বিংশ শতাব্দীর পারম্যে জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব

বিংশ শতাব্দীর পারম্যে জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব 1905-1919 – বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, বিশেষ করে ভারতে, জঙ্গি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছিল, যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছিল। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের ক্ষোভ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। 

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, ইউরোপে জঙ্গি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে, যা পুরাতন সাম্রাজ্যগুলোকে ভেঙে নতুন জাতিরাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত হয়েছিল। এই সময়ে, প্রতিটি জাতি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সচেষ্ট হয়ে ওঠে এবং নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যকে অন্যদের থেকে উন্নত বলে মনে করতে শুরু করে। এই মনোভাব থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের আগ্রাসী ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, যা শান্তি ও পারস্পরিক সহাবস্থানকে বিঘ্নিত করে।

বিংশ শতাব্দীর পারম্যে জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব 1905-1919

আরও জানুনঃঠান্ডা লড়াই

বিংশ শতাব্দীর পারম্যে জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব ও বিকাশকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ?

ভূমিকাঃ

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দুই শতক ধরে ভারতের জাতীয় আন্দোলন মূলত মডারেট বা নরমপন্থী নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু উনিশ শতকের শেষের দিকে কংগ্রেস নেতাদের একাংশ নরমপন্থীদের এই আবেদন নিবেদন নীতির বিরোধী হয়ে ওঠে। তারা নরমপন্থী নেতাদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি বলে সমালোচনা করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেন। ভারতের ইতিহাসে এই মতবাদ চরমপন্থী বা সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত। মহারাষ্ট্রের বালগঙ্গাধর তিলক, পাঞ্জাবের লালা লাজপৎ রায় এবং বাংলায় অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল, অশ্বিনী কুমার দত্ত প্রমুখ ছিলেন চরমপন্থী মতবাদের প্রধান প্রবক্তা। চরমপন্থী বা সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উৎপত্তির কতগুলি কারণ ছিল।

এই জঙ্গি জাতীয়তাবাদের মূলে ছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যেখানে প্রতিটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের উপনিবেশ ও প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠে। জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের মতো দেশগুলোতে এই প্রবণতা বিশেষভাবে দেখা যায়, যেখানে সামরিক শক্তি ও যুদ্ধকে জাতীয় সম্মান ও গৌরব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হতো। দেশের অভ্যন্তরে, এই মতবাদ প্রচারের জন্য শিল্প, সাহিত্য, এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়, যা জনগণের মনে ঘৃণা ও উগ্র দেশপ্রেমের বীজ বপন করে।

সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের কারণ

① ইংরেজদের অর্থনৈতিক শোষন:

ব্রিটিশ সকারের অর্থনৈতিক শোষণ চরমপন্থা বিকাশে সহায়তা করেছিল। শুল্ক আইণ ও কার্পাস আইন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ খুলে দিয়েছিল। দাদাভাই নওরোজি তাঁর ‘Poverty and Un-British Rule in India’ গ্রন্থে এবং রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর ‘Economic History of India’ গ্রন্থে ব্রিটিশদের শোষণ নীতির চিত্র সুন্দর ভাবে তুলে ধরেন। ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধি, কুটির শিল্পের ধ্বংস সাধন, শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় প্রতি বৈষম্য, ভারতে ব্রিটিশদের অবাধ বাণিজ্য নীতি প্রভৃতির ফলে ভারতে দারিদ্র বৃদ্ধি পায়। ১৮৯৬-১৯০০ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে দক্ষিণ ভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতবাসীর মৃত্যু হয়। অর্থনৈতিক শোষণে দেশে বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং দ্রব্যমূল্যের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফলে ভারতীয়রা বুঝতে পারে চরমপন্থী আন্দোলন ছাড়া আর কোন পথ নেই।

② বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র ও দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রভাব:

ফরাসী বিপ্লবের ক্ষেত্রে যেমন মন্তেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো প্রমুখ দার্শনিক জাতির মনে বিপ্লবের আগুন জালিয়ে ছিলেন, তেমনি ভারতের ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র, দয়ানন্দ সরস্বতী ও বিবেকানন্দ জনগণের মধ্যে চরমপন্থী বা সংগ্রামী জাতীয়তাবাদ প্রচার করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর আনন্দমঠ উপন্যাসের মাধ্যমে ভারতের যুবসমাজের মধ্যে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের বীজ বপণ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম্ সঙ্গীত জাতীয়মন্ত্রে পরিণত হয়। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রতিষ্ঠিত ‘আর্য সমাজ’ ধর্মীয় ও সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ প্রসারে সাহায্য করে। স্বামী বিবেকানন্দ প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের আদর্শের সমন্বয়ে ভারতীয় যুব সমাজের সমস্ত জড়তা ত্যাগ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে আহ্বান জানান।

③ বৈদেশিক প্রভাব:

