প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদান

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদান – প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক সাহিত্যিক উপাদান অপরিহার্য। দেশীয় সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় গ্রন্থ যেমন বেদ, পুরাণ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ, এবং ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য যেমন কাব্য, নাটক ও ব্যাকরণ। বৈদেশিক সাহিত্যিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে গ্রিক, রোমান ও চীনা পর্যটকদের বিবরণ, যা তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। 

READ MORE – জন লক-এর রাষ্ট্র চিন্তা

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদান

• সাহিত্যিক উপাদানের ভূমিকা:-

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানগুলিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-সাহিত্যিক উপাদান এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান।

        প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সাহিত্যিক উপাদানগুলিকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যথা- (1) দেশীয় সাহিত্য এবং (2) বৈদেশিক বিবরণী।

• দেশীয় সাহিত্য:-

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে দেশীয় সাহিত্যের ভাণ্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ। দেশীয় সাহিত্যগুলির মধ্যে বৈদিক যুগের সাহিত্য, মহাকাব্য, পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র, ষড়দর্শন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ, সংস্কৃত সাহিত্য, জীবনচরিত, আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

[1] বৈদিক সাহিত্য:-

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ শতকের আগের ভারতীয় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বৈদিক সাহিত্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্বেদ অর্থাৎ ঋক্, সাম, যজুঃ ও অথর্ব বেদ থেকে আর্যদের সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি নানা বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। এ ছাড়া বৈদিক সমাজ, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, অর্থনীতি প্রভৃতি জানতে সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ, সূত্র সাহিত্য প্রভৃতিও যথেষ্ট সাহায্য করে।

[2] মহাকাব্য:-

রামায়ণ ও মহাভারত-এই মহাকাব্যদুটির আনুমানিক রচনাকাল হল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের মধ্যে। প্রাচীনকালের বিভিন্ন রাজকাহিনি, আর্য-অনার্য সংঘর্ষ, দক্ষিণ ভারতে আর্য সভ্যতার বিস্তার, সমকালীন সামজিক অবস্থা প্রভৃতি জানার কাজে মহাকাব্য দুটি খুবই সহায়তা করে থাকে।

[3] পুরাণ:-

বৈদিক যুগের পরবর্তীকালের অনেক তথ্যের জন্য অষ্টাদশ পুরাণের অন্তর্গত ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ, কূর্মপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলিতে তৎকালীন বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান, রাজবংশ তালিকা, রাজার রাজত্বকাল, ভৌগোলিক পরিচিতি প্রভৃতি সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়।

[4] স্মৃতিশাস্ত্র:-

প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় আদর্শ ও সামাজিক বিধানগুলির ইতিহাস জানতে স্মৃতিশাস্ত্রগুলি খুবই সহায়ক। স্মৃতিশাস্ত্রগুলির মধ্যে মনু-স্মৃতি, নারদ-স্মৃতি, বৃহস্পতি-স্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি, কাত্যায়ন-স্মৃতি প্রভৃতি পরবর্তী বৈদিক যুগের সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান। তৎকালীন ধর্ম, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার আইন, সামাজিক বিধিনিষেধ প্রভৃতি জানতে এগুলি সহায়তা করে।

[5] ষড়দর্শন:-

ষড়দর্শনের মধ্যে সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্ব-মীমাংসা, উত্তর-মীমাংসা প্রভৃতি থেকে প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি, সমাজ সংগঠন, জাতি বিচার, রাষ্ট্রীয় কর্তব্য প্রভৃতি জানা যায়।

[6] বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ:-

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলি ভারত-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। মহাকাব্যের যুগের পরবর্তীকালের ইতিহাস রচনার জন্য বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলির মূল্য অপরিসীম। বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থের মধ্যে ত্রিপিটক অর্থাৎ বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক ও অভিধর্ম পিটক প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া, জাতক, দীপবংশ, মহাবংশ, আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প, ললিতবিস্তার, বুদ্ধচরিত প্রভৃতিও যথেষ্ট মূল্যবান গ্রন্থ। জৈন ধর্মগ্রন্থের মধ্যে দ্বাদশ অঙ্গ, জৈন কল্পসূত্র, জৈন ভাগবতী সূত্র, আচারাঙ্গ সূত্র, পরিশিষ্টপার্বণ, প্রবন্ধচিন্তামণি, প্রবন্ধকোষ প্রভৃতি সমকালীন ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে জানার উল্লেখযোগ্য উপাদান।

