ভারতছাড়ো আন্দোলন কি একটি সতর্কিত বিস্ফোরণ

ভারতছাড়ো আন্দোলন কি একটি সতর্কিত বিস্ফোরণ বা সংগঠিত বিদ্রোহ ছিল – ভারতছাড়ো আন্দোলন ছিল একটি সুসংগঠিত বিদ্রোহের অংশ, যা মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে দেশব্যাপী একটি গণআন্দোলন। যদিও এটি মূলত অহিংস আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল, কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তারের পর এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি দেশব্যাপী বিদ্রোহে পরিণত হয়। 

READ MORE – অসহযোগ আন্দোলনে পটভূমি ব্যাখ্যা করো

ভারতছাড়ো আন্দোলন কি একটি সতর্কিত বিস্ফোরণ বা সংগঠিত বিদ্রোহ ছিল ?

উত্তরঃ

ক্রীপস মিশনের ব্যর্থতার ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং দেশবাসীর মনে ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতা প্রবল হয়ে ওঠে। সমকালীন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ঘটনাবলিও গান্ধিজিকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। জাপানী বাহিনির কাছে মালয়, সিঙ্গাপুর ও বঙ্গদেশের দ্রুত পতন গান্ধিজিকে তথা জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দকে ভারতীয় উপমহাদেশের নিরাপত্তা সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মাদ্রাজ ও বাংলাদেশের উপর জাপানি বাহিনির আক্রমণের সম্ভাবনা জনগণের মনে দারুন ত্রাসের সঞ্চার করে। এই অবস্থায় গান্ধিজি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ব্রিটিশের হাতে ভারতের প্রতিরোধ ব্যবস্থার দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে ভারতীয়দের সেই দায়িত্ব গ্রহণ করা সমীচিন। সুতরাং তিনি আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের হাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থার দায়িত্ব এবং ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে মোটেই উৎসাহী ছিলেন না। গান্ধিজি ‘হরিজন’ পত্রিকায় ব্রিটিশ সরকারকে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার উপদেশ দিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। কিন্তু তদানিন্তন পরিস্থিতিতে গান্ধিজির এই প্রস্তাব সম্বন্ধে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত হন। এই অবস্থায় গান্ধিজি প্রস্তাব করেন যে, ভারতের কয়েকটি বিশেষ অঞ্চলে ব্রিটিশ সেনানিবাস ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনি থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ভারতীয়দের হাতে হস্তান্তরিত করা চাই। গান্ধিজি স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন যে, যদি তাঁর এই প্রস্তাব কংগ্রেস গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হয় তাহলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করবেন এবং স্বতন্ত্রভাবে এক ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলবেন।

গান্ধিজির অনমনীয় মনোভাব লক্ষ করে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হন। ১৯৪২ খ্রি. ৮ই আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশন ‘ভারতছাড়ো’ প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয় যে ভারতের মঙ্গলের জন্য এবং জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠার সাফল্যের জন্য ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান অপরিহার্য। প্রস্তাব গৃহীত হবার পর গান্ধিজি জাতির উদ্দেশ্যে বলেন- “পূর্ণ স্বাধীনতা অপেক্ষা কম কোনো কিছুতেই আমি সন্তুষ্ট হবো না।”… করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে।

আন্দোলনের সূচনা-৮ই আগস্ট গভীর রাতে কংগ্রেসের অধিবেশন শেষ হলে, কয়েক ঘন্টার মধ্যে গান্ধিজি জওহরলাল নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং আজাদ সহ কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ৯ আগস্ট কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হলে দেশজোড়া স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হরতাল, মিছিল, বিক্ষোভএবং বিক্ষিপ্ত গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই তখন জেলে, জনগণকে পরিচালিত করার মতো তখন কেউ ছিল না। জনগণরা নিজেদের দ্বারাই বিদ্রোহ করতে শুরু করলো। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কারখানায় ধর্মঘট শুরু করল এবং টেলিফোন, টেলিগ্রাফের তার কাটা, রেললাইন চ্যুত করা, থানা, ডাকঘর, সরকারি অফিস আদালতগুলিতে অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি চলতে থাকলো। দিল্লি, কোলকাতা, বোম্বাই, লক্ষ্ণৌ, কানপুর, নাগপুর, আমেদাবাদ বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে ইংরেজ সেনাবাহিনিদের সপ্তাহব্যাপী সংঘর্ষ চলল।

বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম, উত্তরপ্রদেশ মধ্যপ্রদেশের চাষিরা এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমাজবাদী নেতা, জয়প্রকাশ নারায়ণ, নরেন্দ্রদেব, অরুনা আসফ আলী, সুচেতা কৃপালনী প্রমুখ এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মেদিনীপুরের তমলুক মহকুমা, কাঁথি মহকুমার পটাশপুর ও খেজুরি থানা, দিনাজপুরের বালুরঘাট, মহারাষ্ট্রের সাঁতারা প্রভৃতি স্থানে বিকল্প স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তমলুক ও তাম্রলিপ্তের জাতীয় সরকারে সর্বাধিনায়ক ছিলেন সতীশচন্দ্র সামন্ত। মেদিনীপুরের নারীসমাজও উৎসাহের সঙ্গে যোগদান করেন। মেদিনীপুরের ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা, আসামের ১৩ বছরের কিশোরী কনকলতা বরুয়া প্রমুখ বীরাঙ্গনা নারীর নাম আগষ্ট আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

সরকারি দমননীতি-নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির প্রস্তাব ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারও সক্রিয় হয়ে উঠলেন। ১৯৪২ খ্রি. ৯ই আগস্ট গান্ধিজিসহ কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করা হল। ভারতীয় জনগণ নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। সরকারের দমনীতির প্রতিবাদে সর্বত্র হরতাল পালিত হল এবং সভাযাত্রাও সভাসমিতি অনুষ্ঠিত হল। সরকার কঠোর হাতে আন্দোলন দমনে উদ্যোগী হলেন সর্বত্র ১৪৪ ধারা জারি করে সভাসমিতি নিষিদ্ধ করা হল। এবং লাঠি চালিয়ে সভাসমিতি ভেঙে দেওয়া হল। আন্দোলনের প্রকৃতি-আগস্ট আন্দোলনকে গান্ধিবাদী অহিংস আন্দোলন বলা

যথার্থ নয়, সরকার এই আন্দোলনকে প্ররোচনামূলক অভিহিত করলেও গান্ধিজি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ঘটনাবলিকে বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেন। অনেকের মতে জনগণ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ১৯৪৫ খ্রি. সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেসের কার্যনির্বাহক সমিতি বিদেশি সরকারের প্ররোচনামূলক কাজকে দায়ী করলেও একথা স্বীকার করে যে, কোনো কোনো অঞ্চলে জনগণ কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আদর্শের সংগ্রামের কৌশল হতে বিচ্যুত হয়। প্রকৃতপক্ষে গান্ধিজির নাম উল্লেখ না করলেও কোনো কোনো অঞ্চলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি বা ফরওয়ার্ড ব্লক।

আবার কোনো কোনো অঞ্চলে যেমন পূর্ব যুক্তপ্রদেশ, বিহার, বাংলার মেদিনীপুর ও গুজরাটে নেতৃত্বদেয় স্থানীয় নেতারা। আগস্ট আন্দোলন শুরু হলে গোঁড়া গান্ধিবাদীরা নিজেদের সরিয়ে নেন। এবং অবশিষ্ট অংশরা অল্পবিস্তর জড়িত হয়ে পড়েন। প্রথমদিকে আপত্তি থাকলেও আন্দোলনের প্রসারতার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকসভা এতে যোগ দেয়। ভগৎ সিংহের প্রেরণায় স্বশস্ত্র বিপ্লবীরা এই আন্দোলনে যোগ দেয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে লেখা এক চিঠিতে ভারতের বড়লাট মন্তব্য করেন যে চরিত্রের দিক দিয়ে আগস্ট আন্দোলন ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের তুলনায় অধিকতর ব্যাপক ও ভয়ঙ্কর।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে পরিপূর্ণভাবে স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ বলা চলে না। প্রসঙ্গত বলা যায় ১৯২০ খ্রি. পর জাতীয় কংগ্রেস সর্বভারতীয় গণজাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধানতম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে পরিণত হয় এবং সুদূর গ্রামাঞ্চলে জাতীয় কংগ্রেসের শাখা-প্রশাখা প্রসারিত। তাই ১৯৪২ খ্রি. ৮ই আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সূচনা হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কংগ্রেসের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও জনমানসে কংগ্রেসের ভাবমূর্তি অব্যাহত থাকে। কংগ্রেস অবৈধ ঘোষিত হলেও কংগ্রেস কর্মীরাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। তবে আন্দোলন পরিচালনায় কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল  অগ্রণী ভূমিকা নেয়।