ভারতবাসী যখন ইংরেজ শাসনে অসন্তুষ্ট তখন এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিস্ময়কর পরিবর্তন ভারতীয়দের মনে শক্তির জোগান ঘটায়। রুশ-জাপান যুদ্ধে ক্ষুদ্র জাপানের কাছে বিশালাকৃতি রাশিয়ার পরাজয় ভারতীয়দের উৎসাহিত করে। তাছাড়া আবিসিনিয়ায় ইতালীর পরাজয় এবং বুয়রের যুদ্ধে ইংরেজের পরাজয়ের ভারতীয়দের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। জার শাসিত রাশিয়া, মিশরে নাহার পাশার বৈপ্লবিক সংগ্রাম এবং তুরস্ক ও চীনের সাধারণ মানুষের জয়যাত্রার ফলে ভারতীয়রা বুঝতে পারে যে, কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

(4) কার্জনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি:

লর্ড কার্জনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল নীতি’ ভারতে সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তীব্রতর করে। কার্জন ভারতীয়দের প্রতিবাদে কান না দিয়ে ‘কলকাতা কর্পোরেশন আইন’ ও ‘ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস করেন। তিনি কেবলমাত্র ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসনের অধিকার খর্ব করেন এর পাশাপাশি তিনি শিক্ষিত ভারতবাসী দের যোগ্য মর্যাদা দিতে রাজি ছিলেন না। সবশেষে সকলের সমগ্র জাতির প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাংলায় চরমপন্থী আন্দোলন গর্জে ওঠে তা ক্রমেই মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব ও মাদ্রাজে ছড়িয়ে পরে। ডক্টর অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন, “চিন্তার দিক থেকে চরমপন্থার যতই প্রস্তুতি থাকুক, কার্জনের নীতি তাকে দানা বাঁধতে সাহায্য করেছিল”।

⑤কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিকদের অভিমত:

কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিকগণ যথা ডেভিডওয়া শরুক,গর্ডন জনসন প্রমুখ কংগ্রেসের গোষ্ঠী দ্বন্দে কোনো আর্দশগত ভিত্তি খুঁজে পায়নি। তাদের মতে জাতীয় কংগ্রেসের ভিতরে যে গোষ্ঠীদ্বন্ধ দেখা দেয় তার ফলেই চরমপন্থী আন্দোলনের উদ্ভব হয়েছিল। তাদের মতে, বাংলায় বিপিন চন্দ্র পাল, পাঞ্জাবের লালা লাজপৎ রায়, বোম্বাইয়ে বালগঙ্গাধর তিলক প্রমুখ উগ্রপন্থার সমর্থকেরা কংগ্রেসে ক্ষমতা দখল করতে না পেরে উগ্রপন্থী আন্দোলনের আশ্রয় নিয়েছিল। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার ও সরকারি চাকরি লাভে ব্যর্থ শিক্ষিত যুব সমাজের অনেকেই চরমপন্থা গ্রহণ করে।

উপসংহারঃ

চরমপন্থী নেতাদের কার্যকলাপ মোটেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না, তারা রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে জড়িয়ে অজান্তেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বল করেছিল। গণপতি উৎসব, শিবাজী উৎসব, দুর্গা ও কালী পূজা প্রভৃতির মাধ্যমে মুসলমান সাম্প্রদায়কে তারা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তবে সূক্ষ্ম বিচারে নরমপন্থীদের সঙ্গে চরমপন্থীদের তফাৎ ছিল শুধুমাত্র চরম মানদণ্ডে এবং অধিকতর কড়া সমালোচনার মানসিকতায়; ব্যক্তিগত সংঘাত একেবারে ছিল না। সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল আবেদন নিবেদন নীতির পরিবর্তে সক্রিয় আন্দোলন ও প্রকৃত স্বরাজ লাভ।

এই পরিস্থিতিতে, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে। বলকান অঞ্চলের দেশগুলো যেমন সার্বিয়া, বুলগেরিয়া এবং গ্রিস তাদের স্বাধীনতা ও নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই শুরু করে। এই সংঘাতগুলো ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো এক ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা করে। এই জঙ্গি জাতীয়তাবাদের প্রভাব শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথও প্রশস্ত করে।

এই জঙ্গি জাতীয়তাবাদের ফল ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি কেবল ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির কারণ হয়নি, বরং এটি জাতিগত ঘৃণা, বিভেদ এবং অসহিষ্ণুতাকে সমাজের গভীরে ছড়িয়ে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, যখন জাতীয়তাবাদ তার সংকীর্ণ সীমানা অতিক্রম করে আগ্রাসী রূপ ধারণ করে, তখন তা মানব সভ্যতার জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। আজকের বিশ্বে এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতিগত সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের গুরুত্ব উপলব্ধি করা অপরিহার্য।

দুজন নরমপন্থী নেতার নাম হল:

দাদাভাই নওরোজি এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

দুজন চরমপন্থী নেতার নাম হল:

বালগঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়।

বিংশ শতাব্দীর পারম্যে জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব

Leave a Reply