[7] সংস্কৃত সাহিত্য:-

ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যা, আইন প্রকৃতি বিষয়ক বিভিন্ন সংস্কৃত গ্রন্থও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় বিশেষভাবে সাহায্য করে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গার্গীসংহিতা (জ্যোতির্বিদ্যা-বিষয়ক), ভাসের চাবুদত্ত, পাণিনি-র অষ্টাধ্যায়ী (ব্যাকনাণ), পতঞ্জলির মহাভাষা লাৎস্যায়নের কামসূত্র, কৌটিল্যের অর্থশাস্থ কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম্, রঘুবংশম্ এবং মালবিকাগ্নিমিত্রম্, বিশাখদত্তের দেবীচন্দ্রগুপ্তম, মুদ্রারাক্ষস প্রভৃতি।

[8] রাজ-বৃত্তান্ত ও জীবনচরিত:-

প্রাচীনকালের বিভিন্ন রাজ-বৃত্তান্ত ও জীবনীগ্রন্থ ইতিহাস রচনার মূল্যবান উপাদান। বাণভট্টের হর্ষচরিত, বিলহনের বিক্রমাঙ্কদেবচরিত, সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, জয়সিংহের কুমারশাল চরিত, পদ্মপুপ্তের নবসাহসাঙ্কচরিত, বাষ্পতিবাজের গৌড়বাহ, চাঁদবরদৈ-এর পৃথ্বীরাজচরিত প্রভৃতি গ্রন্থ সমকালীন রাজবংশের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

[9] আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থ:-

প্রাচীনকালে আঞ্চলিকভাবে লিখিত কিছু ইতিহাস গ্রন্থও পাওয়া যায় যেগুলি ইতিহাসের উপাদান হিসেবে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-কলহনের রাজতরঙ্গিনী (কাশ্মীরের ইতিহাস) সোমেশ্বরের রাসমালা ও কীর্তিকৌমুদী (গুজরাটের ইতিহাস), অরিসিংহের সুকৃতিসংকীর্তন, মেরুতুঙ্গের প্রবন্ধচিন্তামণি, নন্দিক কলম্বকাম ও কলিঙ্গত্ব-পরাণি (দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস) প্রভৃতি।

• দেশীয় সাহিত্যিক উপাদানের ত্রুটি:-

(1) বৈদিক সাহিত্য মোটেই ইতিহাস গ্রন্থ নয়। তাই এখান থেকে তথ্য সংগ্রহের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। (2) মহাকাব্য দুটিতে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যেগুলি অতিরঞ্জন দোষে দুষ্ট। (3) পুরাণগুলিতে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন লোককাহিনি ও কিংবদন্তি এমনভাবে মিশে গেছে যে তা থেকে সাবধানে তথ্য সংগ্রহ না করলে অনেক ক্ষেত্রে তথ্য পরিবেশনে ভুল হতে পারে। (4) রাজাদের জীবনীগ্রন্থগুলি অনেক সময় রাজার সভাসদরা লিখতেন বলে তাতে রাজার কৃতিত্ব সম্পর্কে অতিরঞ্জন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়।

• বৈদেশিক বিবরণী:-

প্রাচীনকালে বিভিন্ন সময় ধর্ম, বাণিজ্য, ভ্রমণ, রাজ্যজয় প্রভৃতি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পর্যটক ভারতে এসেছিলেন এবং তাঁরা অনেকেই তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখে গিয়েছেন যা আজকের দিনে ইতিহাস রচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর মধ্যে গ্রিক, রোমান, চৈনিক, তিব্বতীয়, আরবি প্রমুখ পর্যটকদের বিবরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

