You are currently viewing ভারত বিভাজন

ভারত বিভাজন

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ছিল ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্যের বিভাজন, যার ফলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই বিভাজনটি ধর্মের ভিত্তিতে করা হয়েছিল এবং এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থানান্তর ঘটেছিল। 

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ছিল ব্রিটিশ ভারতের সমাপ্তি এবং ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। এই বিভাজন ব্রিটিশদের “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতির ফল ছিল, যেখানে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। মুসলিম লীগের নেতারা মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমির দাবি করেন, যা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সৃষ্টির দিকে পরিচালিত করে। 

আরো জানুন- জোট নিরপেক্ষ নীতি

১৯৪৭ এর ভারত বিভাজন কি অনিবার্য ছিল ?

উত্তরঃ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মবলিদান ও আত্মত্যাগের পরিণতি ঘটে ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট। ভারত স্বাধীন হয়, কিন্তু বিরাট একটা ক্ষত সৃষ্টি হয় ভারতবর্ষের বুকে। ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়। জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’। ভারতবর্ষে এই দুঃখজনক (Tragic) পরিণতি সম্পর্কে দীর্ঘ বিতর্ক চলছে। ভারত বিভাগ কি অনিবার্য ছিল? অনেকের মতে, এই বিভাজন অবশ্যম্ভাবী ছিল না। জাতীয় দলের ভুলভ্রান্তি, কয়েকজন নেতার একগুঁয়ে মনোভাব এবং ক্ষমতালাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এই বিভাগ অনিবার্য করে তুলেছিল। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ-কী হিন্দু, কী মুসলমান কেউই এই দুঃখজনক পরিণতির জন্য প্রস্তুত ছিল না, তবুও ভারত বিভক্ত হল।)

জিন্নাহ’র দায়িত্ব:

সাধারণভাবে। : সাধারণভাবে ভারত বিভাগের জন্য মুসলিম লিগ এবং বিশেষ করে মহম্মদ আলি জিন্নাহকে দায়ী করা হয়। তিনি হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি-এই দ্বিজাতি তত্ত্বকে আঁকড়ে স্বতন্ত্র ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর “পাকিস্তানের জনক” আখ্যা থেকে এ সত্য প্রমাণিত। তাঁর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক (Direct action) এবং দেশ জুড়ে নারকীয় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ প্রমাণ করেছিল যে, হিন্দু-মুসলমান একত্রে সহাবস্থান সম্ভব নয়। কেউ কেউ মনে করেন, ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাননি।

মুসলমানদের দাবিকে সামনে রেখে তিনি নেহরু, প্যাটেল প্রমুখের সাথে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে জয়ী হতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবির চেয়েও তাঁর লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসের বিরোধিতা। তাঁর দৃষ্টিতে কংগ্রেস ছিল হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান। অনেকে বলে থাকেন যে, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তপ্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় কংগ্রেস মংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিগের ২ জন সদস্যকে গ্রহণ না-করার ফলে লিগের সাথে কংগ্রেসের বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। এরপর থেকেই স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি জোরদার হতে থাকে। জিন্নাহ রাজনীতির সাথে ধর্মকে মিশিয়ে ভারতে জাতীয় জীবনের মূল স্রোত থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করে রাখেন।

ইংরেজের দায়িত্ব:

অনেকে বলেন, হিন্দু-মুসলমান বিভেদ সত্ত্বেও ভারত বিভাগ অনিবার্য ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ শাসক “Divide and Rule” নীতি প্রয়োগ করে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার বীজ রোপণ করে ভারত বিভাগ অনিবার্য করে তোলে। দেখা গেছে যে, প্রথমদিকে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ব্যবহার করেছে, কিন্তু পরে হিন্দুরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলে তারা মূল স্রোত থেকে মুসলমানদের সরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-রাষ্ট্রে সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের মনে তীব্র  ভীতি তৈরি করে।

১৯০৯ ও ১৯১৯-এর ভারত সংস্কার আইনে তারা মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র অধিকার স্বীকার করে মুসলমানদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করে। উইনস্টন চার্চিল (Winston Churchill) রাজা ষষ্ঠ জর্জকে একবার বলেছিলেন যে, “ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজকে চলে আসতেই হবে।” সেক্ষেত্রে জিন্নাহর হাতে স্বতন্ত্র ‘পাকিস্তান রাষ্ট্র’ তুলে দিয়ে ইংরেজ তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। সাংবাদিক দুর্গা দাস (Durga Das) তাই লিখেছেন: “Unknown at that time churchill played a key role in the creation of Paskistan.”)

