ভারত বিভাজনের প্রভাব আলোচনা কর – ভারত বিভাজনের প্রভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্থানচ্যুতি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, যা ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। এটি ভারতের ইতিহাসে এক জটিল এবং বেদনাদায়ক ঘটনা, যার ফলে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয় এবং উভয় দেশকেই এর মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হয়।
Table of Contents
ভারত বিভাজনের প্রভাব আলোচনা কর।

ক) ভারতীয় সমাজে প্রভাব:-
ভারত বিভাজনের ফলে ভারতীয় সমাজে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল সাম্প্রদায়িক সমস্যা। দেশবিভাগের ফলে প্রায় ষাটলক্ষ লোক আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। তারা ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই সংখ্যালঘুদের উপর অমানবিক অত্যাচার শুরু করেছিল। লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু নিহত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই “ভ্রাতৃঘাতী মারামারি” এক অভূতপূর্ব মাত্রা স্পর্শ করেছিল। দিল্লী, পাঞ্জাব, বাংলা, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক আকার ধারণ হয়েছিল। তার ফলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ বিপন্ন হয়েছিল।
১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লীর পথে সেনা নামানো হয়েছিল। পুলিশকে কঠোরভাবে এই দাঙ্গা দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে সাম্প্রদায়িক সমস্যা অচিরেই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের সরকার প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নেতৃত্বে সভ্যতা ও স্বাধীনতা বিপন্নকারী সমস্যাকে সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল। সরকার ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হয়েছিল। তার ফলে প্রায় সাড়ে চার কোটি মুসলমান ভারতে রয়ে গিয়েছিল। তবুও জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িকতার কাছে নিজের জীবন দিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার ব্যাপারে গান্ধীজী দুঃখ করে বলেছিলেন তিনি ঈশ্বরকে জানিয়েছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত ভারতের “অশ্রু প্লাবিত ভূমি” থেকে তাঁকে তুলে নিতে। ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দের ৩০ শে জানুয়ারী গান্ধীজী এক উগ্র হিন্দুবাদী নাথুরাম গডসের হাতে নিহত হন।
ভারত বিভাজনের দ্বিতীয় প্রভাব ছিল ছিন্নমূল পরিবারবর্গের আশ্রয়ের সমস্যার সমাধান করা। ভারতবিভাগের ফলে প্রায় যাটলক্ষ ভারতবাসীকে গৃহহারা হতে হয়েছিল। তাদের ত্রাণের ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসনের সমস্যা স্বাধীন ভারতকে বড়ই বিব্রত করেছিল। স্বাধীন সরকারকে সর্বশক্তি নিয়ে এই সমস্যার সমাধানে নামতে হয়েছিল। এই সমস্যার সমাধান করতে যথেষ্টই সময় লেগেছিল। তবে ১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান মোটামুটিভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিল।
ভারতবিভাগের ফলে হিন্দুরা পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানে নিরাপত্তার অভাববোধে ভুগছিলেন। হিন্দুদের উপর দৈহিক অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছিল। পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে পূর্ব পাঞ্জাবে আগত সংখ্যালঘুরা ব্যাপক নরহত্যার সম্মুখীন হয়েছিল। ১৯৪৬ এবং ১৯৫০ খ্রীষ্টাব্দের দাঙ্গার ফলে প্রায় ২ লক্ষ হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ) থেকে পশ্চিমবাংলায় আশ্রয় নিয়েছিল। ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে কাশ্মীরে হজরৎ বাল মসজিদের চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের সমাজের উচ্চ এবং সম্পদশালী ব্যক্তিরা নানারকম নিরাপত্তার অভাবে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। নদীয়ার উদ্বাস্তুদের উপর সাম্প্রতিককালে অনেক গবেষণা হয়েছে। একটি ছোট ঘটনা থেকে সেখানকার অভিজাত হিন্দুদের নিরাপত্তার অভাবের কথা জানা যায়।

খ) ভারতীয় অর্থনীতির উপর প্রভাব :-
ভারত যতদিন ব্রিটিশদের অধীনস্থ উপনিবেশ ছিল ততদিন ব্রিটিশ সরকার ভারতকে অর্থনৈতিক দিক থেকে শোষণ করেছিল। সেজন্য স্বাধীনতার পূর্বে ভারতের অর্থনীতিতে এক স্থাবর অবস্থা ছিল। উৎপাদনশীল শিল্পের উন্নতির কোন বড় রকমের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সেচ, রাস্তাঘাট, শিক্ষা এবং অন্যান্য পরিকাঠামোমূলক ব্যবস্থায় কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা যায় নি। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতালাভের সময় ভারতের অর্থনীতি গ্রামীণ এবং কৃষিভিত্তিক ছিল।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে ও পরে ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৮৫% জনগণ গ্রামেই বসবাস করতো এবং কৃষির উপর নির্ভর করে তাদের জীবনধারণ করত। অধিক উৎপাদনের জন্য কৃষিতে উন্নত রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। কুটীর ও ক্ষুদ্রায়তন শিল্পে সমগ্র জনসংখ্যার এক-দশমাংশ নিযুক্ত ছিল। ম্যালেরিয়া, বসন্ত রোগ, কলেরা; দুর্ভিক্ষ অজম্মা ভারতের অর্থনীতিকে পঙ্গু করেছিল। সাক্ষরতার হার ১৬% এর বেশী ছিল না। শতকরা ৮৪ জন জনগণ অশিক্ষিত ও নিরক্ষর ছিল। মরণশীলতার হার প্রতিহাজারে ছিল ২৭%।
কৃষিমন্ত্রক খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেচ ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। দামোদর ভ্যালি করপোরেশন (D.V.C), ভাকরা-নাঙ্গাল বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। শিল্পের উন্নতির জন্য রসায়নিক সার প্রকল্প, কাগজমুদ্রণ শিল্পের উন্নতি, রেলইঞ্জিন বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য (ব্রিটিশ স্টারলিং-এর সঙ্গে) ভারতের অনুকূলে ছিল। ভারত ব্যবচ্ছেদের ফলে মুদ্রাস্ফিতি এক বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের অভাব দেখা দিয়েছিল। ভারতবিভাগের পর উদ্বাস্তু সমস্যা ও সাম্প্রদায়িক ঘটনার বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। তবে এ ব্যাপারে উন্নতির জন্য স্বাধীন ভারতের সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