[1] গ্রিক বিবরণ:-

(1) ইতিহাসের জনক’ হেরোডোটাস কখনও ভারতে না এলেও তাঁর ইতিহাসমালা থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারতে পারসিক অভিযানের ইতিহাস জানা যায়। (2) টেসিয়াসের ইন্ডিকা নামক গ্রন্থও সমকালীন ভারতের নানা তথ্যে সমৃদ্ধ। (3) আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর তিন অভিযান-সঙ্গী নিয়ারকাস, এরিস্টোবুলাস এবং ওনেসিক্রিটাসের রচনায় এবং ডায়োডোরাসের বিবলিওথেকা হিস্টোরিকা, এরিয়ানের আনাবাসিস, জাস্টিনের এপিটোম, প্লুটার্ক-এর আলেকজান্ডারের জীবনী প্রভৃতি বিবরণে। (4) গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে ভারতে এসেছিলেন। তাঁর লেখা ইন্ডিকা গ্রন্থটি সমকালীন ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। (5) পলিবায়াসের সাধারণ ইতিহাস থেকে ভারতের বাত্নিক গ্রিক আক্রমণের কথা জানা যায়। (6) এ ছাড়া, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে জনৈক গ্রিক নাবিকের লেখা পেরিপ্লাস অফ দি এরিথ্রিয়ান সি বা ভারত মহাসাগরে ভ্রমণ, এবং টলেমির ভূগোল থেকে তৎকালীন ভারতের ব্যাবসাবাণিজ্য সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।

[2] রোমান বিবরণ:-

রোমান লেখক কুইন্টাস কার্টিয়াসের রচনায় আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের বিবরণ পাওয়া যায়। প্লিনির প্রাকৃতিক ইতিহাস (Natural History) (থকে সমকালীন সমুদ্রপথ এবং ভারতের সঙ্গে রোম ও গ্রিসের ব্যাবসাবাণিজ্য সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।

[3] চৈনিক ও তিব্বতীয় বিবরণ:-

চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে ভারতে এসে এদেশে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেন। তাঁর রচিত ফো-কুয়ো-কি একটি মূল্যবান গ্রন্থ। হর্ষবর্ধনের আমলে আগত হিউয়েন সাঙ সি-ইউ-কি (৬৩৯-৬৪৪ খ্রি.) নামক গ্রন্থে তাঁর ভারত ভ্রমণের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এ ছাড়া, ইৎ সিং-এর ভারতে বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত বিবরণী (৬৭১-৬৯৫ খ্রি.) এবং ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তিব্বতীয় ইতিহাসবিদ লামা তারকনাথের ভারতে বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি গ্রন্থটি মূল্যবান ঐতিহাসিক উপাদান।

[4] আরবীয় বিবরণ:-

ভারতে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিবরণ পাওয়া যায় সুলেমান, আল মাসুদি, আল বিলাদুরি, হাসান নিজামি, আল-বেরুনি প্রমুখের বিবরণে। সুলেমান দেবপালের আমলে এবং আল মাসুদি মহীপালের আমলে ভারতে আসেন। আরবীয় পন্ডিত আল-বেরুনি ১০২৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মামুদের সঙ্গে ভারতে আসেন। তাঁর তহকিক-ই-হিন্দ সমকালীন ভারতের সমাজ ও ধর্ম বিষয়ে একটি মূল্যবান গ্রন্থ।

• বৈদেশিক বিবরণীর সীমাবদ্ধতা:-

(1) ভারতের সঙ্গে সংযোগের অভাব: বিদেশি পর্যটকরা ভারতে খুব বেশিকাল কাটাননি বা তাঁরা ভারতের ভাষা, রীতিনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাই তাঁদের রচনার ভিত্তি দুর্বল। (2) জনশ্রুতি:- অনেক সময় বিদেশি পর্যটকরা লোকমুখে শোনা কথা বা কিংবদন্তির ওপর ভিত্তি করে তাঁদের বিবরণ রচনা করায় তা গল্পকাহিনিতে পরিণত হয়েছে। (3) পক্ষপাতিত্ব: নিরপেক্ষতা ছেড়ে বিদেশি পর্যটকরা অনেক সময় নির্দিষ্ট শাসকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন।

• উপসংহার:-

বিভিন্ন সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের সমন্বয়ে প্রাচীন ভারতের ধারাবাহিক যুক্তিনিষ্ঠ ইতিহাস রচিত হয়েছে। তবে সাহিত্যিক উপাদানগুলি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনের হাতে পড়ে নানা সময়ে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে। তাই সাহিত্যিক উপাদানগুলি ব্যবহারের সময় খুবই সচেতন থাকতে হয়। কোনো সাহিত্যিক উপাদানের তথ্য প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের দ্বারা সমর্থিত হলে তা নিশ্চিত উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা যায়। সাহিত্যিক উপাদানের এই ত্রুটি দূর করার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে অসুবিধা নেই।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদান

Leave a Reply