ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি

ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি- ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর (মহাত্মা গান্ধী) উত্থান ছিল একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার ভিত্তি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ এবং গান্ধীজির অহিংস অসহযোগের আদর্শ। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সত্যাগ্রহের কৌশল এবং সাধারণ মানুষের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। 

আরো জানুন – PGHI 2025 2ND Paper Suggestion

ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি আলোচনা কর।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে ব্যক্তির নাম সর্বাগ্রে স্মরণ করতে হয় তিনি হলেন মহাত্মা গান্ধী। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে এসে গান্ধিজি এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে ভারতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন। গান্ধীজী যখন ভারতবর্ষে ফিরে আসেন তখন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ এর অত্যাচারে জর্জরিত ভারতবাসী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য উদগ্রী হয়েছিল। সেই অবস্থায় গান্ধীজীর উত্থান অনেক সহজ হয়েছিল। গান্ধীজী ভারতবাসীকে সঙ্গে নিয়ে একের পর এক আন্দোলন সংগঠিত করে শেষ পর্যন্ত এ দেশ থেকে ব্রিটিশ কে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে গান্ধীজীর এই উদ্যান সম্ভব হল তা নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি

ভারতে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি :-

ক) রাজনৈতিক অস্থিরতা :-

ভারতবর্ষে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে এক রাজনৈতিক অস্থির অবস্থা তৈরি হয়েছিল। ভারতবাসী মনেপ্রাণে চেয়েছিল এ দেশ থেকে ব্রিটিশ প্রদর্শন ইংল্যান্ডে ফিরে যাবে। কিন্তু ভারতবাসীর মধ্যে যাতে ঐক্য বজায় না থাকে তার জন্য পরিকল্পনা করে ব্রিটিশ বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সমগ্র বাংলা জুড়ে এক চরম প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু হয়। বাংলার মানুষ জন বিদেশী দ্রব্য বর্জন করে স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের চাপে পড়ে ব্রিটিশ প্রদর্শন বঙ্গভঙ্গ রদ করে। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকালে এমন কোন বড় নেতা গড়ে ওঠেনি যারা পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিতে পারবে। কিংবা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারায় বাংলাকে নেতৃত্ব দিতে পারবে। সেই শূন্যস্থানে গান্ধীজীর উত্থান অনেক সহজ হয়েছিল।

খ) সুরাট ভাঙ্গান :-

১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে চরম বিবাদ দেখা দেয়। ভারতবর্ষে প্রয়োজন ছিল জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ যে পথে স্বাধীনতার সংগ্রামকে পরিচালিত করেছিল তাতে কোন সুফল দেখা যায়নি। সেই কারণে নরমপন্থী নেতৃবৃন্দের উপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ। সেই পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে চরমপন্থী আন্দোলন জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিভাগ চরম আকার ধারণ করে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের সুরাট কংগ্রেস অধিবেশনে। সুরাট কংগ্রেসের ভাঙনের কারণে ভারতে জাতীয় নেতৃবৃন্দের অভাব দেখা দেয় । এইভাবে ভারতবর্ষের জাতীয় নেতৃবৃন্দের অভাব গান্ধীজীর উদ্যানের পথকে প্রশস্ত করেছিল।

গ) স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা :-

দীর্ঘদিন ধরে ভারতবাসী ইংরেজদের দ্বারা অত্যাচারিত এবং শোষিত হওয়ার ফলে ধীরে ধীরে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে শুরু করে। ভারতবাসী চেয়েছিল এমন কোন নেতার আবির্ভাব ঘটক যে সমগ্র দেশের জনগণকে একত্রিত এবং ঐক্যবদ্ধ করে ব্রিটিশ বিরোধী বৃহত্তর সংগ্রাম বা আন্দোলনের সূচনা ঘটাবে। সেই আন্দোলন ওপর নির্ভর করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হবে। এই পরিকল্পনা থেকে দেশবাসীর একটা আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় যে এবারে স্বাধীনতার খুবই প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ভারতবর্ষে ইংরেজরা অত্যাচার করে আসছিল। এ কথা ভেবে অর্থাৎ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে জাগ্রত ছিল। এই আকাঙ্ক্ষাকে ভারতবাসী বাস্তবায়িত করার জন্য নেতা হিসেবে গান্ধীজিকেই চিহ্নিত করেছিল।  ফলে গান্ধীজীর উত্থান সহজ হয়ে ওঠে।