কংগ্রেসের দায়িত্ব:

ইংরেজ ভারত বিভাগ চেয়েছিল, তাই আমরা তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি-এই যুক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের পক্ষে যথেষ্ট নয়। আমাদের মধ্যে বিরোধ ছিল, তাই তারা সুযোগ পেয়েছিল। তাই আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব কম নয়। এই প্রসঙ্গে ভারতে বৃহত্তম রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় কংগ্রেসের ভূমিকা এসে পড়ে। প্রশ্ন হল-কংগ্রেস কি ভারত বিভাগ এড়াতে পারত? কিংবা ভারত বিভাগের জন্য কংগ্রেস কতটা দায়ী ছিল?? একথা ঠিক যে, কংগ্রেস ভারত বিভাগ চায়নি। কিন্তু একথা আরও বেশি ঠিক, যে ছিদ্রপথে বিচ্ছিন্নতার বীজ ঢুকেছিল, তা বন্ধ করার ব্যাপারেও কংগ্রেস উদাসীন ছিল। কংগ্রেস মুসুলমানদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তারা মুসলমানদের কাছে টানতে ব্যর্থ হয়েছিল।

ব্রিটিশ বা জিন্নাহ কংগ্রেসকে ‘হিন্দু সংগঠন’ বলে যখন চিত্রায়িত করে, তখন কংগ্রেস তার কর্মসূচি দ্বারা সাধারণ মুসলমানদের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টা করেননি। তাই ড. অমলেশ ত্রিপাঠি মন্তব্য করেছেন, “কংগ্রেস প্রায় সকল স্বার্থ ও মতকে স্বপক্ষে আনতে সক্ষম হলেও মুসলমানদের ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছিল এবং সেই কারণে দেশ বিভাগ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।” আয়েসা জালাল অভিযোগ করেছেন, “জিন্নাহ নয়, রাজনীতির সাথে ধর্মকে মিশিয়ে দেন গান্ধি। তার রামরাজ্যের কল্পনা ভারতীয় জনজীবনের মূল স্রোত থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করেছেন।” হিন্দু মহাসভা, স্বয়ং সেবক সংঘ প্রভৃতি হিন্দু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বা দলগুলির কার্যকলাপ হিন্দু-মুসলিম বিচ্ছেদকে তীব্রতর করেছিল। তাই অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন: “ইংরেজ ভাগ করে দিয়ে গেল এটা-পূর্ণ সত্য নয়, কংগ্রেস ভাগ করিয়ে নিল-এটাও অনেকটা সত্য।”

মতামত:

মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী ও ঐতিহাসিকেরাও ভারত বিভাগের জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন। হীরেন মুখোপাধ্যায় লিখেছেন: “Partition turned unavoidable, on account, mainly of the congress leadership’s adherence to compromise with Britain at any price….” ড. সুমিত সরকার (Dr. Sumit Sarkar)-ও মন্তব্য করেছেন যে, “ক্ষমতার লোভে গণ-আন্দোলনের তীব্রতায় ভীত কংগ্রেস প্রথমে সমঝোতা ও পরে ভারত বিভাগ মেনে নেয়।” মার্কসাবাদীদের মতে, “১৯৪৫-১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তিগুলিকে একত্রিত করে কংগ্রেস যদি ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তুলত, তাহলে হয়তো ভারত বিভাগ এড়ানো যেত।”

অনিবার্য পরিণতি:

কংগ্রেসের দায়িত্ব মেনে নিয়েও বলা যায় যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশ বিভাগ মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। মুসলিম লিগে অসহযোগিতার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পাঞ্জাব ও বাংলায় লিগ পরিচালিত সরকার কংগ্রেস-শাসিত প্রদেশগুলি থেকে নিজেদের এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, যেন ওই দুটি রাজ্য ছিল কল্পিত পাকিস্তানের ক্ষুদ্র সংস্করণ। ১৯৪৬-এ জিন্নাহর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক এবং দেশব্যাপী রক্তের হোলিখেলা দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। কংগ্রেস ভেবেছিল যে, দেশ ভাগ না-হলে গৃহযুদ্ধ লাগবেই এবং তার বলী হবে অসংখ্য সাধারণ মানুষ, ধ্বংস হবে দেশের সহায় সম্পদ। তা ছাড়া, দেশীয় রাজাদের সমস্যাও কংগ্রেসকে বিব্রত করেছিল।

সিদ্ধান্ত:

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশ বিভাগের জন্য লিগ তথা জিন্নাহ ইংরেজ এবং কংগ্রেস প্রত্যেকেই কিছু না কিছু দায়ী। কার দায়িত্ব কতটা-সে বিষয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। তবে একথা সত্য যে, এরা কেউই প্রাথমিকভাবে দেশ বিভাগ চাননি। মুসলিম লিগের হঠকারী চিন্তা, জাতীয় কংগ্রেসের বালকসুলভ উদাসীনতা এবং ব্রিটিশ সরকারের নগ্ন শাসননীতি শেষ পর্যন্ত ভারত বিভাগ অনিবার্যই করে তুলেছিল। দুঃখ হল এই যে, যাদের সামনে রেখে এই বিভাজন অর্থাৎ সাধারণ হিন্দু ও মুসলমান-তারা কোনোভাবেই এর থেকে উপকৃত হয়নি।

ভারত বিভাজন

Leave a Reply