ব্যর্থতা-ব্যাপকতা ও গভীরতা সত্ত্বেও কয়েকটি বিশেষ কারণে আগস্ট আন্দোলন ব্যর্থ হয়।-

ভারতছাড়ো আন্দোলন কি একটি সতর্কিত বিস্ফোরণ-

প্রথমত:

জনসাধারণ সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ছিল, এদের কোনো সংগঠন বা কর্মসূচি ছিল না।

দ্বিতীয়ত:

এই আন্দোলনের গতি ও প্রকৃতি সর্বত্র এক প্রকার ছিল না।

তৃতীয়ত:

মুসলীম লীগ হিন্দু মহাসভা, কমিউনিস্ট পার্টি উন্মত্ত প্রভৃতি দল ও গোষ্ঠী এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকায় ব্যর্থ হয়।

চতুর্থত:

নিষ্ঠুর সরকারি দমননীতি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনসাধারণের অসম সংগ্রামে সরকার যে জয়যুক্ত হবে তা স্বতঃসিদ্ধ।

গুরুত্ব-প্রথমত:

ব্যর্থ হলেও এই আন্দোলনের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। বিপানচন্দ্র বলেন যে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ৪২এর আন্দোলন হল চূড়ান্ত পর্যায়। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, জনমনে কংগ্রেসের প্রভাব ব্যাপক ও সর্বাত্মক। আরও প্রসারিত হয় যে স্বাধীনতার জন্য জনসাধারণ প্রস্তুত এবং তা অর্জনের জন্য জনসাধারণ সবরকম অত্যাচার, লাঞ্ছনা, এমনকি মৃত্যুরণ করতেও প্রস্তুত।

দ্বিতীয়ত:

মুসলীম লীগ এই আন্দোলনে যোগ না দিলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও হিন্দু মুসলমান ঐক্য ছিল এই আন্দোলনের বিশাল সম্পদ। এই সময় কোনো সাম্প্রদায়িক বিরোধ ঘটেনি। বহু মুসলীম লীগ এই আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন এবং নানাভাবে আন্দোলনকারীদের সাহায্য করেন।

তৃতীয়ত:

প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলন ছিল গণবিপ্লব। এই আন্দোলনে শ্রমিক, কৃষক ব্যাপকভাবে সামিল হয়। জওহরলাল নেহেরু লেখেন যে, “নেতা নেই, সংগঠন নেই, উদ্যোগ নেই, মনোবল নেই, অথচ একটা অসহায় জাতি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কর্ম প্রচেষ্টার কোনো পন্থা না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল এই দৃশ্য প্রকৃতই বিস্ময়ের ব্যাপার।”

চতুর্থত:

বড়লাট ওয়াভেল ব্রিটিশ সরকারকে লেখেন যে, “ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দিন শেষ হয়ে এসেছে পুনরায় এইরকম একটি আন্দোলন শুরু হলে তা মোকাবিলা করার শক্তি সরকারের নেই।” অ্যায়ারল্যান্ড ও মিশরে যেভাবে ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। ভারতে এখনই তা করা দরকার এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে মুক্তিসংগ্রামে ভারতের জয় অনিবার্য।

পর্যালোচনা-

আপাত দৃষ্টিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন নিশ্চয় সফল হয়নি। কারণ ব্রিটিশ সরকার ভারত ত্যাগ করেনি। উপরন্তু যুদ্ধকালীন সামরিক প্রস্তুতি পূর্ণমাত্রায় নিয়োজিত করে ভারত ছাড়ো আন্দোলন দ্রুত দমন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারত ছাড়ো আন্দোলন নিশ্চয় বিফল হয়নি। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ব্যপ্তি ও গভীরতা থেকে প্রমাণিত হল সারা ভারতব্যাপী দেশবাসীর মনে ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভ কতটা প্রবল হয়ে উঠেছে। এই চাপা অসন্তোষ বহিঃগমণের সুযোগ পেল ভারত ছাড়ো। আন্দোলনে নির্ভিক চিত্ত মানুষের আত্মবলিদান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়।

ভারতছাড়ো আন্দোলন কি একটি সতর্কিত বিস্ফোরণ বা সংগঠিত বিদ্রোহ ছিল

Leave a Reply