গ) ভারতীয় রাজনীতির উপর প্রভাব :-
স্বাধীনতা লাভের পর ভারতকে বেশ কয়েকটি জটিল রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভ এক বিরাট ঐতিহাসিক ঘটনা। স্বাধীনতার পর ভারতকে অজস্র সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এজন্য পণ্ডিত নেহেরু নিজেই বলেছিলেন “যে সাফল্যের জন্য আমরা উৎসব করছি তা কিন্তু নিছক একটি ধাপ, একটা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়া মাত্র।”
প্রথমত :- স্বাধীনতার পরেই যে সমস্যাটি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো দেশীয় করদ রাজ্যগুলিকে ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে যোগ করা ।
দ্বিতীয়ত, দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সমস্যা নগ্ন আকারে দেখা দিয়েছিল। তার আশু মোকাবিলা করার প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তান থেকে আগত প্রায় যাট লক্ষ উদ্বাস্তুর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বিশেষ সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। সাম্প্রদায়িক গুণ্ডাবাজদের আক্রমণ থেকে মুসলমান ও হিন্দুদের রক্ষা করা। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা পরিহার করা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানকে প্রতিহত করা।)
তৃতীয়ত, স্বাধীন ভারতের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনা করা অন্যতম সমস্যা ছিল। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রে ও রাজ্যগুলিতে সরকার গঠন করা। সবশেষে ভারতে ভূমি ও ভূমি-রাজস্ব প্রশাসনে যে “আধা সামন্ততান্ত্রিক” ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাঁর অবসান করা। –
চতুর্থ ভারতের সদ্য স্বাধীনতা লাভ গৌরবজনক ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু জাতীয় অখণ্ডতা রক্ষা করা সব থেকে কঠিন কাজ ছিল। পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিকে সুনিশ্চিত করা অন্যতম কর্তব্য ও সমস্যা ছিল। সারা দেশ যে সর্বগ্রাসী দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপুষ্টি প্রভৃতির সমস্যায় ভুগছিল তার সমাধান পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে সমাধান করা।

ঘ) শরণার্থী সমস্যা :-
১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের আগস্ট এবং ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ভারত ও দেশীয় স্বাধীন করদ রাজ্যগুলি বিশেষ সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। এ ব্যাপারে তারা ব্রিটিশ ও জিন্নাহর কাছ থেকে মদতও পেয়েছিল। সেই সময় দু একটি দেশীয় রাজ্যের মনোভাব সম্পর্কে বল্লভভাই প্যাটেল অবহিত ছিলেন। প্যাটেল ঘোষণা করেন যে বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে। এই ঘোষণার মধ্যে তিনি প্রচ্ছন্নভাবে হুমকিও দিয়েছিলেন। জুনাগড়, হায়দরাবাদ এবং কাশ্মীরের ভারতে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমস্যা স্বাধীন ভারতের সরকার তথা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিল এবং এই রাজ্যগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
স্বাধীন ভারতের সরকার নেহেরুর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক সমস্যাও সমাধান করেছিল। তারফলে প্রায় সাড়ে চার কোটি মুসলমান ভারতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ) থেকে আগত শরণার্থী ও হিন্দুদের পাকিস্তান সরকারের অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সম্প্রদায়িক মনোভাব এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল। হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরাও অনেকাংশে দায়ী ছিল। এর মধ্যে গান্ধীজীর নৃশংস হত্যা সাম্প্রদায়িকতাকে এক বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল। এছাড়াও ছিল ১৯৪৯ সালে দেশজুড়ে রেলওয়ে ধর্মঘট গড়ে তোলা। এই কাজে কমিউনিস্টরা নেতৃত্ব দিয়েছিল। তারা নেহেরুকে “সাম্রাজ্যবাদ ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শক্তির দালাল” বলে ঘোষণা করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে হায়দরাবাদে তেলেঙ্গানার আন্দোলনও দীর্ঘ দিন চলেছিল। এগুলি সবই শেষ পর্যন্ত নেহেরুর সরকার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল।