন্স” গ্রন্থে মহাবিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে গণ্য করেছেন। কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, পি সি জোশী, অশোক মেহতা, অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুশোভন সরকার প্রমুখরাও ১৮৫৭ -র বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন।তাঁদের মতে –
(ক) ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে এবং নিজ নিজ রাজ্যে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ও সর্বোপরি ভারতের স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহীরা বিদ্রোহ করেছিলেন। যদিও এই মতকে বহু ঐতিহাসিকরা অস্বীকার করেছেন।
(খ) ১৮৫৭-র বিদ্রোহেই প্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা-শ্রেণি নির্বিশেষে আপামর ভারতবাসী একই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, একই শত্রুর মােকাবিলায় সামিল হয়েছিল। ভারত থেকে অত্যাচারী ইংরেজ শাসনের উৎপাটন ছিল তাদের সাধারণ লক্ষ্য।

কৃষক বিদ্রোহ :–
ঐতিহাসিক খালদুনের মতে এই বিদ্রোহ ছিল কৃষক শ্রেণীর বিদ্রোহ । তাঁর মতে –(ক) অগণিত কৃষকেরা এই বিদ্রোহে মরণপণ সংগ্রাম চালিয়ে ছিল। সমকালীন অনেক ইংরেজ কর্মচারীও এই মতকে সমর্থন করেছেন।
মূল্যায়ন :–
মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি কি ছিল তা এককথায় বলা বেশ কষ্টসাধ্য। এই বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে যেসব মত উঠে আসে তার প্রত্যেকটির সুনির্দিষ্ট যুক্তি আছে। আবার এই সবের পাল্টা যুক্তিও আছে। তাই সম্পূর্ণভাবে এক কথায় ১৮৫৭ -র বিদ্রোহের প্রকৃতি বলা দুঃসাধ্য । বস্তুতপক্ষে ১৮৫৭-র বিদ্রোহ কোনাে ঐতিহাসিকের নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বক্তব্য মেনে পরিচালিত হয়নি। গতির আবেগে বিদ্রোহ সমস্ত তত্ত্বকেই সংমিশ্রিত করেছিল।
বিদ্রোহের ফলাফল আলোচনা কর।
ভূমিকা:-
বিভিন্ন কারণে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই বিদ্রোহ এক নব যুগের সূচনা করে। বস্তুত এই বিদ্রোহের ফলে ভারতীয় রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটে।
• মহাবিদ্রোহের ফলাফল:-
নিম্নে মহাবিদ্রোহের ফলাফল বা প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হল-
[1] কোম্পানির শাসনের অবসান:-
মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে, ভারতের মতো বৃহৎ সাম্রাজ্যের শাসনভার একটি বণিক সম্প্রদায়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ নয়। এজন্য ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ভারত শাসন আইন’ (Government of India Act, 1858) প্রণয়ন করে। এই আইনের মাধ্যমে ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সরকার বা মহারানী ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পণ করা হয়। রানীর প্রতিনিধি হিসেবে গভর্নর জেনারেল ভারতের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতে থাকে।
[2] শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন:-
মহাবিদ্রোহের পর ভারত শাসনের জন্য বেশ কয়েকটি শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন আনা হয়। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইন দ্বারা বোম্বাই ও মাদ্রাজ কাউন্সিলের আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা বাতিল করে, সেটি কলকাতা কাউন্সিলের ওপর অর্পণ করা হয়। কিন্তু ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর এই নীতি প্রত্যাহার করা হয়। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ‘কাউন্সিল অ্যাক্ট’ দ্বারা বোম্বাই ও মাদ্রাজ কাউন্সিলকে আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এছাড়া নতুন কোনো প্রদেশ গঠিত হলে সেই প্রদেশের জন্য আইনসভা গঠন করা এবং সেখানে ভারতীয় সদস্যদের মনোনয়নের বিধানও গৃহীত হয়।
[3] আইন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগ:-
মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ভারত শাসন আইন’ পাস করেন। এই আইন অনুসারে, কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে এবং বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডন্সির আইন পরিষদে ভারতীয় সদস্য নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।

[4] মহারানীর ঘোষণাপত্র:-
ভারতীয়দের মনে ইংরেজ সরকারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর মহারানী ভিক্টোরিয়া একটি রাজকীয় ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়,
[i] ব্রিটিশ সরকার আর কোনো ভারতীয় রাজ্য গ্রাস করবে না। সেইসঙ্গে পূর্বের রাজ্য বিস্তার নীতি বর্জন করা হবে।
[ii] দেশীয় রাজন্যবর্গের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা হবে।
[iii] দত্তক পুত্র গ্রহণের রীতি প্রচলিত থাকবে এবং ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ পরিত্যক্ত হবে।
[iv] দেশীয় রাজ্যগুলির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হবে না।
[v] জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্য ভারতীয়দের সরকারি চাকুরীতে নিয়োগ করা হবে।
[vi] ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সামাজিক রীতিনীতি ও ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
[5] মুঘল সম্রাটের আইনানুগ অধিকার বিলোপ:-
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের সমাপ্তির পর মুঘল সম্রাটের আইনানুগ অধিকার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করা হয়। ইংরেজরা মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দি করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায় এবং তাঁর পুত্র ও পৌত্রদের নির্মমভাবে হত্যা করে।
[6] ভারতীয়দের উচ্চ পদে নিয়োগ:-
ভারতে ব্রিটিশ সরকার বা মহারাণীর শাসন প্রতিষ্ঠার পর ভারতের প্রশাসনিক কার্য ও রাজকার্যের উচ্চ পদে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্য ভারতীয়দের নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।
[7] সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন:-
মহাবিদ্রোহের পর ভারতের সামাজিক ক্ষেত্রেও এক বিরাট পরিবর্তন আসে। ভারতীয় হিন্দুরা পাশ্চাত্য দর্শন, শিক্ষা, বিজ্ঞান ইত্যাদি গ্রহণ করে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমরা তীব্র ইংরেজ বিরোধী মনোভাব গ্রহণ করে এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা বর্জন করে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে।
[8] শাসক শাসিতের সম্পর্কের অবনতি:-
মহাবিদ্রোহের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল শাসক শাসিতের সম্পর্কের ওপর। বিদ্রোহের সময় উভয়পক্ষই চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেয়। ফলে বিদ্রোহের পরও উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়ে ওঠে।

[9] জাতীয়তাবোধের উদ্ভব:-
মহাবিদ্রোহের পর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা সমমর্যাদা ও দেশ শাসনের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়। ফলে তাদের মধ্যে জাগ্রত হয় জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধ।
• উপসংহার:-
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে সিপাহীদের পরাজয় ঘটলেও, ভারতবর্ষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার যেমন ভারতীয়দের দাবি সম্পর্কে সচেতন হয়, তেমনি সকল ভারতীয়দের মনে দেশাত্মবোধের জাগরণ ঘটে।