ঘ) গান্ধীজীর দক্ষতা :-

গান্ধীজী একজন দক্ষ নেতা ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধীজী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরেন। এবং তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গিয়ে যেভাবে জনগণকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালান তাতে গান্ধীজীর জনপ্রিয়তা এক ধাক্কায় বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। গান্ধীজী ভারতবর্ষের নিচু শ্রেণীর মানুষদের অর্থাৎ কৃষক , শ্রমিক , মজুরদের একত্রিত করে আন্দোলনের পথে সামিল করে। গান্ধীজীর এই দক্ষতা কেবলমাত্র সমাজের নীচু শ্রেণীর মানুষদেরকে নয় পাশাপাশি নারী সমাজকেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। গান্ধীজী তার বক্তৃতা দ্বারা সাধারণ মানুষকে সহজেই প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন এবং রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত করতে পেরেছিলেন।

ঙ) জাতীয় নেতৃবৃন্দের অভাব :-

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গান্ধীজীর আন্দোলন পর্যন্ত বেশ কয়েক বছর ভারতে কোন জাতীয় স্তরের নেতা গড়ে ওঠেনি। আসলে গান্ধীজীর পূর্বে ভারতবর্ষে এমন কোন নেত্রীবৃন্দ গড়ে ওঠেনি। যা সমগ্র দেশ জুড়ে জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার ফলে গান্ধীজী সহজেই তার নিজের কর্ম কুশলতা এবং রাজনৈতিক দক্ষতার ধারা ভারতবর্ষের জনসমাজকে প্রভাবিত করে এবং জাতীয় নেতৃবৃন্দের অভাবের সুযোগ নিয়ে তিনি নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুতরাং এইভাবে বলা যায় জাতীয় নেতৃবৃন্দের অভাব গান্ধীজীর উত্থানের পথকে প্রশস্ত করেছিল।

চ) অহিংস নীতি :-

গান্ধীজীর রাজনৈতিক দর্শনের মূল আদর্শ হলো অহিংস ও সত্যাগ্রহর নীতি। গান্ধীজি অহিংস ও সত্যাগ্রহ নীতি গ্রহণ করে তার রাজনৈতিক দর্শনকে সাজিয়েছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী গণ আন্দোলন গুলিতে গান্ধীজী অহিংসার নীতিতে বিশ্বাসী  ছিলেন। তিনি মনে করেন সত্যের পথে এবং অহিংসার নীতিতে বিশ্বাসী হলে একদিন ঠিকই উদ্দেশ্য পূরণ হবে। অর্থাৎ একদিন ঠিকই ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করা সম্ভব হবে। এর জন্য কোন হিংসার পথ গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। গান্ধীজী হিংসার পথকে সম্পন্নভাবে পরিহার করেন। গান্ধীজীর এই অহিংস ও সত্যাগ্রহের আদর্শ সহজেই ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পেরেছিল। ফলে গান্ধীজি সহজেই জনপ্রিয়তা লাভ করেন এবং জাতীয় নেতা হিসাবে পরিচিতি পান।

ছ) প্রথম তিনটি সত্যাগ্রহ আন্দোলন :-

গান্ধীজী ভারতবর্ষের পরিস্থিতি লক্ষ করে বিহারের চম্পারণে কৃষক, আমেদাবাদে সুতাকল শ্রমিক, এবং খেদাতে কৃষকদের স্বার্থে তিনটি সত্যাগ্রহ আন্দোলন পরিচালনা করেন। গান্ধীজীর নেতৃত্বে এই প্রথম তিনটি সত্যাগ্রহ আন্দোলন সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে গান্ধীজীর জনপ্রিয়তা কে বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। গান্ধীজীর প্রথম আন্দোলনে কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর মন জয় করে ফেলেছিল। সেই সূত্র ধরে গান্ধীজী একের পর এক আন্দোলন পরিচালনা করতে শুরু করে। দেশ জুড়ে গান্ধীজীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং গান্ধীজী একজন সাধারণ নেতা থেকে জাতীয় নেতাতে পরিণত হন।

∆ উপসংহার:-

ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গান্ধীজীর উত্থানের পথ যথেষ্ট কঠিন ছিল। ভারতবর্ষের পুরনো নেতারা গান্ধীজীর এই জনপ্রিয়তা কে সহজে মেনে নিতে পারেনি প্রথম দিকে।। কিন্তু ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ গান্ধীজীর এই আন্দোলন এবং তার জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে খুব সহজেই গ্রহণ করেছিল। গান্ধীজীর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলন গুলি ধীরে ধীরে এত বেশি জনপ্রিয়তা পায় যে গান্ধীজিকে একজন জাতীয় নেতাতে পরিণত হওয়ার পথে আর কোন বাধা রইল না। এভাবেই গান্ধীজী ধীরে ধীরে একজন সাধারণ নেতা থেকে একজন জাতীয় নেতাকে পরিণত হয়। গান্ধীজীর এই জনপ্রিয়তা তাকে পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলন, ভারতছাড়ো আন্দোলন ও আইন অমান্য আন্দোলনের মতো বৃহত্তর আন্দোলনের নেতৃত্বে উদ্যান ঘটিয়েছিল।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থানের পটভূমি

Leave a Reply